ক্ষুধার রাজ্যের হাতেমতাঈ

ঢাকা, শুক্রবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৯ | ৫ আশ্বিন ১৪২৬

ক্ষুধার রাজ্যের হাতেমতাঈ

গহিন পাহাড়েও

বাতিঘর ডেস্ক ১:০৪ অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ০৯, ২০১৯

print
ক্ষুধার রাজ্যের হাতেমতাঈ

সভ্যতার বিদ্যুৎ এখনও সেখানে অধরা। যোগাযোগ বলতে পা-ই ভরসা। বলার অপেক্ষা রাখে না, পাহাড় কতটা বন্ধুর। তবুও সেখানকার প্রত্যন্ত অঞ্চলে পৌঁছে গেছে বিদ্যানন্দ ফাউন্ডেশন।

পাহাড়ের দায়িত্বে থাকা অনিন্দ্যের সঙ্গে মোবাইলে যখন কথা হয়, তিনি নিজেই আলুর বস্তা নিয়ে এতিমখানার দিকে যাচ্ছেন। সেখানে পৌঁছে বাকি আলোচনায় জানালেন, প্রায় দেড়শ’ এতিম শিশু নিয়ে সেখানে এতিমখানা স্থাপন করা হয়েছে। বিশাল সোলার প্যানেল বসিয়ে টেলিভিশন থেকে সব ধরনের আধুনিক সুবিধা নিশ্চিত করা হয়েছে। এখানেও স্বেচ্ছাসেবীর ভিত্তিতে লেখাপড়া ও আহার জোগানো হচ্ছে।

এখানে টাকা থাকলেই আবার সবকিছুর আয়োজন করা কঠিন। সব সময় ভালো খাবার আয়োজন করা সম্ভব হয় না। নিত্যপণ্যের দামও তুলনামূলক বেশি। সঙ্গে অতিরিক্ত পরিবহন খরচের ঝামেলা তো রয়েছেই।

তবে দিন শেষে যখন দেড়শ’ অভুক্ত শিশুর হাসিমুখ দেখেন এখানকার স্বেচ্ছাসেবকরা, তখন অনাবিল সুখ সব পরিশ্রমকে শান্তিতে পরিণত করে। পাহাড়ের সুবিধাবঞ্চিত এসব শিশুকে আলোর মুখ দেখানোর এ উদ্যোগ সকলের সহযোগিতায় পরিচালিত হচ্ছে।

এক টাকায় আহার প্রকল্প শুরু হয় ২০১৬ সালের জুনে। চট্টগ্রামে মাত্র ৩০ জন পথশিশুর মাঝে খাবার বিক্রি করে শুরু হয় এ কার্যক্রম। সে সময় বিদ্যানন্দে পড়ুয়া শিক্ষার্থীদের সকালে শুকনো খাবার দেওয়া হতো ক্লাস শেষে। খাবার প্রজেক্টটিকে আরও বড় পরিসরে করতে প্রথম খাবার নিয়ে একটা নতুন কার্যক্রম শুরুর পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়।

২০১৩ সালের ২২ ডিসেম্বর নারায়ণগঞ্জ থেকে যাত্রা শুরু করে বিদ্যানন্দ ফাউন্ডেশন। পরিকল্পনা শেয়ার করেন বিদ্যানন্দের প্রধান স্বেচ্ছাসেবক কিশোর কুমার দাশ। দানের খাবার গ্রহণ করার মধ্যে এক ধরনের হীনম্মন্যতা কাজ করে গ্রহিতার মধ্যে। খাবার নিতে শিশুরা যেন হীনম্মন্যতায় না ভোগে, বরং গর্ব করতে পারে, সে কারণে খাবার বিতরণের পরিবর্তে বিক্রি করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। আর এর বিনিময় মূল্য হিসেবে ধরা হয় এক টাকা, যেটা বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে সবচেয়ে কম টাকা। এ বিনিময় মূল্যের কারণে শিশুরা আমাদের কাছ থেকে খাবার কিনে খায়। দানের খাবার নেয় না, যেটা তাদের মধ্যে কিনে খাওয়ার অভ্যাস সৃষ্টি করে, সে সঙ্গে তাদের কিনে খাওয়ার আনন্দ বা কিনে খাওয়ার গুরুত্ব উপলব্ধি করতে শেখানো হয়। এখানে যারা খাবার বিতরণ করেন, তাদের মধ্যেও কোনো প্রকার অহংকার কাজ করতে পারে না। কারণ তারা খাবার দিচ্ছেন না, খাবার বিক্রি করছেন।

