সোশ্যাল মিডিয়া নিয়ে বিড়ম্বনায় সরকার

ঢাকা, রবিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২১ | ৪ আশ্বিন ১৪২৮

Khola Kagoj BD
Khule Dey Apnar chokh

সোশ্যাল মিডিয়া নিয়ে বিড়ম্বনায় সরকার

আপত্তিকর লিঙ্ক সরাচ্ছে বিটিআরসি, পর্নো-জুয়ার সাইট বন্ধ করা হচ্ছে, বহু ক্ষেত্রে ফেসবুকের সহযোগিতা চাইবে

সাজেদ রোমেল
🕐 ৯:০৬ পূর্বাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ০৭, ২০২১

সোশ্যাল মিডিয়া নিয়ে বিড়ম্বনায় সরকার

বিশ্বে ফেসবুক-মেসেঞ্জার, ইউটিউভ, গুগলের ব্যবহারকারীর সংখ্যা শত শত কোটি। তবে এসব সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে ঝুঁকিও আছে অনেক। নীতিগতভাবে এটি টেলিকম সেবা প্রদানকারী, ইন্টারনেট সরবরাহকারী এবং এমনকি যোগাযোগ পরিসেবা প্রদানকারীদের গোপন কথা জানার অধিকার দেয় না। এক্ষেত্রে তবে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এসব সুরক্ষার অভাব রয়েছে। ফেসবুকের রয়েছে চারটি অ্যাপ। সেগুলো হলো- ফেসবুক, মেসেঞ্জার, হোয়াটসঅ্যাপ ও ইনস্টাগ্রাম। এগুলো ৩ বিলিয়নেরও বেশি ডিভাইসে ইনস্টল হয়েছে। অন্য যত অ্যাপ রয়েছে তার মধ্যে কেবল ‘টিকটক’ এই উচ্চতায় পৌঁছতে সক্ষম হয়েছে।

ফেসবুক থেকে প্রায় ৫ হাজার লিংক সরানো হয়েছে

গত এক বছরে ফেসবুক থেকে আপত্তিকর কনটেন্ট গণ্য করে প্রায় ৫ হাজার লিংক অবসান করেছে বিটিআরসি। গতকাল সোমবার বিটিআরসির কার্যালয়ের সম্মেলন কক্ষে এক সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানানো হয়। সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, গত এক বছরে প্রায় ১৮ হাজার ৮৩৬টি লিংক অপসারণের জন্য ফেসবুকের কাছে অনুরোধ করা হয়। যার মধ্যে ৪ হাজার ৮৮৮টি লিংক অপসারণ করা হয় এবং এখনো ১৩ হাজার ৯৮৪টি লিংক অ্যাকটিভ রয়েছে।

সংবাদ সম্মেলনে বিটিআরসি কর্তৃক প্রকাশিত একটি পরিসংখ্যানে আরও জানানো হয়, ইউটিউবের কাছে ৪৬১টি লিংক অপসারণ করার অনুরোধ করলে সেখানে ৬২টি লিংক অপসারণ করা হয়। এখনো ৩৬৯টি লিংক অ্যাকটিভ রয়েছে।

২২ হাজারের বেশি পর্নো-জুয়ার সাইট বন্ধ করা হয়েছে

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সংঘটিত অপরাধ প্রতিরোধে ২২ হাজারের বেশি পর্নোগ্রাফি ও অনলাইন জুয়ার সাইট বন্ধ করা হয়েছে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি)। ওই সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানান সংস্থার মহাপরিচালক (সিস্টেম অ্যান্ড সার্ভিসেস) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল নাসিম পারভেজ।

বিটিআরসির চেয়ারম্যান শ্যাম সুন্দর শিকদারের সভাপতিত্বে সংবাদ সম্মেলনে ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার, সচিব মো. আফজাল হোসেন অনলাইনে যুক্ত ছিলেন। এছাড়া বিটিআরসির ভাইস চেয়ারম্যান সুব্রত রায় মৈত্র বক্তব্য দেন।

বাজে কন্টেন্ট সরানোর অনুরোধ করবে বাংলাদেশ

ফেসবুক, গুগল, ইউটিউব থেকে বিভিন্ন বিষয়ে উসকানিমূলক ও উগ্রবাদী কনটেন্টসহ বিভিন্ন ধরনের আপত্তিকর কনটেন্ট সরিয়ে নেওয়ার অনুরোধ করবে বাংলাদেশ। সংবাদ সম্মেলনে এ কথা জানানো হয়।

