বাঙালি নারী জাগরণের অগ্রদূত

ঢাকা, রবিবার, ৬ ডিসেম্বর ২০২০ | ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৭

বাঙালি নারী জাগরণের অগ্রদূত

রোকেয়া ডেস্ক ১:০১ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ১৪, ২০২০

print
বাঙালি নারী জাগরণের অগ্রদূত

রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন সবার কাছে বেগম রোকেয়া নামেই অধিক পরিচিত। বাঙালি নারীদের প্রথম শিক্ষার আলো দেখিয়েছিলেন তিনি। তিনিই প্রথম নারীদের সাংগঠনিকভাবে শক্তিশালী করার কথা ভেবেছিলেন। বঙ্গীয় নারীদের মধ্যে তিনিই কলম ধরেন নারীকে পণ্যকরণের বিরুদ্ধে তীব্র নিন্দা জানাতে। বাঙালি নারী জাগরণের অগ্রদূতও ছিলেন তিনি। মহীয়সী এই নারীকে নিয়ে লিখেছেন সাইফ-উদ-দৌলা রুমী

জন্ম ও শৈশব
বেগম রোকেয়া ১৮৮০ সালে রংপুরের মিঠাপুকুর উপজেলার পায়রাবন্দ গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা জহীরুদ্দিন মোহাম্মদ আবু আলী হায়দার সাবের জমিদার ছিলেন। তার মাতা রাহাতুন্নেসা সাবেরা চৌধূরাণী। রোকেয়ার দুই বোন করিমুননেসা ও হুমায়রা। তিন ভাইদের একজন শৈশবে মারা যায়। বেগম রোকেয়ার পিতা আবু আলী হায়দার সাবের আরবি, উর্দু, ফারসি, বাংলা, হিন্দি এবং ইংরেজি ভাষায় পারদর্শী হলেও মেয়েদের শিক্ষার ব্যাপারে ছিলেন রক্ষণশীল। রোকেয়ার বড় দুই ভাই মোহাম্মদ ইব্রাহীম আবুল আসাদ সাবের ও খলিলুর রহমান আবু যায়গাম সাবের ছিলেন বিদ্যানুরাগী। কলকাতার সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজে অধ্যয়ন করে তারা আধুনিকমনস্ক হয়ে উঠেন। রোকেয়ার বড় বোন করিমুন্নেসাও ছিলেন বিদ্যোৎসাহী ও সাহিত্যানুরাগী। বেগম রোকেয়ার শিক্ষালাভ, সাহিত্যচর্চা এবং সামগ্রিক মূল্যবোধ গঠনে বড় দুই ভাই ও বোন করিমুন্নেসার যথেষ্ট অবদান ছিল।

তৎকালীন সমাজ ব্যবস্থায় মেয়েদের গৃহের অর্গলমুক্ত হয়ে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষালাভের কোনো সুযোগ ছিল না। পাঁচ বছর বয়সে মায়ের সঙ্গে কলকাতায় বসবাস করার সময় একজন মেম শিক্ষয়িত্রীর নিকট তিনি কিছুদিন লেখাপড়ার সুযোগ পেয়েছিলেন। কিন্তু সমাজ ও আত্মীয় স্বজনদের ভ্রুকুটির জন্য তাও বন্ধ করে দিতে হয়। তবু রোকেয়া দমে যাননি। বড় ভাই-বোনদের সমর্থন ও সহায়তায় তিনি বাংলা, ইংরেজি, উর্দু, ফার্সি এবং আরবি আয়ত্ত করেন।

