নারায়ণগঞ্জের গুণী পাঁচ নারী

ঢাকা, রবিবার, ১৮ এপ্রিল ২০২১ | ৫ বৈশাখ ১৪২৮

নারায়ণগঞ্জের গুণী পাঁচ নারী

সাইফ-উদ-দৌলা রুমী ১২:১৩ অপরাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ২৪, ২০২১

print
নারায়ণগঞ্জের গুণী পাঁচ নারী

প্রাচ্যের ডান্ডিখ্যাত নারায়ণগঞ্জ ইতিহাস- ঐতিহ্যে যেমন সমৃদ্ধ ঠিক তেমনি শিল্প-সংস্কৃতিতেও। এ জেলার রয়েছে বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক ইতিহাসও। বহু গুণীর জন্ম হয়েছে এ জেলায়। গুণীদের তালিকায় নারীর সংখ্যাও কম নয়। তেমনই কিছু গুণী নারীকে নিয়ে লিখেছেন মোহাম্মদ নেয়ামত উল্লাহ। সম্পাদনা করেছেন সাইফ-উদ-দৌলা রুমী

মহীয়সী নাগিনা জোহা
নারায়ণগঞ্জের রাজনীতির সঙ্গে ওসমান পরিবারের নামটি অঙ্গাঅঙ্গিভাবে জড়িত। নারায়ণগঞ্জের প্রভাবশালী এ রাজনৈতিক পরিবারটিকে আজকের অবস্থানে নিয়ে আসার পেছনে যিনি কাজ করে গেছেন তিনি হচ্ছেন নাগিনা জোহা। একেএম সামসুজ্জোহার স্ত্রী। খান সাহেব ওসমান আলী সাহেবের পুত্রবধূ। নাগিনা জোহার তিন ছেলে নাসিম ওসমান, সেলিম ওসমান ও শামীম ওসমান; যারা প্রত্যেকে জাতীয় সংসদের প্রতিনিধিত্ব করেছেন এবং এখনও করছেন। বাংলাদেশের ইতিহাসে তিন ভাইয়ের সংসদ সদস্য হওয়ার ঘটনা বিরল। শুধু তাই নয়, বড় ছেলে নাসিম ওসমান চারবার ও শামীম ওসমান তৃতীয় মেয়াদে সংসদ সদস্য হয়েছেন। মহীয়সী রত্নাগর্ভা নাগিনা জোহা সেই সফল নারী; যার তিন ছেলে সংসদ সদস্য হয়েছেন। শুধু তাই নয়, স্বামী একেএম সামসুজ্জোহাও গণপরিষদ সদস্য ছিলেন। ভাষা সৈনিক সামসুজ্জোহার পাশে থেকে তিনিও ভাষা-আন্দোলনে যুক্ত ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধ সংগঠনের পরিকল্পনায় তাদের বাসগৃহ বায়তুল আমান ছিল অন্যতম। শুধু শ্বশুরবাড়ি নয়, পিতৃপরিচয়েও অনেক উজ্জ্বল এ নারী। ১৯৩৫ সালে অবিভক্ত বাংলার বর্ধমান জেলার কাশেম নগরের জমিদার পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাদের পরিবারের পূর্ব পুরুষদের নামানুসারেই গ্রামটির নাম কাশেমনগর রাখা হয়। তার বাবা আবুল হাসনাত ছিলেন সমাজ হিতৈষী ও কাশেম নগরের জমিদার। শিল্প-সংস্কৃতির পৃষ্ঠপোষকতায় তার বিশেষ সুনাম ছিল। নাগিনা জোহার বড় চাচা আবুল কাশেমের ছেলে আবুল হাশিম ছিলেন অবিভক্ত ভারতবর্ষের মুসলীম লীগের সেক্রেটারি ও এম.এল.এ।চাচাতো ভাই মাহবুব জাহেদী ভারতের কেন্দ্রীয় মন্ত্রিপরিষদের সদস্য ছিলেন। ভাগ্নে পশ্চিমবঙ্গের কমিউনিস্ট নেতা সৈয়দ মনসুর হাবিবুল্লাহ রাজ্যসভার স্পিকার ছিলেন। ১৯৫১ সালে একেএম সামসুজ্জোহার সঙ্গে তার বিয়ে হয়। স্বামীর বাড়িতে এসেই ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে অংশ নেন।
২০১৬ সালের ৭ মার্চ বার্ধক্যজনিত কারণে রাজধানীর ইউনাইটেড হাসপাতালে তিনি শেষ নিঃশ^াস ত্যাগ করেন।

রণাঙ্গণের বীরাঙ্গনা ফরিদা আক্তার
শেষ বয়সে এসে জাতীয় পুরস্কার রোকেয়া পদক পাওয়ায় কিছুটা তৃপ্তি নিয়ে মরতে পারবেন বলে অভিব্যক্তি প্রকাশ করেন নারায়ণগঞ্জের নারী মুক্তিযোদ্ধা ফরিদা আক্তার। তবে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ তার জীবনের শ্রেষ্ঠ প্রাপ্তি বলে মনে করেন। শুধু একটি স্বাধীন দেশ পাবার আশায় সে সময়ে একজন নারী হয়েও রণাঙ্গণে ঝাঁপিয়ে পড়তে কুণ্ঠা করেননি। রণাঙ্গণের এই অকুতোভয় নারীর জন্ম ভাষা আন্দোলনের উত্তাল সময়টাতে। নারায়ণগঞ্জের বন্দর কদমরসুল এলাকায় ১৯৫২ সালের ২৩ মে জন্ম নেওয়া এই নারী যেন জন্মেছেন সংগ্রাম ও আন্দোলনের জন্যই। ১৯৬২ সালে নারায়ণগঞ্জের বালুর মাঠে (বর্তমানে তা ডিআইটি মার্কেট) একটি সভার আয়োজন করে আওয়ামী লীগ। সে সভায় বঙ্গবন্ধু ও হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী বক্তব্য রাখেন। ষষ্ঠ শ্রেণীতে পড়া অবস্থায় সে মঞ্চে বক্তব্য রাখেন ফরিদা আক্তার! সাহসী সেই ফরিদার বক্তব্যে সেদিন জাতীয় নেতারা বুঝেছিলেন-এই নারী যেন অগ্নিশিখা।

অগ্নিশিখার মতোই পরবর্তীতে জ্বলে উঠেছিলেন তিনি। এরপর ১৯৬৬ সালে ছাত্রলীগে যোগ দিয়ে ছয় দফা আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশ নেন। পরবর্তীতে ১৯৬৭ সালে আইয়ুব খানের বিরুদ্ধে গণ-আন্দোলনে মহিলা সংগ্রাম পরিষদের নারায়ণগঞ্জ জেলার সাধারণ সম্পাদক, নারায়ণগঞ্জ গালর্স হাই স্কুল ও নারায়ণগঞ্জ মহিলা কলেজে ছাত্রী অবস্থায় তিনি স্বাধীন বাংলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদে নারায়ণগঞ্জ জেলার সাংগঠনিক সম্পাদক হিসেবে রাজনৈতিক ছাত্র আন্দোলনে রাজপথে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। কলেজে ছাত্রী সংসদের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে নির্বাচিত হন। ১৯৭১ সালে মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশ নেন।

মুক্তিযুদ্ধের পরে ১৯৭৪ সালে জেলা আওয়ামী লীগের মহিলা সম্পাদিকা এবং কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদিকা নিযুক্ত হন। ১৯৭৪ সালে বাকশালের প্রেসিডিয়াম সদস্য এবং ১৯৭৪ সালে নারায়ণগঞ্জ পৌরসভার কমিশনার নির্বাচিত হন। ২০২০ সালের ৯ ডিসেম্বর তাকে নারী অধিকার আদায়ের সংগ্রামের স্বীকৃতি হিসেবে বেগম রোকেয়া পদক তুলে দেওয়া হয়। আন্তর্জাতিক ট্রেড ইউনিয়নের প্রেসিডেন্ট হিসেবেও তিনি নারীর অধিকার আদায়ে বেশ সোচ্চার। রোকেয়া পদক পাওয়ার আগে তিনি শ্রেষ্ঠ জয়িতা, শ্রেষ্ঠ সমবায়ী পুরস্কারও পেয়েছেন।

রত্নাগর্ভা লুৎফা জালাল
লুৎফা জালাল। ভাগ্যবান এবং একইসঙ্গে একজন সফল নারী। রতœাগর্ভাও বটে। পিতা-স্বামী-সন্তানকে ঘিরে একটি নারীর জীবন আবর্তিত হয়। অনেকের জীবনে ভালো পিতা জুটলেও বাকি দুটোর অপূর্ণতা থেকে যায়। কিন্তু কিছু কিছু নারীর জীবনে এ তিনটিই আসে আর্শীবাদ হয়ে। লুৎফা জালালের জীবনেও এ তিনটি এসেছে সফলভাবে। স্বামী ও সন্তান যেন সোনায় সোহাগা। চারটি সন্তান; এক একটা যেন হীরের টুকরো। প্রথম সন্তান ড. জেবুন্নেছা, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও লোকপ্রশাসন বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান। দ্বিতীয় সন্তান জাকারিয়া জালাল বুয়েট থেকে পাস করার পরে বর্তমানে দেশের বৃহতম গ্রুপ অব কোম্পানি বসুন্ধরা গ্রুপের এলপিজি বিভাগের ডাইরেক্টর। তৃতীয় সন্তান জান্নাত জালাল একজন কৃষিবিদ। চতুর্থ সন্তান জাবের বিন জালাল জাহাঙ্গীরনগর বিশ^বিদ্যালয় থেকে পাস করে একটি মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিতে কর্মরত।

স্বামী কবি-নাট্যকার মু. জালাল উদ্দিন নলুয়াও একজন স্বনামধন্য ব্যক্তিত্ব। ১৯৭৮ সালে এসএসসি পাস করার পরে জালালউদ্দিন নলুয়ার সঙ্গে বিয়ে হয় তার। বিয়ের পর থেকে স্বামীর উৎসাহে কিছুদিন পড়াশোনা চালিয়ে যান। কিন্তু সন্তানদের কারণে পড়াশোনা আটকে যায়। তখন তিনি সিদ্ধান্ত নেন-সন্তানদের উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত করাবেন। সন্তানদের জন্য শুরু হয় তার নতুন জীবন। সংসারের পাশাপাশি তিনিও লেখালেখিতে মনোযোগ দেন। নব্বইয়ের দশকে প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘অলঙ্কার’ প্রকাশ হয়। কিন্তু এর আগেই আশির দশকে ঢাকা থেকে প্রকাশিত আগামীকাল ম্যাগাজিনে প্রথম লেখা প্রকাশিত হয়। লুৎফা জালাল স্বামীর পাশে থেকেই সাহিত্যাঙ্গণে পদাচারণা করেন। নানা সাহিত্যসভায় ও অন্যান্য সভাগুলোতে দুইজনকেই পাশাপাশি দেখা যেত। সাহিত্য জীবনেও বেশকিছু সম্মাননা অর্জন করেন। নারায়ণগঞ্জ সাহিত্য সম্মেলন সম্মাননা ১৯৯৮, মৃত্তিকা পদক ২০১২, সাদা মনের মানুষ ২০১৪, নারায়ণগঞ্জ জেলার শ্রেষ্ঠ মা ২০১২, বাসিয়া সম্মাননা পদক ২০১৮, গাংচিল সম্মাননাসহ ২০১৮ আরও বেশকিছু সম্মাননা লাভ করেন।

সাধারণ মানুষের ধারণা সাহিত্যের সঙ্গে জড়িতদের জীবন কিছুটা অগোছালো ও ছন্নছাড়া হয়। কিন্তু লুৎফা জালাল তেমনটি নন, তিনি প্রচলিত এই ধারণাকে ভুল প্রমাণ করে নিজেদের সন্তানদের যেমন উচ্চ শিক্ষিত করেছেন, নিজেও সাহিত্যে নিজের অবস্থান তৈরি করেছেন। বাংলা একাডেমির সদস্য লুৎফা জালাল নারায়ণগঞ্জে এখন অনেক নারীর প্রেরণা।

সেলিনা হায়াৎ আইভী
২০০৩ সাল থেকে টানা ১৭ বছর ধরে তিনি প্রথমে নারায়ণগঞ্জ পৌরসভা ও পরে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের চেয়ারে। আড়ালে রগচটা জেদি বা লৌহমানবী অনেকে অনেক কিছুই বললেও সকলেই একবাক্যে স্বীকার করেন আইভীর হাত ধরে নারায়ণগঞ্জে যে উন্নয়ন হয়েছে তা বাংলাদেশের অন্য কোনো সিটি করপোরেশনেও হয়নি। দীর্ঘ সময় ধরে মেয়রের চেয়ারে বসে থাকলেও কোনো বাহিনীও নেই তার। ‘জনগণকে নিজের সেনাবাহিনী’-দাবি করা এই মেয়র অবিচল থেকেছেন নিজের কাজে ও আদর্শে। এ ১৭ বছরে অনেক ঘাত-প্রতিঘাত এলেও এতটুকুও দমেননি তিনি। ঘাত-প্রতিঘাত ঠেলে শুধু সিটি করপোরেশনের উন্নয়নে তিনি মনোযোগ দিয়ে এগোচ্ছেন। দক্ষিণ কোরিয়ার প্রভাবশালী সাময়িকী দ্য এশিয়ান এর চোখে এশিয়ার ক্ষমতাধর মেয়রের তালিকায়ও তার নাম উঠে। কীভাবে তিনি এত ক্ষমতাধর হলেন-সে প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে ইস্পাত কঠিন ব্যক্তিত্ব ও জনগণের সমর্থনের বিষয়টিই সামনে আসে। জনগণের অকুণ্ঠ সমর্থনের কারণে সিটি করপোরেশন এলাকায় দীর্ঘদিনের দখলে থাকা জমি উদ্ধারসহ বড় বড় প্রকল্পগুলো অনায়াসেই যেন করে চলেছেন।

সাধারণ মানুষের মতে, আইভীর আমলে সিটি করপোরেশনের চিত্র বদলে গেছে ইতিবাচকভাবে। নগরীর শেখ রাসেল পার্ক করতে গিয়ে আইভীকে নতুনভাবে চিনেছে নগরবাসী। চারপাশ দিয়ে দখল করে থাকা জঞ্জাল সরাতে আদালত, রাজনীতিক ও স্থানীয় প্রভাবশালীদের কাছেও এতটুকুও হার মানেননি তিনি। বুলডোজার চালিয়ে দিয়েছেন নিজে দাঁড়িয়ে থেকেই। ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী নারায়ণগঞ্জের নগরপিতা খ্যাত আলী আহমেদ চুনকার প্রথম সন্তান। আলী আহমেদ চুনকা ছিলেন নারায়ণগঞ্জ শহর আওয়ামী লীগের সভাপতি, স্বাধীনতার পর যিনি জনপ্রিয়তার তুঙ্গে থেকে দুই দুবার (১৯৭৪ ও ১৯৭৭) নারায়ণগঞ্জ পৌরসভার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। ডাক্তার আইভী ১৯৬৬ সালের ৬ জুন মাতা মমতাজ বেগম ও পিতা আলী আহাম্মদ চুনকার ঘর আলো করে পৃথিবীতে আসেন।

