জননী সাহসিকা সুফিয়া কামাল

ঢাকা, শনিবার, ২৩ জানুয়ারি ২০২১ | ৯ মাঘ ১৪২৭

জননী সাহসিকা সুফিয়া কামাল

রোকেয়া ডেস্ক ১১:৫৪ পূর্বাহ্ণ, অক্টোবর ২৮, ২০২০

print
জননী সাহসিকা সুফিয়া কামাল

বেগম সুফিয়া কামাল কবি হিসেবে সমধিক পরিচিত কিন্তু গদ্য লেখক হিসেবেও তার অবদান রয়েছে। তেমন কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা লাভ করেননি তিনি। তখনকার পারিবারিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটে মেয়েদের লেখাপড়ার সুযোগ ছিল না বললেই চলে। তাদের বাড়িতে উর্দুর চল থাকলেও নিজেই বাংলা ভাষা শিখে
নেন। পর্দার ঘেরাটোপ থেকে বেরিয়ে তিনি হয়ে ওঠেন একজন আধুনিক মানুষ। মহীয়সী এই নারীকে নিয়ে লিখেছেন সাইফ-উদ-দৌলা রুমী

জন্ম ও শৈশব
বেগম সুফিয়া কামাল ১৯১১ সালের ২০ জুন বরিশালের শায়েস্তাবাদে মামার বাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা সৈয়দ আব্দুল বারী এবং মা সৈয়দা সাবেরা খাতুন। তার বাবা কুমিল্লার বাসিন্দা ছিলেন। সুফিয়া কামালের ডাক নাম ছিল হাসনা বানু। আরব্য উপন্যাসের হাতেম তাইয়ের কাহিনী শুনে নামটি রেখেছিলেন তার নানী। তবে দরবেশ নানা তার নাম রেখেছিলেন সুফিয়া খাতুন। ‘একালে আমাদের কাল’ শীর্ষক লেখায় সুফিয়া কামাল তার জন্ম প্রসঙ্গে বলেছেন-‘মাটিকে বাদ দিয়ে ফুল গাছের যেমন কোনো অস্তিত্ব নেই আমার মাকে বাদ দিয়ে আমারও তেমন কোনো কথা নেই। আমি জন্ম নেবার আগেই মায়ের মুখে ‘হাতেম তাইয়ের কেচ্ছা’ শুনে আমার নানী আম্মা আমার নাম রেখেছিলেন হাসনা বানু। আমার নানা প্রথম বয়সে সদর আলা থেকে জজগিরি পর্যন্ত সারা করে শেষ বয়সে সাধক ‘দরবেশ’ নাম অর্জন করেছিলেন। শুনেছি যেদিন আমি হলাম, নিজের হাতে আমার মুখে মধু দিয়ে তিনি আমার নাম রেখেছিলেন সুফিয়া খাতুন। কিন্তু আমার ডাক নাম হাসনা বানুটাই আমাদের পরিবারে প্রচলিত। সুফিয়া বললে এখনও কেউ কেউ আমাকে হঠাৎ চিনতে পারেন না। আমার ভাইয়া ছোট বেলায় আমাকে ডাকতেন হাচুবানু বলে; কেউ কেউ বলতো হাসুবানু।’

সুফিয়া কামালের বাবা সৈয়দ আবদুল বারি পেশায় ছিলেন উকিল। সুফিয়ার যখন সাত বছর বয়স তখন তার বাবা গৃহত্যাগ করেন। ফলে তার মা সাবেরা খাতুন অনেকটা বাধ্য হয়ে তাকে নিয়ে বাবার বাড়িতে আশ্রয় নেন। এ কারণে তার শৈশব কেটেছিল নানার বাড়িতে। বাবার অনুপস্থিতিতে তিনি মা সৈয়দা সাবেরা খাতুনের পরিচর্যায় লালিত-পালিত হতে থাকেন। তার মা ছিলেন শাযয়েস্তাবাদের নবাব পরিবারের মেয়ে। সেই পরিবারের কথ্য ভাষা ছিল উর্দু। এ কারণে অন্দরমহলে মেয়েদের আরবি, ফারসি শিক্ষার ব্যবস্থা থাকলেও বাংলা শেখানোর কোনো ব্যবস্থা ছিল না। তিনি বাংলা শেখেন মূলত তার মায়ের কাছে। তার বড় মামার একটি গ্রন্থাগার ছিল। মায়ের উৎসাহ ও সহায়তায় সেখানে বই পড়ার সুযোগ হয়েছিল তার।

