আঁধারের আলো বিনোদিনী

ঢাকা, রবিবার, ২৫ অক্টোবর ২০২০ | ১০ কার্তিক ১৪২৭

আঁধারের আলো বিনোদিনী

রোকেয়া ডেস্ক ১:৫৬ অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ২৩, ২০২০

print
আঁধারের আলো বিনোদিনী

কালের গর্ভে হারিয়ে যাওয়া এক বেদনাবিধুর ইতিহাসের নাম বিনোদিনী দাসী। ১৮৭৪ সালে বিনোদিনী মাত্র ১২ বছর বয়সে প্রথম মঞ্চে ওঠেন গ্রেট ন্যাশনাল থিয়েটার ‘শত্রুসংহার’ নাটকের মাধ্যমে। বিস্ময় এ নারীর জীবনের পরতে পরতে লেখা আছে বেদনার কাব্যগাথা। নিজের প্রতিভা এবং কর্মক্ষমতা দিয়েই যে সমাজের নিষ্ঠুরতা অতিক্রম করা যায় না বিনোদিনী তার জ্বলন্ত উদাহরণ। বেদনাবিধুর সেই ইতিহাস তুলে ধরেছেন সাইফ-উদ-দৌলা রুমী

মনোরমা চরিত্রে বিনোদিনী
বারাঙ্গনার ঘরে বিনোদিনীর জন্ম এ কথা তিনি কখনও অস্বীকার করেননি। কিন্তু মর্যাদাহীন জীবনকে সম্মানের শিখরে নেওয়ার সাধনা তিনি করেছিলেন। অভিনয়ের পাশাপাশি লিখেছিলেন দুটি বই ‘আমার কথা, ‘আমার অভিনেত্রী জীবন। যদিও দ্বিতীয় বইটি তিনি শেষ করে যেতে পারেননি। তিনি একাধারে কবিও ছিলেন। তার রচিত দুটি কবিতার বই ‘বাসনা’ ও ‘কনক নলিনী’।

বিনোদিনী দাসীর স্বপ্ন ছিল, অভিনয় শিল্পীরা নিজেরা গড়ে তুলবে স্বাধীন নাট্যকেন্দ্র। সেখানে অভিনয় শিল্পের উৎকর্ষতায় নিজেদের উৎসর্গ করবে শিল্পীসমাজ। পরস্পর হয়ে উঠবে পরম আত্মীয়। এ ভাবনা যখন তার ভিতরে দানা বাঁধতে শুরু করে, ঘটনাচক্রে তখন ন্যাশনাল থিয়েটার নিলামে ওঠে। নতুন স্বত্বাধিকারী হিসেবে আসন গ্রহণ করেন শ্রী প্রতাপচাঁদ জহুরী নামে এক মাড়োয়ারী। থিয়েটারের অদ্যক্ষ করা হয় গিরিশ ঘোষকে। শুরু হয় থিয়েটারের এক নতুন যুগ। গিরিশের শিক্ষায় বিনোদের রূপান্তর ঘটল বিস্ময়কর প্রতিভাশালিনী এক অভিনেত্রীতে। যদিও গিরিশ তার কৃতিত্ব দাবি করেননি এবং বিনোদের প্রতিভার কথাই বলেছেন বারবার।

কিন্তু একবার ১৫ দিনের ছুটিতে কাশী গিয়ে অসুস্থ হয়ে পড়ে বিনোদ। এক মাস অভিনয়ে যোগ দিতে পারেননি। তাতে জহুরী তার বেতন বন্ধ করেন। আত্মসম্মানী বিনোদ তখনই থিয়েটার ছেড়ে দিতে চাইলে। কিন্তু গিরিশ ঘোষ ও অন্যরা নিজেদের থিয়েটার তৈরির কথা বলে তাকে শান্ত করেন।

কারণে অকারণে শিল্পীদের পারিশ্রমিক আটকিয়ে দেওয়া স্বাভাবের বাবু প্রতাপচাঁদের সঙ্গে, বিনোদিনী বড় ধরনের গোলাযোগে জড়িয়ে পড়েন। নতুন থিয়েটার গড়ার অর্থ আসবে কিভাবে, সে ভাবনা বিনোদিনীর উপরেই ছেড়ে দেওয়া হয়। ঠিক তখনই গুর্মুখ রায় নামে এক ধনবান যুবক বিনোদের জীবনে আসে। সে টাকা দেবে থিয়েটার গড়তে কিন্তু বদলে চাই বিনোদকে।

