নারীবাদী লেখিকা কামিনী রায়

ঢাকা, শনিবার, ২৩ জানুয়ারি ২০২১ | ৯ মাঘ ১৪২৭

নারীবাদী লেখিকা কামিনী রায়

রোকেয়া ডেস্ক ৯:৫৪ পূর্বাহ্ণ, নভেম্বর ০৪, ২০২০

print
নারীবাদী লেখিকা কামিনী রায়

কামিনী রায় একজন প্রথিতযশা বাঙালি কবি, সমাজকর্মী এবং নারীবাদী লেখিকা। তিনি তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের প্রথম মহিলা স্নাতক ডিগ্রিধারী। তিনি এক সময় ‘জনৈক বঙ্গমহিলা’ ছদ্মনামে লেখালেখি করতেন। কামিনী রায় প্রচলিত শিক্ষাগ্রহণ করেই নিজেকে প্রচলিত পথে বিলীন করেননি; বরং অসাধ্য সাধনে তৎপর হয়েছিলেন। লিখতে শুরু করেছিলেন কবিতা, যা তাকে বাঁচিয়ে রেখেছে আজও। নারীবাদী এই লেখিকাকে নিয়ে লিখেছেন সাইফ-উদ-দৌলা রুমী

জন্ম ও শিক্ষা
কামিনী রায় ১৮৬৪ খ্রিস্টাব্দের ১২ অক্টোবর পূর্ববঙ্গের (বর্তমান বাংলাদেশের) বাকেরগঞ্জের বাসা গ্রামে (বর্তমানে যা বরিশাল জেলার অংশ) জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা চ-ীচরণ সেন একজন ব্রাহ্ম ধর্মাবলম্বী, বিচারক ও ঐতিহাসিক লেখক ছিলেন। ১৮৭০ খ্রিস্টাব্দে চ-ীচরণ ব্রাহ্মধর্মে দীক্ষা লাভ করেন। পরের বছর তার স্ত্রী-কন্যাও কলকাতায় তার কাছে ব্রাহ্মধর্মে দীক্ষিত হন। তিনি ব্রাহ্ম সমাজের বিশিষ্ট নেতা ছিলেন। তার ভগিনী যামিনী সেন লেডি ডাক্তার হিসেবে খ্যাতি লাভ করেছিলেন। কামিনী রায়ের মায়ের নাম বামাসুন্দরী দেবী। কামিনী রায় ছাড়াও তাদের আরেকটি কন্যা ও একটি পুত্র সন্তান ছিল। তার বাবা বিচারিক পেশায় নিয়োজিত থাকলেও ব্রাহ্ম মতের একজন অন্যতম প্রধান ব্যক্তি ছিলেন এবং সাহিত্য ও সংস্কৃতিসেবী হিসেবে পরিচিত ছিলেন।

কামিনী রায়ের পড়ালেখার হাতেখড়ি তার পরিবারের মধ্যেই। বিশেষত মায়ের কাছে। বাড়িতেই তিনি বর্ণপরিচয় প্রথম ও দ্বিতীয় ভাগ এবং শিশু শিক্ষা শেষ করে নয় বছর বয়সে স্কুলে ভর্তি হন। ওই বছরই আপার প্রাইমারি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে প্রথম স্থান অর্জন করেন। এরপর ১৪ বছর বয়সে তিনি মাইনর পরীক্ষা দিয়ে প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হন। কামিনী রায়ের প্রাথমিক শিক্ষার ভার চ-ীচরণ সেন নিজে গ্রহণ করেন। ১২ বছর বয়সে তাকে স্কুলে ভর্তি করে বোর্ডিংয়ে পাঠান। কামিনী রায় ১৮৮০ খ্রিস্টাব্দে কলকাতা বেথুন ফিমেল স্কুল থেকে এন্ট্রান্স (মাধ্যমিকের সমমানের) পরীক্ষা ও ১৮৮৩ খ্রিস্টাব্দে ফার্স্ট আর্টস (উচ্চ মাধ্যমিকের সমমান) পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। বেথুন কলেজ থেকে তিনি ১৮৮৬ খ্রিস্টাব্দে ভারতের প্রথম নারী হিসেবে সংস্কৃত ভাষায় সম্মানসহ স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন। এরপর তিনি বেথুন কলেজেই শিক্ষকতা শুরু করেন এবং পরে অধ্যাপক হিসেবে পদোন্নতি লাভ করেন।

