নবজাগরণের মশালবাহক

ঢাকা, শনিবার, ২৩ জানুয়ারি ২০২১ | ৯ মাঘ ১৪২৭

নবজাগরণের মশালবাহক

রোকেয়া ডেস্ক ১১:৪৯ পূর্বাহ্ণ, নভেম্বর ১৮, ২০২০

print
নবজাগরণের মশালবাহক

স্বর্ণকুমারী দেবীর শৈশব ও শিক্ষাজীবন
১৮৫৬ খ্রিস্টাব্দের ২৮ আগস্ট কলকাতার জোড়সাঁকোর ঠাকুর পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন স্বর্ণকুমারী দেবী। তিনি দ্বারকানাথ ঠাকুরের পৌত্রী এবং দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের চতুর্থ কন্যা এবং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বড় বোন। তৎকালীন ঠাকুর পরিবারের রীতি অনুসারে তিনি শৈশবে ঘরেই লেখাপড়া শেখেন। স্বর্ণকুমারী দেবীর স্মৃতিকথা থেকে জানা যায়, তাদের শিক্ষয়িত্রী শ্লেটে কিছু লিখে দিতেন, সেই লেখাটিই তারা টুকে লিখতেন। দেবেন্দ্রনাথ এ কথা জানতে পেরেই শিক্ষাদান পদ্ধতিটি তুলে দেন। এর পরিবর্তে তিনি অযোধ্যানাথ পাকড়াশি নামে এক দক্ষ শিক্ষককে নিয়োগ করে মেয়েদের লেখাপড়া শেখার ব্যবস্থা করেন। দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর উপলব্ধি করেছিলেন নবযুগের চেতনায় আর শিক্ষায় মানুষ করে তুলতে হবে ছেলে-মেয়েদের। প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য উভয় শিক্ষার সমন্বিত রূপটি প্রবেশ করিয়েছিলেন নিজের বৃহৎ পরিবারে। সুস্থ চেতনা গড়ে তুলতে চেষ্টা করেছিলেন তার পরিবারের মহিলাদের মধ্যে।

বাড়ির মেয়েরা অযোধ্যানাথ পাকড়াশীর কাছে বাংলা ও সংস্কৃত শিখতেন আর মেমের কাছে নিতেন ইংরেজি সাহিত্যের পাঠ। দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর নিজে অনেক সময় বাড়ির মেয়ে-বউদের জ্যোতির্বিজ্ঞানসহ বিজ্ঞানের নানা বিষয়ে পাঠ দিতেন গল্পের মত করে। এর গভীর প্রভাব পড়েছিল মেয়ে স্বর্ণকুমারীর মধ্যে যা গড়ে দিয়েছিল তার বিজ্ঞানবিষয়ক রচনার ভিত। ছোটবেলায় বড় দিদিরা স্কুলে গেলেও স্বর্ণকুমারীর পড়াশোনা শুরু ও শেষ হয়েছিল বাড়িতেই। স্কুলশিক্ষার সিলেবাসের বোঝা না থাকায় নিজের চেষ্টায় নানা বিষয়ে প্রচুর বইপত্র পড়ে স্বশিক্ষিত হয়ে উঠেছিলেন।

বড় দিদি সৌদামিনি ছিলেন বেথুন স্কুলের প্রথম যুগের ছাত্রী। বাড়ির অন্যান্য মহিলা সদস্যরা বড় দিদি সৌদামিনীকে অনুসরণ করলেও স্বর্ণকুমারী দেবী বাড়িতে লেখাপড়া শিখেছিলেন। স্বর্ণকুমারী দেবী ছোট ভাই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের চেয়ে পাঁচ বছরের বড় ছিলেন। দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের ১৪ জন সন্তানের মধ্যে একমাত্র তিনিই ঠাকুর পরিবারে প্রথম মহিলাদের লেখনীর ধারা শুরু করেন। ১৯ শতকের বাংলা নবজাগরণের পুরোধা ছিল এই ঠাকুর পরিবার। শুরু থেকেই ঠাকুরবাড়িতে শিক্ষার পরিবেশ ছিল। দেবেন্দ্রনাথের তৃতীয় ছেলে হেমেন্দ্রনাথ শিক্ষার প্রসার নিয়ে বিশেষ উৎসাহী ছিলেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তার স্মৃতি কথায় লিখেছেন, বিদ্যালয়ের থেকে বাড়িতে বেশিরভাগ শিক্ষা লাভ করেছিলেন।