এ বিষয়ে বিটিআরসির চেয়ারম্যান শ্যামসুন্দর সিকদার বলেন, ডিজিটাল বাংলাদেশ হিসেবে এক যুগ ধরে বাংলাদেশ ক্রমান্বয়ে প্রভূত উন্নতি সাধন করেছে। দেশে মোবাইল ফোন এবং ইন্টারনেটের ব্যবহার বেড়েছে। ক্রমান্বয়ে টু-জি, থ্রি-জি, ফোর-জি চালু হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসমূহের ব্যবহার বেড়েছে। বিভিন্ন ওয়েবসাইট এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহারে ইতিবাচক সুবিধার পাশাপাশি এর অপব্যবহারও ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে। এসব ওয়েবসাইট এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পর্নোগ্রাফি, সরকার ও রাষ্ট্রবিরোধী, সামাজিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক কিংবা ধর্মীয় বিষয়ে উসকানিমূলক ও উগ্রবাদী কনটেন্ট প্রচার প্রতিদিন আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। এ ছাড়া শিশু ও কিশোররা এসব সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার এবং অনলাইনে গেমস খেলার কারণে তাদের পড়াশোনায় ব্যাঘাত ঘটার পাশাপাশি স্বাভাবিক বিকাশও ব্যাহত হচ্ছে।

এ সময় বিটিআরসির বিভিন্ন কার্যকলাপ তুলে ধরে শ্যামসুন্দর সিকদার বলেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, গোয়েন্দা সংস্থা ও বিভিন্ন সরকারি সংস্থা প্রতিনিয়ত সন্ত্রাসী কার্যকলাপ, সরকার ও রাষ্ট্রবিরােধী কর্মকাণ্ড, ধর্মীয়, পর্নোগ্রাফি এবং রাজনৈতিক উসকানিমূলক তথ্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসমূহের বিভিন্ন অ্যাকাউন্ট, পেজ, চ্যানেল, লিংক, ইমেজ, অডিও, ভিডিও কনটেন্ট অপসারণের জন্য বিটিআরসির কাছে অনুরোধ জানায়।

এই অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতে বিটিআরসি সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী বিভিন্ন ওয়েবসাইট, ডোমেইন এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের অবমাননাকর পোস্ট এবং আপত্তিকর কনটেন্ট বন্ধ করার জন্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম প্রতিষ্ঠানসমূহকে কনটেন্ট রিপোর্টিং সিস্টেমের মাধ্যমে অনলাইনে অনুরোধ জানায়। এরপর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম কর্তৃপক্ষ তাদের নিজস্ব কমিউনিটি স্ট্যান্ডার্ড গাইডলাইন অনুযায়ী বিটিআরসি থেকে প্রাপ্ত অভিযোগগুলো বিশ্লেষণ করে ওই কনটেন্টগুলো অপসারণ/ব্লক/অ্যাকাউন্ট স্থগিতকরণ কার্যক্রম গ্রহণ করে।

ফেসবুক, গুগল, ইউটিউবকে দেশের বিভিন্ন বিষয়ে উসকানিমূলক ও উগ্রবাদী কনটেন্টসহ বিভিন্ন ধরনের আপত্তিকর সব কনটেন্ট সরিয়ে নেওয়ার অনুরোধ করা হবে জানিয়ে বিটিআরসির চেয়ারম্যান বলেন, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম যেহেতু যুক্তরাষ্ট্র সরকারের রেজিস্টার্ড প্রযুক্তি কোম্পানি, সে অনুযায়ী অন্য কোনো দেশের কোনো অনুরোধ প্রতিপালন করার বিষয়ে তাদের বাধ্যবাধকতা নেই। তবে তারা তাদের নিজস্ব নীতিমালা অনুসরণ করে প্রয়োজনীয় কার্যক্রম সম্পাদন করে।

তিনি বলেন, এ ছাড়া সরকারের অনুমোদনক্রমে ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের আওতাধীন ডিপার্টমেন্ট অব টেলিকমে (ডট) স্থাপিত সাইবার থ্রেট ডিটেকশন অ্যান্ড রেসপন্স (সিটিডিআর) নামে কারিগরি সিস্টেমের মাধ্যমে স্পর্শকাতর/আপত্তিকর ওয়েবসাইট, ডোমেইন, ব্লগ বন্ধ করার কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়ে থাকে। বিটিআরসি চেয়ারম্যান আরও বলেন, সম্প্রতি হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতির নামে অবমাননাকর পোস্ট এবং আপত্তিকর কনটেন্ট অপসারণে বিটিআরসি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম তথা ফেসবুকের সঙ্গে তাৎক্ষণিক যোগাযোগ করে তাদের সহায়তায় পাঁচটি ফেসবুক অ্যাকাউন্ট এবং অন্য একটি অ্যাকাউন্ট থেকে আপত্তিকর পোস্ট অপসারণ করা হয়েছে।