যোগেন্দ্রনাথ গুপ্ত রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন সম্পর্কে বঙ্গের মহিলা কবি গ্রন্থে লিখেছেন, ‘বঙ্গের মহিলা কবিদের মধ্যে মিসেস আরএস, হোসায়েনের নাম স্মরণীয়। বঙ্গদেশের মুসলমান-নারী-প্রগতির ইতিহাস লেখক এ নামটিকে কখনও ভুলিতে পারিবেন না। রোকেয়ার জ্ঞানপিপাসা ছিল অসীম। গভীর রাত্রিতে সকলে ঘুমাইলে চুপি চুপি বিছানা ছাড়িয়া বালিকা মোমবাতির আলোকে জ্যেষ্ঠ ভ্রাতার কাছে ইংরেজি ও বাংলায় পাঠ গ্রহণ করিতেন। পদে পদে গঞ্জনা সহিয়াও এভাবে দিনের পর দিন তাহার শিক্ষার দ্রুত উন্নতি হইতে লাগিল। কতখানি আগ্রহ ও একাগ্রতা থাকিলে মানুষ শিক্ষার জন্য এরূপ কঠোর সাধনা করিতে পারে তাহা ভাবিবার বিষয়।’

বেগম রোকেয়ার চাওয়া ছিল নিজের স্বাধীন সত্ত্বার স্বীকৃতির, তা অত সামান্যতে মিটবে কেমন করে? তা-ও একবার রোকেয়ার আগ্রহে আর ভাইদের উৎসাহে মা কলকাতার এক ইংরেজ মহিলা নিয়োগ করেছিলেন মেয়ের লেখাপড়ার জন্য। কিন্তু প্রতিবেশী ও আত্মীয়দের প্রবল বাধার মুখে সেই আয়োজনও দীর্ঘস্থায়ী হয়নি।

এরপর বোনদের লেখাপড়ায় এগিয়ে আসেন বড় ভাই ইব্রাহিম সাবের নিজেই। দিনের আলোতে মেয়েদের জ্ঞানচর্চা তখন নিষিদ্ধ, তাই তারা বেছে নিলেন রাতের অন্ধকারকে।

সকলে ঘুমিয়ে গেলে রাতে বিছানা ছেড়ে উঠে এসে প্রদীপ ও মোমবাতির আলোয় বসতেন ভাই-বোন। অন্ধকারের গণ্ডি ছেড়ে শুরু হলো আলোর পথে তাদের পথচলা। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের জ্ঞান নিতে নিতে এক সময় হাতে উঠলো হরেক ছবির আর বাইরের পৃথিবীর গল্পভরা ইংরেজি বই। তবে সেই জ্ঞানচর্চার গল্প সহজ ছিল না। ভাইয়েরা পড়তেন কলকাতার সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজে, মাঝে মাঝে যখন ছুটিতে বাড়ি আসতেন তখন চলতো এ লুকিয়ে পড়ালেখা। তবে রোকেয়ার নিজের আগ্রহ আর চেষ্টার কারণেই অতি কম সময় ও সুযোগেও তিনি জ্ঞানের অনেকখানিই নিজের মধ্যে ধারণ করতে পেরেছিলেন।

ইংরেজি ভাষায় জ্ঞানচর্চা যদিও ভাইয়ের কারণে রোকেয়ার কাছে তুলনামূলক সহজ হয়ে উঠেছিল, কিন্তু সহজ ছিল না নিজের মাতৃভাষার চর্চাটাই। সম্ভ্রান্ত মুসলিমদের কাছে তখন যেন বাংলার চর্চাটাই হয়ে উঠছিল নিষিদ্ধ। আর তাতে মেয়েদের শিক্ষাগ্রহণ তো আরও নিন্দার। কিন্তু এক্ষেত্রে রোকেয়া সাহায্য পান বড় বোন করিমুন্নেসার। টাঙ্গাইলের বিখ্যাত গজনভী জমিদার বাড়িতে বিয়ে হলেও মাত্র নয় বছরের মাথায় বিধবা হয়ে চলে আসেন কলকাতায়। দুই ছেলের মধ্যে বড় ছেলেকে বিলেত পাঠালেন লেখাপড়ার জন্য, আর ছোট ছেলের লেখাপড়ার ব্যবস্থা করলেন ঘরেই।