শায়েস্তাবাদে নানার বাড়ির রক্ষণশীল অভিজাত পরিবেশে বড় হয়েও সুফিয়া কামালের মনে দেশ, দেশের মানুষ ও সমাজ এবং ভাষা ও সংস্কৃতি মূল প্রেরণা হিসেবে কাজ করে। সুফিয়া কামাল নিজেও ‘একালে আমাদের কাল’ লেখায় উল্লেখ করেন- ‘আমরা জন্মেছিলাম এক আশ্চর্যময় রূপায়ণের কালে।

প্রথম মহাযুদ্ধ, স্বাধীনতা আন্দোলন, মুসলিম রেনেসাঁর পুনরুত্থান, রাশিয়ান বিপ্লব, বিজ্ঞান জগতের নতুন নতুন আবিষ্কার, সাহিত্য ও সংস্কৃতির নবরূপ সূচনা, এসবের শুরু থেকে যে অভাবের মধ্যে শৈশব কেটেছে তারই আদর্শ আমাদের মনে ছাপ রেখেছে সুগভীর ভাবে।’ যে সময়ে সুফিয়া কামালের জন্ম তখন বাঙালি মুসলিম নারীদের গৃহবন্দি জীবন কাটাতে হত। স্কুল-কলেজে পড়ার কোনো সুযোগ তাদের ছিল না। পরিবারে বাংলা ভাষার প্রবেশ একরকম নিষিদ্ধ ছিল। সেই বিরুদ্ধ পরিবেশে সুফিয়া কামাল প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সুযোগ পাননি। তিনি পারিবারিক নানা উত্থানপতনের মধ্যে স্বশিক্ষায় শিক্ষিত হয়েছেন। খ্যাতি পেয়েছেন কবি, লেখিকা, নারীবাদী ও আধুনিক বাংলাদেশের নারী প্রগতি আন্দোলনের একজন পুরোধা ব্যক্তিত্ব হিসেবেও। তিনি কবি হলেও সবার কাছে আরও একটি পরিচয় আছে জননী সাহসিকা হিসেবে। যুগে যুগে যারা নারী অগ্রগতির জন্য অবদান রেখেছেন তার মধ্যে সুফিয়া কামাল অন্যতম।

সামাজিক কর্মকাণ্ড
সুফিয়া কামাল সাহিত্যচর্চার পাশাপাশি সমাজসেবা ও বিভিন্ন সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী জানা যায়, ‘চৌদ্দ বছর বয়সে বরিশালে প্রথমে সমাজ সেবার সুযোগ পাই। বাসন্তী দেবী ছিলেন অশ্বিনীকুমার দত্তের ভাইয়ের ছেলের বৌ। তার সঙ্গে দুস্থ মেয়েদের বিশেষ করে মা ও শিশুদের জন্য মাতৃসদনে আমি কাজ শুরু করি।’ জীবনের পরবর্তী সময়ে সমাজসেবা ও সংগঠনমূলক কাজের বিষয়ে সুফিয়া কামাল বর্ণনা করেন, ‘প্রথম জীবনে কাজ করার পর আঠার থেকে বিশ বছর বয়স পর্যন্ত আমি বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেনের প্রতিষ্ঠিত কলকাতার ‘আঞ্জুমান মাওয়াতিনে’ কাজ করি। এই প্রতিষ্ঠানের কাজ ছিল কলকাতার বস্তি এলাকার মুসলমান মেয়েদের মনোভাবে একটু শিক্ষিত করে তোলা।