গাম্ভীর্য ও ব্যক্তিত্বের অধিকারিণী বিনোদিনী বিদীর্ণ চরিত্রগুলিকে বোঝার ক্ষমতা সহজাত বুদ্ধিতে আত্মস্ত করেছেন ও অভিনয় ক্ষমতা গুণে পরিপূর্ণভাবে ফুটিয়ে তুলেছিলেন সেইসব চরিত্রগুলিকে। বঙ্কিমচন্দ্রের উপন্যাসের নায়িকা চরিত্রগুলিতে তিনিই অভিনয় করেছেন। শ্রী শরৎচন্দ্র ঘোষ ছিলেন তার শিক্ষাগুরু। তখন নিজেকে সম্পূর্ণ মেলে ধরার সুযোগ পেলেন তিনি। গিরিশ ঘোষের দলে আসার পর তার অভিনয় প্রতিভা স্বীকৃতি পায় বলার সর্বত্র। মৃণালিনী নাটকে মনোরমা চরিত্রে তার অভিনয় দেখে স্বয়ং বঙ্কিমচন্দ্র বলেছিলেন, ‘আমি মনোরমার চিত্র পুস্তকেই লিখিয়াছিলাম, কখনও যে প্রত্যক্ষ দেখিব এমন আশা করি নাই। আজ বিনোদের অভিনয় দেখিয়া সে ভ্রম ঘুচিল।’

পুঁটি থেকে বিনোদিনী
এক আশ্চর্য প্রতিভার নাম বিনোদিনী দাসী। সে যুগে নারীদের আলাদা কোনো অস্তিত্ব স্বীকার করতনা পরিবার ও সমাজ। এমনকি রাষ্ট্রের শাসকরাও তাদের অবজ্ঞার দৃষ্টিতে দেখতেন। সে সময়ে দাঁড়িয়েও নিজের অভিনয় প্রতিভার জোরে বিনোদিনী নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন শুধু অভিনয় জগতে নয় সংস্কৃতমনস্ক অভিজাত লোকেদের সভাতেও। যেখানে আলোচিত হতো বাংলা ও ইংরেজি সাহিত্য। সম্পূর্ণ আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে সেসব আলোচনায় যোগ দিতেন অসামান্যা প্রতিভাময়ী এ নারী।

যদিও তার প্রথাগত শিক্ষা ছিল সামান্য। ১৮৬৩ সালে কোলকাতার কর্ণওয়ালিশ স্ট্রিটে জন্মগ্রহণ করেন বিনোদিনী। সেখানে ছিলেন মা-দিদিমার তত্ত্বাবধানে। আর্থিক অবস্থা ভালো ছিল না তার পরিবারের। খোলার চালের ঘর। তাও আবার দুই একটি ঘর ছিল ভাড়া দেওয়া অন্নসংস্থানের জন্য। ছোটবেলায় পুঁটি নামে ডাকত সবাই। মা-দাদা আর দিদিমাকে নিয়েই ছিল সংসার। ঘর ভাড়া আর মা-দিদিমার সামান্য অলংকার ছিল আয়ের পথ। জীবনটা ছিল খুবই কষ্টের। বিনোদিনীর বয়স যখন পাঁচ বছর দিদিমা বিয়ে দিয়ে দিলেন তারই খেলার সাথীর সঙ্গে। কিন্তু সে বিয়ে বেশিদিন টিকলো না।

পুঁটির স্বামীকে তার বাড়ির লোকেরা নিয়ে চলে গেল। দাদার এক সময়ে বিয়ে হল, কিন্তু বৌদি তাদের সঙ্গে থাকলেন না। একেবারেই একা হয়ে গেল পুঁটি। তখন তাকে ভর্তি করা হয় কর্ণওয়ালিশ স্ট্রিটের অবৈতনিক স্কুলে। সেখানে নাম লেখানো হলো বিনোদিনী দাসী। পুঁটি থেকে বিনোদিনীতে রূপান্তরিত হওয়ার শুরু সেখান থেকেই।

অভিনয়ের আঙিনায় প্রবেশ
তৎকালীন গায়িকা গঙ্গাবাঈ বিনোদিনী দাসীকে গানের তালিম দিতেন। তার বয়স তখন সাত বছর। গঙ্গাবাঈ বিনোদিনীর গানের প্রথম গুরু। শুধু গানে আটকে থাকাতে বিনোদিনীর মনে হয় সায় ছিল না। তাছাড়া গঙ্গাবাঈও বুঝতে পেরেছিলেন বিনোদিনীর ভেতরে আছে এক অসাধারণ অভিনয় ক্ষমতা। কিন্তু ঘরে ছিল অভাব। অভিনয়কে শুধুমাত্র অর্থ উপার্জনের উপায় হিসেবে তিনি ব্যবহার করেন, এ প্রমাণ পাওয়া যায় না। বরং অভিনয় জগতই তার সর্বস্ব নিয়েছে। অভিনয় জগত এবং জীবন তার কাছে মিলে মিশে একাকার হয়ে গিয়েছিল। ১৮৭৪ সালে ১২ বছর বয়সে ব্রজনাথ সেন এবং পুর্ণচন্দ্র মুখপাধ্যায়ের হাত ধরে তিনি প্রবেশ করেন অভিনয়ের আঙিনায়। ১০ টাকা বেতনে যোগ দেন ভূবন মোহন নিয়োগরি গ্রেট ন্যাশনাল থিয়েটারে। তার প্রথম অভিনীত নাটকের নাম শত্রু সংহার। সেখানে তিনি অভিনয় করেছিলেন দৌপদীর সহচরী রূপে। ঠিক এরপরই হরলাল রায়ের হেমলতা নাটকে হেমলতার ভূমিকায় অভিনয় করেন। নায়িকার ভূমিকায় অভিনয় করার জন্য তাকে অপেক্ষা করতে হয়নি। বিনোদিনী গ্রেট ন্যাশনাল থিয়েটারে ছিলেন ১৯ মাস।

