মহীয়সী নওয়াব ফয়জুন্নেসা

ঢাকা, শনিবার, ৫ ডিসেম্বর ২০২০ | ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৭

মহীয়সী নওয়াব ফয়জুন্নেসা

রোকেয়া ডেস্ক ১২:৩৪ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ০৭, ২০২০

print
মহীয়সী নওয়াব ফয়জুন্নেসা

নওয়াব ফয়জুন্নেসা চৌধূরাণী ছিলেন দক্ষিণ এশিয়ার প্রথম মহিলা নওয়াব। ঊনবিংশ শতাব্দীর মানুষকে আলোকিত করার জন্য শিক্ষা, সাহিত্য-সংস্কৃতি ও জনহিতকর কর্মযজ্ঞ আমৃত্যু অব্যাহত রেখেছিলেন তিনি। পূর্ব বাংলার এক নিভৃত পল্লীতে জন্ম নিয়ে নারী শিক্ষা বিস্তার ও সমাজকল্যাণে মনোনিবেশ করেছিলেন তিনি। বাংলা, আরবি, ফারসি ও সংস্কৃত ভাষায় বিশেষ দক্ষতা অর্জন করেছিলেন তিনি। শিক্ষা, সাহিত্য-সংস্কৃতি ও সমাজকল্যাণে নওয়াব ফয়জুন্নেসার অবদান তুলে ধরেছেন সাইফ-উদ-দৌলা রুমী

জন্ম ও ব্যক্তিগত জীবন
নওয়াব ফয়জুন্নেসা চৌধূরাণী অন্ধকার যুগের এক অন্তঃপুরবাসিনী নারী। তিনি নিজের চেষ্টায় শিক্ষিত হন। নওয়াব ফয়জুন্নেসা চৌধূরাণী প্রথম মুসলিম মহিলা, যিনি শিক্ষা, সাহিত্য-সংস্কৃতি ও জনহিতকর কর্মকা-ের স্বীকৃতি হিসেবে নওয়াব উপাধি পান। ১৮৩৪ সালে কুমিল্লা জেলার হোমনাবাদ পরগনার (বর্তমানে লাকসাম) অন্তর্গত পশ্চিমগাঁয়ে জন্মগ্রহণ করেন তিনি।

তার বাবা জমিদার আহমেদ আলী চৌধুরী আর মা আরফুনেনসা চৌধূরাণী। নওয়াব ফয়জুন্নেসা চৌধূরাণী ছিলেন তার বাবার প্রথম কন্যা সন্তান। মোগল রাজত্বের উত্তরসূরী এ মহীয়সী নারীর দুই ভাই এয়াকুব আলী চৌধুরী এবং ইউসুফ আলী চৌধুরী এবং দুই বোন লতিফুন্নেসা চৌধূরাণী ও আমিরুন্নেসা চৌধূরাণী। ছোটবেলা থেকে লেখাপড়ায় তার প্রচুর আগ্রহ দেখে পিতা তার জন্য তাজউদ্দিন নামে একজন গৃহশিক্ষক নিযুক্ত করেন। কঠোর নিয়মানুবর্তিতা পালন করে তার জ্ঞানস্পৃহাকে আরও উজ্জ্বল করে তোলেন। গৃহশিক্ষকের সাহায্যে ফয়জুন্নেসা দ্রুত কয়েকটি ভাষার ওপর গভীর জ্ঞান অর্জন করেন। বাংলা, আরবি, ফারসি ও সংস্কৃত এ চারটি ভাষায় জ্ঞান লাভ করেন। ফয়জুন্নেসার এ প্রতিভা স্ফুরণে তার শিক্ষক তাজউদ্দিনের অবদান অতুলনীয়।

ফয়জুন্নেসা শৈশবে পিতৃহারা হন। পিতার অকাল মৃত্যুতে সংসারের হাল ধরেন তার মা আরফুনেনসা চৌধূরাণী। সে যুগে সুন্দরী জমিদার কন্যার পাণি প্রর্থীর অভাব ছিল না। বিভিন্নভাবে ফয়জুন্নেসার বিয়ের প্রস্তাবও আসতে থাকে। তবে পিতার মৃত্যুতে তার বিয়ে পিছিয়ে যায়।

