আমার দেখা মুজিব

ঢাকা, বুধবার, ২১ আগস্ট ২০১৯ | ৬ ভাদ্র ১৪২৬

আমার দেখা মুজিব

সুফিয়া কামাল ১:৩২ অপরাহ্ণ, আগস্ট ০৮, ২০১৯

print
আমার দেখা মুজিব

শেখ মুজিবুর রহমান যখন বঙ্গবন্ধু হয়নি, বলা যেতে পারে তার কিশোর বয়স থেকেই আমি তাকে জানি। সোহরাওয়ার্দীর সঙ্গে তাকে প্রথম দেখি কলকাতায়, তখন ইসলামিয়া কলেজের ছাত্র সে। রাজনীতিতে সোহরাওয়ার্দীর খ্যাতি তখন তুঙ্গে, সেই সময় থেকে ছাত্রকর্মী-ছাত্রনেতা হিসেবে মুজিবুর রহমানকে আমি চিনি আজীবন। নেতা হিসেবে সারা বিশ্বে পরিচিত হয়েছেন মুজিবুর রহমান। কিন্তু আমার কাছে আমার ছোট ভাইয়ের মতোনই ছিল সে।

বরাবর আমাকে আপা বলে সম্বোধন করেছে। কাছে গেছি, মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়েছি, তারপর একই পাড়ায় থাকার কারণে মুজিবের সঙ্গে আমার একটা পারিবারিক সম্বন্ধের মতোন গড়ে উঠেছিল। মুজিবের কথা বলতে গেলে মুজিবের স্ত্রীর কথাও বলতে হয়। এত ধৈর্যশীলা, এত শান্ত, এত নিষ্ঠাবতী মহিলা খুব কমই দেখা যায়। বছরের বারো মাসের মধ্যে বেশিরভাগ সময় মুজিবের কেটেছে জেলে। যখনই শুনেছি মুজিবকে ধরে নিয়ে গেছে ছুটে গিয়েছি।

দেখেছি মুজিবের স্ত্রী অবিচল মুখে কাপড়-বিছানা-বালিশ গুছিয়ে পাঠানোর ব্যবস্থা নিচ্ছে। বলেছে, আপনার ভাই তো জেলে গেছে। বেচারি খুব ধৈর্যের সঙ্গে সংসারটাকে টেনেছে। বাপকে জেলে নিয়ে গেছে বলে কোনো স্কুলে হাসিনাকে ভর্তি করবে না এমনও দিন গেছে। নারী শিক্ষা মন্দিরে আমরা তাকে ভর্তি করে নিলাম।

তখন নারী শিক্ষা মন্দিরের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ছিলাম আমি। একুশে ফেব্রুয়ারির সকালে পায়ে হেঁটে হেঁটে মুজিবের সঙ্গে গিয়েছি শহীদ মিনারে ফুল দিতে। মুজিব বলেছে, আহা আমার বোনটা, আমার আপাটা এরকম করে হেঁটে যাবে? আপা, আপনি হেঁটে যাবেন না। আপনি রিকশায় যান। আমরা হেঁটে যাই। আমি বলেছি, না ভাই, আমি হেঁটেই যেতে পারব। এভাবে মুজিবের সঙ্গে হেঁটে গিয়ে মিটিংয়ে যোগ দিয়েছি। আন্দোলনে যোগ দিয়েছি। মুজিব সবসময় আমাকে বড় বোনের মতোন আগে আগে সঙ্গে রেখেছে। রাস্তায় দেখা হলে গাড়ি থামিয়ে বলেছে, আপা শিগগিরই আসেন, গাড়িতে আসেন। আমি বলেছি, না ভাই এইটুকুন পথ তো, এই খান থেকে এইখানে হেঁটে যেতে পারব। কিন্তু মুজিব বলেছে, না আমি পৌঁছে দিয়ে আসি। ড্রাইভারকে বলেছে, আমার বোনকে আমার বোনের বাড়িতে পৌঁছে দিয়ে আসো। মুজিবের বাড়িতে গিয়েছি। শত মিটিং হলেও মুজিব এসে বলেছে, আপনি এসে আমাকে খবর দেন কেন? আপনি সরাসরি আমার কাছে চলে আসবেন। আপনি এসে কেন নিচে বসে থাকেন। আমার বাড়ি আপনার বাড়ি। আমি আপনাকে বড় বোন বলে মনে করি। মুজিব প্রতিদিন ভোরবেলা তার বাড়ি থেকে আমাদের বাড়ির সামনে দিয়ে পায়ে হেঁটে একচক্কর দিত। একদিন আমাকে দেখতে পেয়ে হাসতে হাসতে বলল, গতকাল মনে হলো যে আমার বাড়িতে তো পিঠা হচ্ছে। আপাকে একটা ডাক দেব নাকি? কিন্তু অত ভোরে আপাকে আর ডাক দিলাম না। এই পর্যন্ত তার একটা আন্তরিকতা ছিল, আমাকে নিয়ে পিঠা খাওয়াবে।

