নীতি আদর্শ ছাড়া নেতা হয় না

ঢাকা, বুধবার, ২১ আগস্ট ২০১৯ | ৫ ভাদ্র ১৪২৬

বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক সাক্ষাৎকার

নীতি আদর্শ ছাড়া নেতা হয় না

সাক্ষাৎকার গ্রহীতা সাংবাদিক ডেভিড ফ্রস্ট ১:২৬ অপরাহ্ণ, আগস্ট ০৭, ২০১৯

print
নীতি আদর্শ ছাড়া নেতা হয় না

পাকিস্তান থেকে মুক্তি পেয়ে স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের পর বিদেশি সাংবাদিক হিসেবে সম্ভবত প্রথম বঙ্গবন্ধুর একান্ত সাক্ষাৎকারটি নিয়েছিলেন বিবিসির তৎকালীন সাংবাদিক ডেভিড ফ্র্রস্ট। ১৯৭২ সালের ১৮ জানুয়ারি নিউইয়র্ক টেলিভিশনের ‘ডেভিড ফ্রস্ট প্রোগ্রাম ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে সাক্ষাৎকারটি প্রচারিত হয়। খোলা কাগজের পাঠকদের জন্য সাক্ষাৎকারটির শেষ পর্ব প্রকাশিত হলো-

ডেভিড ফ্রস্ট : একটা বিবরণে দেখলাম, আপনাকে নাকি জেলার সরিয়ে রেখেছিল। ইয়াহিয়া খান যখন আপনাকে হত্যা করার উদ্যোগ নিয়েছিল, তখন আপনাকে স্থানান্তরে নিয়ে গিয়েছিল। একি যথার্থ?
শেখ মুজিবুর রহমান : ওরা জেলাখানায় একটা অবস্থা তৈরি করেছিল, মনে হচ্ছিল কতগুলো কয়েদিকে ওরা সংগঠিত করেছিল। যেন সকালের দিকে আমার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে ওরা আমাকে হত্যা করে ফেলতে পারে। আমার মনে হয়, আমাকে তত্ত্বাবধানের ভার যে অফিসারের ওপর পড়েছিল, আমার প্রতি তার কিছুটা সহানুভূতি জেগেছিল। হয়তো বা সে অফিসার এমনও বুঝতে পেরেছিল যে, ইয়াহিয়া খানের দিন শেষ হয়ে আসছে। আমি দেখলাম, হঠাৎ রাত ৩টার সময়ে সে এসে আমাকে সেল থেকে সরিয়ে নিয়ে তার নিজের বাংলাতে দুদিন যাবৎ রক্ষা করল। এ দুদিন আমার ওপর কোনো সামরিক পাহারা ছিল না। দুদিন পরেই এ অফিসার আমাকে আবার একটা আবাসিক কলোনির নির্জন এলাকায় সরিয়ে নিল। সেখানে আমাকে হয়তো চার-পাঁচ কিংবা ছয় দিন রাখা হয়েছিল। এ সময়টাতে আমার অবস্থান সম্পর্কে নিম্নপদস্থ কিছু অফিসার ছাড়া আর কেউ জ্ঞাত ছিল না।

ডেভিড ফ্রস্ট : এ তাদের সাহসেরই কাজ। এখন তাদের কী হয়েছে, তাই ভাবছি।
শেখ মুজিবুর রহমান : আমিও জানি না। ওদের জন্য যথার্থ শুভ কামনা রয়েছে। এমন কি শেষ মুহূর্তে ইয়াহিয়া খান যখন ভুট্টোর হাতে ক্ষমতা তুলে দেয়, তখন ইয়াহিয়া বলেছিল, মিস্টার ভুট্টো, আমার জীবনের সবচাইতে বড় ভুল হচ্ছে, শেখ মুজিবুর রহমানকে ফাঁসি না দেওয়া।

ডেভিড ফ্রস্ট : ইয়াহিয়া এমন কথা বলেছিল?
শেখ মুজিবুর রহমান : হ্যাঁ, ভুট্টো এ কথা আমায় বলে, তার পরে বলেছিল, ইয়াহিয়ার দাবি ছিল, ক্ষমতা হস্তান্তরের পূর্বে সে পেছনের তারিখ দিয়ে আমাকে ফাঁসি দেবে। কিন্তু ভুট্টো আর এ প্রস্তাবে রাজি হয়নি।