ফয়জুন্নোসাকে বিয়ে করার জন্য তারা পিতার দূর সম্পর্কের ভাগ্নে জমিদার গাজী চৌধুরী প্রথম থেকে চেষ্টা চালান। তিনি ফয়জুন্নেসার গুণে মুগ্ধ ছিলেন। পিতা জীবিত থাকা অবস্থায়ও ফয়জুন্নেসাকে বিয়ের প্রস্তাব গাজী চৌধুরীর তরফ থেকে উত্থাপিত হয়েছিল। কিন্তু ফয়জুন্নেসার বয়স কম থাকায় বিয়েতে মত দেননি পিতা আহমেদ আলী চৌধুরী। দীর্ঘদিনের প্রচেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার পর গাজী চৌধুরী ত্রিপুরার প্রধান বিচারালয়ের উকিল সাহেবের মেয়েকে বিয়ে করেন। কিন্তু ফয়জুন্নেসাকে তিনি ভুলতে পারেননি। বিবাহিত হলেও তিনি ফয়জুন্নেসাকে বিয়ের প্রচেষ্টা চালান।

ফয়জুন্নেসার বাড়ির কাছে ছিল গাজী চৌধুরীর প্রধান কাচারি। তার জমিদারি বিস্তৃতিও ঘটতে থাকে। ফয়জুন্নেসার পরিবারের ওপর চাপ সৃষ্টির সুযোগ আসে তার বড় ভাইয়ের উচ্ছৃঙ্খলতার কারণে। উপায় না পেয়ে গাজী চৌধুরীর হাতে মেয়েকে সঁপে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন তার মা। তবে বিয়েতে তার ভাইদের আপত্তি ছিল।

বিয়েতে গণ্ডগোলও হয়েছিল। তবে নির্ধারিত দিনের এক সপ্তাহ পরে তার বিয়ে হয়। কিন্তু বিয়েতে শর্ত ছিল দেনমোহর হবে এক লাখ টাকা এবং সতীনের সংসারে না উঠিয়ে তার জন্য পৃথক ভবন নির্মাণ ও তাকে সম্মান প্রদর্শন করা। দুটি শর্তই মেনে নেন গাজী চৌধুরী। ফয়জুন্নেসার বিয়ের পর কয়েক বছর বেশ সুখেই কেটেছিল।
দুটি কন্যা সন্তান জন্ম দেন তিনি। দ্বিতীয় মেয়ে জন্মের পরই তার সংসারে অশান্তি দেখা দেয়। গাজী চৌধুরী তাকে অবহেলা করতে শুরু করেন। এক সময় বাধ্য হয়ে তিনি স্বামীর সংসার ত্যাগ করে পিতার বাড়িতে চলে আসেন। সেখানেই তার জীবনের শেষ ৩০ বছর কেটেছে।

দ্বিতীয় কন্যা বদরুন্নেসা তার সঙ্গেই ছিল। তার অপর মেয়ের নাম আরশাদুন্নেসা। ১৮৬৭ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৮৮৯ খ্রিষ্টাব্দ স্বামীর মৃত্যু পর্যন্ত তার সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়নি।

জমিদারি লাভ ও পরিচালনা
১৮৪৪ খ্রিস্টাব্দে ফয়জুন্নেসার পিতা আহমেদ আলী চৌধুরীর প্রয়াণের পর মা আরফুনেনসা চৌধূরাণী বেশিদিন জমিদারি চালাতে পারেননি। কিছুকাল পরই ফয়জুন্নেসার উচ্ছৃঙ্খল বড়ভাই নিজ হস্তে জমিদারি গ্রহণ করেন। সংসার ত্যাগ করে পিতার বাড়িতে ফিরে আসার পর ফয়জুন্নেসা নিজেই জমিদারির হাল ধরেন। কিছুদিনের মধ্যে তিনি প্রজাদের কাছে জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন।

