নিষিদ্ধপল্লী থেকে আলোয়

ঢাকা, শুক্রবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৯ | ৫ আশ্বিন ১৪২৬

নিষিদ্ধপল্লী থেকে আলোয়

বাতিঘর ডেস্ক ১:২৮ অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ০২, ২০১৯

print
নিষিদ্ধপল্লী থেকে আলোয়

১৯৯৭ সালে এসএসএস টাঙ্গাইলে অবস্থিত প্রায় দেড়শ’ বছরের পুরনো কান্দাপাড়া যৌনপল্লীর বাসিন্দা যৌনকর্মীদের অবহেলিত, নিগৃহীত নোংরা ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে জন্ম নেওয়া শিশুদের উদ্ধার করে সমাজের মূলধারায় তাদের প্রতিষ্ঠিত করার প্রয়াস নিয়ে একটি প্রকল্প গ্রহণ করে।

কাজটি যে অতটা সহজ ছিল না তা হাড়ে হাড়ে টের পান এসএসএসের কর্মীরা। শুরুতে কান্দাপাড়া যৌনপল্লীর পূর্ব পাশে ফাঁকা জায়গায় শিশুদের ডেকে এনে বই-খাতা হাতে তুলে দিয়ে লেখাপড়ার সুযোগ করে দেয়। শিশুদের সেখানে ধরে রাখতে বিস্কুট, চকলেট ও দুপুরের খাবারের ব্যবস্থাও করা হয়। এভাবে বেশ কিছুদিন চলে। কিন্তু দেখা যায় শিশুদের সেই যৌনপল্লীর দিকেই ঝোঁক বেশি। এরপর যৌনপল্লীর অদূরে একটি ভাড়া বাসায় কার্যক্রম চলতে থাকে। সেখানে অবশ্য শিশুদের একটু উন্নতি দেখতে পায় এসএসএস। যা আশার আলো জাগায়।

এরপর ৪০ শিশু নিয়ে শহরের কোদালিয়ায় সেভ হোম নাম দিয়ে একটি বাড়িতে আবাসিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে কাজ শুরু করা হয়। সেখানে কাজ শুরুর পর থেকেই স্থানীয়দের বাধার মুখে পড়তে হয় সংস্থাটির। ওদের সঙ্গে মিশে নিজেদের সন্তান খারাপ হয়ে যাবে এ ভয়ে স্থানীয় লোকজন যৌনপল্লীর শিশুদের এলাকায় মেনে নিতে পারেনি। স্থানীয় প্রাথমিক বিদ্যালয় এমনকি মসজিদে নামাজ পড়তে গেলেও শিশুদের বাধা দেওয়া হয়।

এ অবস্থায় সংস্থার শীর্ষ কর্মকর্তারা এলাকার মুরুব্বিদের বার বার কথা বলে বোঝাতে থাকেন। যৌনপল্লীর শিশু হলেও তাদের সমাজে মানুষের মতো মানুষ হয়ে বেঁচে থাকার অধিকার আছে। ওরাও সমাজের একেকজন ভালো মানুষ হয়ে বাঁচতে চায়। এসব নানা দিক বুঝিয়ে স্থানীয়দের ম্যানেজ করা হয়। এ অবস্থায় চলতে থাকে যৌনপল্লীর শিশুদের জন্য গড়ে তোলা সেভ হোমটি। ১৯৯৯ সালে টেরে ডেস হোমস নেদারল্যান্ডস এর অর্থায়নে এগিয়ে আসে।

যদিও বর্তমানে সম্পন্ন এসএসএসের অর্থায়নে পরিচালিত হচ্ছে হোমটি। সে বছরই টাঙ্গাইল সদর উপজেলার মগড়া ইউনিয়নের কুইজবাড়ি গ্রামে প্রায় নয় একর জায়গার মধ্যে এসএসএস প্রতিষ্ঠা করে সোনার বাংলা চিলড্রেন হোম। সেখানে সাত থেকে আট বছরের ১০০ শিশু নিয়ে পথচলা শুরু সোনার বাংলা চিলড্রেন হোমের।

এসএসএসের পরিচালক (ইসিডিপি) আব্দুল লতিফ মিয়া এ প্রসঙ্গে প্রতিবেদককে জানান, স্থানীয় বাসিন্দাদের বদ্ধমূল ধারণা ছিল যৌনপল্লীর শিশুদের সঙ্গে মিশে তাদের সন্তানরা নষ্ট হয়ে যাবে। সে কারণে তারা বাধা হয়ে দাঁড়ায়।

এলাকার লোকজন বিভিন্ন ধরনের বাধার সৃষ্টি করে প্রতিনিয়ত। শিশুদের স্থানীয় কোনো প্রাইমারি স্কুলে ভর্তি না করিয়ে হোমের ভেতরেই পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পড়ালেখার ব্যবস্থা করে সংস্থাটি। প্রাথমিক শিক্ষা সমাপ্ত করে উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা গ্রহণে আবারো বাধার সম্মুখিন হতে হয় তাদের। প্রথমে স্থানীয় উচ্চ বিদ্যালয়ে ভর্তি করতে রাজি হয়নি স্কুল কর্তৃপক্ষ। ওই বিদ্যালয়ের অভিভাবকরা কঠিনভাবে বাধা হয়ে দাঁড়ান।

যৌনপল্লীর সন্তানদের সঙ্গে তাদের সন্তানরা পড়ালেখা করবে- এটা কোনোভাবেই মেনে নিতে পারেনি স্থানীয়রা। স্কুল কর্তৃপক্ষও রাজি হয়নি। অগত্যা হোমের শিশুদের ভর্তি করাতে আবারও দফায় দফায় এসএসএস কর্তৃপক্ষের আলোচনা চলে স্থানীয়দের সঙ্গে।

একইভাবে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে চলে দফায় দফায় আলোচনা। এক পর্যায়ে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সহযোগিতার হাত বাড়ান। ওই শিক্ষক শিশুদের ভর্তি করতে রাজি হন। এর ফলে প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিত করার পর উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়ালেখার সুযোগ সৃষ্টি হয় অবহেলিত ও সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের।