ঢাকার প্রথম আধুনিক নারী

ঢাকা, মঙ্গলবার, ২ মার্চ ২০২১ | ১৮ ফাল্গুন ১৪২৭

ঢাকার প্রথম আধুনিক নারী

সাইফ-উদ-দৌলা রুমী ১১:৩৯ পূর্বাহ্ণ, জানুয়ারি ২০, ২০২১

print
ঢাকার প্রথম আধুনিক নারী

শতবর্ষে বিস্মৃত নাম হরিপ্রভা তাকেদা। প্রথম ভারতীয় মহিলা হিসেবে তিনিই প্রথম জাপান যাত্রা করেন, বৈবাহিক সূত্রে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় তিনি জাপানে বসবাসকালে টোকিও রেডিওতে আজাদ হিন্দ ফৌজের সংবাদ পাঠিকার দায়িত্ব পালন করেন। সে হিসেবে নেতাজী সুভাষ বোসের একজন কর্মীও বটে। যুদ্ধের পর তিনি ভারতে ফিরে আসেন এবং পশ্চিমবঙ্গের জলপাইগুড়িতে বসবাস করতে থাকেন। হরিপ্রভা বিবেচিত হন ‘ঢাকার প্রথম আধুনিক নারী’ হিসেবে। খুবই তাৎপর্যপূর্ণ কিছু গুণের অধিকারী তিনি, যেগুলো সম্পর্কে জানতে পারলে তার আধুনিকতার বিষয়ে সংশয়ের অবকাশ থাকবে না মোটেই। তার আধুনিক হওয়ার রহস্য তুলে ধরেছেন সাইফ-উদ-দৌলা রুমী

প্রথম জীবন

হরিপ্রভার জন্ম ১৮৯০ সালে তদানীন্তন ঢাকা জেলার খিলগাঁও গ্রামে। হরিপ্রভার বাবা শশীভূষণ মল্লিক ছিলেন ঢাকার নববিধান ব্রাহ্মসমাজের সক্রিয় কর্মী। ১৮৯২ সালে তিনি ঢাকায় নিরাশ্রয় মহিলা ও শিশুদের পুনর্বাসনের উদ্দেশ্যে মাতৃনিকেতন নামে একটি আশ্রম প্রতিষ্ঠা করেন। হরিপ্রভার মা নগেন্দ্রবালা মাতৃনিকেতনের দেখাশুনো করতেন। তার শৈশবের কথা তেমন জানা যায়নি। তবে শোনা যায় তিনি ইডেন স্কুলে মেট্রিক পর্যন্ত পড়াশোনা করেছিলেন। ছোট থেকেই তিনি মাতৃনিকেতনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। আশ্রমে কাজ করার সুবাদে তার পরিচয় হয় জাপানি যুবক ওয়েমন তাকেদার সঙ্গে। ওয়েমন তখন ঢাকার বুলবুল সোপ ফ্যাক্টরিতে প্রধান কারিগর ছিলেন। তাদের পরিচয় ক্রমে প্রণয়ে পরিণত হয়। ১৯০৭ সালে উভয় পরিবারের সম্মতিতে নববিধান ব্রাহ্মসমাজের নবসংহিতা অনুসারে তাদের বিবাহ হয়। বিবাহের পর ওয়েমন তার শ্বশুর শশীভূষণ মল্লিকের সহযোগিতায় ঢাকা সোপ ফ্যাক্টরি প্রতিষ্ঠা করেন। বছর খানেক পর ঢাকা সোপ ফ্যাক্টরি আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ে। ওয়েমন তখন ব্যবসার পাট চুকিয়ে সস্ত্রীক জাপানে প্রত্যাবর্তনের সিদ্ধান্ত নেন।