তখন করিমুন্নেসার ছোট ছেলের চেয়ে রোকেয়া মাত্র এক বছরের বড়, তাই বড় বোন সকলের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে নিজের সন্তানের সঙ্গে ছোট বোন রোকেয়ারও লেখাপড়ার ব্যবস্থা করেছিলেন। নিজের জীবনে বড় বোনের এ অবদানের কথা মনে করে তাই রোকেয়া বলেন, ‘আমি শৈশবে তোমারই স্নেহের প্রসাদে বর্ণ পরিচয় পড়িতে শিখি। অপর আত্মীয়গণ আমার উর্দু ও ফারসি পড়ায় ততো আপত্তি না করলেও বাংলা পড়ার ঘোর বিরোধী ছিলেন। একমাত্র তুমিই আমার বাংলা পড়ার অনুকূলে ছিলে। আমার বিবাহের পর, তুমিই আশঙ্কা করেছিলে যে, আমি বাংলা ভাষা একেবারে ভুলিয়া যাইব। চৌদ্দ বৎসর ভাগলপুরে থাকিয়া বঙ্গভাষায় কথাবার্তা কহিবার একটি লোক না পাইয়াও যে বঙ্গভাষা ভুলি নাই, তাহা কেবল তোমারই আশীর্বাদে।’

বাংলা ভাষার প্রতি রোকেয়ার সহজাত গভীর মমতার প্রমাণও পাওয়া যায় তার নিজের কথায়। প্রকৃতপক্ষে পরবর্তীতে আমরা যে সাহসী, সংগ্রামী রোকেয়াকে দেখেছি তার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন হয়েছিল তার শৈশবেই। শৈশবেই রচিত হয়েছিল তার জ্ঞানচর্চার মহাগল্পের সূচনা। শৈশবেই তিনি বুঝেছিলেন, অবরোধবাসিনী হয়ে বেঁচে থাকার যন্ত্রণা।

ব্যক্তিগত জীবন
বেগম রোকেয়ার পরিবার ছিল তখনকার দিনের আর দশটি পরিবারের মতো রক্ষণশীল ও ধর্মভীরু। যদিও তার বাবা ছিলেন সমাজসেবক, ন্যায়পরায়ণ ও উচ্চ শিক্ষিত। কিন্তু বাড়ির মেয়েদের পর্দাপ্রথার ব্যাপারে ছিলেন খুবই কঠোর। সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারের রীতি অনুযায়ী বেশ ছোট বয়সেই বিয়ে হয় রোকেয়ার। শৈশব কাটিয়ে তখন রোকেয়া বড় হয়ে উঠছেন। পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ তাকে বড় ভাইয়ের সাহায্যে বইখাতার রঙিন দুনিয়ার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়।

এদিকে রোকেয়ার মা মেয়ের বিয়ের জন্য তৎপর হয়ে ওঠেন। জমিদার বাড়ির মেয়ের বিয়ের জন্য চারিদিক থেকে সম্ভ্রান্ত ছেলের প্রস্তাব আসতে থাকে। তাছাড়া রোকেয়া ছিলেন দেখতেও বেশ সুন্দরী। কিন্তু সুপাত্রের প্রস্তাব আসলে কি হবে, রোকেয়ার বড় ভাই ইব্রাহিম সাবের ও তার বড় বোন করিমুন্নেসা উভয়ই রোকেয়ার লেখাপড়ার মতো বিয়ের ব্যাপারেও ছিলেন সচেতন ও খুঁতখুঁতে। কবে ভাই ইব্রাহিম সাবের চেয়েছিলেন কোনোভাবেই যেন রোকেয়ায় লেখাপড়া বন্ধ না হয়।