সাহিত্য, বিজ্ঞান, সমাজ, প্রভৃতি সব বিষয়েই স্বর্ণকুমারী দেবীর জ্ঞান ছিল অসামান্য। ঠাকুর পরিবারের অন্তঃপুরে মেয়েদের মধ্যে এক হীরকখ-ের মত নিজের প্রতিভার দীপ্তিতে ক্রমশঃ ভাস্বর হয়ে উঠেছিলেন তিনি। কাব্য, সঙ্গীত, নাটক, ছোটগল্প, রম্যরচনা, গীতিনাট্য ও প্রবন্ধ লেখা, সাংবাদিকতা, পত্রিকা সম্পাদনা, সমাজ সংস্কারমূলক কাজকর্ম, সমিতি স্থাপন, সর্বোপরি উপন্যাস লেখা- সমস্ত ক্ষেত্রেই নিজের উজ্জ্বল প্রতিভার পরিচয় তিনি রেখে গেছেন। সমকালীন স্বদেশী ও বিদেশি প্রায় সব বিদ্বান মানুষই তাকে উনিশ শতকের বাংলার নবজাগরণের এক বিদূষী মশালবাহক বলে স্বীকার করেছেন।

‘সাহিত্য স্রোত’ গ্রন্থে দেবেন্দ্রনাথ ও তার বাল্যশিক্ষা সম্পর্কে স্বর্ণকুমারী লিখেছেন, ‘তিনি মধ্যে মধ্যে অন্তঃপুরে আসিয়া আমাদিগকে সরল ভাষায় জ্যোতিষ প্রভৃতি বিজ্ঞান শিক্ষা দিতেন। তিনি যাহা শিখাইতেন তাহা আমাদিগকে নিজের ভাষায় লিখিয়া তাহারই নিকট পরীক্ষা দিতে হইত। ছাত্রীদিগের মধ্যে আমিই ছিলাম সর্বাপেক্ষা ছোট নগণ্য ব্যক্তি। সেইজন্য পরীক্ষাতেও সকলের সমান হইবার জন্য তীব্র আকাক্সক্ষা জন্মিত। কিন্তু পরীক্ষার নম্বর আমরা কেহ জানিতে পারিতাম না। এইরূপে পিতৃদেব অন্তঃপুরিকাদের মধ্যে শিক্ষার বীজ বপন করিয়াছিলেন।’

প্রথম উপন্যাস রচনা
গল্প কবিতা লেখা দিয়ে তার সাহিত্যে হাতেখড়ি হতে না হতেই তিনি অন্য একটি মস্ত বড় কঠিন কাজ সম্পাদন করলেন। মাত্র একুশ বছর বয়সে লেখেন তার প্রথম উপন্যাস- ‘দীপনির্বাণ’। ছাপা হয় ১৮৭৬ খ্রিস্টাব্দে, বঙ্কিমচন্দ্রের দুর্গেশনন্দিনী প্রকাশের এক দশকের মধ্যে। ‘দীপনির্বাণ’ই বাংলাভাষাতে কোনো মহিলার লেখা প্রথম উপন্যাস। উপন্যাসের বিষয়বস্তু অবাক করার মত। দেশের মানুষের নৈতিক অবনতি আর আত্মকলহের সুযোগে বিদেশি শত্রু বারবার আমাদের দেশকে আক্রমণ করেছে, জয় করেছে, হরণ করেছে আমাদের স্বাধীনতা। সেই গ্লানি আমাদের বয়ে বেড়াতে হচ্ছে নিজেদেরই কারণে। এ বক্তব্যই প্রকাশিত হয়েছে তার উপন্যাসে।