ডেভিড ফ্রস্ট : ভুট্টো কী জবাব দিয়েছিল? সে কথা কি ভুট্টো আপনাকে কিছু বলেছিল?
শেখ মুজিবুর রহমান : ভুট্টো ইয়াহিয়াকে বলেছিল ‘না, আমি তা হতে দিতে পারি না। তাহলে মারাত্মক প্রতিক্রিয়া ঘটবে। বাংলাদেশে এখন আমাদের এক লাখ তিন হাজার সামরিক লোক বাংলাদেশ আর ভারতীয় বাহিনীর হাতে বন্দি রয়েছে। তা ছাড়া পাঁচ থেকে ১০ লাখ অবাঙালি বাংলাদেশে আছে। মিস্টার ইয়াহিয়া, এমন অবস্থায় আপনি যদি শেখ মুজিবকে হত্যা করেন আর আমি ক্ষমতা গ্রহণ করি, তাহলে একটা লোকও আর জীবিত অবস্থায় বাংলাদেশ থেকে পশ্চিম পাকিস্তানে ফেরত আসতে সক্ষম হবে না। আর প্রতিক্রিয়া পশ্চিম পাকিস্তানেও ঘটবে। তখন আমার অবস্থা হবে সংকটজনক।’ ভুট্টো একথা আমাকে বলেছিল।

ডেভিড ফ্রস্ট : যদি ইয়াহিয়া খানের সঙ্গে আপনার সাক্ষাৎ ঘটে, আপনি তাকে কী বলবেন?
শেখ মুজিবুর রহমান : ইয়াহিয়া খান একটা জঘন্য খুনি। তার ছবি দেখতেও আমি রাজি নই। তার বর্বর ফৌজ দিয়ে সে আমার ৩০ লাখ বাঙালিকে হত্যা করেছে।

ডেভিড ফ্রস্ট : নিহতদের সংখ্যা ৩০ লাখ, একথা আপনি সঠিকভাবে জানেন?
শেখ মুজিবুর রহমান : মিস্টার ফ্রস্ট, আপনি জানেন, আমার বাংলাদেশে কী ঘটেছে? শিশু, মেয়ে, বুদ্ধিজীবী, কৃষক, শ্রমিক, ছাত্র সকলকে ওরা হত্যা করেছে। ৩০ লাখ বাঙালিকে ওরা হত্যা করেছে। অন্ততপক্ষে ২৫ থেকে ৩০ ভাগ ঘরবাড়ি ওরা জ্বালিয়ে দিয়েছে এবং তারপর সবকিছু ওরা লুট করেছে। খাদ্যের গুদামগুলোকে ওরা ধ্বংস করেছে। আমার লোকজন তথ্য সংগ্রহ করে চলেছে। এখনো আমরা চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে আসিনি। সংখ্যা হয়তো একেও ছাড়িয়ে যাবে। ত্রিশ লাখের কম তো নয়ই।

ডেভিড ফ্রস্ট : আর এতো ছিল মুসলমানের হাতেই মুসলমানের হত্যা?
শেখ মুজিবুর রহমান : ওরা নিজেরা নিজেদের মুসলমান বলে। অথচ ওরা হত্যা করেছে মুসলমান। আমাদের ত্রাণশিবিরে এখনো অনেক রয়েছে। নির্যাতিত মেয়েদের, অনেককে উদ্ধার করেছি। এদের স্বামী, পিতা-সকলকে হত্যা করা হয়েছে। মা আর বাবার সামনে ওরা মেয়েকে ধর্ষণ করেছে। পুত্রের সামনে মাকে ধর্ষণ করেছে। এরা তো পশুরও অধম। মনে করুন, আমার বন্ধু মশিউর রহমানের কথা। আমাদের দলের একজন শীর্ষস্থানীয় নেতা ছিলেন তিনি। তাকে নির্যাতন করে হত্যা করা হয়েছে। ২৪ দিন ধরে তার ওপর নির্যাতন চালিয়েছে। প্রথমে তাঁর এক হাত কেটেছে। তারপর পা কেটেছে। ২৪ দিনব্যাপী চলছে এমন নির্যাতন (শেখ মুজিব কান্নায় ভেঙে পড়েন)। এমন অমানুষিক নির্যাতনের কাহিনী আমি ইতিহাসে কোথাও শুনিনি।