মিসেস হামিদা মোমেন, মিসেস শামসুন্নাহার মাহমুদ, সরলা রায়, জগদীশ বাবুর স্ত্রী অবলা বসু, ব্রহ্মকুমারী দেবী এরা সকলেই ছিলেন এই প্রতিষ্ঠানে। আমার স্বামী ছিলেন উদার প্রকৃতির মানুষ, এসব কাজে তার কাছ থেকে প্রচুর উৎসাহ পেয়েছি আমি। এরপর ১৯৪৩ এর দুর্ভিক্ষের সময় বর্ধমানে এবং ১৯৪৬ এর ‘ডাইরেক্ট অ্যাকশন ডে’র হিন্দু মুসলমান সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার পর বিপন্ন এবং আহতদের মধ্যে কাজ করেছি। এ সময়ই তো হাজেরা মাহমুদ, রোকেয়া কবীর, হোসনা রশীদ ও তোমার (নূরজাহান মুরশিদ) সঙ্গে আমার পরিচয় হল। ১৯৪৭ এর পরই ঢাকায় এলাম। প্রথমে ওয়ারি মহিলা সমিতি প্রতিষ্ঠিত করি এবং এই সমিতির মাধ্যমেই কাজ শুরু করি। প্রখ্যাত নেত্রী লীলা রায় আমাকে সমাজ কল্যাণের কাজে এগিয়ে আসতে আহ্বান জানান। এরপর পর্যায়ক্রমে ভাষা আন্দোলন, গণআন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধে আমি বিশেষভাবে জড়িয়ে পড়ি।’

১৯৩১ সালে সুফিয়া মুসলিম মহিলাদের মধ্যে প্রথম ‘ভারতীয় মহিলা ফেডারেশন’-এর সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৩৩-৪১ পর্যন্ত তিনি কলকাতা করপোরেশন প্রাইমারি স্কুলে শিক্ষকতা করেন। এই স্কুলেই তার পরিচয় হয় প্রাবন্ধিক আবদুল কাদির এবং কবি জসীম উদ্দীনের সঙ্গে। ১৯৪৮ সালে সুফিয়া ব্যাপকভাবে সমাজসেবা ও রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়েন। তিনি হিন্দু-মুসলিম সম্প্রীতি রক্ষার উদ্দেশ্যে শান্তি কমিটিতে যোগ দেন। এ বছরই তাকে সভানেত্রী করে ‘পূর্ব পাকিস্তান মহিলা সমিতি’ গঠিত হয়। ১৯৪৯ সালে তার যুগ্ম সম্পাদনায় প্রকাশিত হয় সুলতানা পত্রিকা, যার নামকরণ করা হয় বেগম রোকেয়ার সুলতানার স্বপ্নগ্রন্থের প্রধান চরিত্রের নামানুসারে।

১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে সুফিয়া কামাল সরাসরি অংশগ্রহণ করেন। শুধু তা-ই নয়, পাকিস্তান সরকার বাংলা ভাষা ও বাঙালি সংস্কৃতির ওপর দমন-নীতির অংশ হিসেবে রবীন্দ্রনাথকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করলে তিনি তার বিরুদ্ধেও তীব্র প্রতিবাদ জানান। ১৯৬১ সালে রবীন্দ্রনাথের জন্মশতবর্ষে তিনি ‘সাংস্কৃতিক স্বাধিকার আন্দোলন’ পরিচালনা করেন। ১৯৬৯ সালে ‘মহিলা সংগ্রাম পরিষদ’ (বর্তমানে-বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ) গঠিত হলে তিনি তার প্রতিষ্ঠাতা প্রধান নির্বাচিত হন এবং আজীবন তিনি এর সঙ্গে জড়িত ছিলেন।

স্বাধীনতার পরও সুফিয়া কামাল অনেক সংগঠন প্রতিষ্ঠা ও পরিচালনা করেন। তিনি যেসব সংগঠনের প্রতিষ্ঠাপ্রধানের দায়িত্ব পালন করেন সেগুলি হলো বাংলাদেশ মহিলা পুনবার্সন বোর্ড, বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন কমিটি এবং দুস্থ পুনর্বাসন সংস্থা। এছাড়াও তিনি ছায়ানট, বাংলাদেশ প্রতিবন্ধী ফাউন্ডেশন এবং নারী কল্যাণ সংস্থার সভানেত্রী ছিলেন। ১৯৩২ সালে তার স্বামীর আকস্মিক মৃত্যু তাঁকে আর্থিক সমস্যায় নিপতিত করে। তিনি কলকাতা করপোরেশন স্কুলে শিক্ষকতা শুরু করেন এবং ১৯৪২ সাল পর্যন্ত এ পেশায় নিয়োজিত থাকেন। এর মাঝে ১৯৩৯ সালে কামালউদ্দিন আহমেদের সঙ্গে তার দ্বিতীয় বিয়ে হয়। দেশবিভাগের পূর্বে কিছু কাল তিনি নারীদের জন্য প্রকাশিত সাময়িকী বেগমের সম্পাদক ছিলেন।

