সময়ের ভাষ্যকার

ঢাকা, শুক্রবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৯ | ৫ আশ্বিন ১৪২৬

আবুল মনসুর আহমদ

সময়ের ভাষ্যকার

আন্দালিব রাশদী ১:২৭ অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ০৮, ২০১৯

print
সময়ের ভাষ্যকার

কথাসাহিত্যিক আবুল মনসুর আহমদ আমার প্রিয় মানুষ হলেও আমি তাকে বিবেচনা করেছি চারজন মানুষ হিসেবে। সাফল্য কমবেশি চারজনেরই। একজন আবুল মনসুর আহমদের মধ্যে যে চারজনকে পেয়েছি গুরুত্বের ক্রমানুসারে তারা হচ্ছেন- একজন রাজনীতিবিদ যিনি মন্ত্রী এমনকি ভারপ্রাপ্ত প্রধানমন্ত্রীও হয়েছেন, প্রাক ১৯৪৭ এবং উত্তর ১৯৭১-এর একজন বস্তুনিষ্ঠ রাজনীতিক ভাষ্যকার, একজন সফল কথাসাহিত্যিক, পূর্ব বাংলার নিজস্ব সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ গ্রহণকারী এবং সংস্কারক।

প্রাক ১৯৪৭ বাংলা এবং সাতচল্লিশোত্তর পাকিস্তান রাজনীতির যে বৈশিষ্ট্য-শঠতা, জন-প্রতারণা, ভুয়া মেনিফেস্টো মিথ্যা আশ্বাস, আবুল মনসুর আহমদ ভেতর থেকে দেখেছেন এবং অবলীলায় তা লিখে গেছেন। আবার এই রাজনীতির ভেতর থেকেই গণআন্দোলন এবং স্বাধীনতা লড়াই কেমন করে দানা বেঁধেছে তিনি তাও তুলে ধরেছেন।

এ সময় রাজনীতিতে তার প্রধান ভূমিকা পলিটিক্যাল নিগোশিয়েটর ও পলিটিক্যাল ক্যাটালিস্ট হিসেবে। দলিলপত্রে ১৫-২০ জন স্বাক্ষরদাতার একজন হিসেবে কেউ কেউ আস্ফালন করে বেড়ান, কিন্তু সাতচল্লিশোত্তর পাকিস্তানে তখনকার পূর্ব বাংলায় যে একুশ দফা রাজনীতির গতি ও ধারা পাল্টে দিল, তার অন্যতম প্রণেতা আবুল মনসুর আহমদ- এটি তেমন উচ্চারিত হয় না।

পাকিস্তান কেমন রাষ্ট্র হবে-তার স্পষ্ট ধারণা তিনি পাকিস্তান হাসিলের অনেক আগেই জানিয়ে দিয়েছিলেন। ১৯৪৪-এ আনুষ্ঠানিক সভায় সভাপতি হিসেবে তিনি বলেছিলেন, ‘পাকিস্তান দাবিটা প্রধানত কালচারাল অটনমির দাবি। রাষ্ট্রীয় স্বাধীনতার চেয়ে কালচারাল অটনমি অধিক গুরুত্বপূর্ণ। এদিক হইতে পাকিস্তানের দাবি শুধু মুসলমানদের সাম্প্রদায়িক দাবি নয়, এটা গোটা ভারতের কালচারাল মাইনরিটির দাবি। ভারতীয় মুসলমানরা হিন্দু হইতে আলাদা জাত তো বটেই, বাংলার মুসলমানরাও পশ্চিমা মুসলমানদের হইতে পৃথক জাত। শুধু ধর্ম জাতীয়তার বুনিয়াদ হইতে পারে না।’ ১৯৭১-এর রক্তাক্ত সংগ্রাম এ থিসিসটিকেই প্রতিষ্ঠিত করেছে।