বড় ভাই সাবেরই জ্বেলেছিলেন রোকেয়ার জীবনে শিক্ষার আলো; অনেক খুঁজে শেষ পর্যন্ত পাত্র হিসেবে নির্বাচিত হলেন সৈয়দ সাখাওয়াত হোসেন। তার বাড়ি ছিল বিহারের ভাগলপুর। তিনি লেখাপড়া করেছেন হুগলি কলেজে। বি.এ পাশ করা ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট ছিলেন সাখাওয়াত হোসেন। তবুও কিছু সমস্যা যেন থেকেই গেল। দীর্ঘদেহী সাখাওয়াত হোসেন দেখতে তেমন সুন্দর ছিলেন না, তার ওপর তার বয়সও ছিল বেশি। এসব ছাড়াও সাখাওয়াত ছিলেন বিপতœীক। প্রথম স্ত্রীর গর্ভে এক কন্যা সন্তানের জন্ম হয়। কিন্তু এত কিছুর পরও পাত্রের অমায়িক ব্যবহার, মাতৃভক্তি আর জ্ঞানচর্চার জন্য অপ্রতুল শ্রদ্ধাবোধের কারণে ভাই ইব্রাহিম সাবের সাখাওয়াতকেই নির্ধারণ করেছিলেন প্রিয় বোনটির জীবনসঙ্গী হিসেবে।

তবে ইব্রাহিম চেয়েছিলেন বিয়ে হওয়ার পর রোকেয়ার লেখাপড়া যেন থেমে না যায়। এ লক্ষ্যে পাত্র নির্বাচনে তিনি ভুল করেননি। সাখাওয়াত হোসেন রোকেয়ার লেখাপড়ার প্রতি বেশ যতœশীল ছিলেন। এমনকি তিনি রোকেয়ার স্বাধীন সাহিত্যচর্চার দিকেও মনোযোগ দিতেন। তিনি চেয়েছিলেন সংসারের চাপে যেন রোকেয়ার প্রতিভা বা আগ্রহ কোনোটাই মুখ থুবড়ে না পড়ে। নিরিবিলিতে বসে সাহিত্য সাধনা চালিয়ে যাওয়ার জন্য সাখাওয়াত হোসেন রোকেয়াকে একটি অষ্টভূজাকৃতির ঘর তৈরি করে দেন। স্বামীর অনুপ্রেরণা আর সাহায্যই জীবনের এ অধ্যায়ে রোকেয়াকে নিজের পথে অটল থাকতে সাহায্য করে।

রোকেয়ার স্বামী ছাত্র জীবনে ঊনিশ শতকের নবজাগরণের অন্যতম প্রতিভূ ভূদেব মুখোপাধ্যায়ের পরিবারের যথেষ্ট সাহচার্য পেয়েছিলেন। ভূদেবের পুত্র মুকুন্দরাম ছিলেন সৈয়দ সাখাওয়াত হোসেনের সহপাঠী। সাখাওয়াত হোসেনের জীবনবাবসানের পর রোকেয়ার শিক্ষাব্রতে মুকুন্দরাম নানা রকম সহযোগিতা করেছিলেন। সাখাওয়াত হোসেন বিয়ের কিছুটা পর থেকেই বেশ অসুস্থ ছিলেন।

বহুমূত্র রোগে ভুগছিলেন তিনি। বিদূষী রোকেয়া অসুস্থ স্বামীর যাবতীয় সেবাই কেবল নয়, তার মলমূত্র পর্যন্ত পরিষ্কার করতেন। নারীর স্বাধিকার যে নারী-পুরুষের ভিতর পারস্পরিক সংঘাতের পরিবেশে আসবে না- রোকেয়া তার চিরন্তন ভারতীয় নারীর ভূমিকা পালনের ভিতর দিয়ে তা দেখিয়ে গিয়েছেন।

স্বামীর জীবদ্দশাতে রোকেয়ার লেখা মতিচূরের একটি খণ্ড প্রকাশিত হয়েছিল। স্বামীর উদ্যোগেই তিনি শিখেছিলেন ইংরেজি ভাষা। সেই বিদেশি ভাষা আত্মস্থ করেই তিনি লেখেন সুলতানাজ ড্রিম। এ বইটিকে বাংলায় এবং বাঙালির লেখা প্রথম কল্প বিজ্ঞানের বই বলা যেতে পারে।

