ইন্টারনেটে ধীরগতির নেপথ্যে ‘ব্যবসা’

ঢাকা, মঙ্গলবার, ২ মার্চ ২০২১ | ১৮ ফাল্গুন ১৪২৭

ইন্টারনেটে ধীরগতির নেপথ্যে ‘ব্যবসা’

শাহাদাৎ স্বপন ৮:৫৯ পূর্বাহ্ণ, ডিসেম্বর ২৪, ২০২০

print
ইন্টারনেটে ধীরগতির নেপথ্যে ‘ব্যবসা’

বিশ্বব্যাপী ইন্টারনেটের গতি যেখানে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে। অথচ সেই দৌড়ে সবচেয়ে খারাপ অবস্থানে বাংলাদেশ। মাত্র সাত লাখ মানুষের দেশ মালদ্বীপ দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে বেশি ইন্টারনেট গতি সুবিধা দিচ্ছে নাগরিকদের। অথচ প্রায় ১৮ কোটি মানুষের দেশ; বাংলাদেশের নাগরিকরা বিশে^র সবচেয়ে কমগতির ইন্টারনেট ব্যবহার করতে হচ্ছে। এটা ডিজিটালাইজেশনে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করেছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, এর পেছনে মুখ্য হয়ে উঠেছে ব্যবসা। একদিকে মোবাইল কোম্পানিগুলোর অভিযোগ, সরকার অধিক পরিমাণ অর্থের লোভে তরঙ্গ ধরে রাখছে। আর সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, অপারেটরদের পর্যাপ্ত তরঙ্গ কিনতে বললে তারা সরকারের কাছে বিনা পয়সায় তরঙ্গ চায়; যা মানা সম্ভব না।

গ্রামীণফোনের ৭ কোটি ৭৫ লাখ ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর জন্য মাত্র ৩৭ মেগাহার্জ তরঙ্গ কিনেছে সরকারের কাছ থেকে। সেই হিসেবে প্রতি ১ মেগাহার্টজ তরঙ্গের বিপরীতে গ্রাহক সংখ্যা প্রায় ২২ লাখ। অপরদিকে নেপালের মতো দেশে এক মেগাহার্জ তরঙ্গ সুবিধা নিয়ে ইন্টারনেট ব্যবহার করছে মাত্র তিন লাখ ইন্টারনেট ব্যবহারকারী। ফলে নেপালের ইন্টারনেট ব্যবহারকারীদের চেয়ে প্রায় ৮ ভাগের এক ভাগ পরিমাণ গতি সুবিধা পাচ্ছে বাংলাদেশের মানুষ। অর্থাৎ বাংলাদেশের ইন্টারনেট ব্যবহারকারীরা যে পরিমাণ গতি পাচ্ছে, তার প্রায় আট গুণ বেশি গতি সুবিধা পাচ্ছে নেপালের মতো দেশের নাগরিকরা।

ব্যবসায় অধিক লাভের উদ্দেশ্যে মোবাইল অপারেটরগুলো একদিকে সরকারের কাছ থেকে তরঙ্গ বেশি দামে কিনছে না। আর বেশি অর্থের আশায় পর্যাপ্ত তরঙ্গ মোবাইল অপারেটরদের দিচ্ছে না সরকার। মাঝখান থেকে সাধারণ গ্রাহকরা বিশে^র অন্য দেশের নাগরিকদের তুলনায় বেশি অর্থ খরচ করেও উপযুক্ত গতি থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ মুঠোফোন গ্রাহক এসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক মহিউদ্দিন খোলা কাগজকে বলেন, সরকার এবং মোবাইল কোম্পানিগুলোর এমন হীনমন্যতার ফলে সুবিধাবঞ্চিত হচ্ছে সাধারণ ইন্টারনেট ব্যবহারকারীরা। এ কারণে আমরা ইতিমধ্যে ডাক ও টেলিযোগাযোগ সচিব, বিটিআরসি চেয়ারম্যান এবং মোবাইল অপারেটরগুলোকে উকিল নোটিস পাঠিয়েছি। আদালত বর্তমানে বন্ধ রয়েছে, ফলে আদালত খোলার সঙ্গে সঙ্গে এ বিষয়ে আমরা একটি রিট পিটিশন দায়ের করব। তিনি বলেন, আমরা পরিষ্কার বলতে চাই সরকার এবং মোবাইল অপারেটর সংশ্লিষ্টদের উভয়পক্ষকে এগিয়ে এসে অধিক পরিমাণ তরঙ্গ ব্যবহারকারীদের জন্য নিশ্চিত করতে হবে। শুধু মোবাইল অপারেটরগুলো বেশি টাওয়ার নির্মাণ করে ইন্টারনেটের গতি বাড়াতে পারবে না। বরং বেশি টাওয়ার নির্মাণের ফলে আমাদের দেশের টাকা বিদেশে চলে যাচ্ছে, জমি অপচয় হচ্ছে। এমনকি সাধারণ নাগরিকের স্বাস্থ্য ঝুঁকি বাড়ছে।