জাপান যাত্রা

হরিপ্রভার জাপান যাত্রার সংবাদ প্রচারিত হতেই দেশে হইচই পড়ে যায়। দিনাজপুরের মহারাজা তাকেদা দম্পতির জাপান যাত্রার কথা শুনে তাদের ২৫ টাকা উপহার দেন। ঢাকাস্থ জনৈক জাপানি ব্যবসায়ী কোহারা তাদের ৫০ টাকা উপহার দেন। ঢাকার নববিধান ব্রাহ্মসমাজের পক্ষ থেকে তাদের যাত্রার শুভকামনা করে প্রার্থনার আয়োজন করা হয়। ১৯১২ সালের ৩ নভেম্বর হরিপ্রভা ও ওয়েমান ঢাকা থেকে যাত্রা শুরু করেন। প্রথমে নারাছুগঞ্জ থেকে স্টিমারে গোয়ালন্দ্র। গোয়ালন্দ্র থেকে ট্রেনে কলকাতা। ৫ নভেম্বর তারা কলকাতা থেকে জাহাজে করে জাপানের উদ্দেশ্যে রওনা দেন। তারা জাপানের পোর্ট মোজিতে পৌঁছান ১৩ ডিসেম্বর। হরিপ্রভার জাপানে আগমন সংবাদ জাপানের দুটি সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয়। হরিপ্রভা তার প্রথম জাপান সফরে চার মাস কাটান। এ সময়ে তিনি শুধু তার শ্বশুরবাড়িই নয় জাপানের সমাজ ব্যবস্থাকেও খুব কাছ থেকে দেখার সুযোগ পান। তিনি জাপানের সামাজিক রীতিনীতির খুঁটিনাটি বিষয় পর্যবেক্ষণ করেন ও ভারতীয় সমাজের রীতিনীতির সঙ্গে তা তুলনা করতে থাকেন। ১৯১৩ সালের ১২ এপ্রিল তারা ভারতের উদ্দেশ্যে রওনা দেন। দেশে ফেরার পর তিনি ‘বঙ্গমহিলার জাপান যাত্রা’ নামে একটি ভ্রমণ বৃত্তান্ত লেখেন। সেখানে তিনি তার সমুদ্রযাত্রা, শ্বশুরবাড়ির আতিথেয়তা, ভারতীয়দের নিয়ে জাপানিদের ঔৎসুক্য, জাপানের সমাজ ব্যবস্থা ইত্যাদি বিষয়গুলি নিয়ে লেখেন। ১৯১৫ সালে মাতৃনিকেতনের সহায়তায় তার ভ্রমণ বৃত্তান্তটি পুস্তকা আকারে প্রকাশিত হয় ঢাকা থেকে।

দ্বিতীয় জাপান যাত্রা

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে জাপান সরকার ভারতে অবস্থানকারী সমস্ত জাপানি নাগরিককে দেশে ফিরিয়ে নেয়। ১৯৪১ সালে হরিপ্রভা তার স্বামীর সঙ্গে পাকাপাকিভাবে জাপান চলে যান। যুদ্ধকালীন সময়ে জাপানের আর্থনৈতিক সঙ্কট চলছিল। জাপানে তাদের বাসস্থান বা উপার্জন কিছুই ছিল না। এর মধ্যে ওয়েমন অসুস্থ হয়ে পড়েন। এ সময় হরিপ্রভার পাশে দাঁড়ান রাসবিহারী বসু। তার মাধ্যমে হরিপ্রভা নেতাজীর সঙ্গে পরিচির হন। নেতাজী হরিপ্রভাকে দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ করেন। রাসবিহারী বসুর মধ্যস্থতায় হরিপ্রভা ১৯৪২ সালে টোকিও রেডিওতে আজাদ হিন্দ্র ফৌজের হয়ে বাংলায় সংবাদ পাঠিকার চাকরি পান। সেই সময় টোকিও শহরে মিত্র বাহিনীর বোমা বর্ষণ অব্যাহত ছিল। সেই পরিস্থিতে প্রতি রাতে হরিপ্রভা হেলমেট মাথায় দিয়ে টোকিও রেডিও স্টেশনে যেতেন। ১৯৪৪ সাল পর্যন্ত তিনি আজাদ হিন্দ্র ফৌজের হয়ে বাংলায় সংবাদ পাঠ করেছিলেন।

