রক্ত যেন বৃথা না যায়

ঢাকা, শনিবার, ৭ ডিসেম্বর ২০১৯ | ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

রক্ত যেন বৃথা না যায়

বিশেষ আয়োজন ডেস্ক ৪:১৮ অপরাহ্ণ, আগস্ট ১০, ২০১৯

print
রক্ত যেন বৃথা না যায়

১০ এপ্রিল ১৯৭২ বাংলাদেশ গণপরিষদে স্বাধীনতার ঘোষণা সম্বন্ধীয় প্রস্তাবের ওপর বঙ্গবন্ধুর ভাষণ।

জনাব স্পিকার সাহেব
আপনার মাধ্যমে আমি আজ কয়েকটা বিষয় এখানে আলোচনা করতে চাই। আমরা এখানে গণপরিষদের সদস্য হিসেবে বসবার সুযোগ পেয়েছি। আমরা আজকে বাংলাদেশকে স্বাধীন করতে পেরেছি এবং বাংলাদেশ আজ একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র। আমরা যে আজ বাংলাদেশের সার্বভৌম গণপরিষদের সদস্য হিসেবে কাজ করতে পারছি, সে সুযোগ এ দেশের জনসাধারণ তাদের রক্ত দিয়ে এনে দিয়েছে।

জনাব স্পিকার সাহেব আপনার জানা আছে যে, তিরিশ লাখ ভাইবোনের রক্তের বিনিময়ে এই স্বাধীনতা আমরা পেয়েছি। এই গণপরিষদের সদস্য হিসেবে নিশ্চয়ই তাদের আত্মত্যাগের কথা আমরা স্মরণ করবো এবং মনে রাখবো। আমাদের মনে রাখতে হবে, যে রক্তের বিনিময়ে আমরা স্বাধীনতা পেয়েছি, সে রক্ত যেন বৃথা না যায়। রক্ত দিয়েছে এ দেশের লাখ লাখ ভাইবোন, নিরীহ জনসাধারণ। রক্ত দিয়েছে এ দেশের কৃষক, ছাত্র, শ্রমিক, বুদ্ধিজীবীরা, রক্ত দিয়েছে এ দেশের জনগণ, রক্ত দিয়েছে সামরিক বাহিনীর ভাইয়েরা, রক্ত দিয়েছে পুলিশ, রক্ত দিয়েছে ভূতপূর্ব ইপিআর, রক্ত দিয়েছে। আনসার, মোজাহেদরা। রক্ত দিয়েছে প্রত্যেকটি বাঙালি, এমনকি সরকারি কর্মচারীরাও রক্ত দিয়েছে এই স্বাধীনতা সংগ্রামে। নিষ্ঠুর বর্বর ইয়াহিয়া খানের খানসেনারা যে অত্যাচার করেছে, জুলুম করেছে, তা থেকে বাংলাদেশের মা-বোনেরা পর্যন্ত নিস্তার পায়নি। লাখ লাখ মা-বোনকে নির্যাতন করা হয়েছে। আজ তাদের কথা আমরা স্মরণ করছি, স্মরণ করতে হয় আমার সহকর্মী সভ্যবৃন্দের কথা, যারা সেই গত নির্বাচনে নির্বাচিত হয়েছিলেন। তাদের অনেককেই বন্দি করে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে- তাদের নামও ঐ প্রস্তাবে রয়েছে, যে প্রস্তাব আমি আপনার মাধ্যমে পরিষদে পেশ করছি। তা ছাড়া এই দেশের জানা-অজানা লাখ লাখ লোক, আওয়ামী লীগের লাখ লাখ কর্মী স্বাধীনতার জন্য জীবন দিয়েছেন। সঙ্গে সঙ্গে অন্যান্য যারা স্বাধীনতার জন্য রক্ত দিয়েছেন, তাঁদের ত্যাগের কথা কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করে আমাদের ভবিষ্যৎ কর্মপন্থা গ্রহণ করতে হবে।