কর্মজীবন
একজন কবি, সমাজকর্মী এবং নারীবাদী লেখিকা ও সাহিত্য ক্ষেত্রে রূপসী বাংলার কবি জীবনানন্দ দাশের পরই কামিনী রায়ের স্থান। সেকালে মেয়েদের শিক্ষা বিরল ঘটনা ছিল। তারপরও তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের প্রথম মহিলা গ্রাজুয়েট তিনি। সে সময়ে কামিনী রায় নারীবাদে বিশ্বাসী হয়ে উঠেছিলেন। লিখেছিলেন সব অসংগতির বিরুদ্ধে ও নারী জাগরণের পক্ষে। সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকা-ে বিশেষ করে নারীকল্যাণে তার অগ্রণী ভূমিকা ছিল। তিনি সব সময়ই শিক্ষানুধ্যায়ীদের ভালোবাসতেন, উৎসাহ দিতেন ও সহযোগিতা করতেন অন্য নারী সাহিত্যিকদের।
তিনি ১৯২৩ সালে এক সম্মেলনে বরিশাল এলে কবি বেগম সুফিয়া কামালের সঙ্গে পরিচিত হয়ে তাকে লেখালেখির বিষয়ে প্রবল উৎসাহ দেন এবং মনোনিবেশ করতে বলেন। তিনি ১৯২২-২৩ সালে নারীশ্রম তদন্ত কমিশনের সদস্য ছিলেন। স্নাতক ডিগ্রি অর্জনের পর ১৮৮৬ সালেই তিনি বেথুন কলেজের স্কুল বিভাগে শিক্ষিকার পদে নিযুক্ত হন। পরবর্তীকালে তিনি ওই কলেজে অধ্যাপনাও করেছিলেন।

ব্যক্তিগত জীবন
কামিনী রায়ের ব্যক্তিগত জীবনের টানাাড়নের কারণেই তার কবিতায় এসেছে হতাশার সুর।
যা অশ্রুসংগীত হয়ে বেজে উঠেছে; একদিকে মধ্যযুগ প্রভাবিত পরমাত্মার সঙ্গে জীবাত্মার মিলনের চেতনা, অন্যদিকে স্বামী বা প্রভু নামক পুরুষের পদতলে নিজেকে বিলীন করে ধন্য হবার বোধ, মা নামক ধারণার নিচে বলি হওয়ার আকাক্সক্ষা, সন্তানের মঙ্গলের জন্য সর্বদা উদ্বিগ্ন থাকা; এই চারটি ক্ষেত্রে বাস্তবিক ব্যর্থতাই কামিনী রায়কে করে তোলে মর্ষকামি।

১৮৯৪ খ্রিস্টাব্দে কামিনীর সঙ্গে স্টাটুটারি সিভিলিয়ান কেদারনাথ রায়ের বিয়ে হয়। প্রচলিত বাঙালি নারীর সংসার কামনাকে তিনি কবিতার বিষয়বস্তু করেছেন এবং বিয়ের পর তিনি ঘোষণা করেছিলেন ‘সংসারই আমার কবিতা’; এই কথা বলার পর ছেড়ে দিয়েছিলেন কবিতা লেখা।
১৯০৮ সালে দুর্ঘটনায় তার স্বামী মারা যান। এরপর আবার শুরু করেন কবিতা লেখা। কবিতায় তিনি লিখেছেন, ‘সংসার মরীচিকাময়ী; তদুপরি মানুষ আশার ছলনে পুড়ছে মরে।’ গৃহহীন এই মানুষ গৃহের সন্ধান করছে আজীবন।

কিন্তু সংসারে ও গ্রহে থাকতে সংসার বা গ্রহের মূল্য বুঝতে পারছে না। কামিনী রায়ের কাছে সংসার সম্পর্কিত প্রচলিত ধারণাই মহৎ। স্বামীর শোক ভুলতে না ভুলতে কয়েক বছরের মধ্যে তিনি সন্তান লীলা ও অশোককেও হারান। হতাশার পর হতাশায় নিমজ্জিত কামিনী রায় লিখেছেন ‘হে ঐশ্বর্যবান,’ কেড়ে নিলে ‘সর্বশ্রেষ্ঠ দান তবথপ্রাণের সন্তান।’