তবে তবে রোকেয়ার বিবাহিত জীবন বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। ১৯০৯ সালের ৩ মে সাখাওয়াশ হোসেন মারা যান। সাখাওয়াত হোসেনের মৃত্যুর পর প্রথম স্ত্রীর ছেলে-মেয়ে রোকেয়ার সঙ্গে বেশ খারাপ ব্যবহার করেছিলেন। যার জন্যে রোকেয়া বাধ্য হয়েছিলেন স্বামীর গৃহ ভাগলপুর ছাড়তে। জন্মস্থান পায়রাবন্দের পারিবারিক পরিম-লে কঠোর লড়াই করে বিদ্যাচর্চা করতে হলেও বিয়ের পর স্বামীর কাছ থেকে বিদ্যাচর্চার জন্যে যথেষ্ট উৎসাহ প্রথম থেকেই রোকেয়া পেয়েছিলেন।

নারী শিক্ষায় অবদান
চৌদ্দ বছরের বিবাহিত জীবনের ইতি ঘটার সঙ্গে সঙ্গে রোকেয়া যেন পরোক্ষভাবে মুক্তি পেয়ে যান সাংসারিক সকল বন্ধন থেকে। স্বামীর মৃত্যুর পর সেখানকার আত্মীয় বা স্বামীর প্রথমা স্ত্রীর কন্যা কেউই রোকেয়ার সঙ্গে শোভন আচরণ করেননি। আত্মীয় স্বজনদের দুর্ব্যবহার ও বৈষয়িক জটিলতার শিকার হয়ে রোকেয়া এক সময় ভাগলপুর ছেড়ে কলকাতায় এসে বাস করা শুরু করেন। রোকেয়ার স্থানান্তরের সঙ্গে সঙ্গে বন্ধ হয়ে যায় ভাগলপুরে বহু কষ্টে তার স্থাপন করা বালিকা বিদ্যালয়টি। কিন্তু তাই বলে মনোবল হারাননি রোকেয়া। কলকাতায় এসে নতুন করে শুরু করেন সাখাওয়াত মেমোরিয়াল গার্লস স্কুলের পথচলা।

অনেক দুঃখের বোঝা মাথায় নিয়েও নিজেকে অসহায় বিধবা ভাবেননি রোকেয়া। ১৯১০ সালের ৩ ডিসেম্বর যখন রোকেয়া ভাগলপুর থেকে কলকাতায় আসেন তখন নির্ভরযোগ্য আপনজন বলতে কেউ ছিল না তার। কিন্তু মনে ছিল বিশ্বাস। ৩০ বছর বয়সী রোকেয়া কলকাতায় এসেই হাত দেন নিজের অসম্পূর্ণ কাজে। ১৩ ওয়ালিউল্লাহ রোডে বাড়ি ভাড়া করে প্রতিষ্ঠা করলেন মেয়েদের স্কুল সাখাওয়াত মেমোরিয়াল বালিকা বিদ্যালয়।

দুটো বেঞ্চ আর আটজন মাত্র ছাত্রীকে নিয়ে রোকেয়া স্কুলের প্রথম ক্লাস করলেন। স্কুলের শিক্ষিকা রোকেয়া নিজেই। তার না ছিল কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রি, না ছিল বাড়ির বাইরে কাজ করার কোনো অভিজ্ঞতা। কেবল মনোবল আর ইচ্ছা শক্তিকে পুঁজি করে তিনি দাঁড় করিয়ে ফেলেন সমাজের অন্ধকার সময়ে এরকম এক আলোর প্রতিষ্ঠান। মানুষের বাড়ি বাড়ি ঘুরে, অভিভাবকদের বুঝিয়ে, নিজের আস্তরিক প্রচেষ্টার পরও বাঙালিদের মধ্যে প্রথম দিকে নারী শিক্ষার জন্য তেমন সাড়া ফেলতে পারলেন না রোকেয়া। তাই স্কুলের শিক্ষার মাধ্যম উর্দুই রাখতে হলো। সাখাওয়াত মেমোরিয়াল স্কুলের সকল ছাত্রীই লেখাপড়া করতেন বিনা বেতনে। স্কুল চালু হওয়ার শুরুর দিকেই নেমে এলো বিপর্যয়। কলকাতার বার্মা ব্যাংক দেউলিয়া হয়ে গিয়ে সাখাওয়াতের রেখে যাওয়া স্কুলের জন্য অনুদানের টাকাসহ রোকেয়াকে ৩০ হাজার টাকা হারাতে হয়। ফরিদপুরের কেন্দ্রীয় সমবায় ব্যাংকের কাছে রক্ষিত টাকাও রোকেয়া কোনো দিন ফেরত পাননি।