সংবাদ পাঠিকা

হরিপ্রভার জীবনে এক নতুন অধ্যায়ের শুরু হয় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়। সেসব অভিজ্ঞতার আখ্যান তিনি লিখেছেন ‘যুদ্ধবিধ্বস্ত জাপানে’ নামক অন্য এক আত্মকথায়। মূলত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে জাপান সরকার ভারতে অবস্থানকারী সমস্ত জাপানি নাগরিককে দেশে ফিরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। তাই ১৯৪১ সালে স্বামীর সঙ্গে পাকাপাকিভাবে জাপানে থাকার উদ্দেশ্যে বোম্বে থেকে জাহাজে উঠতে হয় হরিপ্রভাকে। কিন্তু আগেরবার জাপানে গিয়ে যে আত্মীয় স্বজনদের সান্নিধ্য তিনি পেয়েছিলেন, এবার তার কোনোকিছুই ছিল না। এক সময়কার শান্ত-সুশৃঙ্খল জাপান যুদ্ধের তান্ডবে পুরোপুরি বিপর্যস্ত।
এদিকে জাপানে চলছে চরম অর্থনৈতিক সঙ্কটও। ফলে হরিপ্রভাদের বাসস্থান বা উপার্জন কিছুই ছিল না। এরই মধ্যে গোদের উপর বিষফোঁড়া হিসেবে উপস্থিত হয় উয়েমনের শারীরিক অসুস্থতা। সব মিলিয়ে সমস্যা ক্রমশ প্রকটতর হতে থাকে হরিপ্রভার জন্য। কিন্তু ঠিক এ সময়ই হরিপ্রভা পাশে পান বিপ্লবী রাসবিহারী বসুকে।
তার মাধ্যমে হরিপ্রভার পরিচয় হয় নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসুর সঙ্গেও। এই দুই কীর্তিমান ব্রিটিশবিরোধী বিপ্লবীর কল্যাণে হরিপ্রভা দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হন। তার মনে জাগে দেশকে স্বাধীন করার ইচ্ছা। সেই সঙ্গে তার একটি চাকরিও জুটে যায়। সেটি হলো টোকিও রেডিওতে আজাদ হিন্দ ফৌজের হয়ে বাংলায় সংবাদ পাঠিকার চাকরি।
সে সময় টোকিও শহরে মিত্রবাহিনীর বোমাবর্ষণ অব্যাহত ছিল। কিন্তু সেসবের তোয়াক্কা না করে হরিপ্রভা গভীর রাতে মাথায় হেলমেট দিয়ে চলে যেতেন টোকিও রেডিও স্টেশনে।
শুরুর দিকে পরণে শাড়িই থাকত। কিন্তু ঠিকমতো যে বাড়িতে ফিরতে পারবেন, তার তো কোনো নিশ্চয়তা নেই। তাই পেটিকোটে একটি পকেট বানিয়ে সেটির ভেতর পাসপোর্ট, টাকা পয়সা, গয়নাগাটি বহন করতেন তিনি। পরের দিকে অবশ্য শাড়ি পরে চলাচলে অসুবিধা হওয়ায়, তিনি স্বামীর প্যান্ট পরেই চলাফেরায় অভ্যস্ত হয়ে যান। এভাবে ১৯৪৪ সাল পর্যন্ত তিনি আজাদ হিন্দ ফৌজের হয়ে বাংলায় সংবাদ পাঠ করেন।

