রাজনীতি বড় নিষ্ঠুর

ঢাকা, শনিবার, ১৪ ডিসেম্বর ২০১৯ | ৩০ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

রাজনীতি বড় নিষ্ঠুর

বিশেষ আয়োজন ডেস্ক ১২:১৮ অপরাহ্ণ, আগস্ট ০৯, ২০১৯

print
রাজনীতি বড় নিষ্ঠুর

১৯৭৪ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি সকাল ৯টা। ধানমন্ডির ৩২ নম্বরে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে দেখা করেন বাংলা একাডেমির তৎকালীন মহাপরিচালক ড. মযহারুল ইসলাম, লেখক রাহাত খান, বাংলা একাডেমির সংস্কৃতি বিভাগের ম. জিল্লুর রহমান এবং শামসুজ্জামান খান। সেই সাক্ষাৎ নিয়ে শামসুজ্জামান খান ‘বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে আলাপ’ নামে একটি নিবন্ধ লিখেছেন। সাক্ষাৎকার আকারে সেটি উপস্থাপিত হলো-

প্রশ্ন : আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামে চীনের ভূমিকা...।
বঙ্গবন্ধু : মাও খুব বড় নেতা। বহু সংগ্রাম করেছেন। তার জীবন ও চিন্তাটা জানা ও বোঝা দরকার। একটা অনুন্নত বিশাল দেশকে তিনি স্বাধীনতা এনে দিয়েছেন। সে দেশটায় এত মানুষ হওয়া সত্ত্বেও কত উন্নত হয়েছে। এই ব্যাপারটা কীভাবে ঘটেছে তা উপলব্ধি করার চেষ্টা করছি। রাজনীতি বড় জটিল, নিষ্ঠুর। এর ফলে কত অস্বাভাবিক ঘটনা ঘটে। তা না হলে চীনের আমাদের সমর্থন না করার কোনো যুক্তিই নেই। চীন খুব অন্যায় কাজ করেছে।

বঙ্গবন্ধু : বলুন প্রফেসর, কি মনে করে এসেছেন।
ড. মযহারুল ইসলাম : আমরা বাংলা একাডেমি থেকে একটি আন্তর্জাতিক সাহিত্য সম্মেলনের আয়োজন করছি। আপনাকে সম্মেলনে প্রধান অতিথি হিসেবে পেতে চাই।
বঙ্গবন্ধু : আমি সাহিত্যের কি বুঝি! একজন প্রবীণ ও সর্বজন শ্রদ্ধেয় সাহিত্যিক বা পণ্ডিতকে দিয়ে এ কাজ করান, সম্মেলনের মর্যাদা বাড়বে। আগে তো তাই হতো। ছাত্রজীবনে দু’একবার সাহিত্য সম্মেলনে যোগ দিয়েছি। কই, রাজনৈতিক নেতারা তাঁর উদ্বোধন করেছেন বলে তো মনে পড়ে না। আমি রবীন্দ্রনাথ পড়ি, ভালোবাসি তাঁকে- সাহিত্যে আমার পুঁজি তো ওইটুকুই। এই পুঁজি নিয়ে দেশ-বিদেশের বড় বড় পণ্ডিত ও সাহিত্যিক-শিল্পীদের মধ্যে যেতে আমি সংকোচবোধ করছি।

প্রশ্ন : স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম জাতীয় সাহিত্য সম্মেলন। এর তাৎপর্য ভিন্ন। আপনি সম্মেলন উদ্বোধন করলে তা আন্তর্জাতিক মর্যাদা লাভ করবে।
বঙ্গবন্ধু : ঠিক আছে, যাব। আমার বন্ধু জসীমউদ্দীন ও শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনকেও বিশেষ মর্যাদায় আমন্ত্রণ জানাবেন। আর একটি ছোট ভাষণ প্রস্তুত করে আমাকে দেখিয়ে নেবেন। আপনারা সাহিত্যিক-সাংবাদিক, সংস্কৃতিকর্মী ও গবেষক। ভবিষ্যতে আপনারা হয়তো মুক্তিযুদ্ধ বা বাংলাদেশ নিয়ে লিখবেন, তাই আমি আজ কিছু কথা বলতে চাই।

প্রশ্ন : আগরতলা ষড়যন্ত্র...।
বঙ্গবন্ধু : কিসের ষড়যন্ত্র! বল, আমাদের স্বাধীনতার প্রয়াস। আগরতলায় আমি ঠিকই গিয়েছিলাম। বৃষ্টিতে ভিজতে হয়েছিল। একটু জ্বরও হয়েছিল। অনেকটা পথ হেঁটে যেতে হয়। আমার পা ফুলে গিয়েছিল। তবে নেতাদের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ কথাবার্তা ও ফলপ্রসূ আলোচনা হয়।