বক্তব্যের গুরুত্বই যুগের প্রেক্ষাপটে উপন্যাসটিকে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছিল। তবে প্রথমে উপন্যাসে লেখকের নামের জায়গায় লেখা ছিল ‘জনৈক লেখিকা’। বাংলাদেশে তখনও ভালোভাবে স্ত্রী শিক্ষার প্রসারই হয়নি, অনেক মহিলাই লেখাপড়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত। সেই অবস্থায় কোনো বাঙালি মহিলার উপন্যাস লিখে ফেলাটা বেশ শক্ত কাজ ছিল। কলকাতার তখনকার বিদ্বান, প-িত মানুষেরা উপন্যাসের ভাষা আর বিষয়বস্তুর উৎকর্ষ দেখে বিস্মিত হয়েছিলেন।

কলকাতায় হিন্দু পেট্রিয়ট, দি ক্যালকাটা রিভিউ প্রভৃতি নামকরা পত্রিকায় প্রশংসা পেয়েছিল তার লেখা। দাদা সত্যেন্দ্রনাথ তখন ইংলন্ডে, সেখানে তার হাতেও সেই উপন্যাসের এক কপি পৌঁছালো। তিনি তো প্রথমে বিশ্বাস করতেই পারেননি যে, একজন মহিলা এ রকম একটি উপন্যাস রচনা করতে পারেন। ভাবলেন উপন্যাসটি হয়ত তার ছোট ভাই জ্যোতিরিন্দ্রনাথ লিখেছেন ছদ্মনামে। অভিনন্দন জানিয়ে তাকে চিঠি লিখলেন, জ্যোতির জ্যোতি কি প্রচ্ছন্ন থাকিতে পারে? সেই শুরু হল বাংলার সাহিত্যপ্রাঙ্গণে স্বর্ণকুমারীর অবাধ বিচরণ। একের পর এক অবাক করে দেওয়ার মত লেখা বেরোতে লাগল তার কলম থেকে। এক ধাঁচের নয় সেসব, নানা বিষয় বৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ সেসব লেখা। ছোটভাই রবীন্দ্রনাথ ছাড়া ঠাকুর পরিবারের আর কেউই তার মত এত বেশি লেখেননি। ১৩টি উপন্যাস, চারটি নাটক, গীতিনাট্য ‘বসন্ত-উৎসব’ এবং প্রকাশিত হল তার বিজ্ঞানবিষয়ক ২৭টি প্রবন্ধের সংকলন ‘পৃথিবী’। শৈশবে বিজ্ঞানের পাঠ যার কাছ থেকে শুরু হয়েছিল সে মহর্ষি পিতাকে শ্রদ্ধা জানানোর জন্যই তার নামে বিজ্ঞান প্রবন্ধের বইটি উৎসর্গ করেন। এর মধ্যেই ১৮৫২ সালে হানা ক্যাথারিন মুলেন্স তার ফুলমণি ও করুণার বৃত্তান্ত প্রকাশ করে বাংলা ভাষার প্রথম উপন্যাসিকের মর্যাদা লাভ করেন। কিন্তু স্বর্ণকুমারী দেবী ছিলেন প্রথম বাঙালি মহিলা ঔপন্যাসিক। দীপনির্বাণ উপন্যাসটি ছিল জাতীয়তাবাদী ভাবে অনুপ্রাণিত এক উপন্যাস।