চলার পথে এতো বাধার পরও রোকেয়া দমে যাননি। বরং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ছোট্ট স্কুলকে পরিপূর্ণ শিক্ষা নিকেতনে পরিণত করেন। একদিকে যেমন ছাত্রী সংখ্যা বাড়তে থাকে, অন্যদিকে বিভিন্ন দিক থেকে আসতে থাকে সাহায্য আর অনুদান। স্কুল প্রতিষ্ঠার এক বছর পর, ১৯১২ সাল থেকে অনেক চেষ্টার করে ৭১ টাকার সরকারি অনুদান পায় স্কুল। রেঙ্গুন থেকে এক ব্যক্তির পাঠানো ২৭ টাকার অনুদান পেয়ে উচ্ছ্বসিত হয়ে পড়েন বেগম রোকেয়া। ১৯১৫ সালে মাত্র পাঁচটি ক্লাস নিয়ে স্কুলটি প্রাথমিক পর্যায়ে উন্নীত হলো। রোকেয়ার অনেক চেষ্টায় শিক্ষার মাধ্যম উর্দু থেকে ইংরেজি করা হলো। এক সময় স্কুলটি মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষণোপোযোগী হয়।

১৯৩১ সালে রোকেয়ার প্রতিষ্ঠিত সাখাওয়াত মেমোরিয়াল বালিকা বিদ্যালয়ের ছাত্রীরা প্রথমবারের মতো কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রবেশিকা পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে এবং স্কুলের প্রায় ৬০০ ছাত্রী বঙ্গীয় শিক্ষা পরিষদের পরীক্ষায়ও কৃতিত্বের সঙ্গে পাস করে। সেই থেকে এখনও এই স্কুল সফলভাবে নারী শিক্ষায় নিজের উজ্জ্বল স্বাক্ষর রেখে চলেছে। বর্তমানে এটি পশ্চিমবঙ্গের একটি নামকরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। কঠোর সাধনা আর অধ্যবস্যায়ের মধ্য দিয়ে এই স্কুলের ভিত রচনা করেছিলেন রোকেয়া নিজে।

সাহিত্যচর্চার সূচনা
সাহিত্যিক হিসেবে বেগম রোকেয়ার আত্মপ্রকাশ ঘটে ১৯০২ সালে। কলকাতা থেকে প্রকাশিত নভপ্রভা পত্রিকায় ছাপা হয় পিপাসা। এটি ছাড়াও বিভিন্ন সময়ে তার রচনা নানা পত্রিকায় ছাপা হতে থাকে। ১৯৫০ সালে প্রথম ইংরেজি রচনা সুলতানাজ ড্রিম মাদ্রাজ থেকে প্রকাশিত একটি পত্রিকায় ছাপা হয়। সবাই তার রচনা পছন্দ করে। এরপর থেকে তিনি সাহিত্যিক হিসেবে পরিচিত হয়ে ওঠেন।

১৯০২ সালে পিপাসা নামে একটি বাংলা গল্প লিখে সাহিত্য জগতে তার অবদান রাখা শুরু হয়। এরপর একে একে লিখে ফেলেন মতিচূরে-এর প্রবন্ধগুলো এবং সুলতানার স্বপ্ন-এর মতো নারীবাদী বিজ্ঞান কল্পকাহিনী।