আমার মেয়ের স্বামী আবদুল কাহহার চৌধুরী চাটগাঁ রেডিওর অফিসার ছিল। একাত্তর সালে পাক বাহিনীর হাতে মারা যায়। দেশে ফেরার পর মুজিব এ ঘটনা শুনল। বলল, কই দুলু কোথায়? আমার মেয়ে বিধবা হলে যেরকম কষ্ট পেতাম সেরকম কষ্টবোধ করছি। দুলু যা চায়, আমি ওকে সব দেব। আমি বললাম, হাজারো মানুষ এরকম গেছে, আমার জামাইও গেছে। তার জন্য শুধু দোয়া করো।

মুজিব আবার বলল, আপা আমি আপনার কাছে হাতজোড় করে বলছি, আপনি বলেন, দুলুকে আমি কি সাহায্য করতে পারি? আমি বললাম, ভাই রক্তের বিনিময়ে আমার মেয়েকে কিছু দিতে হবে না। দেশের হাজারো মেয়ের মতো আমার দুলুও বিধবা হয়েছে। অনেক বিধাব তো আমার আশ্রয়েই রয়েছে। ওদের জন্য শুধু দোয়া করো।

তারপর যখন রাষ্ট্রপতি হলো, আমাকে বলেছে, একবার এসে আমাকে দোয়া করে যান। গাড়ি পাঠাল। আমি গেলাম। ওই প্রথম যাওয়া, ওই শেষ যাওয়া আমার প্রেসিডেন্ট হাউসে। তখন বাকশাল গঠিত হয়েছে। মুজিব বলল, একটা লোক পাচ্ছি না যাকে আমি বাকশালের ভার দেব। আপা আপনি যদি রাজি হন তবে বাকশালের সভানেত্রী হয়ে থাকুন। আপনি যেরকম বলবেন, সেরকমই হবে। আমি বললাম, ভাই আমি রাজনীতি বুঝি না। আমাকে মাফ করো। এই আমি সেই বাকশালে গেলাম না। কিন্তু যখনই কোনো মিটিং হয়েছে, আমি মুজিবের সঙ্গে গিয়েছি। তারপরে বলেছে, আওয়ামী লীগের মহিলা কমিটি গঠন করে সেখানে আপনি সভানেত্রী থাকুন।

সবসময় আমাকে সে সম্মানের পদ দিতে চেয়েছে। আমি বলেছি, ভাই রাস্তায় নামতে পারি কিন্তু রাজনীতির কোনো সংশ্রবে আমি থাকব না। তখন মুজিব বলেছে, আপা আপনাকে আমি মাথায় রাখব, আমি আপনার কাছে মিনতি করছি। আমি বলেছি, ভাই আমিও মিনতি করছি।

ধানমন্ডি পাড়ায় মুজিবের আগে আসি আমি। তাকে গ্রেপ্তারের সময়গুলোতে তার ছেলেমেয়েদের স্কুলে ভর্তির সমস্যা দেখা দিয়েছে। তার বউ একটা বাড়ি খুঁজে পাচ্ছে না। এই দুর্দশার ভেতর দিয়ে মুজিবুর রহমান নেতা হয়েছে। মুজিবের ত্যাগের কোনো সীমা নেই। তার নিষ্ঠার কোনো পরিসীমা নেই। দেশকে যে সে কতখানি ভালোবাসত তার পরিমাপ কোথাও নেই। মানুষের জন্য মমত্ববোধ, আত্মার একটা টান ছিল তার। আজকের দিনে তার মতো একটি মানুষ সারা বিশ্বে আমি দেখতে পাচ্ছি না। তার পলায়নি মনোবৃত্তি ছিল না। যেখানে সংকট, যেখানে সংগ্রাম, যেখানে সংঘাত দেখেছে, সে এসে আগে দাঁড়িয়েছে। মরণকে ভয় করেনি। তার পেছনে লাখ জনতা মুজিব ভাই বলে লাফিয়ে পড়ে এই দেশকে স্বাধীন করেছে।

বাঙালি আমাকে মারবে না মুজিবের এই বিশ্বাস ছিল বাঙালির ওপর। সেই বাঙালির হাতে মুজিব হত্যা হয়েছে। এই বাঙালি জাতির সেই পাপের, সেই গুণার প্রায়শ্চিত্ত কবে হবে, আমি জানি না। মুজিবকে আমি সারা অন্তর দিয়ে এখনো উপলব্ধি করি।

সে যা দিয়ে গেছে সেই সোনার বাংলায় এখন যারা আগুন জ্বালাচ্ছে, তাদের ধিক্কার দেওয়ার মতো ভাষা আমার নেই। মুজিবের দেশপ্রেমের আদর্শ নতুন প্রজন্মের মধ্যে ব্যাপ্ত হোক এই প্রার্থনা করি আমি আল্লাহর কাছে।