জনাব স্পিকার সাহেব
আজ স্বাধীনতা আমরা পেয়েছি, এর সঙ্গে সঙ্গে আমি চারটি স্তম্ভকে স্মরণ করতে চাই, যে স্তম্ভকে সামনে রেখে আমাদের দেশের সংবিধান করতে হবে। জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা। আমরা গণতন্ত্র দিতে চাই এবং গণতন্ত্র দিতেই আজ আমরা এই পরিষদে বসেছি। কারণ আজ আমরা যে সংবিধান দেবো, তাতে মানুষের অধিকারের কথা লেখা থাকবে, যাতে ভবিষ্যতে কেউ জনগণের জানমাল মিয়ে ছিনিমিনি খেলতে না পারে। এমন সংবিধানই জনগণের জন্য পেশ করতে হবে।

জনাব স্পিকার সাহেব
জাতির কাছে আমাদের একটা বিরাট কর্তব্য আছে। আমি আমার বক্তৃতা বড় করতে চাই না। কিন্তু বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অধিকার আদায়ের জন্য যারা সংগ্রাম করে ইতিহাস সৃষ্টি করেছেন, তাদের সেই ইতিহাস আজ পর্যালোচনা না করলেও চলবে। কিন্তু বিশেষ কয়েকজন নেতার কথা স্মরণ করছি, যারা গণতন্ত্রের পূজারি ছিলেন, যেমন হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক, বর্বর পাক বাহিনীর হাতে নিহত ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত। আর কলম দ্বারা সংগ্রাম করেছেন, সেই জনাব তফাজ্জল হোসেন- আমাদের মানিক ভাই। এঁদের কথা শ্রদ্ধার সঙ্গে আমরা স্মরণ করতে চাই। স্মরণ করি ১৯৪৭ সাল থেকে আজ পর্যন্ত প্রত্যেকটি আন্দোলনের সময়ে যারা জীবন দিয়েছেন, যারা কারাগারে জীবন কাটিয়েছেন। গণতন্ত্রকে এ দেশে প্রতিষ্ঠা করার জন্য যারা সংগ্রাম করেছেন, তাদের কথা যদি স্মরণ না করি, তাঁদের ইতিহাস যদি না লেখা হয়, তবে ভবিষ্যৎ বংশধরেরা জানতে পারবে না এই সংগ্রামের পিছনে কারা ছিলেন। গত বছর নির্বাচন হলো। সেই নির্বাচনের পূর্ব থেকেই আমাদের জানা ছিল যে, বাংলাদেশ জনসংখ্যায় সংখ্যাগরিষ্ঠ থাকা সত্ত্বেও তারা আমাদের কলোনি এবং বাজার করে রাখতে চায়। আমাদের সংগ্রাম তখন থেকেই চলছিল। আমরা জানতাম সংগ্রামকে ধাপে ধাপে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে। এভাবে সংগ্রাম এগিয়ে আজ চরম সংগ্রামে পরিণত হয়েছে।

২৫ মার্চ তারিখের ইতিহাস আপনাদের জানা আছে। সেই দিন বর্বর পাক হানাদার বাহিনী কোনো আইনকানুন মানে নাই। কোনো সভ্য দেশে তাদের কাজের তুলনা পাওয়া যায় না। প্রত্যেক সভ্য দেশে যুদ্ধের একটা নিয়ম আছে। কোনোরূপ ওয়ার্নিং না দিয়েই অতর্কিতে কাপুরুষের মতো বাড়িঘরে আগুন লাগিয়ে দুধের বাচ্চাকে পর্যন্ত হত্যা করে তারা এক জঘন্য লীলায় মেতে উঠেছিল। সেনাবাহিনী যদি যুদ্ধ ঘোষণা করত, তবে আমরা সে যুদ্ধের মোকাবেলা করতে পারতাম। কিন্তু তারা অতর্কিতে ২৫ মার্চ তারিখে আমাদের আক্রমণ করল। তখন আমরা বুঝতে পারলাম যে, আমাদের শেষ সংগ্রাম শুরু হয়ে গেছে। আমি ওয়্যারলেসে চট্টগ্রামে জানালাম, বাংলাদেশ আজ থেকে স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র, এই খবর প্রত্যেককে পৌঁছে দেওয়া হোক, যাতে প্রতিটি থানায়, মহকুমায়, জেলায় প্রতিরোধ সংগ্রাম গড়ে উঠতে পারে। এই জন্য প্রয়োজনীয় নির্দেশও দিয়েছিলাম।