বেগম রোকেয়া মিসেস আর. এস. হোসেন নামে লেখালেখি করতেন। এই নামে তার বইগুলিও বেরিয়েছিল। তার গ্রন্থের সংখ্যা ছিল মাত্র পাঁচটি : মতিচূর; যার প্রথম খ- প্রকাশিত হয় ১৯০৪ সালে। সুলতানাজ ড্রিম প্রকাশিত হয় ১৯০৮ সালে। মতিচূর দ্বিতীয় খ- প্রকাশিত হয় ১৯২২ সালে। পদ্মরাগ প্রকাশিত হয় ১৯২৪ সালে এবং অবরোধবাসিনী প্রকাশিত হয় ১৯৩১ সালে। এ গ্রন্থে ৪৭টি ছোট বড় রচনা রয়েছে। প্রত্যেকটিতে আছে নারীর অবরোধ জীবনের সত্য কাহিনী। বড় মর্মান্তিক সেসব কাহিনী। লেখিকার দাবি, এর একটিও কাল্পনিক বা বানানো কাহিনী নয়। এছাড়াও তিনি ছয়টি ছোটগল্প ও রস রচনা এবং সাতটি কবিতা লিখেছেন।

গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হওয়ার আগে তার লেখাগুলো নবনূর, সওগাত, মোহাম্মদী ইত্যাদি পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল। তার প্রবন্ধ, গল্প, উপন্যাসের মধ্য দিয়ে তিনি নারী শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা আর লিঙ্গসমতার পক্ষে যুক্তি তুলে ধরেছেন। হাস্যরস আর ব্যঙ্গ-বিদ্রুপের সাহায্যে পিতৃতান্ত্রিক সমাজে নারীর অসম অবস্থান ফুটিয়ে তুলেছেন। তার রচনা দিয়ে তিনি সামাজিক সচেতনতা সৃষ্টির চেষ্টা করেছেন, ধর্মের নামে নারীর প্রতি অবিচার রোধ করতে চেয়েছেন। শিক্ষা আর পছন্দ অনুযায়ী পেশা নির্বাচনের সুযোগ ছাড়া যে নারী মুক্তি আসবে না সেটাও তিনি বলেছেন।

রোকেয়া অলঙ্কারকে দাসত্বের প্রতীক বিবেচনা করেছেন এবং নারীদের অলঙ্কার ত্যাগ করে আত্মসম্মানবোধে উজ্জীবিত হয়ে আর্থরাজনৈতিক স্বাধীনতা অর্জনে সচেষ্ট হতে আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি লিখেছেন- ‘আমরা বহুকাল হইতে দাসীপনা করিতে করিতে দাসীত্বে অভ্যস্ত হইয়া পড়িয়াছি। ক্রমে পুরুষরা আমাদের মনকে পর্যন্ত দাস করিয়া ফেলিয়াছে।... তাহারা ভূস্বামী গৃহস্বামী প্রভৃতি হইতে হইতে আমাদের স্বামী হইয়া উঠিয়াছেন। ...আর এই যে আমাদের অলঙ্কারগুলি দাসত্বের নিদর্শন। ...কারাগারে বন্দিগণ লৌহনির্মিত বেড়ী পরে, আমরা স্বর্ণ রৌপ্যের বেড়ী পরিয়া বলি মল পরিয়াছি।