দেওভোগ আখড়া প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে শিক্ষা জীবন শুরু করেন। পরবর্তীতে তিনি নারায়ণগঞ্জ প্রিপারেটরি স্কুলে ভর্তি হন এবং ষষ্ঠ শ্রেণী পর্যন্ত লেখাপড়া করেন। অতঃপর তিনি মর্গ্যান বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে ভর্তি হন। ১৯৭৯ সালে ট্যালেন্টপুলে জুনিয়র স্কলারশিপ পান এবং ১৯৮২ সালে মাধ্যমিক স্কুল সার্টিফিকেট পরীক্ষায় স্টার মার্কসহ উত্তীর্ণ হন। এরপর তিনি ১৯৮৫ সালে রাশিয়ান সরকারের স্কলারশিপ নিয়ে চিকিৎসা বিজ্ঞানে শিক্ষা গ্রহণের জন্য ওডেসা পিরাগোব মেডিকেল ইনস্টিটিউটে ভর্তি হন এবং ১৯৯২ সালে কৃতিত্বের সঙ্গে মেডিসিন ডাক্তার ডিগ্রি লাভ করেন। পরবর্তীতে ১৯৯২-৯৩ সালে ঢাকা মিডফোর্ট হাসপাতালে ইন্টার্নি সম্পন্ন করেন। ডা. আইভী তার সুদীর্ঘ শিক্ষা জীবনের পর ১৯৯৩-৯৪ সালে মিডফোর্ট হাসপাতালে এবং ১৯৯৪-৯৫ সালে নারায়ণগঞ্জ ২০০ শয্যা বিশিষ্ট হাসপাতালে অনারারি চিকিৎসক হিসেবে কাজ করেন। তিনি স্কুল ও কলেজ জীবন থেকে বাবার সঙ্গে বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক কর্মকা-ে অংশগ্রহণ করতেন। ১৯৯৩ সালে তিনি নারায়ণগঞ্জ শহর আওয়ামী লীগের স্বাস্থ্য ও পরিবেশ বিষয়ক সম্পাদিকা ছিলেন।

২০০৩ সালে অনুষ্ঠিত পৌরসভা নির্বাচনে অংশগ্রহণের মাধ্যমে তার সক্রিয় রাজনৈতিক জীবনের সূত্রপাত ঘটে। ২০০৩ সালের ১৬ জানুয়ারি তনি বিপুল ভোটের ব্যবধানে পৌরসভার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। তিনি ছিলেন কোনো পৌরসভার নির্বাচিত নারী চেয়ারম্যান। এরপর দুবার পৌরসভার নির্বাচনে এবং ২০১১ সালে সিটি করপোরেশন গঠিত হওয়ার পরে আবারও দুবার নির্বাচিত হন আলোচিত এই নারী। নগর আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি ছাড়াও তিনি আলী আহাম্মদ চুনকা ফাউন্ডেশন এবং নারায়ণগঞ্জ হার্ট ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি এবং স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদের (স্বাচিপ) নারায়ণগঞ্জ জেলার আহ্বায়কের দায়িত্বও পালন করেন।

বিশ্ব মিডিয়ায় সনু রানী
স্কুলে নিজের পরিচয় গোপন রাখতেন। কারণ তাদের সম্প্রদায়ের লোকজন হিন্দি সংস্কৃতি লালন করে। নিচু বর্ণের লোক হিসেবে পরিচিত হওয়ায় সমাজে নিগ্রহেরও শিকার হতে হয় তাদের। ফলে স্কুলে গিয়ে পড়াশোনা করা, বড় চাকরি করা এসব তাদের কাছে স্বপ্নের মতো। এই সম্প্রদায়ের নারীরা আরও বেশি নিগৃহীত। তাদের পড়াশোনা করাকে বিলাসিতা মনে করা হয়। সে পরিবেশ থেকে উঠে এসে ২০১৪ সালে স্নাতক পাশ করেছেন সনু রানী দাস। নারায়ণগঞ্জের দলিত সম্প্রদায়ের প্রথম গ্র্যাজুয়েট তিনি। তার এ অর্জনের খবর রীতিমতো চমকে দিয়েছে তাদের সম্প্রদায়কে। শুধু নারায়ণগঞ্জে নয়, আলোড়ন তোলেন গণমাধ্যমেও। স্থানীয়, জাতীয় ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমেও সনু রানীকে নিয়ে বড় বড় খবর বেরোয়। সনু রানী ২০০৬ সালে এসএসসি এবং ২০০৮ সালে এইএএসসি পাশ করেন। এক বছর বিরতি দিয়ে ২০১০ সালে ডিগ্রিতে ভর্তি হন। দলিত সম্প্রদায়ের এই নারী শুধু তাদের দীর্ঘদিনের গণ্ডিই ভেদ করেননি, করেছেন আলোকিত পথেরও সন্ধান। আলোচিত এই নারী হয়ে উঠলেন আলোচিত। বিশ্ব মিডিয়ায় একে একে তাদের নিয়ে প্রতিবেদনের পরে তিনি এখন দেশজুড়েই পরিচিত।