হরিপ্রভার আধুনিকতার রহস্য

হরিপ্রভা তাকেদা খুবই তাৎপর্যপূর্ণ কিছু প্রথমের অধিকারী তিনি, যেগুলো সম্পর্কে জানতে পারলে তার আধুনিকতার বিষয়ে সংশয়ের অবকাশ থাকবে না। তবে তার ব্যাপারে বিস্তারিত আলোচনার আগে, জানতে হবে তার বাবা শশীভূষণ বসু মল্লিককে।
শশীভূষণের বাড়ি ছিল মূলত নদীয়ার শান্তিপুরে। সরকারি চাকরির সুবাদে তিনি ঊনিশ শতকের শেষার্ধে ঢাকায় চলে আসেন এবং সেখানেই স্থায়ীভাবে বসবাস করতে শুরু করেন। ১৮৮৪ সালে তিনি বিয়ে করেন
নগেন্দ্রবালাকে এবং পরের বছর তারা যোগ দেন ব্রাহ্ম সমাজে।
তবে শশীভূষণ ও তার স্ত্রীর ব্রাহ্ম হওয়ার পেছনে রয়েছে আরেকটি গল্প। একদিন শশীভূষণ শহরের অদূরে জঙ্গলে একটি শিশুকে কুড়িয়ে পেয়ে ঘরে নিয়ে আসেন এবং তাকে পালন করবেন বলে মনস্থির করেন। কিন্তু তাদের এ সিদ্ধান্তকে স্বাভাবিকভাবে নিতে পারেনি হিন্দু সমাজ। ফলে তাদেরকে সমাজ থেকে পতিত হতে হয়, এবং তারা ধর্ম পরিবর্তন করে ব্রাহ্ম হয়ে যান। এরই সূত্র ধরে শশীভূষণ একক প্রচেষ্টায় ১৮৯২ সালে ঢাকায় অনাথ শিশুদের জন্য উদ্ধারাশ্রম নামে একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। পরবর্তীকালে সেটির নাম হয় মাতৃনিকেতন। এছাড়া শশীভূষণ বেশ কয়েকটি বইও রচনা করেন।
শশীভূষণ যখন ব্রাহ্ম হন, তখন ব্রাহ্ম সমাজ ছিল দ্বিধাবিভক্ত। তিনি ছিলেন কেশবচন্দ্রের ভক্ত, যে কারণে যোগ দেন নববিধানে। ঢাকার নববিধান তখন খুবই হীনবল। ব্যক্তিগত পর্যবেক্ষণ থেকে শশীভূষণ উপলব্ধি করেন, এ দেশের যদি উন্নতি করতে হয়, তাহলে দুটি কাজ করা দরকার। একটি হলো আন্তর্জাতিক বিবাহের মাধ্যমে মানুষের মাঝে আন্তর্জাতিক চেতনা জাগিয়ে তোলা। অন্যটি হলো শিল্পায়ন, যাতে দেশের অর্থনৈতিক উন্নতি হয়। তার এ দুটি উপলব্ধিই পরবর্তী সময়ে তার প্রথম সন্তান হরিপ্রভা বসু মল্লিকের জীবনে ব্যাপক প্রভাব ফেলে।
হরিপ্রভার স্বামী উয়েমন তাকেদা ছিলেন কারিগরি শিক্ষায় প্রশিক্ষিত একজন কেমিস্ট। তখনকার দিনে জাপানি সমাজে পৈতৃক সম্পত্তির একমাত্র উত্তরাধিকারী হতো বড় ছেলে। তাই অনেক জাপানি ভাগ্যান্বেষণে পাড়ি দিত দূর-দূরান্তের দেশে। ঠিক তেমনই ১৯০৩ সালে ২৪ জন জাপানি নাগরিক ভারতে আসেন কাজের খোঁজে, যাদের মধ্যে একজন উয়েমন। তিনি ঢাকায় একটি সাবানের কারখানা শুরু করেন, নাম ইন্দোজাপানিজ সোপ ফ্যাক্টরি।
ছোটবেলা থেকেই মায়ের সঙ্গে ‘মাতৃনিকেতন’ দেখাশোনা করতেন হরিপ্রভা। সেখানেই একদিন তার সঙ্গে সাক্ষাৎ হয় উয়েমনের। সেই থেকে তাদের ঘনিষ্ঠতা এবং একপর্যায়ে পরিবারের সম্মতিতে ব্রাহ্ম সমাজের নিয়মানুসারে উয়েমনকে বিয়ে করেন হরিপ্রভা। বিয়ের পর নামের শেষ থেকে বসু মল্লিক উঠিয়ে পরিণত হন হরিপ্রভা তাকেদায়।