কুমিল্লার তদানীন্তন জেলা প্রশাসক মি. ডগলাস জেলার জন্য জনহিতকর সংস্কারমূলক একটা পরিকল্পনা হাতে নিয়ে অর্থাভাবে পড়েন। তৎকালীন অর্থশালী বিত্তবান হিন্দু জমিদারদের কাছে তিনি প্রয়োজনীয় অর্থ ঋণ হিসেবে চেয়েছিলেন। কিন্তু অর্থের পরিমাণ শুনে সবাই অপারগতা জানান। মি. ডগলাস কোনো মুসলমান জমিদারের কাছে এ আবদার জানাননি। তার বদ্ধমূল ধারণা ছিল যে মুসলমানদের কাছ থেকে তিনি কোনো সাহায্যই পাবেন না।

কারণ ইংরেজদের প্রতি তারা ছিলেন বিরূপ মনভাবাপন্ন। তাছাড়া পশ্চিমগাঁয়ের জমিদার ছিলেন একজন নারী। এলাকার সংস্কার প্রকল্পে যখন কোনো হিন্দু পুরুষ জমিদার সাহায্যের হাত বাড়ালেন না, তখন একান্ত নিরুপায় হয়ে মি. ডগলাস জমিদার ফয়জুন্নেসার সাহায্য কামনা করেন। দূরদর্শী জমিদার ফয়জুন্নেসা মি. ডগলাসের সংস্কারমূলক পরিকল্পনার খুঁটিনাটি সবিশেষে মনোযোগ সহকারে পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং জনকল্যাণ কতটুকু হবে তা ভেবে দেখার জন্য সময় নেন। এরপর তিনি প্রকল্পটি ভালোভাবে পরীক্ষা করে দেখেন। একপর্যায়ে জনকল্যাণের কথা ভেবে প্রয়োজনীয় অর্থের সম্পূর্ণটাই একটা তোড়ায় বেঁধে একখানি চিঠিসহ মি. ডগলাসের কাছে পাঠিয়েছিলেন।

তিনি চিঠিতে মি. ডগলাসকে লিখেছিলেন, ‘আমি জনকল্যাণমূলক যেসব কাজ করতে চেয়েছিলাম তা আপনার হাত দিয়েই হোক, এই আশা করি। ... ফয়জুন্নেসা যে টাকা দেয় তা দান হিসেবেই দেয় কর্জ হিসেবে নয়।’ নওয়াব ফয়জুন্নেসা চৌধূরাণী মি. ডগলাসকে কত টাকা পাঠিয়েছিলেন তা বর্তমানে সঠিকভাবে নিরুপণ করা সম্ভব নয়। কারণ দানের পরিমাণের বিষয়টা ছিল গোপনীয়।

সুদূর বাংলাদেশের নিভৃত পল্লীর একজন নারী জমিদারের সমাজসেবা ও উদার হৃদয়ের পরিচয় পেয়ে ব্রিটিশ সম্রাজ্ঞীও অভিভূত হয়েছিলেন। মহারানী ভিক্টোরিয়া তার সভাসদের পরামর্শক্রমে মি. ডগলাসকে নির্দেশ দেন জমিদার ফয়জুন্নেসাকে মহারানির আন্তরিক শ্রদ্ধা জানিয়ে সরকারিভাবে বেগম উপাধি দিয়ে সম্মানিত করা হোক। ডগলাস সাহেব ফয়জুন্নেসাকে এ ঘটনা জানালে তিনি সরাসরি মহারানির প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি জানান জমিদার হিসেবে নিজের জমিদারিতে এমনিতেই সবার কাছে পরিচিত। সুতরাং নতুন করে বেগম খেতাবের কোনো প্রয়োজন নেই।

