বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে কিছু কথা

ঢাকা, শুক্রবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৯ | ৫ আশ্বিন ১৪২৬

বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে কিছু কথা

শামসুর রাহমান ৫:৪৬ অপরাহ্ণ, আগস্ট ১৫, ২০১৯

print
বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে কিছু কথা

তাকে যখন প্রথম দেখি তখন তিনি ছিলেন শুধু শেখ মুজিবুর রহমান। ১৯৪৯ সালের মার্চ মাস। তখন আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের দাবি আদায়ের আন্দোলনে নেতৃত্ব দিচ্ছেন তরুণ তেজী নেতা শেখ মুজিব। এই আন্দোলনে যুক্ত ছিলেন অলি আহাদ, কে জি মোস্তফা এবং আরও কেউ কেউ। শেখ মুজিবের নেতৃত্বে আমরা কিছুসংখ্যক সাধারণ ছাত্র তখন ভাইস চ্যান্সেলরের বাসভবন ঘেরাও করেছিলাম। আমার মতো ভেতর-গোঁজা মানুষের পক্ষে কোনো মিছিল কিংবা ঘেরাও কর্মসূচিতে যোগ দেওয়া খুব সহজ ছিল না সেকালে। বিশ্ববিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের ন্যায্য দাবি আদায়ের আন্দোলনে কী করে যে সেদিন ঝাঁপিয়ে পড়েছিলাম তা ভাবলে এখনো বিস্মিত হই। সেদিন ভাইস চ্যান্সেলরের সবুজ পাতা-অলা ছোট ছোট গাছের বেড়া-ঘেরা বাসভবনের সামনে, মনে পড়ে, দশাসই ঘোড়সওয়ার পুলিশের তাড়া খেয়েছিলাম। একটি বলবান অশ্বের খুরের ঠোকর আর পুলিশের ব্যাটনের বাড়ি খেতে খেতে বেঁচে যাই কোনো মতে।

দীর্ঘকায়, কান্তিমান শেখ মুজিব তার কথা এবং জ্বলজ্বলে দৃষ্টি আমাদের অনুপ্রাণিত করছিলেন, জাগাচ্ছিলেন সাহস। সেদিন ঘোড়ার পায়ের নিচে পড়ে থেঁতলে গেলেও হয়তো কোনো খেদ থাকত না। প্রকৃত নেতার প্রেরণার শক্তি বোধহয় এরকমই হয়। শেখ মুজিবকে দ্বিতীয়বার দেখি সৈয়দ আওলাদ হোসেন লেনে। তিনি যাচ্ছিলেন রিকশায়। তার পাশে কে একজন ছিলেন, চিনতে পারিনি। শেখ মুজিবের পরনে ছিল মেটে রঙের খদ্দরের পাঞ্জাবি, সাদা পায়জামা এবং কালো কাবুলি চপ্পল। চোখে কালো ফ্রেমের চশমা, চশমার আড়ালে এক জোড়া দীপ্তিমান চোখ। আমি মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিলাম তার দিকে। তিনিও আমার দিকে তাকালেন ক্ষণিকের জন্য। আমাকে তার চেনার কথা নয়। তবু সেই সন্ধানী দৃষ্টিতে পরিচয়ের সূত্র খোঁজার আভাস ছিল।

এরপর দীর্ঘকাল তাকে দেখিনি। জেনেছি তার একজন যুবনেতা থেকে পূর্ব বাংলার প্রথম সারির অন্যতম জননেতা হয়ে ওঠার কথা। ধাপে ধাপে তিনি এগিয়ে গেছেন মহত্ত্ব এবং অমরত্বের দিকে। পাকিস্তানি স্বৈরশাসকরা তাকে বারবার কারাবন্দি করেছে, কারণ তিনি বাঙালিদের স্বার্থরক্ষার ব্যাপারে ছিলেন আপসহীন। ব্যক্তিগত আরাম-আয়েশ ত্যাগ করে, আরাম কেদারার হাতছানি তুচ্ছজ্ঞান করে পথে পথে, মাঠে প্রান্তরে সাধারণ মানুষের কাছে ছুটে গিয়েছেন তাদের দুঃখ-দুর্দশা মোচনের তাগিদে। তিনি দেশের জনগণকে ভালোবেসেছেন, অকুণ্ঠ ভালোবাসা পেয়েছেন জনসাধারণের। বহু ত্যাগ ও সংগ্রামের পথে চলতে চলতে তিনি বঙ্গবন্ধু বলে খ্যাত হলেন, পরিণত হলেন জাতির জনকে। তারই নেতৃত্বে মুক্তিযুদ্ধ হলো ১৯৭১ সালে, জন্ম হলো স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের।