আন্দাজ করা যায়, উদারমনা ব্রাহ্ম হওয়ার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বিবাহ ও শিল্পের প্রতি অনুরাগ থাকার ফলেই, শশীভূষণ উয়েমনের সঙ্গে তার মেয়ের বিয়েটি মেনে নেন। তবে বিয়েটি ঠিক কোন বছর হয়, এ নিয়ে মতান্তর রয়েছে। কোথাও দেখা যায়, বিয়ের সাল বলা হচ্ছে ১৯০৪, আবার কোথাও ১৯০৬ বা ১৯০৭। সে যা-ই হোক, খুব সম্ভবত এটিই ছিল কোনো বাঙালি নারীর প্রথম জাপানি বিয়ে। তাই উয়েমনের সঙ্গে হরিপ্রভার বিয়ে ছিল একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা। বিয়ের পর উয়েমন তার শ্বশুর শশীভূষণ বসু মল্লিকের সহযোগিতায় প্রতিষ্ঠা করেন ঢাকা সোপ ফ্যাক্টরি। এ প্রতিষ্ঠানের আয়ের কিছু অংশ ব্যায়িত হতে থাকে মাতৃনিকেতনে।
কিন্তু খুব বেশিদিন চলেনি উয়েমনের নতুন কারখানা। কয়েক বছর পরই আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ে সেটি। এদিকে জাপান ছেড়ে আসার পর দীর্ঘ নয় বছর কেটে গেছে, পরিবারের সঙ্গে কোনো প্রকার যোগাযোগ নেই উয়েমনের। তাছাড়া জাপানে সদ্যই মেইজি যুগের অবসান ঘটে শুরু হয়েছে তাইশো যুগ। নতুন জাপান তখন পূর্বের দারিদ্র্য কাটিয়ে মাথা তুলে দাঁড়াতে শুরু করেছে। দেশের এই পরিবর্তিত অবস্থাও স্বচক্ষে দেখার বাসনা জাগে উয়েমনের মনে। তাই ১৯১২ সালের শেষ দিকে তিনি সস্ত্রীক জাপানের পথে রওনা দেন। জাপানে পা রাখার পর থেকেই অনেক জাপানি ব্যগ্রভাবে দেখতে শুরু করে হরিপ্রভাকে। সাংবাদিকরাও এসে ছবি তুলতে থাকেন তাদের। এরপর তাকেদা দম্পতি ট্রেনে করে যাত্রা শুরু করেন গ্রামের উদ্দেশে। উয়েমনের বাড়ির বা গ্রামের নাম অবশ্য জানা যায়নি। ধারণা করা হয়, গ্রামটি বর্তমান কোওনান শহরের অন্তর্গত বা তার আশপাশে কোথাও। গ্রামের স্টেশনে পৌঁছেই হরিপ্রভা দেখতে পান, তাদের নিতে এসেছেন তার দুই দেবর। কিন্তু শুধু তারাই নন, গোটা স্টেশনই লোকে লোকারণ্য। সকলেই এসেছে ‘ইন্দোজিন’ দেখতে। স্টেশন থেকে বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, সেখানেও উপচে পড়া ভিড়। একে তো ঘরের ছেলে বহুদিন বাদে ফিরেছে, তার উপর আবার সঙ্গে ভারতীয় স্ত্রী। ফলে সকলেই যেন ফেটে পড়ছিল কৌতূহলে। যতদিন হরিপ্রভা সেখানে ছিলেন, প্রতিদিনই ছেলে বুড়ো অসংখ্য মানুষ দেখতে আসত তাকে। তবে সবচেয়ে স্বস্তির কথা, হরিপ্রভার শ্বশুর-শাশুড়ি তাকে খুবই আপন করে নেন। তাদের মমতা ও আন্তরিকতায় মুগ্ধ হয়ে যান হরিপ্রভা।
তাকেদা দম্পতি জাপানে থাকেন চার মাস। ১৯১৩ সালের ১২ এপ্রিল তারা জাপান থেকে ভারতের উদ্দেশে ফিরতি যাত্রা শুরু করেন। হরিপ্রভার শাশুড়ি, ননদ আসেন তাদের কোবে পর্যন্ত পৌঁছে দিতে। এরপর ২৫ দিনের মাথায় তারা ভারতে পা রাখেন।
