চট্টগ্রামের মেধস আশ্রম

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২৪ অক্টোবর ২০১৯ | ৯ কার্তিক ১৪২৬

অসুর দোলনী

চট্টগ্রামের মেধস আশ্রম

এস প্রকাশ পাল ১:৪৩ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ০৬, ২০১৯

print
চট্টগ্রামের মেধস আশ্রম

মর্ত্যে দেবী দুর্গার আগমনস্থল হিসেবে খ্যাত চট্টগ্রামের বোয়ালখালী উপজেলার কড়লডেঙ্গা পর্বতশীর্ষে অবস্থিত চণ্ডীতীর্থ মেধস মুনির আশ্রম। এখানকার সন্ন্যাসী পাহাড়ে প্রায় ৬৮ একর জায়গাজুড়ে ৫ শত ফুট উচ্চতায় অরণ্য শোভিত পরিবেশে অবস্থিত ঐতিহাসিক এই মন্দির। এখানে রয়েছে দেবী ভগবতীর মূল মন্দির, রয়েছে চণ্ডী, শিব, সীতা, তারা কালী ও কামাক্ষ্যাসহ দৃষ্টিনন্দন আরও কয়েকটি মন্দির। মেধস ঋষি বর্ণিত ও মার্কণ্ডেয় কর্তৃক পুনরুজ্জীবিত চণ্ডীর অর্চনা প্রাচীনকাল থেকেই বাংলায় প্রচলিত ছিল। ‘সপ্তসতী চণ্ডী’ গ্রন্থের প্রথম অধ্যায়ে ‘মেধা ঋষির’ আশ্রমের কথা উল্লিখিত আছে। পবিত্র এ তীর্থভূমিতে হাজার হাজার বছর আগে দেবী ভগবতীর আবির্ভাব ঘটে। রাজ্যহারা রাজা সুরথ ও স্বজন পরিত্যক্ত বণিক সমাধি বৈশ্য উপস্থিত হয়েছিলেন এখানকার মেধস মুনির আশ্রমে।

মেধস আশ্রমে মুনিপদে তাদের দুঃখের কথা ব্যক্ত করলেন। মেধস ঋষি সুরথ ও সমাধি বৈশ্যের জাগতিক দুঃখ-দুর্গতির কথা শুনে মুনি শোনালেন, ‘মধুময়ী চণ্ডী’। ঋষির উপদেশ শুনে রাজা সুরথ ও সমাধি বৈশ্য অরণ্য অভ্যন্তরে ঋষি মেধসের আশ্রমে মৃন্ময়ী মূর্তি গড়ে সর্বপ্রথম মর্ত্যলোকে দশভুজা দুর্গাদেবীর পূজা শুরু করেছিলেন।

মেধস আশ্রম নিয়ে রচিত গ্রন্থ সূত্রে জানা গেছে, বরিশালের গৈলা অঞ্চলের পণ্ডিত জগবন্ধু চক্রবর্তীর ঘরে ১২৬৬ বঙ্গাব্দের ২৫ অগ্রহায়ণ জন্ম নেন চন্দ্রশেখর। জন্মের দু’বছর পর মারা যান তার পিতা। মায়ের অনুরোধে ১৪ বছর বয়সে বিয়ে করেন মাদারীপুরের রাম নারায়ণ পাঠকের কন্যা বিধুমুখীকে। ছয় মাস পর মারা যান স্ত্রী। এর কিছুদিন পর মারা যান মা। সংসারে আপন বলতে আর কেউ রইল না।

একাকীত্ব জীবনে এসে চন্দ্রশেখর নানা বেদ শাস্ত্র পাঠ করে হয়ে ওঠেন পরিচিত পণ্ডিত। তখন নাম হলো শীতলচন্দ্র। তিনি মাদারীপুরে প্রতিষ্ঠা করেন সংস্কৃত কলেজসহ নানা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। পরবর্তীতে যোগীপুরুষ স্বামী সত্যানন্দের সঙ্গে সাক্ষাতের পর চন্দ্রশেখরের মনে চন্দ্রনাথ দর্শনের আগ্রহ জন্মে। তিনি চলে আসেন চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের চন্দ্রনাথ পাহাড়ে। সেখানে তিনি বৈরাগ্য ধর্ম গ্রহণ করেন। ততদিনে চন্দ্রশেখর হয়ে ওঠেন বেদানন্দ স্বামী। সেখানে যোগবলে বেদানন্দ দর্শন লাভ করেন চন্দ্রনাথের (শিব)। চন্দ্রনাথ সেই দর্শনে বেদানন্দকে পাহাড়ের অগ্নিকোণে দৃষ্টি নিবদ্ধ করার আদেশ দিয়ে বলেন, ‘দেবীর আবির্ভাবস্থান মেধস আশ্রম পৌরাণিক শত সহস্র বছরের পবিত্র তীর্থভূমি।

কালের আবর্তে সেই পীঠস্থান অবলুপ্ত হয়ে পড়েছে। তুমি স্বীয় সাধনবলে দেবীতীর্থ পুনঃআবিষ্কার করে তার উন্নয়নে মনোনিবেশ কর। দেবী দশভুজা দুর্গা তোমার ইচ্ছ পূরণ করবে।’ দৈববলে প্রভু চন্দ্রনাথের আদেশে বেদানন্দ স্বামী পাহাড়-পর্বত পরিভ্রমণ করে পবিত্র এ তীর্থভূমি মেধাশ্রম আবিষ্কার করেন। সনাতন ধর্মাবলম্বীদের পদচারণায় এখন সবসময় মুখরিত থাকে মেধস মুনির আশ্রম। দানবীর অদুল চৌধুরীর অর্থায়নে নির্মিত সুদৃশ্য কামাক্ষ্যা মন্দির দৃষ্টি কাড়ছে সবার। এছাড়া রাম-সীতা মন্দিরকে ঘিরে পুকুর সংস্কার ও দর্শনার্থীদের ওঠা-নামার সুবিধার্থে নির্মিত হয়েছে শতাধিক ধাপের সিঁড়ি। ধ্যানে মগ্ন সুবিশাল শিব বিগ্রহ বাড়িয়েছে আশ্রমের শোভা।

বোয়ালখালী পূজা উদযাপন পরিষদ সভাপতি অজিত বিশ্বাস ও সম্পাদক লিটন শীল বলেন, ভক্ত-দর্শনার্থী ও পূজার্থীদের সমাগমে নিত্য মুখরিত হয় চণ্ডীতীর্থ মেধস মুনির আশ্রম। এখানে এখনো দুর্গাপূজা চলছে সাড়ম্বরে। তবে যোগাযোগ ব্যবস্থার করুণ অবস্থা। প্রতি বছর শুভ মহালয়ার মাধ্যমে সূচনা হয় দেবী পক্ষের।

আশ্রমের অধ্যক্ষ বুলবুলানন্দ ব্রহ্মচারী বলেন, সনাতন ধর্মাবলম্বীদের প্রধান ধর্মীয় উৎসব দুর্গাপূজার উৎপত্তি এ মেধস মুনির আশ্রমে। সড়ক যোগাযোগের করুণ অবস্থার জন্য আশ্রমে আসা পুণ্যার্থীদের দুর্ভোগ সইতে হচ্ছে। সরকার সেদিকে একটু নজর দিলে ইতিহাস সমৃদ্ধ মেধস আশ্রম বিশাল পর্যটন স্পটে পরিণত হবে। দর্শনার্থীদের যোগাযোগের দুর্ভোগ লাঘবে সরকারের সুদৃষ্টি কামনা করি।