একজন বাঙালি ভিখারিনী বা অভাবী নারী যেমন সন্তানকেই সর্বশ্রেষ্ঠ মনে করেন, তেমনি তিনিও একইরকম ভেবেছেন এবং এ উক্তি দিয়েই প্রকাশিত হয়েছে বাঙালির সামগ্রিক ব্যর্থতার পরিপূর্ণ রূপের খ-িত অংশ।

সাহিত্যচর্চা
শৈশবে তার পিতামহ তাকে কবিতা ও স্ত্রোত্র আবৃত্তি করতে শেখাতেন। এভাবেই খুব কম বয়স থেকেই কামিনী রায় সাহিত্য রচনা করেন ও কবিত্ব-শক্তির স্ফূরণ ঘটান। তার জননীও তাকে গোপনে বর্ণমালা শিক্ষা দিতেন। কারণ তখনকার যুগে হিন্দু পুরমহিলাগণের লেখাপড়া শিক্ষা করাকে একান্তই নিন্দনীয় ও গর্হিত কাজ হিসেবে বিবেচনা করা হতো। ১৫ বছর বয়সে তার প্রথম কাব্যগন্থ আলো ও ছায়া প্রকাশিত হয় ১৮৮৯ খ্রিস্টাব্দে। এ গ্রন্থটির ভূমিকা লিখেছিলেন হেমচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়। কিন্তু প্রথমে এতে গ্রন্থকর্ত্রী হিসেবে কামিনী রায়ের নাম প্রকাশিত হয়নি।

গ্রন্থটি প্রকাশিত হলে তার কবিখ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে। কবি কামিনী রায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও সংস্কৃত সাহিত্য দ্বারা প্রভাবিত হয়ে খুব অল্প বয়স থেকে সাহিত্যচর্চায় মনোনিবেশ করেন। মাত্র আট বছর বয়সে তিনি প্রথম কবিতা লেখেন। কামিনী রায় কবিতা লেখার শুরুতেই মধ্যযুগের নৈতিকতা দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিলেন এবং মহাজগতকে পরস্পর বিরুদ্ধ শব্দ দ্বারা চিনতে শিখেছিলেন।

পৃথিবীকে ও তার বস্তুসমূহকে সাদা-কালো, আলো-আঁধার, স্বর্গ-নরক ইত্যাদি বিপরীত শব্দ দিয়ে তিনি বুঝেছিলেন এবং পরপর বিপরীত শব্দগুলো দ্বারা কবিতার বাক্য গঠন করেছিলেন। কয়েকটি উদাহরণ দিলে বিষয়টি পরিষ্কার হবে; যেমন ‘কেউ হাসে, কাঁদে কেউ, ...দুঃখে-সুখ রয়েছে বাঁচিয়া’, ‘জীবন ও মরণের খেলা’, ‘ভাসাইয়া ক্ষুদ্র তরী, দিবালোকে, অন্ধকারে’, জীবন-মরণ একই মতন’, ‘মুক্তবন্দি’ ইত্যাদি অনেক ধরনের বাক্য তিনি ব্যবহার করেছেন।

বাঙালি প্রায় সব কালেই সবকিছুকেই এরকম পরস্পর-বিরুদ্ধ ভাব দ্বারা ব্যাখ্যা করেছেন; যা দ্বান্দিক হলেও যান্ত্রিকতা-দোষে দুষ্ট ও অবৈজ্ঞানিক; সাদা-কালোর মাঝেও অনেক স্তর রয়েছে; মানুষ শুধু ভালো বা মন্দ নয়, সে আরও অনেক কিছু; আলো-অন্ধকার নিয়েই মানুষের জীবন নয়, জীবনের নানা দিকে রয়েছে বৈচিত্র্যের বর্ণিল সমাহার। এরকম বিস্তৃত জায়গাতে মানুষকে কামিনী রায় দেখেছেন সাদা চোখে একদেশদর্শি মানুষের চিন্তার মতো।