এরপর স্বর্ণকুমারী দেবী আরও অনেক উপন্যাস, নাটক, কবিতা ও বিজ্ঞানবিষয়ক প্রবন্ধ লেখেন। বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান পরিভাষা রচনা বিষয়ে তার আগ্রহ ছিল ব্যাপক। তিনি অসংখ্য গানও রচনা করেন। সেই সময়ে স্বর্ণকুমারী দেবী বা কামিনী রায়ের মতো মহিলা সাহিত্যিকদের গুরুত্ব অপরিসীম। তারাই ছিলেন বাঙালি নারী সমাজের প্রথম যুগের শিক্ষিত প্রতিনিধি। ১৮৭৯ খ্রিস্টাব্দের ৪ নভেম্বর স্বর্ণকুমারী দেবী প্রথম বাংলা গীতি নাট্য (অপেরা) বসন্ত উৎসব চালু করেন। পরবর্তীকালে এই ধারাটিকে গ্রহণ করে তার ছোটভাই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সার্থকতর গীতিনাট্য রচনায় সফল হয়েছিলেন।

বৈবাহিক জীবন
পরিবারের প্রথা অনুযায়ী মাত্র ১৩ বছর বয়সে ১৮৬৮ খ্রিস্টাব্দে জানকীনাথ ঘোষালের সঙ্গে স্বর্ণকুমারী দেবীর বিয়ে হয়। স্বামী ছিলেন শিক্ষিত, সমাজ সচেতন, ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট। তিনি ছিলেন নদীয়া জেলার এক জমিদার পরিবারের শিক্ষিত সন্তান।

দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের পরিবার ছিল পিরালী ব্রাহ্মণ। পিরালী ব্রাহ্মণ বংশের কন্যাকে বিয়ে করার জন্য জানকীনাথ পরিবারচ্যুত হয়েছিলেন। কিন্তু দৃঢচেতা জানকীনাথ নিজ উদ্যোগে ব্যবসা করে সাফল্য অর্জন করেন এবং নিজস্ব জমিদারী তৈরি করে রাজা উপাধি অর্জন করেন। তিনি একজন দিব্যজ্ঞানবাদী (থিওসফিস্ট) এবং ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা তথা আদিযুগের সক্রিয় সদস্য ছিলেন। ঠাকুরবাড়িতে বিয়ের পর মেয়েদের স্বামীসহ বাপের বাড়িতেই থাকবার প্রথা হলেও স্বর্ণকুমারী ও জানকীনাথ তা পালন করেননি। বিবাহের পর স্বর্ণময়ীকে লেখাপড়ায় বিশেষভাবে তার স্বামী সাহায্য করায় তিনি নানা ধরনের বিষয়ে পড়ার সুযোগ পেয়েছিলেন।

জানকীনাথ ও স্বর্ণকুমারী দেবীর চার সন্তান ছিলেন। ১৮৬৭ খ্রিস্টাব্দের ৫ ডিসেম্বর ১২৭৫ বঙ্গাব্দ ২১ অগ্রহায়ণ তার প্রথম কন্যা হিরন্ময়ী দেবী জন্মগ্রহণ করেন। তার প্রথম সন্তান জন্মগ্রহণের পর তার শ্বশুর তাকে এবং তার কন্যাকে আশীর্বাদ করেন এবং এর দ্বারা জানকীনাথের সঙ্গে তার পিতার সুসম্পর্ক স্থাপিত হয়।

১৮৭০ খ্রিস্টাব্দে তার দ্বিতীয় সন্তান জ্যোৎস্নানাথ ঘোষাল জন্মগ্রহণ করেন। তিনি আইসিএস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে পশ্চিম ভারতে কর্মে বহাল ছিলেন। এরপর ১৮৭২ খ্রিস্টাব্দের ৯ সেপ্টেম্বর তৃতীয় সন্তান সরলা দেবীর জন্ম হয়। সর্বশেষ সন্তান উর্মিলা দেবী জন্মগ্রহণ করেন ১৮৭৪ খ্রিস্টাব্দে।

