বিশ্ব ইতিহাসের কালো অধ্যায়

ঢাকা, শনিবার, ১৪ ডিসেম্বর ২০১৯ | ৩০ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

বিশ্ব ইতিহাসের কালো অধ্যায়

অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আলাউদ্দিন ৮:২০ পূর্বাহ্ণ, আগস্ট ১১, ২০১৯

print
বিশ্ব ইতিহাসের কালো অধ্যায়

বাঙালি জাতির জীবনে ১৫ আগস্ট একটি কলঙ্কজনক অধ্যায়। হাজার বছরের কাক্সিক্ষত যে লক্ষ্য- মুক্তিযুদ্ধের চেতনা অঙ্কুরেই বিনষ্ট হয় ১৫ আগস্ট হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে। ১৫ আগস্ট নির্মম হত্যাকাণ্ডের পর কয়েকবার সংঘটিত সেনা অভ্যুত্থানে ক্ষমতায় আসে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী গোষ্ঠী। দেখা যায়, তারা ক্ষমতায় এসে সংবিধানে কাটাছেঁড়া করে এমন এমন কাজ করা শুরু করলেন, যা আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পরিপন্থী। এ থেকে স্পষ্ট হয়, ১৫ আগস্ট হত্যাকাণ্ডের পেছনে শুধু দেশীয় নয়, বিদেশি কুচক্রী গোষ্ঠী সক্রিয় ছিল। উল্লেখ্য, সমরবিদ্যা বলে, হয় যুদ্ধ করে জিততে হবে, নয়তো বিজয়ী গোষ্ঠী যাতে বিজয়ের সুফল স্বতঃস্ফূর্তভাবে ভোগ না করতে পারে সে ব্যবস্থা করতে হবে। পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী ও তাঁদের এ দেশীয় দোসরেরা সেই কাজটিই করেছে। ইয়াহিয়া খান আক্ষেপ করে একসময় বলেছিলেন, তার জীবনে দুটি ভুলের মধ্যে একটা- শেখ মুজিবকে হত্যা না করা, অন্যটা- ভুট্টোর হাতে ক্ষমতা দেওয়া। স্বাধীনতার পর থেকেই বঙ্গবন্ধু হত্যার পেছনে ভুট্টো তিন বছর টাকা ও মেধা ঢেলেছেন। এ থেকে সুস্পষ্ট বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পেছনে শুধু দেশীয় কুচক্রী গোষ্ঠী ও ক্ষমতালোভীরা জড়িত ছিল না, এই হত্যাকাণ্ড ছিল দুরভিসন্ধিজাত।

বঙ্গবন্ধু ছিলেন একজন বিশাল হৃদয়ের মানুষ। মহান মুক্তিযুদ্ধে সহযোগিতাকারী ব্রিটিশ সাংবাদিক ডেভিড ফ্রস্ট বঙ্গবন্ধুকে প্রশ্ন করেছিলেন আপনার বড় শক্তি কি? ‘বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, আমার দেশের মানুষকে আমি ভালোবাসি।’ আর আপনার সবচেয়ে বড় দুর্বলতা কি? বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘আমি আমার দেশের মানুষকে ভালোবাসি।’ আগে থেকে সতর্ক করা হলেও বঙ্গবন্ধু বিশ্বাস করতেন না যে, বাঙালিরা তাকে হত্যা করতে পারে। বাঙালির প্রতি ছিল তাঁর অগাধ বিশ্বাস ও আস্থা। বঙ্গবন্ধুর বক্তৃতায় পাওয়া যায়, যার অসংখ্য নজির ‘সাত কোটি বাঙালির ভালোবাসার কাঙাল আমি। আমি সব হারাতে পারি, কিন্তু বাংলাদেশের মানুষের ভালোবাসা হারাতে পারব না।’ অথচ সেই বাঙালিদের মধ্যে একদল কুচক্রী ও বিশ্বাসঘাতক জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করেছিল।

বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডে বিশ্বের বিভিন্ন বরেণ্য ব্যক্তি ভিন্ন ভিন্ন প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছিলেন। ফিদেল ক্যাস্ট্রো বলেছিলেন, ‘শেখ মুজিবের মৃত্যুতে বিশ্বের শোষিত মানুষ হারাল তাদের একজন মহান নেতাকে, আমি হারালাম একজন অকৃত্রিম বিশাল হৃদয়ের বন্ধুকে।’

ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী বলেছিলেন, ‘শেখ মুজিব নিহত হওয়ার খবরে আমি মর্মাহত। তিনি একজন মহান নেতা ছিলেন। তার অনন্য সাধারণ সাহসিকতা এশিয়া ও আফ্রিকার জনগণের জন্য প্রেরণাদায়ক ছিল।’

মিসরের প্রেসিডেন্ট আনোয়ার সাদাত বঙ্গবন্ধুর করুণ মৃত্যুতে, শোকে কাতর হয়ে পড়েন। তিনি বলেন, তৃতীয় বিশ্ব একজন যোগ্য নেতৃত্বকে হারালো। ফিলিস্তিনের অবিসংবাদিত নেতা ইয়াসির আরাফাত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যাকাণ্ডের খবরে বেদনাহত হয়ে বলেছিলেন, ‘আপসহীন সংগ্রামী নেতৃত্ব আর কুসুমকোমল হৃদয় ছিল মুজিব চরিত্রের বৈশিষ্ট্য।’