বাংলাদেশে ইন্টারনেট ব্যবহারকারী কম সুবিধা পাচ্ছে কেন এমন প্রশ্নের জবাবে গ্রামীণফোনের হেড অব এক্সটার্নাল কমিউনিকেশন্স মুহাম্মদ হাসান এই প্রতিবেদককে বলেন, ইন্টারনেট গতি বিষয়ে সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে সমস্যার সমাধান করা সম্ভব। গ্রামীণফোন কর্তৃপক্ষ গ্রাহকদের অভিযোগ সেবার মান উন্নয়নে ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করে থাকে। এর বাইরে তিনি আর কোনো কথা বলতে রাজি হননি।

বাংলালিংকের নাম প্রকাশ না করার শর্তে ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা বলেন, মৌলিকভাবে ইন্টারনেটের গতি কমার কারণ হচ্ছে তরঙ্গ সুবিধা কম থাকা। আর এ তরঙ্গ সুবিধার মালিকানা পুরোপুরি সংরক্ষণ করে সরকার। বিশে^র এমন অনেক দেশ রয়েছে যেখানে ফ্রিতে মোবাইল অপারেটরগুলোকে তরঙ্গ সুবিধা দেয় সরকার। কিন্তু বাংলাদেশে অনেক বেশি চড়ামূল্যে সরকারের কাছ থেকে তরঙ্গ সুবিধা কিনতে হয় মোবাইল অপারেটরদের।

ওই কর্মকর্তা বলেন, আসলে তরঙ্গ হচ্ছে রাষ্ট্রের প্রাকৃতিক সম্পদ। সরকার চাইলে মোবাইল অপারেটরদের ভালো সুবিধা দেওয়ার শর্তে তরঙ্গ সুবিধা দিতে পারে। এক্ষেত্রে সরকার যে পরিমাণ তরঙ্গ সুবিধা মোবাইল কোম্পানিগুলোকে দেবে, সেই আনুপাতিক হারে মোবাইল অপারেটরগুলো সাধারণ ইন্টারনেট ব্যবহারকারীদের সুবিধা দিতে পারবে। সব অপারেটর ব্যবসা করতে বাজারে এসেছে। শুনে আশ্চর্য হবেন দীর্ঘ ২০ বছর ধরে বাংলালিংক ব্যবসা করে আজ পর্যন্ত লাভে আসতে পারেনি। অপারেটরগুলো প্রতি ১০০ টাকা ব্যবসা করলে নানাভাবে ৫৫ টাকা সরকারের খাতেই জমা দিতে হয়। ফলে যে পরিমাণ তরঙ্গ সুবিধা সরকার দেবে সে আনুপাতিক হারে সাধারণ গ্রাহকরাও এ সুবিধা পাবে।

এ বিষয়ে ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার খোলা কাগজকে বলেন, এখানে দুটি পদক্ষেপ নিতে হবে। একটি হচ্ছে দেশের সবগুলো অপারেটরকে ফোরজি ইন্টারনেট সুবিধা দিতে হবে। তাহলে ইন্টারনেটের যে দুর্বল অবস্থা রয়েছে তা নিরসন হবে। আমাদের মোবাইল অপারেটরগুলোর সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হচ্ছে, তাদের যে পরিমাণ গ্রাহক রয়েছে সে পরিমাণ ইন্টারনেট ব্যবহার করার জন্য তরঙ্গ নেই। তাদের এটা কিনতে বললে তারা সহজেই বলে দেয়, সরকারকে বিনা পয়সায় তরঙ্গ দিতে হবে। আর তারা যেটা বলে সেটা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। কারণ তরঙ্গ রাষ্ট্রীয় সম্পদ এবং রাষ্ট্রীয় সম্পদ বিলিয়ে দেওয়ার কোনো কারণ নেই।

তিনি বলেন, আমরা ইতিমধ্যে রবির তরঙ্গ সুবিধা রিনিউ করে দিয়েছি। অন্যরা যদি আবেদন করে তাদেরও এ সুবিধা দেওয়া হবে।