তেজস্বী এই মহীয়সী জমিদারের কাছে ব্রিটিশ সম্রাজ্ঞীর প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান হলে মি. ডগলাস বড়ই বিপাকে পড়েন। ডগলাস নিরুপায় হয়ে তিনি সম্পূর্ণ ঘটনাটি পুনরায় মহারানিকে জানান। মহারানির প্রস্তাব প্রত্যাখানের কথা শুনে রানি ফয়জুন্নেসার তেজস্বীতায় একাধারে অভিভূত এবং অন্যধারে গভীর সমস্যায় পড়েন। তারপর তাকে ১৮৮৯ খ্রিস্টাব্দে নওয়াব খেতাব দেওয়া হয়।

নওয়াব ফয়জুন্নেসা ছিলেন প্রজারঞ্জক ও জনকল্যাণকামী জমিদার। স্টেটের দেওয়ান লকিয়ত উল্লাহ ছিলেন তার দক্ষিণ হস্ত। প্রবীণ সুদক্ষ নায়েব ফয়জুন্নেসার অত্যন্ত বিশ্বস্ত ছিলেন। ফয়জুন্নেসা সর্বদা আড়ালে থেকেই সব কাজকর্ম চালিয়ে যেতেন। প্রজাদের অবস্থা স্বচক্ষে দেখার জন্য মাঝে মাঝে পালকি চেপে তিনি জমিদারি তদারকিতে বের হতেন। বিভিন্ন মৌজায় গিয়ে প্রজাদের সুবিধা-অসুবিধা বুঝে ব্যবস্থা নিতেন।

প্রসাদে সাহিত্য চর্চা
রবীন্দ্রযুগে যে কয়জন বাংলা সাহিত্য সাধনা করে যশ ও খ্যাতি অর্জন করেন, নবাব ফয়জুন্নেসা তাদের মধ্যে অন্যতম। আধুনিক বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে প্রথম মুসলিম সাহিত্যিক হিসেবে নবাব ফয়জুন্নেসার নাম চিরস্মরণীয়।

তার সাহিত্য সাধনার খুব অল্প সময়ে তিনি বঙ্কিমচন্দ্রের সমসাময়িক লেখক। শুধু তাই নয় প্রথম মুসলিম গদ্য-পদ্যে লেখিকা ছিলেন তিনি। ১৮৭৬ খ্রিস্টাব্দের ১০ ফেব্রুয়ারি ঢাকা গিরিশচন্দ্র মুদ্রণ যন্ত্র থেকে শ্রীমতি নবাব ফয়জুন্নেসা চৌধূরাণী রচিত সাহিত্য গ্রন্থ রূপজালাল প্রকাশিত হয়।

ব্রিটিশ অপশাসনের ফলে মুসলিম সমাজে কুসংস্কারের বেড়াজালে অবরোধবাসিনী হয়েও ফয়জুন্নেসা সাহিত্য সাধনার মাধ্যমে একটি গৌরবময় স্থান অধিকার করে আছেন। নওয়াব ফয়জুন্নেসা চৌধূরানীর সঙ্গে সংস্কৃত সাহিত্যের গভীর সম্পর্ক ছিল। ওই সময় তার রূপজালাল গ্রন্থটি মধ্যযুগের কবি আলাওলের রচনার সঙ্গে তুলনা করা হয়েছিল। সংস্কৃত গদ্য-পদ্য মিশ্রিত চম্পু কাব্যের নিদর্শন থাকলেও বাংলাতে তা ছিল বিরল। মধ্যযুগে বৈষ্ণব ভাবধারায় দুই একখানি চম্পু কাব্য রচিত হলেও ঊনিশ শতকে এ ধরনের দ্বিতীয় গ্রন্থ রচিত হয়নি।