হেনস্তা হলে বিটিআরসিকে জানানোর আহ্বান

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে হেনস্তার শিকারের অভিযোগ পেলে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ সংস্থা (বিটিআরসি) সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে যে কেউ কনটেন্ট অপসারণের অনুরোধ করতে পারে বলে জানিয়েছেন প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান শ্যাম সুন্দর শিকদার।

বিটিআরসি চেয়ারম্যান বলেন, অনেক নারী, তরুণীরা বিভিন্নভাবে বিব্রতকর অবস্থায় পড়ছেন। আমরা তাদের পরামর্শ দেই থানায় জিডি করে কপিটা আমাদের কাছে দেন। ডিজিটাল সিকিউরিটি এজেন্সির কাছে অভিযোগ করলেও আমরা পাই। আবার সরাসরি আমরা কাজ করি। হটলাইন, ই-মেইলে, বিটিআরসির চেয়ারম্যানের ফেসবুকে দিতে পারেন।

তবে মন্ত্রীর মতে, সোশ্যাল মিডিয়ায় তালা মারার ক্ষমতা নেই

সোশ্যাল মিডিয়ার কনটেন্ট অপসারণ বা তালা মারার ক্ষমতা বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) নেই বলে মন্তব্য করেছেন ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, কনটেন্ট ও আনুষঙ্গিক বিষয়ে গতকালের সংবাদ সম্মেলনে এ মন্তব্য করেন মন্ত্রী।
টেলিযোগাযোগ মন্ত্রী বলেন, কেবলমাত্র টেলিফোন বা আইএসপি দিয়ে অপরাধ হয় না। ডার্ক ওয়েভে অপরাধের প্রবণতা বাড়ছে। এখন সবচেয়ে বেশি অপরাধের মাধ্যম ইন্টানেট। এক্ষেত্রে অসহায় প্রকাশ করা ছাড়া বিকল্প কিছু থাকে না। ভিপিএন অপরাধের বড় হাতিয়ার। দিনে দিনে অপরাধ করার হাতিয়ার বাড়ছে।

মোস্তাফা জব্বার বলেন, বিটিআরসি কেবল টেলকো অপারেটর ও আইএসপিগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। এখন আপত্তিকর ওয়েবসাইটগুলো বাংলাদেশের সীমানায় বন্ধ করতে পারে।

‘বাকি বিষয়গুলো নিয়ে আমরা এক রকমের অসহায়ত্ব বোধ করি, আর তা হলো সোশ্যাল মিডিয়া। তারা তাদের মতো করে কমিউনিটি স্ট্যান্ডার্ড বানায়, আমরা তাদের কৃপার ওপর নির্ভরশীল। সেটা আমাদের মেনে নিতে হবে। আমরা আশ্বস্ত করতে পারি, ফেসবুকের সঙ্গে নিয়মিত কথাবার্তা হয়। ’

মন্ত্রী বলেন, যারা আইন-আদালতের কাছে যান, তারা আমাদের অবস্থাটা বুঝবেন। তালা মারার ক্ষমতা বিটিআরসির নেই। যে জায়গায় কাজ করার সক্ষমতা রাখি না, তার দায় আমাদের ওপর দিলে অবিচার হবে।

সামনে ফাইভজি চালু করা হবে জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, ডিজিটাল অপরাধ বাড়ছে, আরও বাড়বে। আমাদের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা অর্জন করতে হবে। আমরা আমাদের দায়িত্ব সততা, নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করছি। আমাদের দিক থেকে মনে হয় না কোনো ত্রুটি পাবেন। দিনরাত কাজ করছি।

মন্ত্রী বলেন, আদালেতের পক্ষাবলম্বন বা বিরোধিতার কোনোটাই আমরা করছি না। আদালতের রায় দেশের নাগরিক হিসেবে ব্যত্যয় করার কোনো কারণ নেই। আমরা আদালতের বক্তব্যের জন্য সংবাদ সম্মেলন করিনি। বিটিআরসি কোনোটা করতে পারে কোনটা করতে পারে না- সেটি খোলাসা করার জন্য সংবাদ সম্মেলন। আদালতকে সাংবাদিক সম্মেলনের সঙ্গে যুক্ত করবেন না। আদালতের বাইরে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ নেই, সেই সুযোগও চাই না।

 
Electronic Paper