স্বর্ণকুমারী তার জীবনের বিকাশে স্বামীর সহায়তার কথা উল্লেখ করতে গিয়ে বলেছেন, ‘আমার প্রিয়তম স্বামীর সাহায্য ও উৎসাহ ব্যতিরেকে আমার পক্ষে এতদূর অগ্রসর হওয়া সম্ভব হইত না। আজ বহির্জগত আমাকে যেভাবে দেখিতে পাইতেছে, তিনিই আমাকে সেইভাবে গঠিত করিয়া তুলিয়াছিলেন এবং তাহার প্রেমপূর্ণ উপদেশে বা ঝটিকা বিক্ষুব্ধ সমুদ্রেও যেমন সন্তরণ নিপুণ ব্যক্তি সহজে ও অবলীলাক্রমে সন্তরণ করিয়া যায়, সাহিত্য জীবনের ঝটিকাময় ও উত্তাল তরঙ্গের মধ্য দিয়া আমিও সেইরূপ অবলীলাক্রমে চলিয়া আসিয়াছি।’

সাহিত্যচর্চার সূচনা
বিয়ের আগ থেকেই তার লেখক জীবন শুরু হয়ে গিয়েছিল। বিয়ের পর তাতে কোনো আঁচ লাগেনি। বরং বিয়ের পর তার সাহিত্যপ্রতিভার পূর্ণ আলোক বিচ্ছুরণ ঘটে। প্রগতিবাদী স্বামী জানকীনাথের সহযোগিতায় স্বর্ণকুমারীর সাহিত্যচর্চা আরও গভীরভাবে দৃড় হলো।

সংগীত, নাটক ও সাহিত্যে জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ির পুরুষ সদস্যদের দৃষ্টিশীলতা স্বর্ণকুমারী দেবীকেও স্পর্শ করেছিল। জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর সংগীত, নাটক, সাহিত্য নিয়ে নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালিয়ে যাচ্ছিলেন, আর এতে সাহায্য করছিলেন অক্ষয়চন্দ্র চৌধুরী ও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। জ্যোতিরিন্দ্রনাথের জীবন স্মৃতি থেকে জানা যায়, জানকীনাথ যখন ইংল্যান্ডে যান তখন স্বর্ণকুমারী দেবী অনেকদিন তার বাপের বাড়িতেই থেকে যান। এ সময়েই তার সঙ্গীত চর্চার, ইংরেজি ভাষা শিক্ষা ও ভালোভাবে ইংরেজি সাহিত্য পাঠের সুযোগ হয়েছিল।

তাছাড়া তিনিও দাদাদের সঙ্গে নতুন পরীক্ষা-নিরীক্ষার কাজে মেতে ওঠেন। জ্ঞানদানন্দিনী দেবী যখন পরিবারের প্রাচীন প্রথাগুলিকে নারী স্বাধীনতার পথ হিসেবে প্রশস্ত করছিলেন তখন স্বর্ণকুমারী নিজের সাহিত্য সাধনায় মগ্ন ছিলেন। বাড়ির অন্য মেয়েরা ঘরের কাজে, রান্নাঘরে নতুন নতুন খাবার তৈরিতে, নানা রকম হাতের কাজে, রূপচর্চায় আর গল্প-গাছায় যখন সময় কাটাতেন তখন তিনি নিজেকে সরিয়ে রাখতেন এ সব থেকে। তার মেয়ে সরলা দেবী চৌধুরানীর লেখা থেকে জানা যায়, সরলা মাঝে মাঝে অন্দরমহলের মেয়েদের আসরে উপস্থিত থাকলেও তার মাকে কখনও সেখানে দেখেনি। স্বর্ণকুমারী দেবী তখন নিজের ঘরে আপন-মনে ব্যস্ত থাকতেন নিজের পড়াশোনা, সংগীত রচনা ও সাহিত্য সাধনায়।