প্রশ্ন : ১৯৭১-এর স্বাধীনতা...।
বঙ্গবন্ধু : ২৫ মার্চ রাতে আমি গ্রেপ্তার হওয়ার আগে স্বাধীনতার ঘোষণা দিই। পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সের মাধ্যমে ওয়্যারলেসে সে ঘোষণা সব জেলা সদরে পাঠানো হয়। আমি বিভিন্ন চ্যানেলে ভারতের সঙ্গেও যোগাযোগ করে যাই। তা না হলে তোমরা অত সহজে অস্ত্র ও সাহায্য সহযোগিতা পেতে না।

প্রশ্ন : কিন্তু আপনি কেন ওদের হাতে ধরা দিলেন।
বঙ্গবন্ধু : আমাকে ধরতে না পারলে ওরা আরও বেশি লোককে খুন করত; দুই, আন্তর্জাতিকভাবে আমরা বিচ্ছিন্নতাবাদী ও ভারতের ক্রীড়নক বলে প্রমাণিত হতাম এবং এতে আন্তর্জাতিক সহমর্মিতা কমত এবং আরও বেশি দেশ আমাদের আন্দোলন সম্পর্কে সন্দেহ পোষণ করত। আমার সুদৃঢ় বিশ্বাস আমি পাকিস্তানিদের হাতে বন্দি থাকায় আমার দুঃখী বাঙালিদের মধ্যে দুশ্চিন্তা, উদ্বেগ যেমন বেড়েছে তেমনি মানুষ আমার অনুপস্থিতিতে আমার একটা বিশাল প্রতীক মনে মনে তৈরি করে নিয়েছে। এটা ছিল মুক্তিযুদ্ধের খুব বড় একটা শক্তি। আমি প্রবাসী সরকারে থাকলে শুধু প্রমাণ সাইজের মুজিবই থাকতাম।
ওদের হাতে বন্দি থাকায় মহাশক্তিধর ও বাংলাদেশের সব মানুষের প্রাণপ্রিয় নেতার ভূমিকায় স্থান পাই। ওরা যদি আমাকে মেরে ফেলত, তাহলে আমি আরও বড় প্রতীকে পরিণত হতাম।

শামসুজ্জামান খান : আরও খোলামেলা কথা বলার সুযোগ আছে কি?
বঙ্গবন্ধু : সবাইরে বিদায় করে তোমাদের নিয়া বসছি। অন্তর খোলাসা করেই বসছি। তোমরা একাডেমির লোক, লেখো, গবেষণা কর, আমি তো তোমাদের কাছেই প্রাণ খুলে কথা বলতে পারি।

প্রশ্ন : সমাজে নৈরাজ্য, হতাশা দেখা দিচ্ছে। ছিনতাই, রাহাজানি মানুষকে আতঙ্কিত করছে।
বঙ্গবন্ধু : তোমরা অনেক পড়াশোনা করছো- অনেক কিছু বোঝো। কিন্তু নিজ দেশের কতগুলো বাস্তব ব্যাপার তোমরা যেন দেখতে পাও না। দেশে এতবড় একটা যুদ্ধ হয়ে গেল। যুদ্ধ মানুষের মূল্যবোধ আমূল বদলে দেয়। মানুষকে বেপরোয়া, লাগামহীন করে। আমাদের দেশেও সেটা হয়েছে। হাইজ্যাক-ডাকাতি বেড়েছে, চাটার দল বেড়েছে। এসব একদিনে দমন করা যাবে না। অনেকে অস্ত্র জমা দেয় নাই। ইসলামী দলগুলো আগাগোড়া আমার বিরুদ্ধে গোপন প্রচার করছে, বেনামা পুস্তিকা ছাপছে। জাসদের বিভ্রান্ত অংশ বিপ্লবের নামে কি করছে? দুষ্কৃতকারীরা পাটের গুদামগুলো পুড়িয়ে দিয়ে অর্থনীতিকে কাবু করছে। থানা আক্রমণ করে অস্ত্র লুটে নিচ্ছে। অথচ তিন বছরে আমরা যা করেছি অন্য কোনো দেশ তা পারত না। দেশটা ছিল ভাঙাচোরা; শ্মশান। কি আর বলব, হুজুর (মওলানা ভাসানী) মুরুব্বি মানুষ, তিনি যেসব বক্তৃতা বিবৃতি দিচ্ছেন তাকে লুফে নিচ্ছে সাম্প্রদায়িক দল। তারা তাঁকে শিল্ড হিসেবে ব্যবহার করে শয়তানের হাসি হাসছে। এসব দেখেশুনে মনে হয় তাজউদ্দীনদের হাতে ক্ষমতা দিয়ে ভোলা বা মনপুরায় গিয়ে ছোট্ট ঘর বানিয়ে থাকি।