নারায়ণগঞ্জের টানবাজার সুইপার কলোনির প্রথম গ্রাজুয়েট সনু রানী দাসের স্বপ্নও এখন বেশ বড়। হরিজন সম্প্রদায়ের ছেলে-মেয়েরা কেন পড়াশোনায় পিছিয়ে, তাদের এগিয়ে চলার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতাগুলো কী, কীভাবে সেগুলো দূর করা যায়-এসব বিষয়ে নিজের ভাবনার কথা বলেছেন তিনি। এসব নিয়ে বহু দিনের ভাবনা তার। কলোনির সংকটের পাশাপাশি কথায় কথায় সনু তার নিজের জীবনের গল্প বলেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশে এখনও একজন নারীকে উঠে আসতে হলে অনেক সংগ্রাম করতে হয়। আর সুইপার কলোনিতে জন্ম নেওয়া একটি শিশুর জন্য ভিন্ন ভাষায় পড়াশোনা করাটা আরও কঠিন।

কিন্তু সনু ও তার দুই বান্ধবী সে সংগ্রামটা করেছেন। মাঝপথে দুজন কিছুটা পিছিয়ে গেলেও সনু তার সংগ্রমাটা চালিয়ে গেছেন। সনু জানান, তিনি এবং তার দুই বান্ধবী মিনা ও পূজা নারায়ণগঞ্জের হরিজনদের মধ্যে প্রথম এসএসসি পাস করেন। ১৫০টি পরিবারের এ কলোনিতে ১৯৬৪ সাল থেকেই একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় আছে। তবু ২০০৬ সালের আগে সেই কলোনির কেউ মাধ্যমিকের গণ্ডি পার করতে পারেননি। সনুর মতে, ভাষাগত প্রতিবন্ধকতা, পরিবারগুলোর অসচেতনতা ও অর্থনৈতিক দৈন্যই এর জন্য দায়ী। সুইপারদের মাতৃভাষা হিন্দি হলেও পাঠ্যবইগুলো বাংলায়। বাংলা বুঝতে না পারায় প্রাথমিক পর্যায়েই ছেলে-মেয়েরা ঝরে পড়ে। স্কুলের শিক্ষকেরা ভিন্ন ভাষা ও ভিন্ন সংস্কৃতির হওয়ার কারণে পড়াশোনাটা শিশুদের জন্য আনন্দদায়ক হয়ে ওঠে না। সনু বলেন, ‘উচ্চ মাধ্যমিকের পাঠ চোকানোর পরই আমি ও মিনা (সনুর বান্ধবী) ভাবলাম, শিক্ষক হতে হবে। শিশুদের বাংলা শেখানোর জন্যই শিক্ষক হওয়ার ইচ্ছা।’ শিক্ষক না হতে পারলে কী করবেন?

প্রশ্ন করতেই ভ্রু কুঁচকে ফেলেন সনু। বলেন, ‘অন্য কিছু করার হলে তো এতেদিনে সেটাই করতাম। এনজিও থেকে চাকরির প্রস্তাব আসে। মোটা অঙ্কের বেতনের কথা বলে। কিন্তু তারা কী দিচ্ছে, সেটা আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ না। আমি কী করতে চাই, সেটাই জরুরি। আমি আমার কলোনির শিশুদের নিয়েই কাজ করতে চাই। নিজ সম্প্রদায়ের প্রতি এটা আমাদের দায়বদ্ধতা।’