দ্বিতীয়ত ফয়জুন্নেসার গদ্য-পদ্য উভয় অংশ বিশুদ্ধ বাংলায় রচিত। আরবি-ফারসি শব্দের মিশ্রণ নেই বললেই চলে। ফয়জুন্নেসা চৌধূরাণী গল্পের নায়ক জালাল ও নায়িকা রূপবানুর প্রণয় কাহিনির মধ্যে কৌশলে স্বীয় জীবনের ছায়াপাত ঘটিয়েছেন। ব্যতিক্রম একটি ক্ষেত্রে যে নিজের দাম্পত্য জীবন ব্যর্থতা ও বেদনায় পূর্ণ। রূপজালালের প্রেম ও দাম্পত্য জীবন সুখ ও আনন্দে পূর্ণ। সৃষ্টির এখানেই স্বার্থকতা। ব্যক্তিগত জীবনের ব্যর্থতাকে সৃষ্টিকর্মে সফল হতে দেখেছেন। তিনি অন্তর্দাহ প্রকাশ করতে গিয়ে রূপজালাল উপন্যাস রচনায় মাঝে মাঝে কবিতার আশ্রয় গ্রহণ করেছেন। রূপজালালে ফুটে উঠেছে ফয়জুন্নেসার কবি প্রতিভা।

গ্রন্থটি বেগম রোকেয়ার জন্মের অন্তত চার বছর আগে প্রকাশিত হয়। সতীন বিদ্বেষের কারণেই ফয়জুন্নেসার বিবাহিত জীবন ব্যর্থ হয়ে যায়। রূপবানুর সতীন হুরবানু তাদের পরিণতি কিরূপ ছিল গ্রন্থের শেষ কয়েকটি চরণে তা প্রকাশ পেয়েছে-

হুরবানু নিয়ে রাণী, রূপবানু মনে।
মিলন করিয়া দিল প্রবোদ বচনে
হদোহে সম রূপবতী সম বুদ্ধিমতী।
বিভূকৃত ভেবে দোহে জন্মিল সম্প্রীতি
উভয় সপতœী নানা গুণে গুণবতী।
আনন্দে বিহরে দোহে পতির সঙ্গতি
দুই জন নিয়ে সম দৃষ্টিতে রাজন।
নিত্য সকৌতুকে কাল করিয়ে যাপন
সিংহাসনে বসি সদা হরিষ অন্তরে।
বিধি বিধানেতে ভূপ রাজকার্য করে
বিচার কৌশলে দূর হৈল অবিচার।
প্রজার জন্মিল ভক্তি সুখ্যাতি প্রচার

রূপজালাল গ্রন্থের একটি অংশে তিনি লিখেছেন- ‘বিধাতা রমনীদিগের মন কি অদাভূত দ্রব্য দ্বারা সৃজন করিয়াছেন, যাহা স্বাভাবিক সরল ও নম্র। তাহাতে কিঞ্চিৎ মাত্র ক্রোধানল প্রজ্জ্বলিত হইলেও লৌহ বা প্রস্তর বৎ কঠিন হইয়া উঠে। আমার এ বাক্য শ্রবণে মহিষী উত্তর করিল, হ্যাঁ ভালো বলিয়াছেন, তাই তো বটে, কোথায় দেখিয়াছেন, রমনীগণ এক পুরুষকে পরিত্যাগ করিয়া, পুরুষান্তর আশ্রয় করে। বরং পুরুষরা একটি রূপবতী যুবতী দেখিলেই পূর্বপ্রেম এবং ধর্ম বিসর্জন দিয়া তাদের প্রতি আসক্ত হয় এবং তাহাকে প্রণয়িনী করিবার জন্য নানা প্রকার চেষ্টা করে। প্রভুর ইচ্ছায় যদি কোনোক্রমে ওই কার্য সুসম্পন্ন করিতে না পারে, তবে পূর্ব প্রণয়িনীর কাছে আসিয়া সহস্র শপথ করিয়া বলে, তোমাকে বিনা আমি আর কাহাকেও জানি না। অধিক কি অন্য বামার রূপলাবণ্য আমার চক্ষে গরল প্রায় জ্ঞান হয়। পুরুষদিগের অন্তঃকরণের স্নেহ চিরস্থায়ী নহে।’

রাজা ন্যায় বিচারক ও প্রজানুরঞ্জন হবেন- এটাও তার কাম্য ছিল। স্বামী বিচ্ছেদের প্রায় নয় বছর পরে রূপজালাল প্রকাশিত হয়। তিনি গ্রন্থখানি স্বামীর নামেই উৎসর্গ করেন। বাস্তবে দুঃখ যন্ত্রণার পক্ষে থেকে তিনি কল্পনায় প্রেমানন্দের পদ্মফুল ফুটিয়েছেন। জাতীয় ভাষা অপরিহার্য ফয়জুন্নেসা চৌধূরাণী এটি গভীরভাবে উপলব্ধি করেছেন।