ড. মযহারুল ইসলাম : সারা দেশে আপনার হাজার হাজার কর্মী ও সমর্থক আছে, আপনি হতাশ হচ্ছেন কেন? কঠোর হোন, নির্দেশ দিন।
বঙ্গবন্ধু : ডাক্তার সাহেব, বাংলাদেশ বড় কঠিন জায়গা। মনে হয় যেন বাঘের পিঠে চড়ে বসেছি। পারি, সব ঠিক করে দিবার পারি। কিন্তু কি করব, মনে হয় কার গায়ে হাত দেবো, সবারই পরিবার-পরিজন আছে। তখন আপনারাই আসবেন আবার তদবির নিয়ে। কিন্তু বেশি দিন তো সহ্য করা যাবে না। শক্ত একটা কিছু করতে হবে। আমি ‘লাল ঘোড়া’ দাবড়াইয়া দিতে চেয়েছিলাম। তা দিতে চেয়েছিলাম ‘চাটার দলের ওপর’, কেউ কেউ তা পছন্দ করল না। আমার সমালোচনা করল। তাহলে আমি যাই কোথায়!

প্রশ্ন : দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা...।
বঙ্গবন্ধু : আমি দেশের সেরা অর্থনীতিবিদদের নিয়ে পরিকল্পনা কমিশন করেছিলাম। তারা তো আমার স্বপ্ন বাস্তবায়ন করতে পারল না। আসলে তত্ত্ব আর বাস্তবের মধ্যে পার্থক্য অনেক। ওরা (পরিকল্পনা কমিশনের সদস্যরা) ভালো লোক, পণ্ডিত, কিন্তু আমাদের গ্রামবাংলা আর গ্রামীণ অর্থনীতির সঙ্গে বোধহয় এদের ভালো পরিচয় নাই। আমি সোনার মানুষের কথা বলি। আমার কৃষকরাই শুধু সোনার মানুষ। তারা সারা বছর হাড়ভাঙা পরিশ্রম করে ফসল ফলায়, ঘরবাড়ি বানায়, নৌকা চালায়, তবেই না আমরা বাবু সেজে পায়ের ওপর পা তুলে আরও কত বড় হব তার খোয়াব দেখি।
আমরা সমাজতন্ত্রের কথা বলেছি, সমবায়ের কথা বলেছি। দেশের যা অবস্থা, মধ্যবিত্তের যা খাই খাই ভাব তাতে সফল হব কি না জানি না। আমি ভিয়েতনামকে দ্রুত স্বীকৃতি দিয়েছি। হোচিমিন কত বড় নেতা, আর খাঁটি মানুষ; তারা কি করছেন সেখান থেকে শিক্ষা নেওয়ার চেষ্টা করছি, বড় বড় ইন্ডাস্ট্রি করে বোধ হয় খুব সুবিধা করতে পারব না। শিল্পকারখানা থাকবে অর্থনীতির সহায়ক শক্তি হিসেবে দ্বিতীয় স্থানে, আমি সমবায় ও কৃষিভিত্তিক ছোট ছোট প্রকল্পে হাত দিতে চাই।

প্রশ্ন : হতাশ হওয়ার কিছু কি আছে?
বঙ্গবন্ধু : তোরা হতাশ হবি না। প্রফেসর সাহেব, আমার একথাটা খুব মন দিয়া শোনেন। বাঙালি খুব গরিব, দরিদ্র, আমার ভাষায় দুঃখী। আমি যতটা ইতিহাস পড়েছি তাতে জেনেছি হাজার বছর ধরেই বাঙালি দুঃখী, অভাবী। কিছুদিন আগে একটা উপন্যাস পড়ছিলাম, ‘কলকাতার কাছেই’। তাতেও আছে, বাঙালি কাঁচা পয়সার কি কাঙাল। মনে হয় শায়েস্তা খাঁর আমলেও বাঙালি কাঙালিই ছিল। সস্তা হলেও কোনো জিনিস সে কিনতে পারেনি। ডাক্তার সাহেব (মযহারুল ইসলাম), এরা তো (শামসুজ্জামান খান, রাহাত খান, ম. জিল্লুর রহমান) সেদিনের ছাওয়াল। এরা বুঝবে না, কিন্তু আপনি আমি জানি- বাঙালির বিশেষ করে কৃষিজীবী মুসলমান বাঙালির হাতে কোনো কাঁচা পয়সা থাকত না। ধান কাটার মৌসুমে পেট পুরে গরম ভাত খেতাম। পাটের সময় হলে কিছু নগদ পয়সা জুটত। ওটা দিয়ে বাবা চাচারা ইলশা মাছ কিনে আনতেন। বাঙালি বিশেষ করে তরুণরা এখন বাঁধনহারা। সমাজ পরিবর্তনের প্রবল ও আকস্মিক ধাক্কায় দিশেহারা। কেউ গাড়ি কিনছে, কেউ ফাইভ ফিফটি ফাইভ ফুঁকছে, কেউ ছিনতাই-হাইজ্যাকসহ নানা অকাম করছে। ধীরে ধীরে আইনকানুন তৈরি করে এদের সচেতন করা হবে; নিয়ন্ত্রণে আনা যাবে।
(ঈষৎ সংক্ষেপিত)