সখি সমিতি প্রতিষ্ঠা
১৮৯৬ সালে ঠাকুরবাড়ির অন্যান্য সদস্যদের নিয়ে স্বর্ণকুমারী দেবী অনাথ ও বিধবাদের জন্য সখি সমিতি প্রতিষ্ঠা করেন। ১৮৯৮ সালে ভারতীয় ও বালক পত্রিকায় একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। তা হচ্ছে সখি সমিতির প্রধান উদ্দেশ্য ছিল অসহায় অনাথ ও বিধবাদের সহায়তা করা। এ কাজটি দুইভাবে করা হবে। যে ক্ষেত্রে এসকল বিধবা ও অনাথের কোনো নিকট আত্মীয় থাকবে না বা থাকলেও তাদের ভরণপোষণ ক্ষমতা আত্মীয়দের নেই, তাদের ভরণপোষণের সম্পূর্ণ দায়িত্ব সখি সমিতি নেবে। অন্যান্য ক্ষেত্রে সখি সমিতি তাদের যথাসাধ্য সাহায্য করবে। সখি সমিতি যেসব মেয়েদের পূর্ণ দায়িত্ব নেবে তাদের লেখাপড়া শিখিয়ে স্ত্রী শিক্ষার প্রসার ঘটাবে। তারা শিক্ষা সম্পন্ন করে অন্যান্য মহিলাদের লেখাপড়া শেখাবেন। সমিতি থেকে এজন্য তাদের পারিশ্রমিকও দেওয়া হবে। এভাবে দুটি উদ্দেশ্য সাধিত হবে। হিন্দু বিধবারা হিন্দু ধর্মের অনুমোদনক্রমে শ্রমদানের মাধ্যমে উপার্জনক্ষম হয়ে উঠবেন। সংগঠন পরিচালনা শুধুমাত্র সদস্যদের চাঁদায় সম্ভব নয় বলে স্বর্ণকুমারী দেবী বেথুন কলেজে একটি বার্ষিক মেলার আয়োজন করেন। এ মেলায় ঢাকা ও শান্তিপুরের শাড়ি, কৃষ্ণনগর ও বীরভূমের হস্তশিল্প এবং বহিবঙ্গের কাশ্মীর, মোরাদাবাদ, বারানসি, আগ্রা, জয়পুর, বোম্বাইয়ের হস্তশিল্প প্রদর্শিত হয়। তার উদ্দেশ্য ছিল ভারতের দেশীয় পণ্যের প্রদর্শনী ও বিক্রির ব্যবস্থা করা। এ মেলাটি তখন কলকাতায় আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল।

আশ্রমের পরিচালিকা কল্যাণী মল্লিকের লেখা থেকে জানা যায়, ১৯৪৯ সালেও এটি চালু ছিল। সখি সমিতি নামকরণটি করেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। সরলা রাইয়ের অনুরোধে সমিতির জন্য অর্থ সংগ্রহের উদ্দেশ্যে রবীন্দ্রনাথ মায়ার খেলা নৃত্যনাট্যটি লিখে মঞ্চস্থ করেছিলেন।

রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড
মেয়েরা পুরুষের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করতে অবশ্যই পারে আর সেটা করা উচিত তিনি মনেপ্রাণে বিশ্বাস করতেন। নিজের জীবনেও তিনি সেটা করে দেখিয়েছেন। লেখালেখির পাশাপাশি ১৮৮৯ ও ১৮৯০ সালে প-িতা রামাবাই রানাড ও কাদম্বিনী গঙ্গোপাধ্যায়ের সঙ্গে তিনিও জাতীয় কংগ্রেসের বার্ষিক অধিবেশনে অংশ নেন। স্বামী জানকীনাথ ঘোষাল জাতীয় কংগ্রেসের সম্পাদক ছিলেন। তিনি নিজেও সামাজিক সংস্কার ও জাতীয়তাবাদী রাজনীতির সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন। তিনিই প্রথম বাঙালি মহিলা যিনি কংগ্রেসের জাতীয় অধিবেশনে প্রকাশ্যে অংশগ্রহণ করেছিলেন। ১৮৮৯ খ্রিস্টাব্দে বোম্বাইয়ের শহরে অনুষ্ঠিত কংগ্রেসের পঞ্চম জাতীয় সম্মেলনে ও ১৮৯০ খ্রিস্টাব্দে কলকাতায় অনুষ্ঠিত জাতীয় সম্মেলনে তিনি ছিলেন অন্যতম বাঙালি মহিলা প্রতিনিধি।