রূপজালাল ব্যতীত ফয়জুন্নেসা আরও দুটি গ্রন্থ রচনা করেছেন। সঙ্গীত লহরী ও সঙ্গীত সার গ্রন্থ দুটি প্রকাশিত হলেও তা এখন দুষ্প্রাপ্য। বাংলার নারীদের সাহিত্যে অবদানে নওয়াব ফয়জুন্নেসা সর্বাগ্রে।

ফয়জুন্নেসা চৌধূরাণী গানও লিখেছেন। রূপজালাল কাব্যে গান আছে। মূলতান রাগিনীতে রূপবানুর গান ও অন্যত্র মালঝাপ রাগিনীতে কন্যার স্বীয় বৃত্তান্তের বিবরণ আছে। এ ছাড়া বারমাসি, সহেলা, বিরহ-বিলাপ, খেদোক্তি ইত্যাদি শিরোনামে যেসব পদ আছে সেগুলোও সংগীত। সংগীত সম্পর্কিত তার স্বতন্ত্র গ্রন্থও আছে।

শিক্ষা বিস্তার ও সমাজ সংস্কার
নওয়াব ফয়জুন্নেসা কেবল একটি নাম নয়, একটি জনকল্যাণকর প্রতিষ্ঠানও। ঊনবিংশ শতাব্দীর মানুষকে আলোকিত করার জন্য শিক্ষা, সাহিত্য-সংস্কৃতি ও জনহিতকর কর্মযজ্ঞ আমৃত্যু অব্যাহত রেখেছিলেন তিনি। সামাজিক সংকট, অসত্য, নিমর্মতা তাকে নিদারুণ কষ্ট দিয়েছে ঠিকই, তবে পরক্ষণে তিনি প্রতিরোধে উজ্জীবিত হয়েছেন এবং প্রজ্ঞা, দূরদর্শিতা কাজে লাগিয়ে প্রজা ও সাধারণ মানুষকে সঠিক নির্দেশনা দিয়ে গেছেন।

নওয়াব ফয়জুন্নেসা চৌধূরাণীই উপমহাদেশে সর্বপ্রথম উপলব্ধি করেছিলেন, পুরুষের পাশাপাশি নারীদেরও শিক্ষার যথেষ্ট প্রয়োজন রয়েছে। এ প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেই তিনি নারী শিক্ষার প্রতি বিশেষ মনোযোগী হন। তার চিন্তাধারায় অগ্রগণ্য হয়ে উঠে যুগোপযোগী আধুনিক শিক্ষা ব্যতিরেকে সমগ্র নারীর উন্নয়ন সম্ভব নয়। যে যুগে মুসলিম ছেলেরাই ইংরেজি স্কুলে লেখাপড়া করত না, অথচ মেয়েদের ইংরেজি শিক্ষার জন্য তিনি ১৮৭৩ সালে কুমিল্লা জেলা শহরের উপকণ্ঠে বাদুরতলায় ফয়জুন্নেসা উচ্চ ইংরেজি বালিকা বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করার মাধ্যমে অসীম সাহসিকতার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। বর্তমানে ফয়জুন্নেসা সরকারি পাইলট উচ্চ বালিকা বিদ্যালয় যুগের শ্রেষ্ঠত্বের দাবিতে চলমান।