কামিনী রায়ের কবিতায় বহুল ব্যবহৃত কিছু শব্দ যেমন আশা-নিরাশা, হর্ষ-বিষাদ, অবসাদ, আর্তনাদ, সুখ-দুঃখ, স্বর্গ-মর্ত, ভয়, আলো-আঁধার, অশ্রু, জীবন-মরণ, মলিন, শোক, বেদনা, লাভ-ক্ষতি ইত্যাদির দিকে তাকালেই বোঝা যায় তিনি জীবনের ইতি ও নেতি দ্বারা প্রভাবিত ছিলেন এবং কবিতার বিষয়বস্তুর দিকে নজর দিলে দেখা যাবে যে তিনি জীবনের ব্যর্থতা, হতাশা, দুঃখ, বিষাদকেই প্রধান বিষয় করে তুলেছেন।

কামিনী রায়ের চিন্তার বড় অংশ জুড়ে রয়েছে মধ্যযুগীয় অলৌকিকতা, ঈশ্বরমুখিনতা, আধ্যত্মিকতা; সকল কর্মের কেন্দ্রে তিনি আকাশের ওইপারের অদৃশ্য শক্তির প্রকাশ দেখেছেন যেমন ‘তুমি শক্তিমান, দিতে পার, নিতে পার;’, ‘দুঃসহ এ জ্যোতির মাঝার অন্ধবত ঘুরিয়া বেড়াই’; এসেছে পুনর্জন্মের কথাও, ‘ক্ষুদ্র দীপ যদি নিভে যায়, কে বলিতে পারে, জ্বলিবে না সে যে পুনরায়?’

‘হাসিবার কাঁদিবার অবসর নাহি আর, দুঃখিনী জন্মভূমি, মা আমার, মা আমার’। এই দুঃখিনী জন্মভূমির জন্য যে আত্মত্যাগের ব্রত, তাই বারবার প্রকাশিত হয়েছে তার কবিতায়। মৃত্যুকে তিনি জীবনের অংশরূপেই দেখেন এবং তাই নির্ভীকভাবে কামনা করে লিখেছেন ‘মরিব জন্মভূমির জন্যই’।

দেশপ্রেম অবশ্যই প্রয়োজন এবং তা হওয়া উচিত যুক্তিপূর্ণ। কিন্তু বাঙালির দেশপ্রেমের সঙ্গে যুক্তিহীন আবেগের আধিক্য ও অতিরিক্ত আত্মত্যাগের প্রবণতা বাঙালির ক্ষতির কারণ হয়েছে। বাঙালি আত্মত্যাগ করেছে কিন্তু সংগ্রামের অর্জনগুলোকে নিজেদের কাছে রাখতে পারেনি। এরকম সীমাবদ্ধতার চিহ্ন ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে তার কিছু কবিতায়। তিনি নিজেকে ‘জগতের পায়ে বিসর্জন’ দিতে চাইলেও বিসর্জনের শক্তি তাকে চাইতে হয়েছে দেবতার কাছে। একটি ক্ষুদ্র ব্রত সম্পন্ন করার ‘আকাক্সক্ষা’ তিনি সারা জীবন করতে চেয়েছেন, কিন্তু চরিতার্থতার পথ খুঁজে পাননি। ১৮৯১ সালে প্রকাশিত নির্মাল্য কাব্যের যে ‘আকাক্সক্ষা’ সেটিই সুস্পষ্ট হয়েছে ১৯২৯ সালে প্রকাশিত ‘দীপ ও ধূপ’ কাব্যগ্রন্থের কবিতাগুলোতে। তার বহু আগেই প্রথম গ্রন্থ ‘সুখ’ কবিতাটিতে তিনি জানিয়ে দিয়েছেন