স্বর্ণকুমারী দেবীর রচনাবলী
ঊনবিংশ শতাব্দীর মহিলা গীতিকবিদের মধ্যে স্বর্ণকুমারী দেবী সমধিক প্রসিদ্ধ। তিনি যে কাব্যগ্রন্থগুলি রচনা করেছিলেন, তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য ‘গাথা’ শীর্ষক কাব্যগ্রন্থ। তার কবিতা ও গানে প্রভাত সঙ্গীত, মধ্যাহ্ন সংগীত ও নিশীথ সংগীত রয়েছে। ‘গাথা’ কাব্যগ্রন্থটি তিনি উপহার দিয়েছিলেন তার স্নেহের ছোট ভাই ররীন্দ্রনাথকে। রবীন্দ্রনাথের বয়স তখন ১৯ বছর। অনেকেই মনে করেন ভাই রবীন্দ্রনাথের উপর তার বেশকিছু প্রভাব পড়েছিল। এ গ্রন্থে ৭৪টি কবিতা এবং গান রয়েছে ৯৯টি। এর মধ্যে জাতীয় সংগীত ছয়টি ও ১৪টি ধর্ম সংগীত রয়েছে। প্রভাত সংগীত প্রথম কবিতা ‘প্রভাত’। কবিতার কয়েকটি লাইন এরকম-
অরুণ মুকুট শিরে,
অধরে ঊষার হাসি,
পদতলে প্রস্ফুটিত
শত শত ফুল-রাশি!
স্বর্ণকুমারীর বিজ্ঞান বিষয়ক প্রবন্ধগুলিও বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তিনি যে বিজ্ঞানের অনুরাগী পাঠক ছিলেন তার প্রমাণ পাওয়া যায় ‘তারকা জ্যোতি’, ‘নীহারিকা’, ‘সূর্য’, প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য প্রবন্ধে। তার ‘বৈজ্ঞানিক সংবাদ’ সংকলন অংশে পাশ্চাত্যের বহু বিজ্ঞানীরদের গবেষণার স্থান পেয়েছে।

তার লেখা উপন্যাসের মধ্যে রয়েছে দীপনির্বাণ (১৮৭৬), মিবার-রাজ (১৮৭৭), ছিন্নমুকুল (১৮৭৯), মালতী (১৮৭৯), হুগলীর ইমামবাড়ী (১৮৮৭), বিদ্রোহ (১৮৯০), স্নেহলতা (১৮৯২), কাহাকে (১৮৯৮), ফুলের মালা (১৮৯৫), বিচিত্রা (১৯২০), স্বপ্নবাণী (১৯২১), মিলনরাতি (১৯২৫), সাব্বিরের দিন রাত (১৯১২)।
তার রচিত নাটক বিবাহ-উৎসব (১৮৯২), বসন্ত-উৎসব, রাজকন্যা, দিব্যকমল, দেবকৌতুক, কনেবদল, যুগান্ত, নিবেদিতা। কাব্যগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে গাথা, গীতিগুচ্ছ। এছাড়াও বিজ্ঞান-বিষয়ক প্রবন্ধ ‘পৃথিবী’।