বিদ্যানন্দ ফাউন্ডেশনের ঢাকা শাখার দায়িত্বে থাকা সালমান জানান, আমাদের আর ওদের মাঝে ভিক্ষা বা করুণার শব্দটি মুছে দিতেই মূলত এক টাকা নেওয়া হয়। আর এ খাবার বিক্রি করে আমরা তাদের অনুপ্রাণিত করতে চাই। কারণ ছোট বেলায় এ খাবারের মাধ্যমেই আমাদের সবচেয়ে বেশি আপন আমাদের মায়ের সঙ্গে পৃথিবীর সেরা সম্পর্কটি সৃষ্টি হয়। আর তাই সুবিধাবঞ্চিত শিশু ও পথশিশুদের সঙ্গে এ সম্পর্ক সৃষ্টি করতে আমরা মূলত খাবারকে মাধ্যম হিসেবে বেছে নিয়েছি।

১২ বছরের নিচে সুবিধাবঞ্চিত শিশু, ৬০ বছরের ওপরে বয়স্ক, শারীরিক বা মানসিক প্রতিবন্ধী আমাদের কাছ থেকে খাবার কিনতে পারে। শুরুটা ৩০ প্যাকেট দিয়ে চট্টগ্রাম জেলা থেকে শুরু হলেও বর্তমানে ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, রংপুর, রাজবাড়ী, কক্সবাজার, নারায়ণগঞ্জ ও বান্দরবানে চলে আমাদের এ কার্যক্রম। প্রতিদিন গড়ে ২ হাজার খাবার রান্না হয় সারাদেশে অবস্থিত আমাদের বিভিন্ন কিচেনে। ঢাকায় রান্না হয় প্রায় ৬৫০ জনের খাবার। ঢাকার এয়ারপোর্ট স্টেশন, রায়ের বাজার, মিরপুর দুয়ারীপাড়া বস্তি, ভোলা বস্তি, ভাষানটেক বস্তি, হাইকোর্ট, কমলাপুর স্টেশনসহ বিভিন্ন জায়গায় চলে এক টাকায় আহারের কার্যক্রম।

মূলত বিদ্যানন্দের স্বেচ্ছাসেবীরাই রান্নার কাজটি করে থাকেন। আইটেম হিসেবে সপ্তাহের বিভিন্ন দিন বিভিন্ন মেন্যু থাকে। খিচুড়ি, ডিম, নুডুলস, সবজির পাশাপাশি মোরগ পোলাও, তেহেরি, মিষ্টির ব্যবস্থা থাকে খাবার মেন্যুতে। বিদ্যানন্দের এক টাকায় আহার ছাড়াও আরও বিভিন্ন প্রকল্প ও কার্যক্রম রয়েছে। মূলত এক্সটার্ননাল অডিট ফার্মকে দিয়ে অডিট করিয়ে আর্থিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করছে বলে বিভিন্ন দাতারা এ প্রতিষ্ঠানে নিয়মিত অর্থ সহায়তা দিয়ে থাকেন, যার মধ্য দিয়ে এ কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।

আর্থিক সংকটে পড়লে আমরা কাজের পরিধি ছোট করব। কিন্তু ভবিষ্যতের জন্য সঞ্চয় করার নীতিতে চলে না বিদ্যানন্দ। তাই মাসে আসা ডোনেশন মাসেই খরচ করে সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের মুখে হাসি ফোটানোর কাজ করে বিদ্যানন্দ। যার কারণ এখন পর্যন্ত এ বিশাল কার্যক্রমটি দাতাদের দানের উপরেই পরিচালিত হচ্ছে।

উদ্যোক্তার প্রত্যাশা কী সে বিষয়ে তিনি বলেন, আমরা টিম হয়ে কাজ করি। তাই উদ্যোক্তার নাম কিংবা কোনো প্রকার বক্তব্য প্রকাশ করতে চাচ্ছি না। একজন যেমন আইডিয়া শেয়ার করে, তেমনি অন্যরা সে আইডিয়া কার্যকর করতে শ্রম দিয়ে যায়। সবাই একটা টিম হয়ে কাজ করি।