নাই কিরে সুখ? নাই কিরে সুখ?’
এ ধরা কি শুধু বিষাদময়?
যতনে জ্বলিয়া কাঁদিয়া মরিতে
কেবলি কি নর জনম লয়?...
কাঁদাইতে শুধু বিশ্বরচয়িতা
সৃজেন কি নরে এমন করে?
মায়ার ছলনে উঠিতে পড়িতে
মানবজীবন অবনী পরে?
বল ছিন্ন বীণে, বল উচ্চৈঃস্বরে,...
না, ...না, ...না, ...মানবের তরে
আছে উচ্চ লক্ষ্য, সুখ উচ্চতর,
না সৃজিলা বিধি কাঁদাতে নরে।
কার্যক্ষেত্র ওই প্রশস্ত পড়িয়া,
সমর-অঙ্গন সংসার এই,
যাও বীরবেশে কর গিয়ে রণ;
যে জিনিবে সুখ লভিবে সেই।
পরের কারণে স্বার্থে দিয়া বলি
এ জীবন মন সকলি দাও,
তার মত সুখ কোথাও কি আছে?
আপনার কথা ভুলিয়া যাও।
পরের কারণে মরণের সুখ;
‘সুখ’ ‘সুখ’ করি কেঁদনা আর,
যতই কাঁদিবে ততই ভাবিবে,
ততই বাড়িবে হৃদয়-ভার।
গেছে যাক ভেঙে সুখের স্বপন
স্বপন অমন ভেঙেই থাকে,
গেছে যাক্ নিবে আলেয়ার আলো
গৃহে এস আর ঘুর না পাঁকে।
যাতনা যাতনা কিসেরি যাতনা?
বিষাদ এতই কিসের তরে?
যদিই বা থাকে, যখন তখন
কি কাজ জানায়ে জগৎ ভরে?
লুকান বিষাদ আঁধার আমায়
মৃদুভাতি স্নিগ্ধ তারার মত,
সারাটি রজনী নীরবে নীরবে
ঢালে সুমধুর আলোক কত!
লুকান বিষাদ মানব-হৃদয়ে
গম্ভীর নৈশীথ শান্তির প্রায়,
দুরাশার ভেরী, নৈরাশ চিৎকার,
আকাক্সক্ষার রব ভাঙে না তায়।
বিষাদ... বিষাদ... বিষাদ বলিয়ে
কেনই কাঁদিবে জীবন ভরে?
মানবের মন এত কি অসার?
এতই সহজে নুইয়া পড়ে?
সকলের মুখ হাসি-ভরা দেখে
পারনা মুছিতে নয়ন-ধার?
পরহিত-ব্রতে পার না রাখিতে
চাপিয়া আপন বিষাদ-ভার?
আপনারে লয়ে বিব্রত রহিতে
আসে নাই কেহ অবনী পরে,
সকলের তরে সকলে আমরা,
প্রত্যেকে আমরা পরের তরে।

যে ভারতীয়রা একদা সকলকে ভাষা দিয়েছিল সেই ভারতীয়রা নিজেদের শাসন করতে পারে না; ইউরোপীয় বেনিয়ারা এসেছে ভারতকে লুট করতে, আর ভারত-সন্তানরা ডুব দিয়েছে অন্ধকারে। সেই অন্ধকার সময়ে কামিনী রায় ঘোষণা দেন কবিতায় ‘জ্ঞানে, প্রেমে, কর্মে দৈন্য হবে অবসান’। উনিশ শতকে বাংলা ভাষা হৃষ্টপুষ্ট হচ্ছে, এমনি সময়ে এসেছে জাতি গঠনের প্রসঙ্গ। তখন দেশ গঠনের জন্য প্রয়োজন হাজার হাজার বঙ্গ-সন্তানের; সেই দামাল সন্তানদের মায়েদের উদ্দেশ করে কামিনী রায় বলছেন, ‘হে মায়েরা, তোমাদের সন্তান শুধু তোমাদের নয়, শতেক মায়ের ছেলে সে, দেশের তরে, দশের তরে’।

আধ্যাত্মিকতা দ্বারা প্রভাবিত হওয়ার কারণে সর্বদাই কামিনী রায় সহজ আশাবাদী, যদিও দুঃখে তিনি যথেষ্ট পুড়েছেন। স্বপ্ন দেখেছেন, একতায় বলিয়ান ভারতসন্তান আসছে, নারী-শিশুরা উন্নত কামনা ভরে উল্লাসে গাইছে বিজয়ের গান। বাঙালির সহজ-সরল অনুভূতি যেমন অভিমান, সুখ, দুখ, আনন্দ, বেদনা, অন্ধকার, বিষাদ, বিসর্জন, অশ্রু, সংকীর্ণতা ইত্যাদি বিষয় নিয়ে কবিতা লেখা শুরু করলেও তিনি শেষ দুটি গ্রন্থে আশাবাদী হয়ে গেছেন এবং সেই বই-দুটোর কবিতাগুলোতে সমাজ ও রাজনীতিমনস্কতা তুলে ধরেছেন।