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাকারী টাইম ম্যাগাজিন ১৯৮২ সালের ৫ এপ্রিল তাদের একটি সংখ্যায় লিখেছিল, ‘স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম ১০ বছরের মধ্যে শেখ মুজিবুর রহমানের আমল ছিল সর্বপ্রথম এবং দীর্ঘ গণতান্ত্রিক আমল। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট স্বাধীনতা সংগ্রামের নায়ক ও প্রথম নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবকে হত্যার পর হঠাৎ গণতান্ত্রিক শাসনের অবসান ঘটে।’ ভারতীয় বেতার ‘আকাশ বাণী’ ১৯৭৫ সালের ১৬ আগস্ট তাদের সংবাদ পর্যালোচনা অনুষ্ঠানে বলে, ‘যিশু মারা গেছেন। এখন লাখ লাখ লোক ক্রস ধারণ করে তাকে স্মরণ করছে। মূলত, একদিন মুজিবই হবেন যিশুর মতো।’ তৎকালীন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জার বলেছিলেন, ‘আওয়ামী লীগ নেতা শেখ মুজিবুর রহমানের মতো তেজি এবং গতিশীল নেতা আগামী বিশ বছরের মধ্যে এশিয়া মহাদেশ আর পাওয়া যাবে না।’ মূলত, ২০ বছর নয়, বঙ্গবন্ধুর শূন্যতা বাঙালি হৃদয়-মানসে হাজার বছর ধরে অব্যাহত থাকবে। স্বাধীন দেশ গঠনের জন্য আমরা আদতে কোনো সময় দিইনি। সবেমাত্র বঙ্গবন্ধু দেশ গঠনের কাজে আত্মনিয়োগ করেছিলেন, এরই মধ্যে বিশ্বাসঘাতকরা বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করে বাঙালি হৃদয় মানসে এক অমোচনীয় ক্ষত সৃষ্টি করল। ব্রিটিশ এমপি জেমস বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের প্রতিক্রিয়ায় বলেছিলেন, ‘বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডে বাংলাদেশ শুধু এতিমই হয়নি, বিশ্ববাসী হারিয়েছে একজন মহান সন্তানকে।’

১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে নির্মমভাবে হত্যার খবর শুনে জার্মানির সাবেক চ্যান্সেলর ও নোবেল বিজয়ী উইলিবান্ট বলেছিলেন, ‘মুজিব হত্যার পর বাঙালিদের আর বিশ্বাস করা যায় না, যারা মুজিবকে হত্যা করেছে তারা যে কোনো জঘন্য কাজ করতে পারে।’ বিশ্বাসঘাতকরা সেটাই করল। বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর সংবিধান পরিবর্তন হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত স্বঘোষিত খুনিদের রাষ্ট্রের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় বসানোসহ বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের আমদানি, শুধু তাই নয় হত্যার বিচার যাতে না হয় সে জন্য ইনডেমনিটি বিল পাস করা হলো সংসদে। সর্বোপরি, বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর, বঙ্গবন্ধুকে হারিয়ে বাঙালি জাতি হলো- এতিম। ’৭১-এ পরাজিত শক্তি অর্থাৎ যারা মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী তারা ছাড়ার সবার মনেই, সেদিন নেমে এসেছিল শোকের ছায়া।

বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ড দেশীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে যে কতটা পরিকল্পিত ছিল তা বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের বিচার চলাকালে আদালতে একজন সাক্ষীর জবানবন্দি থেকে বোঝা যা- ‘বঙ্গবন্ধুর বাসভবনে দায়িত্বরত সৈনিকদের সকালে (১৫ আগস্ট) নতুন গুলি দেওয়ার কথা বলে, তাদের আগের গুলিগুলো নিয়ে গেছে ঘাতকের দল, যাতে প্রতিরোধ সেখানে থেকেও না আসে।’ বিশ্বাসঘাতক ও খুনিদের তাণ্ডব থেকে সেদিন বঙ্গবন্ধুর ১০ বছরের শিশুপুত্র শেখ রাসেলও রেহাই পায়নি। বঙ্গবন্ধুর দুই কন্যা শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা দেশের বাইরে অবস্থানের জন্য বেঁচে যান। ১৯৮১ সালে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা দেশে আসেন। ১৯৯৬ সালে দীর্ঘ ২১ বছর পর শেখ হাসিনার নেতৃত্বে রাষ্ট্রক্ষমতায় আসে আওয়ামী লীগ। ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ বাতিল করে বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার প্রক্রিয়া শুরু হয়। আজ দৃশ্যত বঙ্গবন্ধু আমাদের মাঝে নেই। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর আদর্শ অমলিন আমাদের মাঝে। প্রজন্ম প্রজন্মান্তরে বঙ্গবন্ধু বেঁচে থাকবেন।

লেখক : ভাইস চ্যান্সেলর, মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।