সার্বজনীন ও বৈপ্লবিক তাৎপর্য

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২৪ অক্টোবর ২০১৯ | ৯ কার্তিক ১৪২৬

অসুর দোলনী

সার্বজনীন ও বৈপ্লবিক তাৎপর্য

যতীন সরকার ১:৩৩ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ০৬, ২০১৯

print
সার্বজনীন ও বৈপ্লবিক তাৎপর্য

দুর্গাপূজা বাঙালি হিন্দুর ধর্মীয় কৃত্য। তবে, ধর্মীয় কৃত্য হলেও, মনে রাখা প্রয়োজন : সম্প্রদায়-নির্বিশেষে কোনো বাঙালিরই ধর্ম ধ্রুপদী শাস্ত্রের পূর্ণ অনুসারী নয়। লৌকিক চেতনাদীপ্ত সকল বাঙালির ধর্মকেই মনীষী বিনয়কুমার সরকার ‘বাঙালি ধর্ম’ আখ্যা দিয়েছিলেন। সেই ধর্মই বাঙালি হিন্দুদের পুরাণ ভাবনায় ও অনুষ্ঠান-পরিকল্পনায় দুর্গাপূজার মধ্যে এক অভিনব রূপ ধারণ করেছে। এ রকমটি ঘটানো হয়েছে রামায়ণের মতো প্রাচীন ভারতের মহাকাব্যের বাঙালিকরণ ঘটিয়ে।

মধ্যযুগের বাঙালি কবি কৃত্তিবাস সংস্কৃত ভাষায় রচিত বাল্মীকি রামায়ণের মূল কাঠামোটি বজায় রেখেই বাংলায় রামায়ণ রচনা করেছিলেন বটে, কিন্তু এর কাহিনী বিন্যাসে ও চরিত্র-চিত্রায়ণে তিনি এমন সব অভিনব রূপান্তর ঘটান, তা একান্তভাবেই বাঙালির নিজস্ব মহাকাব্যে পরিণত হয়ে যায়। কৃত্তিবাসের হাতে রামচন্দ্র হয়ে যান দুর্গাপূজারি, দুর্গাপূজা করেই তিনি রাবণ বধের শক্তি লাভ করেন। অথচ, বিশ্বজগতের পালনকর্তা দেবতা বিষ্ণুর অবতাররূপে পূজিত শ্রীরামচন্দ্র অন্য কোনো দেবতার পূজা করবেন- এমন কথা স্বপ্নেও ভাবতে পারেন না উত্তর ভারত তথা বাংলার বাইরের হিন্দুরা। সেই হিন্দুরা রামচন্দ্রের শুধু পূজাই করেন না, রামের নাম করে অনেক অঘটনও ঘটিয়ে থাকেন।

বাঙালির দুর্গাপূজাও তাই সাম্প্রদায়িক ধর্মকৃত্যের সীমায় আবদ্ধ থাকে না, পরিণত হয়ে যায় সর্বজনীন উৎসবে। সর্বজনীন দুর্গোৎসব আবার বাঙালির বৈপ্লবিক ভাবনারও ধারক হয়ে ওঠে। কৃত্তিবাস যে ভাবনার সূচনা ঘটিয়েছিলেন, প্রাক-আধুনিক কালেই তার উত্তরসূরি কবিবৃন্দ সে ভাবনায় ক্রমাগত নতুন নতুন মাত্রার সংযোগ ঘটিয়ে চলেন। আধুনিককালে এসে মাইকেল মধুসূদন দত্ত থেকে শুরু করে রবীন্দ্রনাথ এবং বুদ্ধদেব বসু পর্যন্ত অনেকের হাতেই আরও নতুনতর মাত্রা সংযোজিত হয়েছে। পুরাণের নবনব জন্ম সংঘটিত হয়েছে। তবে বিপ্লবী কবি কাজী নজরুল ইসলাম যে দৃষ্টিতে পুরাণের নবজন্ম ঘটিয়েছেন, বিশেষ করে রামায়ণের কাহিনী ও চরিত্রগুলোর যে ভাষ্য নির্মাণ করে সে-সবের ভেতর যে বৈপ্লবিক মাত্রার সংযোজন ঘটিয়েছেন, তা একেবারেই অভিনব ও অভূতপূর্ব।

