শহীদ সমাধির পরিচর্যাই যার ব্রত

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২০ জুন ২০১৯ | ৬ আষাঢ় ১৪২৬

মাছ বিক্রেতা মতিউরের অনন্য দেশপ্রেম

শহীদ সমাধির পরিচর্যাই যার ব্রত

শফিক হাসান ১০:৩০ অপরাহ্ণ, জানুয়ারি ১১, ২০১৯

print
শহীদ সমাধির পরিচর্যাই যার ব্রত

দেশমাতৃকার ঋণ শোধ করতে চান অনেকেই, শেষ পর্যন্ত পেরে ওঠেন নগণ্যসংখ্যক মানুষ। রকমারি টানাপড়েন ও প্রতিবন্ধকতার গণ্ডিতে আটকে একসময় মৃত্যু ঘটে লালিত স্বপ্নের। এ অবস্থায় একজন ভ্রাম্যমাণ মাছ বিক্রেতা শেখ মতিউর রহমান দৃষ্টান্ত হয়ে উঠেছেন। সীমিত সাধ্যে নিজেকে সঁপে দিয়েছেন শহীদ বুদ্ধিজীবীদের সমাধিসৌধ পরিচর্যায়। দুইজন শহীদ বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর রহমান ও শেখ মাহফুজুর রহমানের কবর নিয়মিত পরিচ্ছন্ন রাখার কাজ করে চলেছেন তিনি। এটাকে তিনি জীবনের ব্রত হিসেবেই নিয়েছেন।

মতিউর জানান, কিছু করতে চেয়েছেন দেশের জন্য। কিন্তু দেশের জন্য কাজ ও জনসেবা করতে প্রয়োজন প্রচুর টাকার। অত টাকা তার নেই। তাই ‘সহজ পন্থা’ হিসেবে নিয়েছেন শহীদ বুদ্ধিজীবীর সমাধিসৌধ পরিচ্ছন্ন রাখার ব্রত। এভাবেই চেষ্টা করেন দেশের দায় কিছুটা হলেও শোধের।
খুব ভোরে আড়ত থেকে মাছ কিনে এনে সারা দিন হেঁটে হেঁটে বিক্রি করেন। কোনো কোনো ক্রেতার কাছে মাছ বিক্রি করতে উঠতে হয় পাঁচ-ছয়তলা পর্যন্তও। বিক্রীত মাছ কেটেও দিতে হয় কাউকে কাউকে। দিনভর পরিশ্রমের পর শরীর ভেঙে পড়তে চায়, মন চায় বিশ্রাম। কিন্তু শরীরের অসহযোগিতা অগ্রাহ্য করে মতিউর চলে আসনে মিরপুরের শহীদ বুদ্ধিজীবী গোরস্তানে। দুজন শহীদের সমাধিতে ঝাড়ু দিয়ে, ঘষে মেজে ঝকঝকে করে রাখেন। ঘাস এবং আগাছা লম্বা হলে সেগুলোও কেটে দেন সাইজ মতো। এর বাইরেও তার সাধ্যমতো পরিচ্ছন্নতার প্রচেষ্টা থাকে প্রতিনিয়ত।
বিনা পারিশ্রমিকে স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে বিগত পাঁচ বছর ধরে দুই মুক্তিযোদ্ধাসহ অন্য বুদ্ধিজীবীর কবর পরিচ্ছন্ন রাখছেন। ব্যাংকে টাকা জমিয়ে কিনেছেন কিছু ফুলের গাছ। সেসব চারা ভেতরে রোপণ করে চেষ্টা করেছেন শ্রদ্ধা জানানোর পাশাপাশি সৌন্দর্যবর্ধনেরও।
জানতে চাইলে শেখ মতিউর রহমান বলেন, বাংলাদেশ সৃষ্টিতে রক্ত দিয়ে যারা অবদান রেখে গেলেন, তাদের যদি একটু সম্মান করতে পারি নিজের আকাক্সক্ষা কিছুটা হলেও পূরণ করতে পারব। বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর রহমানের মরদেহ পাকিস্তান থেকে নিয়ে আসা হয়েছে দীর্ঘ সময় পর। বাংলাদেশেই যদি তার কবর অপরিচ্ছন্ন থাকে-সেটা ভীষণ বেদনার। দেশের সূর্যসন্তানদের ভালোবাসি, শ্রদ্ধা করি, সম্মান করি বলেই নিজ উদ্যোগেই কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে অনুমতি নিয়ে কাজ করে যাচ্ছি। শহীদদের কবরে হাত দিলে আমার শরীরে শিহরণ জাগে, নিজেকে বীরের মতো মনে হয় বলে মন্তব্য করেন এ দেশপ্রেমিক।
মতিউর আরও বলেন, সারা দিন মাছ বিক্রির পর শরীর ক্লান্ত হলে ঘুম আসে। তখন কে যেন আমাকে ডাকে। বলে-এই মতিউর, যা! বুদ্ধিজীবীর গোরস্তানে এলে কোনো ক্লান্তিই থাকে না। ঝড়বৃষ্টি, রোদ কোনো কিছুই আমাকে কর্তব্যকর্ম থেকে বিচ্যুত করতে পারে না। যত যা কিছুই হোক, আমার আসা থেমে থাকে না। যতক্ষণ দিনের আলো থাকে, যতক্ষণ পর্যন্ত কাজ করতে পারি-এখানেই থাকি।
স্বপ্নের কথা জানতে চাইলে শেখ মতিউর রহমান বলেন, এখানে যদি একটি জাদুঘর করা হতো, শহীদ বুদ্ধিজীবীদের জীবনী লেখা হতো তাহলে ভালো লাগত। ভূমিহীন কৃষকের সন্তান, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী হতে পারি কিন্তু আমারও তো এ দেশ নিয়ে ভাবার আছে, কিছু করার আছে।
মতিউর স্বপ্ন দেখেন, তার এ উদ্যোগের কথা নতুন প্রজন্ম জানবে। এ প্রজন্ম হৃদয়ে ধারণ করবে দেশপ্রেমের চেতনা। প্রাপ্য সম্মান করবে প্রত্যেক মুক্তিযোদ্ধাকে।
একজন শেখ মতিউর রহমান যেভাবে প্রতিদিন শহীদদের সম্মানে নিজেকে নিবেদন করেন, হরেক বাধা অগ্রাহ্য করে চেষ্টা করেন দেশের ঋণশোধের-তার এ প্রচেষ্টা ও কর্মোদ্যমকে শ্রদ্ধা এবং স্যালুট না করে উপায় থাকে না!