উহাদের হাতকড়ী লৌহনির্র্মিত, আমাদের হাতকড়ী স্বর্ণ বা রৌপ্যনির্র্মিত চুড়ি। ..অশ্ব হস্তী প্রভৃতি পশু লৌহশৃঙ্খলে আবদ্ধ থাকে, সেইরূপ আমরা স্বর্ণশৃঙ্খলে কণ্ঠ শোভিত করিয়া বলি হার পরিয়াছি। গো-স্বামী বলদের নাসিকা বিদ্ধ করিয়া নাকা দড়ী পরায়, আমাদের স্বামী আমাদের নাকে নোলক পরাইয়াছেন। অতএব দেখিলে ভগিনি, আমাদের ঐ বহুমূল্য অলঙ্কারগুলি দাসত্বের নিদর্শন ব্যতীত আর কিছুই নহে! ...অভ্যাসের কি অপার মহিমা! দাসত্বে অভ্যাস হইয়াছে বলিয়া দাসত্বসূচক গহনাও ভালো লাগে। মাদকদ্রব্যে যতই সর্বনাশ হউক না কেন, মাতাল তাহা ছাড়িতে চাহে না। সেইরূপ আমরা অঙ্গে দাসত্বের নিদর্শন ধারণ করিয়াও আপনাকে গৌরবান্বিতা মনে করি। ...হিন্দুমতে সধবা স্ত্রীলোকের কেশকর্তন নিষিদ্ধ কেন? সধবা নারীর স্বামী ক্রদ্ধ হইলে স্ত্রীর সুদীর্ঘ কুম্ভলদাম হস্তে জড়াইয়া ধরিয়া উত্তম মধ্যম দিতে পারিবে। ...ধিক আমাদিগকে!
আমরা আশৈশব এ চুলের কত যতœ করি! কি চমৎকার সৌন্দর্য্যজ্ঞান!’

এভাবেই বিংশ শতাব্দির প্রথমে তিনি তার সাহিত্যের মাধ্যমে যে আলোড়ন তুলেছিলেন শতাব্দি শেষেও আমরা তার আলোড়ন এবং তরঙ্গের ওঠানামা দেখছি বিস্ময়তায়। বাংলা সাহিত্যে তার নিজস্ব লেখনীর চেয়ে তাকে নিয়ে ঢের বেশি লেখা হয়েছে এবং হচ্ছে।

মৃত্যু ও স্বীকৃতি
১৯৩২ সালের ৯ ডিসেম্বর বেগম রোকেয়া কলকাতায় মৃত্যুবরণ করেন। সে সময় তিনি নারীর অধিকার নামে একটি প্রবন্ধ লিখছিলেন। তার কবর উত্তর কলকাতার সোদপুরে অবস্থিত। যা পরবর্তীকালে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক অমলেন্দু দে আবিষ্কার করেন।

বেগম রোকেয়ার নামে সর্বপ্রথম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৯৬০ এর দশকে ছাত্রীনিবাস রোকেয়া হল খোলা হয়। যার নাম আগে ছিল উইমেন্স হল। তবে ব্রিটিশ আমলে ১৯৩৮ সালে চামেলি হাউজ নামে প্রথমে হলটি চালু হয়েছিল। রংপুর বিভাগের একমাত্র পূর্ণাঙ্গ সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে রংপুর বিশ্ববিদ্যালয় ৮ অক্টোবর ২০০৮ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। ২০০৯ সালে নারী জাগরণের অগ্রদূত হিসেবে তার নামকে স্মরণীয় করে রাখতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিশ্ববিদ্যালয়টি বেগম রোকেয়ার নামে নামকরণ করেন। কোনো নারীর নামে বাংলাদেশে প্রথম পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় এটি।

মহীয়সী বাঙালি নারী হিসেবে বেগম রোকেয়ার অবদানকে চিরস্মরণীয় করে রাখতে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় এবং বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রীদের আবাসনের জন্য আবাসিক হল রোকেয়া হল নামকরণ করা হয়। প্রতি বছর ৯ ডিসেম্বর তার জন্মদিনে বেগম রোকেয়া দিবস পালন করা হয়। নারী উন্নয়নে অবদান রাখার জন্য বিশিষ্ট নারীদের বেগম রোকেয়া পদক প্রদান করা হয়। ১৯৮০ সালে বেগম রোকেয়ার জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে শ্রদ্ধাঞ্জলি জানাতে বাংলাদেশ ডাক বিভাগ দুটি স্মারক ডাকটিকিট প্রকাশ করে।