নারীমুক্তির আকুতি থাকলেও কীভাবে নারীমুক্তি হবে তার কোনো কর্মসূচি ছিল না কবিতায়। তিনি বিপ্লবী তো ননই, এমনকি সংস্কারকও নন; তবে তিনি পরিবর্তন আনতে চেয়েছিলেন। বৈষম্য ও নির্যাতনকে সহনশীল পর্যায়ে নামাতে চেয়েছিলেন। তিনি লিখেছেন, ‘দাসত্বের ভেঙে হাতকড়া, শাসনের ছিঁড়ে দড়ি-দড়া, ছুটিয়াছে মুক্তি অনুরাগে, যজ্ঞের বেদির পুরোভাগে’। পুরুষকে তিনি অনুরোধ করে লিখেছেন ‘খুলিয়া শৃঙ্খল ভাঙিয়া পিঞ্জর, শিখাও চলিতে ধরি তার কর’।

মহাপ্রয়াণ
কামিনী রায়ের তিনটি সন্তান ছিল। প্রথম সন্তান জন্মের কিছুদিনের মধ্যেই (১৯০০ সালের দিকে) মারা যায়। অপর দুই সন্তানের নাম ছিল লীলা রায় ও অশোকরঞ্জন রায়। ১৯০৩ সালে কামিনী রায়ের বোন কুসুম, ১৯০৬ সালে প্রথমে ভাই ও পরে বাবা মারা যান। ১৯০৮ সালে তার স্বামী কেদারনাথ রায় ঘোড়ার গাড়ি উল্টে গিয়ে আঘাত পেয়ে মারা যান এবং এর কয়েক বছরের মধ্যে তিনি সন্তান লীলা ও অশোককেও হারান। এভাবে মাত্র সাত বছরের মধ্যে প্রায় সব আপনজনকে হারিয়ে তিনি একেবারে নিঃস্ব হয়ে পড়েন।

স্বামী-সন্তান ও নিকটাত্মীয়ের অকাল মৃত্যুর ফলে তার সাহিত্যের মধ্যে এক ধরণের ব্যথাতুর ও নৈসর্গপ্রিয়তার ভাব দেখা যায়। ব্যক্তিগত বেদনা, দেশপ্রেম, জীবন চিন্তার নানাভাব বিভিন্ন রূপকল্পনা ও প্রতিমার মধ্য দিয়ে তার কাব্যে নতুন রূপে প্রকাশ করেছেন; তার লেখায় মানবতাবোধ এবং নৈতিকতা প্রকাশই মুখ্য হয়ে দেখা দেয়। তবে ব্যক্তিগতভাবে তিনি রবীন্দ্র মন ও মানস দ্বারা প্রবলভাবে প্রভাবিত ছিলেন। আবার সংস্কৃত ভাষায় ব্যুৎপত্তি লাভের কারণে তার সাহিত্য-রচনাগুলো বিশেষভাবে সংস্কৃত অলংকরণ ও ভাবধারা দ্বারা প্রভাবিত।

তৎকালীন সময়ে মেয়েদের শিক্ষাও বিরল ঘটনা ছিল, সেই সময়ে কামিনী রায় নারীবাদে বিশ্বাসী হয়ে উঠেছিলেন। লিখেছিলেন সব অসংগতির বিরুদ্ধে ও নারী জাগরণের পক্ষে। সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে বিশেষত নারী কল্যাণে তার অগ্রণী ভূমিকা ছিল। শেষ জীবনে তিনি ভারতের ঝাড়খণ্ড  রাজ্যের হাজারীবাগে বসবাস করতেন এবং ১৯৩৩ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর সেখানেইে তার জীবনাবসান ঘটে। তার একটি লেখা আজও আমাদের পথ চলার পাথেয়- ‘সকলের তরে সকলে আমরা, প্রত্যেকে মোরা পরের তরে।’

গ্রন্থ তালিকা

আলো ও ছায়া (১৮৮৯)
নির্মাল্য (১৮৯১)
পৌরাণিকী (১৮৯৭)
মাল্য ও নির্মাল্য (১৯১৩)
অশোক সঙ্গীত (সনেট সংগ্রহ, ১৯১৪)
অম্বা (নাট্যকাব্য, ১৯১৫)
দীপ ও ধূপ (১৯২৯)
জীবন পথে (১৯৩০)
একলব্য
দ্রোণ-ধৃষ্টদ্যুম্ন
শ্রাদ্ধিকী