ডেভিড ফ্রস্ট : ওরা কী চেয়েছিল?
শেখ মুজিবুর রহমান : ওরা চেয়েছিল আমাদের এ বাংলাদেশকে একেবারে উপনিবেশ করে রাখতে। আপনি তো জানেন, মিস্টার ফ্রস্ট, ওরা বাঙালি পুলিশ বাহিনীর লোককে, বাঙালি সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের হত্যা করেছে। ওরা বাঙালি শিক্ষক, অধ্যাপক, ইঞ্জিনিয়ার, বাঙালি ডাক্তার, যুবক, ছাত্র সবাইকে হত্যা করেছে। যুদ্ধের শেষ অবস্থাতেও ১৪ ডিসেম্বর ওরা ১৩০ জন বুদ্ধিজীবীকে হত্যা করেছে।

ডেভিড ফ্রস্ট : আমাদের আজকের এ আলাপে আপনি নেতা এবং নেতৃত্বের কথা তুলেছেন। যথার্থ নেতৃত্বের আপনি কী সংজ্ঞা দেবেন?
শেখ মুজিবুর রহমান : আমি বলব, যথার্থ নেতৃত্ব আসে সংগ্রামের প্রক্রিয়ার মাধ্যমে। কেউ আকস্মিকভাবে এক দিনে নেতা হতে পারে না। তাকে সংগ্রামের মধ্য দিয়ে আসতে হবে। তাকে মানুষের মঙ্গলের জন্য নিজেকে উৎসর্গ করতে হবে। নেতার আদর্শ থাকতে হবে, নীতি থাকতে হবে। এসব গুণ যার থাকে, সেই মাত্র নেতা হতে পারে।

ডেভিড ফ্রস্ট : ইতিহাসের কোন নেতাদের স্মরণ করেন?
শেখ মুজিবুর রহমান : আমি আব্রাহাম লিংকনকে স্মরণ করি। স্মরণ করি মাও সে-তুং, লেনিন, চার্চিলকে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভূতপূর্ব প্রেসিডেন্ট জন কেনেডিকেও আমি শ্রদ্ধা করতাম...।

ডেভিড ফ্রস্ট : মহাত্মা গান্ধী সম্পর্কে আপনার কী ধারণা?
শেখ মুজিবুর রহমান : মহাত্মা গান্ধী, পণ্ডিত জহরলাল নেহরু, নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসু, সোহরাওয়ার্দী, একে ফজলুল হক, কামাল আতাতুর্ক এদের জন্য আমার মনে গভীর শ্রদ্ধাবোধ রয়েছে। আমি ঔপনিবেশিকতার বিরুদ্ধে সংগ্রামী নেতা ড. সুকর্ণকে বিশেষ শ্রদ্ধা করতাম। এই সকল নেতাই তো সংগ্রামের মধ্য দিয়ে নেতা হয়েছিলেন।

ডেভিড ফ্রস্ট : কোন দিনটিকে আপনার জীবনের সব চাইতে সুখের দিন বলে গণ্য করবেন?
শেখ মুজিবুর রহমান : আমি যেদিন শুনলাম, আমার বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে, সে দিনটিই ছিল আমার জীবনের সব চাইতে সুখের দিন।

ডেভিড ফ্রস্ট : পৃথিবীর মানুষের জন্য কী বাণী আপনার কাছ থেকে বহন করে নিয়ে যেতে পারি?
শেখ মুজিবুর রহমান : আমার একমাত্র প্রার্থনা বিশ্ব আমার দেশের মানুষের সাহায্যে অগ্রসর হয়ে আসুক। আমার হতভাগ্য দেশবাসীর পাশে এসে বিশ্বের মানুষ দাঁড়াক। আপনি আমার এই বাণী বহন করুন।