কবির দৃষ্টিভঙ্গি
সুফিয়া কামাল এক সাক্ষাৎকারে তার বেড়ে ওঠা সময়কালের সামাজিক অবস্থা বর্ণনা করেন ‘তখনকার সময়টাতে শ্রেণীভেদ একটা বড়ো ব্যাপার ছিল। বড়োলোক, ছোটলোক, সম্ভান্ত লোক, চাষি-কৃষক, কামার-কুমার ইত্যাদি সমাজে বিভিন্ন ধরনের বংশ ছিল এবং এসব বংশে শ্রেণীবিভেদ ছিল। সেই শ্রেণীভেদ অনুসারে বলা যায়, তখন মধ্যবিত্ত বা নিম্নবিত্তদের ঘরের মেয়েরা পড়ালেখা বেশি জানতো না। তারা বড়োজোর কোরআন শরিফ পড়া শিখতো। আর হয়তো বাবা-মায়ের কাছে দোয়া-দূরুদ আর নামাজ পড়া শিখতো। এই ছিল তাদের শিক্ষা। স্কুল-কলেজের বালাই তো ছিলই না। তবে ধর্মীয় শাসনের একটি প্রক্রিয়া ছিল। সেটা ছেলে-মেয়ে সকলের ওপরই কার্যকর থাকতো।’

সুফিয়া কামাল পর্দাযুগের মেয়েদের সঙ্গে এখনকার মেয়েদের তুলনা করেন এভাবে, ‘আগে মেয়েরা ষোলআনা নির্ভরশীল ছিল পুরুষের ওপর। স্ত্রী-কন্যার কি প্রয়োজন না প্রয়োজন তা স্বামী বা পিতাই নির্ধারণ করতেন। যেখানে পুরুষ মানুষটি এসব ব্যাপারে তেমন মাথা ঘামাতো না। সেখানে স্ত্রী-কন্যা নীরবে কষ্ট সহ্য করতো এবং সেই পরিস্থিতিতেই নিজেকে খাপ খাইয়ে নিতো। এখন আবার যেসব মেয়েদের রোজগার আছে স্বামীরা তাদের রোজগার কেমন করে খরচ হবে তাও বলে দিতে চায়। আর টাকা পয়সার ব্যাপারে দেখা গেছে মেয়েরা নিজের টাকা যত খরচ করে স্বামীরা ততই হাত গুটোয়।’

সুফিয়া কামাল নারীর সামাজিক শৃঙ্খল ভেঙে মুক্তির দিগন্ত উন্মোচন করার জন্য নিবেদিত ছিলেন। নারীর সামগ্রীক মুক্তির জন্য তার ভূমিকা ছিল সম সময়ের জন্য উদ্দীপনামূলক ও আগ্রহ উদ্দীপক, সে কারণে তিনি বলেন, ‘আমার কাছে সবচেয়ে ভালো লাগে এই দেখে যে, মেয়েরা আগের তুলনায় এখন অনেক সাহসী হয়েছে। মেয়েরা এখন রাস্তায় বেরিয়ে অন্তত নিজেদের কথা বলতে শিখেছে। আমরা চেয়েছিলাম, মেয়েরা কথা বলতে শিখুক, সাহসী হয়ে উঠুক, নিজেদের অধিকার তারা বুঝতে পারুক। এটা এখন হয়েছে। এটা বড়ো আনন্দের।’

তবে নারীর স্বাধীনতা সম্পর্কে সুফিয়া কামালের নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি ও মূল্যবোধগত বিবেচনা ছিল, এ কারণে তিনি নারী স্বাধীনতার সঙ্গে সঙ্গে নীতি-আদর্শ-ঐতিহ্যকে গুরুত্ব দিয়েছেন। তিনি মন্তব্য করেন, ‘মেয়েরা স্বাধীনতা পেয়েছে। কিন্তু অনেকেই সেই স্বাধীনতার ব্যবহার সব সময় সঠিকভাবে করতে শেখেনি। অনেক সময় অপব্যবহার করছে। এটা আমার কাছে খুব খারাপ লাগে। এই যে মেয়েরা অপ্রয়োজনে বিদেশের ফ্যাশনের হুজুগে নিজেদের সংস্কৃতি বিরোধী কাপড় পরছে, ব্যবসায়ী মহল তাদের ব্যবহার করছে নানাভাবে, মেয়েরা ভাবছে এটাই স্বাধীনতা। এটাই অপব্যবহার। মেয়েরা মডেলিং করুক, অভিনয় করুক, কিন্তু তা যেন মর্যাদা হারাবার মাধ্যম না হয়। অযথা অশালীন অভিনয়, যাত্রা, নাচগানের কোনো দরকার নেই। নারীদের যেন কোনো পণ্য না করা হয়, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। বিজ্ঞাপনে মেয়েদের শরীর প্রদর্শন করিয়ে কোটি কোটি টাকা অর্জন করা হচ্ছে। এটা বন্ধ করতে হবে। পর্ণো ম্যাগাজিনের পণ্য হওয়া মেয়েদের বন্ধ করতে হবে।’