সামাজিক প্রতিকূল অবস্থাকে উপেক্ষা করে নারীদের জ্ঞানের আলোয় উদ্ভাসিত করার অক্লান্ত প্রচেষ্টা করে গেছেন তিনি। নওয়াব ফয়জুন্নেসা ছিলেন জনকল্যাণে নিবেদিত প্রাণ। তিনি আমরণ সিংহচিহ্ন অঙ্কিত জমিদারির চেয়ার পরিত্যাগ করে সামান্য বেতের নির্মিত মোড়ায় উপবিষ্ট হয়ে একজন প্রজাদরদি সুযোগ্য শাসকরূপে ন্যায়নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করে গেছেন। নওয়াব ফয়জুন্নেসা ছিলেন একাধারে শাসক, শিক্ষানুরাগী ও সুসাহিত্যিক। শাসকরূপে তিনি নিজেই ঘোড়ায় সওয়ার হয়ে বিভিন্ন মৌজায় গিয়ে প্রজাদের সুখ-দুঃখের খবরাখবর নিতেন। প্রজাদের অভাব অভিযোগ লাঘবের চেষ্টা করতেন। প্রজাদের সুবিধার্থে নির্মাণ করেছেন বিভিন্ন মৌজায় খাল, পুকুর, রাস্তাঘাট, স্কুল, মুসাফিরখানা, দাতব্য চিকিৎসালয়, মাদ্রাসা-মক্তব ইত্যাদি। তাছাড়া তার জমিদারির আওতাধীন ১২টি মৌজায় সম্পূর্ণ নিজস্ব খরচে প্রতিষ্ঠা করেছেন প্রাথমিক বিদ্যালয়। তার দানে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল লাকসাম দাতব্য চিকিৎসালয়। যা এখনো সগৌরবে মানুষের কাজে আসছে।

১৮৯৩ সালে কুমিল্লা শহরে প্রতিষ্ঠিত ফয়জুন্নেসা হাসপাতাল পরে ফিমেল ওয়ার্ড হিসেবে জেনারেল হাসপাতালের সঙ্গে সংযুক্ত হয়েছে। নওয়াব ফয়জুন্নেসা হজে যাওয়ার আগে নিজের বসতবাড়িসহ সমস্ত সম্পদ জনকল্যাণে দান করেছিলেন। তিনি তার ওয়াক্ফ দলিলের প্রারম্ভেই বলেছেন, ‘জগৎ পিতা জগদ্বীশ্বরের কৃপায় আমি পার্থিব সর্বপ্রকার মান-সম্ভ্রম ও ঐশ্বর্য এবং ঐহিক সুখ-স্বচ্ছন্দতা বিপুল পরিমাণে ভোগ করিয়াছি। এই ক্ষণ আমার বৃদ্ধাবস্থা উপস্থিত বিধায় ইহকালের বৈষয়িক চিন্তাজাল হতে নিষ্কৃতি লাভ পারমার্থিক এ পারত্রিক উপকারজনক কার্যে মনোনিবেশ করাই সর্বেসর্বাভাবে কর্তব্য।’

মক্কায় হজ পালন করতে গিয়ে সুপেয় পানির অভাব মেটাতে সেখানে বহু অর্থ ব্যয় করে ‘নাহরে জুবাইদা’ পুনঃখনন করেন তিনি। পশ্চিমবঙ্গের নদীয়া জেলার কৃষ্ণনগরে স্কুল স্থাপন এবং মক্কা শরীফে মাদ্রাসা-ই-সাওলাতিয়া ও ফোরকানিয়া মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করে মাসিক ৩০০ টাকা হারে সাহায্যের ব্যবস্থা করেছিলেন। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত ফয়জুন্নেসার উত্তরাধিকারীরা এ অর্থ প্রেরণ করতেন নিয়মিত।

ধর্মীয় শিক্ষার জন্য নিজস্ব বাড়ি পশ্চিমগাঁয়ে ফয়েজিয়া মাদ্রাসা নির্মাণ করেছিলেন, কালক্রমে ধাপে ধাপে পরিবর্তিত হয়ে তা নওয়াব ফয়জুন্নেসা সরকারি কলেজে রূপান্তরিত হয়। নওয়াব ফয়জুন্নেসার সাহিত্যকীর্তি হলো রূপজালাল কাব্যগ্রন্থ।

