দুই নার্সের স্মৃতি

ঢাকা, বুধবার, ২১ আগস্ট ২০১৯ | ৬ ভাদ্র ১৪২৬

দুই নার্সের স্মৃতি

বিশেষ আয়োজন ডেস্ক ১:১২ অপরাহ্ণ, আগস্ট ০৮, ২০১৯

print
দুই নার্সের স্মৃতি

জাহানারা বেগম ও মমতাজ বেগম। দুই বোন। বাড়ি বরিশালের মুলাদী থানায়। মুলাদীতে মেয়েদের মধ্যে তারাই প্রথম ম্যাট্রিক পাস করেন। পরবর্তী সময়ে ভর্তি হন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নার্সিংয়ে। তখন বঙ্গবন্ধুর সান্নিধ্য পাওয়ার সৌভাগ্য হয়েছিল এই দুই বোনের

জাহানারা বেগম লিখেছেন-
আমি ঢাকা মেডিকেলে নার্সিংয়ে চতুর্থ বর্ষে পড়ি। বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে দেখা হয়ে গেল। স্বাধীনতার কয়েক বছর আগের কথা। খুব আন্দোলন চলছিল। বঙ্গবন্ধুকে কয়েক দিন পরপর জেলে নেওয়া হয়। জেলে অসুস্থ হয়ে পড়লে তাঁকে চিকিৎসা দিতে নিয়ে আসা হয় ঢাকা মেডিকেলে। তখন আমার ডিউটি ছিল সেখানে। হাসপাতালে বঙ্গবন্ধুকে একবার জিজ্ঞাসা করেছিলাম- আপনি তো রাজবন্দি, আপনাকে তো জেলে ভালোভাবেই রাখা হয়! এমন অসুস্থ হয়ে পড়লেন কীভাবে?
বঙ্গবন্ধু বললেন, ‘তোমরা তো মনে করো আমাকে কোনো কষ্ট দেওয়া হয় না। আসলে তা নয়, বরফের ওপর আমাকে শুইয়ে রাখা হয়েছে। ছোট্ট একটি রুমে থাকতে দেওয়া হয়েছে।’
৭ মার্চের ভাষণ সরাসরি শোনার সৌভাগ্য হয়েছে আমার। তখন আমি পিজি (বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়) হাসপাতালে চাকরি করছি। আমরা দলবেঁধে গিয়েছিলাম ভাষণ শুনতে। মেয়েদের সামনে বসতে দেওয়া হয়েছিল। প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত ভাষণ শুনেছি। সে কি ভাষণ! শরীরের লোম খাঁড়া হয়ে গিয়েছে সেই জ্বালাময়ী ভাষণ শুনে। শুনছি আর অবাক হচ্ছি। কীভাবে সম্ভব কোনো কিছু না দেখে এত নিখুঁতভাবে ভাষণ দেওয়া!
বঙ্গবন্ধুকে যখন বন্দি করে পশ্চিম পাকিস্তানে নিয়ে যাওয়া হলো তখন মনের অজান্তেই মুখ দিয়ে বেরিয়ে এসেছিল ‘বঙ্গবন্ধু মুক্তি পেলে আমি সাতটি জীবন মুক্ত করবো’। স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু যখন মুক্ত হয়ে দেশে ফিরে এলেন মনে হলো স্বাধীনতা পূর্ণতা পেল। আমি অসুস্থ থাকায় আমার স্বামীর হাতে সাতটি কবুতর তুলে দিয়ে বলেছিলাম, তুমি চেষ্টা করো এ কবুতরগুলো বঙ্গবন্ধুর হাতে তুলে দিতে। আমার ইচ্ছা তিনি নিজ হাতে কবুতরগুলো মুক্ত করুক। রেসকোর্স ময়দানে (সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) সেদিন বঙ্গবন্ধু নিজ হাতে মুক্ত করেছিলেন কবুতরগুলো।
জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামকে দেখতে পিজি হাসপাতালে এসেছিলেন বঙ্গবন্ধু। তখন আমার ডিউটি ছিল কাজী নজরুল ইসলামের কেবিনে। বঙ্গবন্ধু পরম মমতায় তাঁর শারীরিক খোঁজখবর নিলেন। আমাদের চিকিৎসকদের কাছে জানতে চাইলেন কবির শারীরিক অবস্থার কথা। কী অমায়িক তাঁর ব্যবহার!

মমতাজ বেগম লিখেছেন-
স্বাধীনতার আগের কথা। আমাদের এক আত্মীয় ঝমু ভাই বঙ্গবন্ধুর ট্রাক চালাতেন। ঝমু ভাই বঙ্গবন্ধুকে আমাদের কথা জানিয়েছিলেন যে, আমার দুই বোন ঢাকা মেডিকেলে নার্সিংয়ে পড়ে। বঙ্গবন্ধু শুনে বলেছিলেন, একদিন বাসায় নিয়ে এসো। বাবা কোরবানির ঈদে ছোট ভাই ও আমাকে সঙ্গে নিয়ে ধানমন্ডিতে বঙ্গবন্ধুর বাসায় গিয়েছিলেন। আমাদের দেখে বঙ্গবন্ধু তার বোনকে বললেন, তাড়াতাড়ি রান্না করো। রান্না হওয়ার পর তিনি নিজ হাতে আমাদের খাবার তুলে দেন। ছোট ভাইয়ের পাতে মাংসের টুকরো দিতে দিতে বলেন ‘এখনই তো খাবার সময়, নেও ভালো করে খাও’।
আরেকদিনের কথা। আমি বাবা আর ছোট ভাই মোশাররফ রমনা পার্কে ঘুরতে গিয়েছিলাম। ততক্ষণে সন্ধ্যা হয়ে গেছে। হঠাৎ সামনে একটি গাড়ি এসে থামল। দেখলাম গাড়ির ভেতর থেকে বঙ্গবন্ধু নামছেন। তিনি বাবাকে জিজ্ঞেস করলেন, কোথায় যাচ্ছেন? বাবা বললেন, মেয়েকে পার্কটি একটু ঘুরিয়ে দেখাবো। বঙ্গবন্ধু বাবাকে বললেন, সন্ধ্যা হয়ে আসছে, পার্কে যাওয়া ঠিক হবে না। এরপর গাড়িতে করে নামিয়ে দিলেন মেডিকেলের হোস্টেলে।