সুফিয়া কামাল রাজনৈতিক বিবেচনা থেকে দেশের উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির কথা ভেবেছেন, অন্যদিকে বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গির মাধ্যমে প্রগতির পথে এগিয়ে যাওয়ার বাসনা অনুভব করেছেন। মানুষে মানুষে ভালোবাসা ও সাম্য তার লেখা ও কর্মকাণ্ডে ভিত্তিমূল হিসেবে কাজ করেছে। দার্শনিক বিবেচনাবোধ থেকে এভাবে তিনি ইতিহাস ও সমাজ বিশ্লেষণ করেছেন, ‘ইতিহাসে বার বার দেখা গেছে, মূঢ়তা এবং হিংস্রতা যখন সীমা অতিক্রম করেছে তখনই তার ধ্বংস অনিবার্য হয়ে উঠেছে- সে নিজেকেই নিজে ধ্বংস করেছে।

হয়তো অনেক সুন্দর ও শুভকে এজন্যে আত্মহুতি দিতে হয়, কিন্তু ভয় এবং হতাশায় নিস্কৃতি কোথায়? আরও একটা কথা মানি, আমাদের দারিদ্র্য এবং হতাশার অন্যতম কারণ; জনসংখ্যার অনুপাতে আমাদের সম্পদের অভাব; মানুষের ক্ষুধায় এবং লোভে প্রকৃতি লুণ্ঠিত, শূন্য হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু প্রতিকারের পথ একটাই, দুঃখের অন্ন সবাইকে একসঙ্গে ভাগ করতে খেতে হবে, তারপর মানুষ ও প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষার জন্যে বিজ্ঞানকে কাজে লাগাতে হবে। মানুষের প্রতি মানুষের ভালোবাসাই সব সমস্যা দূর করতে সক্ষম।’

সুফিয়া কামাল সংসারকে কখনও প্রাধান্য পেতে দেননি, এমনকি কাব্যকেও জীবন জুড়ে দাঁড়াতে দেননি, খ্যাতি বা প্রতিষ্টা গ্রাস করতে পারেনি জীবন। তার পটভূমি ও ক্ষেত্র হয়ে উঠেছিল দেশ ও ইতিহাস। দেশের কাজ এবং ইতিহাসের দায় সুফিয়া কামালকে সব সময়ে রেখেছে ব্যস্ত। কঠিন এবং সঠিক সিদ্ধান্ত তাকে নিতে হয়েছে বারবার। ইতিহাসের কী সব ঘূর্ণিপাক, বাঁক তিনি পেরিয়েছেন সাবলীল স্বচ্ছতায় যখন বহু মণিষীও হোঁচট খেয়েছেন, বোকা হয়েছেন। এভাবে সুফিয়া কামাল যেন হয়ে উঠেছিলেন সত্য পথের ধ্রুবতারা। প্রজ্ঞার মাধুর্যে স্থির আর চিত্তের জৌলুসে উজ্জ্বল।

সাহিত্য চর্চার সূচনা
১৯২৪ সালে মাত্র ১৩ বছর বয়সে মামাতো ভাই সৈয়দ নেহাল হোসেনের সঙ্গে সুফিয়ার বিয়ে দেওয়া হয়। তখন তিনি সুফিয়া এন. হোসেন নামে পরিচিত হন। নেহাল অপেক্ষাকৃত আধুনিকমনস্ক ছিলেন। তিনি সুফিয়া কামালকে সমাজসেবা ও সাহিত্যচর্চায় উৎসাহিত করেন।