হরিপ্রভা স্বদেশে ফেরার আড়াই বছর পর প্রকাশিত হয় তার ভ্রমণ বৃত্তান্ত ‘বঙ্গমহিলার জাপান যাত্রা’। ডিমাই ৮ আকারের ৬১ পৃষ্ঠার বইটি ওয়ারীর ভারত মহিলা প্রেসে মুদ্রন করেন দেবেন্দ্রনাথ দাস। ১৯১৫ সালের ১১ নভেম্বর তা ‘কুমারী শান্তিপ্রভা মল্লিক’ কর্তৃক প্রকাশিত হয় মাতৃনিকেতনের সাহায্যার্থে। এভাবে প্রথম বাঙালি তো বটেই, এমনকি সম্ভবত উপমহাদেশের প্রথম ব্যক্তি হিসেবেও জাপান বিষয়ক বই রচনা করেন হরিপ্রভা। কেননা এটি যে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘জাপান যাত্রী’ প্রকাশেরও চার বছর আগেই আলোর মুখ দেখে। কেউ কেউ তো এমন দাবিও করে থাকেন, সমগ্র এশিয়া মহাদেশের মধ্যেই হরিপ্রভা প্রথম নারী, যিনি লিখেছেন সূর্যোদয়ের দেশ ঘুরে এসে। আবার গবেষক মনজুরুল হকের মতে, ‘চীন বা পূর্ব এশিয়ার বাইরে এশিয়ার অন্য কোনো ভাষায় এর আগে জাপান সংক্রান্ত কোনো পূর্ণাঙ্গ গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে কি না, সেই প্রশ্নে সন্দ্রেহমুক্ত হতে হলেও বিস্তারিত গবেষণার প্রয়োজন।’
‘বঙ্গমহিলার জাপান যাত্রা’ বইয়ের নামপত্র; হরিপ্রভা তার বইটি শুরু করেছেন এভাবে, ‘আমার যখন বিবাহ হয়, তখন কেহ মনে করে নাই যে আমি জাপান যাইব। কাহারও ইচ্ছাও ছিল না। কিন্তু আমার বড়ই ইচ্ছা হইত আমি একবার যাই। সে ইচ্ছা স্বপ্নেই পর্যবসিত হইত। বিবাহের পর শ্বশুর-শ্বাশুড়ির আশীর্বাদ লাভ করিতে ইচ্ছা হইত। তাহাদের নিকট পত্র লিখিয়া যখন তাহাদের ফটোসহ আশীর্বাদপূর্ণ একখানি পত্র পাইলাম ও তাহারা আমাদের দেখিবার জন্য আগ্রহান্বিত হইয়া পত্র লিখিলেন, আমার প্রাণ তখন আনন্দে ভরিয়া গেল। তাহাদিগকে ও তাদের দেশ দেখিবার আকাক্সক্ষা প্রাণে জাগিয়া উঠিল। ঈশ্বরেচ্ছায় আমার মনোবাঞ্ছা পূর্ণ হইতে চলিল...’
হরিপ্রভার সেই বইয়ের গুণগত মানও নিঃসন্দেহে অসামান্য। কেননা তিনি তো জাপানে শুধু শ্বশুরবাড়ির লোকজনের সঙ্গে দেখা করেননি, বরং সুযোগ পেয়েছেন জাপানের সমাজ ব্যবস্থাকে খুব কাছ থেকে দেখার ও অনুভব করার।
এ কথাও অনস্বীকার্য যে তার পর্যবেক্ষণ শক্তি ছিল প্রখর। তাই তিনি খুবই খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে জাপানের সামাজিক রীতিনীতি ও আদব কায়দাগুলো খেয়াল করেন এবং ভারতে দেখে যাওয়া সমাজের রীতি ও প্রথার সঙ্গে তুলনা করতে থাকেন। যা পরবর্তী সময়ে উঠে আসে তার কলমে।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘জাপান যাত্রী’তে হয়তো জাপানি নান্দনিকতা ও সৌন্দর্যের বহিঃপ্রকাশ ঘটে, কিন্তু হরিপ্রভার বইটিতে এক বাঙালি নারীর ব্যক্তিগত আবেগ-অনুভূতি এবং জীবন দর্শনও খুব স্বতঃস্ফূর্তভাবে ধরা দেয়।
হরিপ্রভা তার স্বামীর সাথে জাপানের বিভিন্ন শহর পরিভ্রমণ করে সেগুলোর যেমন বর্ণনা দিয়েছেন, তেমনই আবার মাঝে মধ্যে যোগ করেছেন তৎকালীন জাপানি সংস্কৃতি নিয়ে নিজের পর্যবেক্ষণ, ‘মেয়েদের প্রতি, বাড়ির আত্মীয়-স্বজন ও শ্বশুর-শাশুড়ির সেবা পরম ধর্ম। ইহার কোনোরূপ অন্যথা হইলে স্ত্রী অত্যন্ত লাঞ্ছিত হন। এমনকি শাশুড়ির অপছন্দ হইলে স্বামী অনায়াসে স্ত্রী পরিত্যাগ করিতে পারেন।’