সম্মাননা ও স্বীকৃতি
১৯২৭ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় স্বর্ণকুমারী দেবীকে জগত্তারিণী স্বর্ণপদক দিয়ে সম্মানিত করে। ১৯২৯ সালে তিনি বঙ্গীয় সাহিত্য সম্মেলনে সভাপতিত্ব করেন। স্বর্ণকুমারী দেবী বহু দেশাত্মবোধক গান লিখে স্বদেশ মন্ত্রে দেশবাসীকে উদ্বুদ্ধ করেন। বাংলার মহিলাদের মধ্যে তিনি প্রথম জগত্তারিণী স্বর্ণপদক সম্মানের অধিকারী হন। ৭৬ বছর বয়স পর্যন্ত তিনি তার লেখা চালিয়ে গেছেন। চেতনা ও দৃষ্টির সর্বত্রগামীতা, নতুন যেকোনো ভালো পরামর্শ গ্রহণ করার মত উদার মানসিকতা, নারী কল্যাণ মূলক নানা অভিনব কার্যক্রম থেকে অনায়াসেই ঊনবিংশ শতাব্দীর চেতনার ক্ষেত্রে তাকে প্রথম নারীর স্থান দেওয়া যায়। ১৯৩২ খ্রিস্টাব্দের ৩ জুলাই চির বিদায় নেন স্বর্ণকুমারী দেবী। আর রেখে গেছেন বাংলার নারীদের জন্য দৃষ্টান্ত।

পত্রিকা সম্পাদনা
১৮৭৭ খ্রিস্টাব্দে ঠাকুর পারিবার থেকে ভারতী নামক মাসিক সাহিত্য পত্রিকা প্রকাশিত হতে থাকে। পত্রিকার প্রথম সম্পাদক ছিলেন দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুর। তিনি সাত বছর পত্রিকা সম্পাদনা করেছিলেন। ১৮৮৪ খ্রিস্টাব্দের ২০-২১ এপ্রিল জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্ত্রী কাদম্বরী দেবী আত্মহত্যা করেন। এ কারণে ভারতী পত্রিকা বন্ধ করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। কাদম্বরী দেবীর মৃত্যুর আগেই ভারতীর বৈশাখ ১২৯১ সংখ্যার প্রায় অর্ধেকটা ছাপা হয়ে গিয়েছিল। সেই কারণে বাকি অংশসহ পত্রিকা প্রকাশিত হয়েছিল স্বর্ণকুমারী দেবীর সম্পাদনায়। তবে পত্রিকাটি প্রকাশিত হয়েছিল বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ যুগ্মসংখ্যা হিসেবে। এরপর থেকে তার সম্পাদনায় পত্রিকাটি নিয়মিত প্রকাশিত হতে থাকে। ১৩০২ বঙ্গাব্দে স্বর্ণকুমারী দেবী অসুস্থ হয়ে পড়েন। ফলে তিনি ভারতী সম্পাদকের পদ ত্যাগ করেন। ভারতীর বৈশাখ ১৩০২ সংখ্যা থেকে সম্পাদকের দায়িত্ব পান স্বর্ণকুমারীর দুই কন্যা হিরন্ময়ী দেবী ও সরলা দেবী।

এরপর মাঝখানে ১৩০৫ বঙ্গাব্দে রবীন্দ্রনাথ এক বছর এটি সম্পাদনা করার পর সরলা দেবী আবার এর দায়িত্ব নেন। সরলা দেবীর বিবাহের পর ১৩১৪ বঙ্গাব্দে পত্রিকাটি সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যায়। পরে ১৩১৪ বঙ্গাব্দের জ্যৈষ্ঠ মাসে সরলা দেবী পাঞ্জাব থেকে কলকাতায় এসে এর দায়িত্ব সৌরিন্দ্রমোহনের হাতে অর্পণ করেন। কিন্তু আর্থিক সংকটের জন্য ১৩১৪ বঙ্গাব্দের আশ্বিন সংখ্যা পর্যন্ত প্রকাশিত হওয়ার পর এটি আবার বন্ধ হয়ে যায়। ১৩১৫ বঙ্গাব্দের বৈশাখ মাস থেকে স্বর্ণকুমারী দেবীর সম্পাদনায় পুনরায় পত্রিকাটি প্রকাশিত হয়।