জনাব স্পিকার সাহেব
এসব কথা বলতে গেলে ভাষা আসে না, মানুষ ভাবপ্রবণ হয়ে যায়। সে জন্য এগুলো বলা আমার পক্ষেও কষ্টকর। কারণ আমি ভাবপ্রবণ হয়ে যাই। আমরা দেখতে পাই আমাদের লাখ লাখ মা-বোনদের অত্যাচার করা হয়েছে এবং আমাদের হাজার হাজার ছেলে পঙ্গু অবস্থায় রয়েছে, তাদের জন্য কিছুই করতে পারি নাই। আমাদের বাংলার গ্রামকে গ্রাম জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ছারখার করে দিয়েছে।

জনাব স্পিকার সাহেব
আমাদের সামনে আজকে বিশেষ কর্তব্য হলো, জাতিকে একটা সংবিধান দেওয়া এবং যত তাড়াতাড়ি হয়, সেই সংবিধান দেওয়ার চেষ্টা করা হবে। আমার সহকর্মী ভাইয়েরা, যারা এখানে উপস্থিত আছেন, আপনার মাধ্যমে তাদের সবাইকে বলে দিতে চাই যে, আপনারা গাছতলায় বসে যুদ্ধ করেছেন, না খেয়ে যুদ্ধ করেছেন, পরনের কাপড়ও ছিল না, আমার সহকর্মীদের আত্মীয়স্বজনের ওপর অত্যাচার করা হয়েছে, তাদের বাড়িঘর জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছে।

মেম্বারদের যে অধিকার পাওয়ার আছে, সে অধিকার পুরোপুরি দেওয়ার ক্ষমতা আমার নেই। যদি মাইক্রোফোন বিদেশ থেকে আনবার চেষ্টা করতাম, তাহলে তিন মাস সময় লাগত, অনেক দেরি হয়ে যেত। এই অ্যাসেম্বলি ভবন যে অবস্থায় ছিল, তাতে মাত্র ৩০০ মেম্বারের বসার জায়গা ছিল, আজকে সেখানে ৪৫০ জন বসেছেন। যদি এই অ্যাসেম্বলি ভবনও না থাকত, তবে গাছতলায় বসেও আমার মেম্বাররা সংবিধান রচনা করতেন- এই সুনিশ্চিত আশ্বাসটুকু দিতে পারি।

এই সংবিধানে মানবিক অধিকার থাকবে, যে অধিকার মানুষ চিরজীবন ভোগ করতে পারে। আমরা গত তেইশ বছরে কী দেখেছি শাসনতন্ত্রের নামে অশাসনতন্ত্র, জনগণের নিরাপত্তার নামে মার্শাল ল’, জনগণের দাবি আদায়ের নামে প্রতারণা। আর বাংলাদেশের কথা উঠলেই ‘হিন্দুস্তানের দালাল’- এই ধরনের কথা সারা জীবন শুনে আসছি। সেসব যাতে এ দেশ থেকে উঠে যায়, সে জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা করতে হবে এবং সে বিষয়ে সবার সহযোগিতা কামনা করছি।

জনাব স্পিকার সাহেব
আপনি এই পরিষদের স্পিকার হয়েছেন। আবার আপনাকে জানাতে চাই যে, আমরা একটা গণমুখী সংবিধান তৈরি করতে চাই এবং সেই সঙ্গে এই আশ্বাস দিতে চাই যে, আপনি যতক্ষণ নিরপেক্ষ থাকবেন, আমাদের কাছ থেকে পূর্ণ সহযোগিতা পাবেন।

আপনার কর্তব্যটুকু আইন ও আপনার বিবেক অনুযায়ী এবং পার্লামেন্টারি কনভেনশন মেনে নিয়ে পালন করবেন, এই আশা করি। আপনি কোন দল বড় কোন দল ছোট তা দেখবেন না; কার্যপ্রণালী বিধি অনুযায়ী বিচার ও ইনসাফ করবেন। আমার দলের পক্ষ থেকে আপনাকে পূর্ণ সমর্থন ও সহযোগিতা জানাবো। এখানে যে প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল, নজরুল ইসলাম সাহেব তা পড়েছিলেন, আবার সংশোধন করে তা পেশ করা হবে। আপনার মাধ্যমে আমার সদস্য ভাইদের ধন্যবাদ দিচ্ছি এবং আপনাকেও ধন্যবাদ দিচ্ছি।
(ঈষৎ সংক্ষেপিত)