শেষ জীবন

যুদ্ধ শেষ হলে, ১৯৪৭ সালে অসুস্থ স্বামীকে নিয়ে দেশে ফেরেন হরিপ্রভা। কিন্তু তার জন্মস্থান পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত হওয়ায়, তিনি পশ্চিমবঙ্গের জলপাইগুড়িতে বোন অশ্রুবালা মল্লিকের বাড়িতে ওঠেন। পরের বছরই তার স্বামী পরলোকগত হন জলপাইগুড়িতেই। কিন্তু স্বামীর মৃত্যুর পরও ভেঙে পড়েননি হরিপ্রভা। থেকেছেন বরাবরের মতোই দৃঢ়চেতা। স্বামীর প্রতি ভালোবাসায় কোনো কমতি ছিল না তার। তাইতো জাপানি বিয়ে করার দরুন কোনো বাধ্যবাধকতা না থাকলেও, হিন্দু বা ব্রাহ্ম ধর্মাবলম্বী বিধবা নারীদের মতো তিনি সাদা শেমিজ ও সাদা থান পরতে আরম্ভ করেন। ১৯৬৭ সালে, জীবনের সায়াহ্নে এসে হরিপ্রভাকে সম্মুখীন হতে হয় এক নতুন বিপর্যয়ের।
গীতা নামের বাড়ির পরিচারিকা, আদতে যে ছিল একটি গ্যাংয়ের সদস্য, মেরে তার মাথা ফাটিয়ে দিয়ে যাবতীয় মূল্যবান সম্পদ চুরি করে পালিয়ে যায়। ফলে আশি ছুঁই ছুঁই বয়সের হরিপ্রভাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। শেষ পর্যন্ত ১৯৭২ সালে কলকাতার শম্ভুনাথ পন্ডিত হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। ২০১২ সালে হরিপ্রভার প্রথম জাপান যাত্রার শতবর্ষে বাংলাদেশের প্রখ্যাত চিত্র পরিচালক তানভীর মোকাম্মেল জাপান ফাউন্ডেশনের সহায়তায় হরিপ্রভার জীবনের উপর একটি তথ্যচিত্র নির্মাণ করেন। সেটির শিরোনাম ‘জাপানী বধূ’। ইংরেজিতে ‘দ্য জাপানিজ ওয়াইফ’।
সেই তথ্যচিত্রের শেষাংশে বলা হয়, ‘হরিপ্রভাকে আমরা খুঁজে পাইনি। খুঁজে পাইনি জাপানে হরিপ্রভাদের গ্রামটিও। তবে যেসব নারীরা আজও ভালোবাসা ও স্বামী-সংসারের টানে ভিনদেশের এক প্রবাসী জীবন বেছে নিতে দ্বিধা করেন না, সেসব সাহসী নারীদের মাঝেই যেন খুঁজে পাই হরিপ্রভার প্রতিচ্ছায়া। না-ই বা তোমায় খুঁজে পেলাম, হরিপ্রভা!’