সাহিত্য ও সাময়িক পত্রিকার সঙ্গে সুফিয়ার যোগাযোগও ঘটিয়ে দেন তিনি। সুফিয়া কামাল সে সময়ের বাঙালি সাহিত্যিকদের লেখা পড়তে শুরু করেন। ১৯১৮ সালে কলকাতায় গিয়েছিলেন সুফিয়া কামাল। সেখানে বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেনের সঙ্গে তার দেখা হয়েছিল। সুফিয়া কামালের শিশুমনে বিশেষ জায়গা করে নিয়েছিলেন বেগম রোকেয়ার কথা ও কাজ। সুফিয়া কামালের কাজেকর্মেও ছাপ পাওয়া যায় বেগম রোকেয়ার।

সাহিত্যপাঠের পাশাপাশি সুফিয়া কামাল সাহিত্য রচনাও শুরু করেন। ১৯২৩ সালে তিনি রচনা করেন তার প্রথম গল্প ‘সৈনিক বধু’ যা বরিশালের ‘তরুণ’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। ১৯২৬ সালে তার প্রথম কবিতা বাসন্তী সে সময়ের প্রভাবশালী সাময়িকী সওগাতে প্রকাশিত হয়। ত্রিশের দশকে কলকাতায় অবস্থানকালে বাংলা সাহিত্যের উজ্জ্বল নক্ষত্র রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, শরৎচন্দ্র প্রমুখের দেখাও পান তিনি।

১৯৩৮ সালে প্রকাশিত হয় তার ‘সাঁঝের মায়া’ কাব্যগ্রন্থ। এর ভূমিকা লিখেছিলেন নজরুল। গ্রন্থটি পড়ে প্রশংসা করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। একটি চিঠিতে সুফিয়া কামালকে তিনি লেখেন, ‘তোমার কবিত্ব আমাকে বিস্মিত করে। বাংলা সাহিত্যে তোমার স্থান উচ্চে এবং ধ্রুব তোমার প্রতিষ্ঠা।’

সুফিয়া কামাল ‘একালে আমাদের কাল’ নামে একটি আত্মজীবনী রচনা করেছেন। তাতে তার ছোটবেলার কথা এবং বেগম রোকেয়ার প্রসঙ্গ স্থান পেয়েছে। তিনি অনেক ছোটগল্প এবং ক্ষুদ্র উপন্যাসও রচনা করেছেন।

কেয়ার কাঁটা তার একটি উল্লেখযোগ্য গল্পগ্রন্থ। তার আরও কয়েকটি উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ হলো মায়া কাজল, মন ও জীবন, উত্তপ্ত পৃথিবী, অভিযাত্রিক ইত্যাদি। তার কবিতা চীনা, ইংরেজি, জার্মান, ইতালিয়ান, পোলিশ, রুশ, ভিয়েতনামিজ, হিন্দি ও উর্দু ভাষায় অনূদিত হয়েছে।

১৯৮৪ সালে রুশ ভাষায় তার সাঁঝের মায়া গ্রন্থটি সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে প্রকাশিত হয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায়ও তার বেশকিছু কবিতা প্রকাশিত হয়। ২০০১ সালে বাংলা একাডেমি তার কিছু কবিতার ইংরেজি অনুবাদ দিয়ে গড়ঃযবৎ ড়ভ চবধৎং ধহফ ড়ঃযবৎ ঢ়ড়বস এবং ২০০২ সালে সুফিয়া কামালের রচনা সমগ্র প্রকাশ করেছে।

মুসলিম নারীদের সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণকে উৎসাহিত করার জন্য বেগম রোকেয়ার প্রতিষ্ঠিত সংগঠন ‘আঞ্জুমানে খাওয়াতিনে ইসলামে’ রোকেয়ার সঙ্গে সুফিয়া কামালের পরিচয় হয়। বেগম রোকেয়ার চিন্তাধারা ও প্রতিজ্ঞা তার মধ্যেও সঞ্চারিত হয়, যা তার জীবনে সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলে।

নিজের সাহিত্য প্রয়াসের সূচনা প্রসঙ্গে তিনি স্মৃতিচারণ করে লেখেন, ‘এমনি কোনো বর্ষণমুখর দিনে মুসলমান সাহিত্য পত্রিকায় প্রকাশিত কাজী নজরুল ইসলামের লেখা দহেনাদ পড়ছিলাম বানান করে। প্রেম, বিরহ, মিলন এসবের মানে কি তখন বুঝি? তবু যে কী ভালো, কী ব্যথা লেগেছিল তা প্রকাশের ভাষা কি আজ আর আছে? গদ্য লেখার সেই নেশা। এরপর প্রবাসী পত্রিকায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতা পড়তে পড়তে অদ্ভুত এক মোহগ্রস্তভাব এসে মনকে যে কোন অজানা রাজ্যে নিয়ে যেতো।