ঊনিশ শতকের শেষপ্রান্তে দেশ-উন্নয়নের বিভিন্ন ক্ষেত্রে, বিশেষত শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও জনসুবিধাজনক কর্মকাণ্ডে নওয়াব ফয়জুন্নেসা চৌধূরাণীর অবদান এবং ভূমিকা যুগের তুলনায় ছিল অনেক অগ্রসর। তিনি পত্রপত্রিকা প্রকাশনায় ও সভা সমিতিতেও অকাতরে অর্থ দান করেন। সাপ্তাহিক ঢাকা প্রকাশ (১৮৬১ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত) কে নগদ অর্থ সাহায্য দেন।

কৃতজ্ঞতার স্বীকৃতিস্বরূপ তার দানের কথা উল্লেখ করে ঢাকা প্রকাশ (৫ মাঘ, ১২৮১ বঙ্গাব্দ) মন্তব্য করে ‘অদ্য আমরা আমাদিগের পূর্ব বাংলার একটি মহিলা রতেœর পরিচয় দান করিয়া ক্ষান্ত থাকিতে পারিলাম না। .......ইনি যেমন বিদ্যানুরাগিনী ও সর্ববিষয়ে কার্যপারদর্শিনী সেইরূপ সৎকার্যেও সমুৎসাহিনী। ........শুনিলাম ইহার আবাসস্থানে সচরাচর যেরূপ করিয়া থাকেন, এখানেও সেইরূপ বিনাড়ম্বরে নিরুপায় দরিদ্রদিগকে দান করিয়াছেন।’

পরলোক গমন
অজ্ঞানতার অন্ধকার আর কুসংস্কারের তিমির বিদার করে যে ক্ষণজন্মা জ্যোতির্ময়ীর আবির্ভাব, তিনি নবাব ফয়জুন্নেসা চৌধূরাণী। জ্ঞানে, ব্যক্তিত্বে এক প্রখর আলোকদীপ্তি নিয়ে তিনি যাপন করেছেন তার সময়। দানে-দাক্ষিণ্যে, স্থাপনা প্রতিষ্ঠায় তিনি যে অক্ষয় কীর্তি রেখে গেছেন তাকে ছাপিয়ে উঠেছেন ব্যক্তি ফয়জুন্নেসা।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ‘শাজাহান’ কবিতায় ফয়জুন্নেসাকে নিয়ে লিখেছেন-

তোমার কীর্তির চেয়ে তুমি যে মহৎ,
তাই তব জীবনের রথ
পশ্চাতে ফেলিয়া যায় কীর্তিরে তোমার বারংবার।
তাই চিহ্ন তব পড়ে আছে, তুমি হেথা নাই।

ফয়জুন্নেসার প্রাত্যহিক জীবনযাত্রায় সব সময় একটা সুশৃঙ্খল নিয়ম নিষ্ঠা বিরাজ করত। তিনি শেষরাতে উঠে ওযু করে নামাজ আদায় করতেন। নামাজ ও কোরআন তিলাওয়াত শেষে ৮টায় নাস্তা করতেন। তারপর ৮টা থেকে ১১টা পর্যন্ত জমিদারির কাজকর্ম শেষ করে অন্দর মহলের পুকুরে গোসল ও সাঁতার কাটতেন।

আহারাদি ও জোহরের নামাজ সেরে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে আবার জমিদারির কাজ করতেন। আছরের নামাজ পড়ে কিছু সময় সাহিত্য সাধন করতেন। ৭০ বছর বয়সে ১৯০৩ খ্রিস্টাব্দের ২৩ সেপ্টেম্বর এ মহীয়সী নারী পরলোক গমন করেন। পশ্চিমগাঁয়ের নিজ বাড়িতে কন্যা আরশাদুন্নেসার পাশে তিনি চিরশয্যায় শায়িত আছেন।

মৃত্যুর ১০০ বছর পর বাংলাদেশ সরকার ২০০৪ খ্রিস্টাব্দে ফয়জুন্নেসা চৌধূরাণীকে সমাজ সেবায় অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ একুশে পদক ও সম্মাননা পত্র (মরণোত্তর) প্রদান করে।