আমার দেখা রাজনীতির ৫০ বছর রচনা কোনো সাহিত্যিকের কাজ নয়, রাজনীতিবিদেরও নয়, সাবেক কোনো মন্ত্রীরও নয়। এ কাজটি অনুসন্ধিৎসু একজন মানুষের, যিনি সাংবাদিকও এবং ঘটে যাওয়া বিষয়গুলোর প্রেক্ষাপট যার জানা। আবুল মনসুর আহমদ আসলে সময়ের ভাষ্যকার। তিনি সময়ের ইতিহাস লিখেছেন, নিজস্ব টীকা-টিপ্পনীসহ। তার আত্মকথার একাংশও এই গ্রন্থের সঙ্গে সংযুক্ত হতে পারে। এটি একটি আকর গ্রন্থ। বাংলাদেশের শতবর্ষের রাজনৈতিক ইতিহাস হোক কি কেবল গণঅভ্যুত্থানের ইতিহাস হোক, সূত্রগ্রন্থ হিসেবে ‘আমার দেখা রাজনীতির পঞ্চাশ বছর’ কাছে না পেলে ইতিহাস অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। এক জীবনে এমন একটি বই-ই যথেষ্ট।

আবুল মনসুর আহমদের সাহিত্যকর্ম নিয়ে আলোচনা কমই হয়েছে। যারা করেছেন তাদের অনেকেই তার সাহিত্যকর্মে ‘ব্যঙ্গ’ ছাড়া আর তেমন কিছু খুঁজে পাননি। অবশ্য ব্যঙ্গ ও শ্লেষ তিনি কখনো কখনো ব্যবহার করেছেন তার ভাষাকে বহন করার জন্য। তার কাহিনীকে পাঠকের কাছে ত্বরিত পৌঁছে দেওয়ার জন্য এবং ব্যঙ্গাত্মক চিত্রকল্পে আমাদের কার কী অবস্থান তা বুঝিয়ে দেওয়ার জন্য।

সৈয়দ ওয়ালিউল্লাহর ‘লালসালু’ (১৯৪৮-এ প্রকাশিত) নিঃসন্দেহে বাংলা সাহিত্যে একটি উজ্জ্বল মাইলফলক। কিন্তু মোল্লাতন্ত্র ও লেবাসধারীদের ধর্ম ব্যবসা নিয়ে আরও প্রায় দুই দশক আগে যে সাহসী রচনা আবুল মনসুর আহমদ প্রকাশ করেছেন, এ কালের ‘শতকিয়া ও ‘হাজারি’ বুদ্ধিজীবীদের কেউ সে সাহস দেখাতে পারেননি। ব্যঙ্গ ও শ্লেষ ব্যবহার করে হুজুরের মুখোশ উন্মোচনের হুজুর কেবলা ও বাংলা গল্পের একটি উজ্জ্বল মাইলফলক। শুধু ‘হুজুর-কেবলা’র মতো স্পষ্ট, বস্তুনিষ্ঠ, শিল্পসম্মত গল্প বাংলা সাহিত্যে দ্বিতীয়টি নেই।

ধর্মের নামে ভ-ামির বিরুদ্ধে আমাদের রাজনৈতিক বক্তব্যের কমতি নেই। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত বক্তব্যদাতাদের অনেকের ভেতরেই কোনো না কোনো আদলে একজন হুজুর কেবলা বাস করেন, তাদের কীর্তি হুজুরের সাগরেদ-মুরিদদের মতো জনগণও কমবেশি জানে। সে জন্য এসব বক্তব্যের প্রভাব অতি সামান্যই।

আমরা সম্ভবত লিবারেশনের আগে বেশি লিবারেল ছিলাম, আবুল মনসুর আহমদ তাই মুরতাদ ঘোষিত হননি। গল্প লেখার জন্য অন্তত রাষ্ট্রীয় ‘টিকটিকি’ তাকে হেনস্তা করেনি। হুজুর কেবলা হোক না আবার নবম-দশম শ্রেণির পাঠ্য! মানুন আর নাই মানুন, ‘হুজুর কেবলা’ একটি ধ্রুপদ কাহিনী। ‘আদু ভাই’-এর কথা মনে পড়ে? তিনি বরাবর ক্লাস সেভেনেই পড়তেন। স্কুলের শিক্ষকদের কারও কারও তিনি সহপাঠী ছিলেন। আটাত্তর বছর আগে প্রকাশিত আবুল মনসুর আহমদের ‘আদু ভাই’ গল্পটি আদু ভাই-এরই গল্প? আমাদের নয়?

প্রযুক্তির মহাসড়কে পা দিয়েও আমরা মানুষ হিসেবে প্রমোশন পাচ্ছি না। কেন? অনতিক্রম্য ক্লাস সেভেনেই রয়ে যাচ্ছে। আদু ভাই অন্তত ভালো মানুষ ছিলেন, আমরা হীন মানুষই রয়ে গেছি।
(সংক্ষেপিত)