যা হোক, তৃতীয় এবং শেষবার বঙ্গবন্ধুকে দেখলাম তখনকার গণভবনে। ইত্তেফাকের দেখাদেখি একদিন পর একটি বাসি টেলিগ্রাম প্রকাশ করে দৈনিক বাংলা। সরকারবিরোধী সেই টেলিগ্রাম ‘ইত্তেফাক’-এ প্রকাশিত হওয়ার একদিন পরে দৈনিক বাংলায় মুদ্রিত হওয়ায় বঙ্গবন্ধু রুষ্ট হন। চাকরিচ্যুত হলেন প্রধান সম্পাদক হাসান হাফিজুর রহমান এবং সম্পাদক আবদুল তোয়াব খান। আমরা দৈনিক বাংলার সাংবাদিক ও অন্য কর্মচারী বঙ্গবন্ধুর কাছে দলবেঁধে অনুরোধ জানাতে গেলাম, যাতে হাসান হাফিজুর রহমান এবং আবদুল তোয়াব খানকে দৈনিক বাংলায় পুনর্বহাল করা হয়। বঙ্গবন্ধু সেই যৌথ আবেদন গ্রহণ করেননি, কিন্তু কথা দিয়েছিলেন তাদের দুজনকে ভালো কাজে নিযুক্ত করা হবে। তিনি কথা রেখেছিলেন।

সেবারও দীর্ঘকায়, সুদর্শন জননেতাকে দূর থেকেই দেখেছিলাম। তিনি কারও কারও সঙ্গে কথা বলছিলেন, কুশল বিনিময় করছিলেন হাসিমুখে। তার মুখে ক্রোধের অভিব্যক্তি ছিল না, কিন্তু ছিল আশ্চর্য দৃঢ়তা। তার সিদ্ধান্ত থেকে কেউ তাকে টলাতে পারবে না, এটা আমরা সেদিন বুঝতে পেরেছিলাম।

বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে আমার বাক্যালাপ হয়নি কখনো, যদিও দু’একবার সুযোগ এসেছিল। ১৯৭৩ সালের সেপ্টেম্বর মাসের গোড়ার দিকে আলজেরিয়ার জোটনিরপেক্ষ দেশগুলোর শীর্ষ সম্মেলনে যোগদানের আগে বঙ্গবন্ধু আমাকে তার সঙ্গে দেখা করার জন্য খবর পাঠান। যিনি এই বার্তা বহন করে এনেছিলেন তার নাম সেলিমুজ্জামান, তদানীন্তন তথ্য মন্ত্রণালয়ের একজন বড় কর্তা। তাকে বললাম, ‘এখন নয়, বঙ্গবন্ধু আলজেরিয়া থেকে ফিরে আসার পর অবশ্যই তার সঙ্গে দেখা করব।’ সেলিমুজ্জামান আমাকে জানালেন যে, বঙ্গবন্ধু আমাকে দৈনিক বাংলার সম্পাদক নিযুক্ত করতে আগ্রহী। সেলিমুজ্জামানকে বললাম : ‘আমি সম্পাদক হতে চাই না। বড় ঝুট ঝামেলার কাজ। আমি কবিতা লিখতে চাই।’ পরে অবশ্য বঙ্গবন্ধুর কাছে আর যাওয়া হয়নি। রাষ্ট্রপ্রধানদের কাছে ধরনা দেওয়া আমার ধাতে নেই। তবু দু’একবার বঙ্গবন্ধুকে খুব কাছ থেকে দেখা এবং তার কিছু কথা শোনার সাধ ছিল। কিন্তু আমি সেই সৌভাগ্য থেকে বঞ্চিত হয়েছি।

১৯৭৫ সালের পনেরোই আগস্ট ষড়যন্ত্রীদের হাতে সপরিবারে নিহত হলেন বঙ্গবন্ধু, তার শিশুপুত্র রাসেলও কাতিলদের পাশব হাত থেকে রেহাই পায়নি। বাংলাদেশের বুক ঝাঁজরা হয়ে গেল বুলেটের আঘাতে। সেই ঘোর কৃষ্ণপক্ষে আরও নিহত হলেন আবদুর রব সেরনিয়াবাত এবং তার পরিবারের কয়েকজন সদস্য। আমার অনুজ ব্যারিস্টার তোফায়লুর রাহমান আবদুর রব সেরনিয়াবাতের জামাতা। পনেরোই আগস্টের ট্র্যাজেডির পর আমাদের পরিবারকে গভীরভাবে স্পর্শ করেছে। (সংক্ষেপিত)