দুর্গোৎসব সবার সম্প্রীতির বন্ধন

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২৪ অক্টোবর ২০১৯ | ৯ কার্তিক ১৪২৬

অসুর দোলনী

দুর্গোৎসব সবার সম্প্রীতির বন্ধন

স্বপন সাহা ১:২৮ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ০৬, ২০১৯

print
দুর্গোৎসব সবার সম্প্রীতির বন্ধন

দুর্গাপূজা ঐতিহাসিকভাবে বাঙালি হিন্দু সম্প্রদায়ের সর্ববৃহৎ ধর্মীয় উৎসব। বিভিন্ন রাষ্ট্রের বাঙালি অধ্যুষিত অঞ্চলগুলোয় শারদীয় দুর্গোৎসব ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান ও উৎসবের আমেজে পাঁচ দিনব্যাপী সব সম্প্রদায়ের মধ্যে এক সুন্দর সম্প্রীতির পরিবেশের সৃষ্টি করে। সবার কাছে আজ ব্যাপকভাবে গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়েছে শারদীয় দুর্গোৎসব। দুর্গাপূজার প্রধান আবেদন হলো, ‘দুষ্টের দমন শিষ্টের পালন’, অর্থাৎ সব অশুভ শক্তিকে নির্মূল করার জন্যই পৃথিবীতে প্রতি বছর দুইবার দেবী দুর্গার আগমন হয়। প্রাচীনকাল থেকেই বছরের চৈত্র মাসে বসন্তকালে বাসন্তী নামে পৃথিবীতে মা দুর্গা আবির্ভূত হন, যা হিন্দু সম্প্রদায়ে বাসন্তী পূজা হিসেবে উদযাপন করা হয়।

রাক্ষস রাজা রাবণ রামচন্দ্রকে যুদ্ধে পরাভূত করার জন্য কৌশল হিসেবে তার সহধর্মিণী সীতাকে অপহরণ করে লঙ্কায় নিয়ে যায়। রামচন্দ্র সীতাকে উদ্ধারের জন্য শরৎকালে অকালবোধনের মাধ্যমে মা দুর্গাকে আবাহন করেন। তখন থেকেই শরৎকালে এই শারদীয় পূজার প্রচলন শুরু। ভক্তরা বাসন্তী মায়ের আরাধনা করেন সব প্রাণীর দুঃখ-দৈন্য, অভাব-অনটন, রোগমুক্তি, অন্যায়-অবিচার, অত্যাচার দূর করে, মানুষের তথা দেশের সুখ, সমৃদ্ধি ও শান্তিময় জীবনের আশায়।

শারদীয় উৎসবের উদ্দেশ্য একই, তবে বাসন্তী পূজার তুলনায় শারদীয় সর্বজনীনতা ও উৎসবের ব্যাপকতা অনেক বেশি। শরতের শিশিরভেজা শিউলি ফুলের গন্ধ, কাশফুলের শুভ্রতা, আকাশজুড়ে শরতের সাদা মেঘ সবই যেন মা দুর্গার আগমন বার্তা নিয়ে আসে ভক্তদের মধ্যে। তখন থেকেই শুরু হয়ে যায় দেবীকে বরণ করে নেওয়ার আয়োজন।

ইতিহাসে কথিত আছে, প্রায় ২০০ বছর আগে রাজশাহীর রাজা কংস নারায়ণ প্রথম শরৎকালে দুর্গোৎসব শুরু করেছিলেন। অতীতে রাজা-জমিদাররাই এ পূজা করতেন।

মাসব্যাপী এ উৎসবের আমেজ ওই অঞ্চলের সব মানুষ উপভোগ করত। যেহেতু দুর্গাপূজা উৎসবের আঙ্গিকে একটি ব্যয়বহুল পূজা, সেহেতু প্রথমে শুধু রাজা ও জমিদাররাই এ আয়োজন করতেন। দুর্গাপূজা পরবর্তী পর্যায়ে সবার অংশগ্রহণের মাধ্যমে সর্বজনীন পূজা হিসেবে প্রচলিত হয়। আজ দুর্গাপূজার সর্বজনীনতা সবার কাছে ব্যাপকভাবে সমাদৃত ও জনপ্রিয়। তাই শারদীয় দুর্গাপূজা শুরু হওয়ার প্রায় দুই মাস আগে থেকে পূজার প্রস্তুতি চলে বিভিন্ন মন্দির, আশ্রম, সংগঠন, শহর-বন্দর, উপজেলা ও জেলা শহরে। বিশেষ করে বিভিন্ন সংগঠন মা দুর্গা তার সন্তান লক্ষ্মী, সরস্বতী, গণেশ, কার্তিক ও স্বামী ভগবান মহেশ্বরকে সঙ্গে নিয়ে মর্ত্যে আগমন করেন।

অসুর শক্তি নিধনের প্রতীকী মূর্তিতে আমরা মা দুর্গাকে মহিষাসুর বধ করার দৃশ্যে দেখতে পাই। কে কত সুন্দর ও আকর্ষণীয়ভাবে তা প্রতিষ্ঠা করতে পারে এ নিয়ে বিভিন্ন পূজামণ্ডপের আয়োজকদের মধ্যে শুরু হয় তুমুল প্রতিযোগিতা। প্রতিমার মৃৎশিল্পীদের মধ্যেও প্রতিযোগিতা শুরু হয় কে কত সুন্দর ও শৈল্পিক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে প্রতিমা নির্মাণ করে আয়োজকদের মধ্যে নিজেদের গ্রহণযোগ্যতা বাড়াতে পারেন। ধর্মীয়ভাবে প্রচলিত আছে যে মা দুর্গা এ সময় তার স্বামী-সন্তানদের নিয়ে বাপের বাড়িতে আসেন, তাতে ব্যাপক আয়োজন হবে বৈকি! বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকে পূজা বেড়েই চলেছে। স্বাধীনতার পর সারা দেশে পূজার সংখ্যা ছিল চার থেকে পাঁচ হাজারের মতো। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় পূজার সংখ্যা ব্যাপকভাবে বেড়ে গেছে। বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদের পরিসংখ্যান অনুযায়ী গত বছর সারা দেশে প্রায় ২৯ হাজার মণ্ডপে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হয়েছে।

এখন সব রাজনৈতিক দলের নেতা, বুদ্ধিজীবী, সুধীসমাজসহ সব শ্রেণি-পেশার মানুষ বাঙালি হিন্দু ঐতিহ্যের সর্ববৃহৎ ধর্মীয় উৎসব দুর্গাপূজায় মণ্ডপে যায় এবং এর মধ্য দিয়ে ধর্মে ধর্মে, বর্ণে বর্ণে, গোত্রে গোত্রে ভাব বিনিময়ের মাধ্যমে এক মহা মিলনমেলার সৃষ্টি হয়। এতে আমাদের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির বন্ধন আরও দৃঢ় হয়। বিভিন্ন রাষ্ট্রের বাঙালি অধ্যুষিত অঞ্চলে শারদীয় দুর্গোৎসবের ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান ও উৎসবের আমেজে পাঁচ দিনব্যাপী সব সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যে এক সুন্দর সম্প্রীতির পরিবেশের সৃষ্টি হয়। আজ এ উৎসব সব মানুষের কাছে ব্যাপকভাবে গ্রহণযোগ্যতা অর্জন করেছে এবং বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়েছে।

এখানে বিশেষভাবে উল্লেখ্য যে, ভারতের সাবেক পশ্চিমবঙ্গ, বর্তমানে ‘বাংলা’ রাজ্যসহ আসাম, ত্রিপুরা ও অন্যান্য বাঙালি হিন্দু অঞ্চলে দুর্গাপূজার আনন্দ-উদ্দীপনা, আকর্ষণ ও ব্যাপকতা দেশ-বিদেশে বিশেষভাবে আলোচিত এবং প্রশংসিত। তা ছাড়া আমেরিকা, কানাডা, ইউরোপ, অস্ট্রেলিয়া, সিঙ্গাপুর, নেপালসহ বিশে^র অন্যান্য স্থানেও এই শারদীয় দুর্গোৎসব বেশ জাঁকজমকপূর্ণভাবেই পালিত হচ্ছে।