রামায়ণের অন্তর্গত বিভিন্ন আখ্যান ও বর্ণিত চরিত্রের যে তাৎপর্য নজরুল উদ্ঘাটন করেছেন, তেমনটি তার আগে কারও চিন্তাতেই আসেনি। জগৎ ঘটকের সংগ্রহ থেকে প্রাপ্ত নজরুলের একটি রচনার খসড়ায় তো এ বিষয়টি একেবারেই স্ফটিক স্বচ্ছরূপে ধরা পড়েছে। নজরুলের বিবেচনায় রামায়ণের অন্যতম চরিত্র জনক হলেন সেই মানুষদের প্রতিনিধি যারা ‘শস্য বা ফসল উৎপাদন করে’। আর সীতা ‘জনক বা শস্য-উৎপাদকের কন্যা’ অর্থাৎ ‘শস্য’। রাম হলেন ‘জনগণ বা কৃষকের প্রতিনিধি’। রাবণ ‘সেই শস্য বা সীতাকে হরণ করে, সে ‘লোভের’ প্রতীক। ‘যে বিশ হাত দিয়ে লুণ্ঠন করে, দশ মুখ দিয়ে গ্রাস করে’ সে-ই রাবণ। কৃষকের প্রতিনিধি রাম সেই লুণ্ঠনকারী ধনিক রাবণকে হত্যা করে ‘শস্য’ বা সীতাকে উদ্ধার করেন। আবার রামায়ণেই আছে সীতার পাতাল-প্রবেশের কাহিনী। নজরুলের দৃষ্টিতে এর তাৎপর্য হলো : ‘রাম অর্থাৎ কৃষকদের প্রতিনিধি যখন শস্যকে অবহেলা করে জনগণের দুর্বুদ্ধিপ্রসূত স্বর্ণকে গ্রহণ করেন, তখন শস্য পাতালে প্রবেশ করেন। অর্থাৎ শস্য উৎপাদিকা শক্তিকে অবহেলা করে স্বর্ণরৌপ্যকে (স্বর্ণসীতাকে) বড় করে ধরলে দেশের সমূহ সর্বনাশ হয়।’

পূজাকে কেন্দ্র করে যে উৎসব তা-ও উৎসবের মূল মর্মকে পরিত্যাগ করে হয়ে ওঠে বহিরঙ্গসর্বস্ব। কোথাও কোথাও তা নানা ক্লেদাক্ততা ও আবিলতায় একান্ত পঙ্কিলও হয়ে ওঠে।অবশ্য এ রকমটি যে কেবল একালেই ঘটছে, তা নয়। একালে বরং দুর্গোৎসবের অনেক বেশি গণায়ন ঘটেছে এবং তার ফলে ক্লেদাক্ততা ও আবিলতাও অনেক পরিমাণে প্রতিরুদ্ধ হয়েছে। ইতিহাস থেকে জানা যায়, ষোড়শ শতাব্দীতে রাজশাহীর তাহিরপুরের রাজা কংসনারায়ণ বহু লক্ষ টাকা ব্যয় করে শারদীয় দুর্গাপূজার সাড়ম্বর অনুষ্ঠান করেন। সেই থেকেই এই দুর্গাপূজা বাঙালি হিন্দুর বিশেষ ধর্মীয় ঐতিহ্যে পরিণত হয়ে যায়।

তবে রাজা কংসনারায়ণ কেবল যে একটি ধর্মীয় ঐতিহ্যই সৃষ্টি করেছিলেন, তেমন কথাও বলা যায় না। রাজার আসল উদ্দেশ্য ছিল ঐশ্বর্য প্রদর্শন। অর্থাৎ ঐশ্বর্যের দাপট দেখানো। সেই থেকে দুর্গাপূজাকে কেন্দ্র করে ঐশ্বর্যশালীদের দাপট দেখানোর একটি অপঐতিহ্যও সৃষ্টি হয়ে গিয়েছিল। সেই ঐতিহ্য অষ্টাদশ শতাব্দীতে নদীয়ার রাজা কৃষ্ণচন্দ্র ও তার উত্তরসূরিরা বেশ নিষ্ঠার সঙ্গেই বহন করে যেতে থাকেন! তারপর ঊনবিংশ শতাব্দীতে কলকাতা নগরীকে কেন্দ্র করে যে নব্যধনী বা ‘হঠাৎ নবাবদের’ উদ্ভব ঘটে, তারা সে ঐতিহ্যকে আরও বেগবান (!) করে ফেলেন।

অশ্লীল কদর্য নৃত্যগীত, মদ্যপান ও বেশ্যাগমন- তাদের দুর্গাপূজার অপরিহার্য অনুষঙ্গী হয়ে পড়ে। ঐসব উপসর্গ যুক্ত হওয়ার পর পূজা ও উৎসব- দুই-ই চরিত্রভ্রষ্ট হয়ে যায়।ওইসব উপসর্গ যেখানে খুব প্রকট নয়, সেখানেও পূজা ও উৎসব চরিত্রভ্রষ্ট। এই চরিত্রভ্রষ্টতা দূর করা ও ‘পূজা অভিনয়’কে অভিনয় মুক্ত করার জন্যই সচেতন জনগণের প্রতি নজরুলের আহ্বান।