এরপর দেখতাম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন, বেগম সারা তাইফুর লিখছেন। কবিতা লিখছেন বেগম মোতাহেরা বানু। মনে হলো ওরা লিখছেন আমিও কি লিখতে পারি না? শুরু হলো লেখা লেখা খেলা। কী গোপনে, কত কুণ্ঠায়, ভীষণ লজ্জার সেই হিজিবিজি লেখা ছড়া, গল্প। কিন্তু কোনোটাই কি মনের মতো হয়! কেউ জানবে, কেউ দেখে ফেলবে বলে ভয়ে ভাবনায় সে লেখা কত লুকিয়ে রেখে আবার দেখে দেখে নিজেই শরমে সংকুচিত হয়ে উঠি।’

কাব্যগ্রন্থ
সাঁঝের মায়া (১৯৩৮)
মায়া কাজল (১৯৫১)
মন ও জীবন (১৯৫৭)
প্রশস্তি ও প্রার্থনা (১৯৫৮)
উদাত্ত পৃথিবী (১৯৬৪)
দিওয়ান (১৯৬৬)
অভিযাত্রিক (১৯৬৯)
মৃত্তিকার ঘ্যাণ (১৯৭০)
মোর জাদুদের সমাধি
পরে (১৯৭২)

গল্প
কেয়ার কাঁটা (১৯৩৭)

ভ্রমণ কাহিনী
সোভিয়েতে দিনগুলি (১৯৬৮)

স্মৃতিকথা
একাত্তরের ডায়েরি (১৯৮৯)

আত্মজীবনীমূলক রচনা
একালে আমাদের
কাল (১৯৮৮)

শিশুতোষ
ইতল বিতল (১৯৬৫)
নওল কিশোরের
দরবারে (১৯৮১)

পুরস্কার
পাকিস্তান সরকারের
তমঘা-ই-ইমতিয়াজ (১৯৬১)
(প্রত্যাখান করেন ১৯৬৯)
বাংলা একাডেমি
পুরস্কার (১৯৬২)
সোভিয়েত লেনিন
পদক (১৯৭০)
একুশে পদক (১৯৭৬)
নাসিরউদ্দিন স্বর্ণপদক (১৯৭৭)
সংগ্রামী নারী পুরস্কার,
চেকোশ্লোভাকিয়া (১৯৮১)
মুক্তধারা পুরস্কার (১৯৮২)
বেগম রোকেয়া পদক (১৯৯৬)
জাতীয় কবিতা পরিষদ
পুরস্কার (১৯৯৫)
দেশবন্ধু সি আর দাস
গোল্ড মেডেল (১৯৯৬)
স্বাধীনতা দিবস পদক (১৯৯৭)

শেষ জীবন
বহু ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে তারুণ্য পার করেছেন সুফিয়া কামাল। ১৯৩২ সালে মাত্র ২১ বছর বয়সে স্বামী নেহাল হোসেনের আকস্মিক মৃত্যু তাকে আর্থিক সমস্যায় নিপতিত করে। একই বছর বেগম রোকেয়ার মৃত্যুও তাকে মর্মাহত করে। তবে পারিবারিক অর্থনৈতিক অসহায়ত্ব তাকে দমাতে পারেনি। সব বাধা অতিক্রম করে তিনি জয় করেছেন মানবসত্বা। ১৯৩৯ সালে কামালউদ্দিন খানের সঙ্গে তার বিয়ে হয়। ১৯৪১ সালে মারা যান তার মা। এরপর পুত্র শোয়েবকে হারান ১৯৬৩ সালে। স্বামী কামালউদ্দিন খানকে হারান ১৯৭৭ সালে।

সুফিয়া কামাল ৫০টির বেশি পুরস্কার লাভ করেছেন। ১৯৯৯ সালের ২০ নভেম্বর ঢাকায় সুফিয়া কামাল মৃত্যুবরণ করেন। তাকে পূর্ণ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় সমাহিত করা হয়। বাংলাদেশি নারীদের মধ্যে তিনিই প্রথম এ সম্মান লাভ করেন। প্রতি বছর এ দিনটিতে তাকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্মরণ করা হয়।