এরপর ২৫ টাকা মাসিক বেতনে, শ্রী শরৎচন্দ্র ঘোষের বেঙ্গল থিয়েটারে যোগ দেন বিনোদিনী দাসী। এই বেঙ্গল থিয়েটারেই মেঘনাদ বধ, বঙ্কিমচন্দ্রের মৃণালিনী, দুর্গেশনন্দিনীসহ অনেক বিখ্যাত নাটকে অভিনয় করে অদ্বিতীয় অভিনয় শিল্পীতে পরিণত হন।

গিরিশচন্দ্র ঘোষ তখন বাংলার নাট্যাঙ্গনে বসে ছিলেন মহাদেবের আসনে। গিরিশচন্দ্র ঘোষ এবং ন্যাশনাল থিয়েটারের (গ্রেট ন্যাশনাল এবং ন্যাশনাল ভিন্ন দুটি থিয়েটারে) স্বত্বাধিকারী কেদারনাথ চৌধুরী প্রায়ই বেঙ্গল থিয়েটারে যেতেন। বিনোদিনীর কপালকু-লা নাটক দেখে, বাবু কেদারনাথ চৌধুরী মুগ্ধ হন। নাট্যাচার্য গিরিশচন্দ্র ঘোষ, শ্রী শরৎচন্দ্র ঘোষের বেঙ্গল থিয়েটার থেকে অনেকটা অনুরোধ করে বিনোদিনী দাসীকে নিয়ে আসেন। তিনি একটি থিয়েটার করবেন এ আশা নিয়ে। বেঙ্গল থিয়েটার ছেড়ে ১৯৭৭ সালেই বিনোদিনী চলে আসেন নাট্যগুরু গিরিশচন্দ্র ঘোষের কাছে। জহুরী যেমন সোনা চিনতে ভুল করে না। তেমনি নট এবং নাট্যগুরু গিরিশচন্দ্র ঘোষও সেদিন বিনোদিনীকে চিনতে ভুল করেননি।

এরপরই গুরু শিস্যের দীর্ঘ পথচলা। বিনোদিনীর একথা বোঝাতে দেরি হয়নি, গুরু গিরিশচন্দ্র ঘোষই তার প্রকৃত ঠিকানা। এ সময় থেকেই শুরু হয় বিনোদিনী দাসীর নাট্য জীবনের প্রকৃত সাধনা। গুরু-শিস্যের বন্ধন আর কোনোদিন ছিন্ন হয়নি। মহাতারকা বিনোদিনী দাসী নাট্যগুরু গিরিশচন্দ্র ঘোষের সান্নিধ্যে এসে যেন পেলেন এক নতুন জীবন। নাট্যাচার্যের নিবিড় পরিচর্যায়, খোলস ছেড়ে স্বপ্রতিভায় আবির্ভূত হন এই বিস্ময় নারী।

এরপর গিরিশচন্দ্র ঘোষের হাত ধরে ১৮৭৭ সালে বিনোদিনী দাসী যোগ দেন কেদারনাথ চৌধুরীর ন্যাশনাল থিয়েটারে। অভিনয় জীবনে ব্যর্থতা শব্দের সঙ্গে তার কোনো পরিচয় ছিল না। মঞ্চের প্রতিটি চরিত্রে তিনি সফলতার চিহ্ন রেখে ক্রমাগত এগিয়ে গেছেন। চৈতন্যলীলা, মেঘনাদ বধ, বিষবৃক্ষ, বুদ্ধদেব, মৃণালিনী, দুর্গেশনন্দিনী, কপালকু-লা প্রভৃতি নাটকে অসামান্য অভিনয় করে একদিকে নিজেকে তুলে ধরেন উচ্চতার এক মহান আসনে। অন্যদিকে নাটককে সমাদৃত করে তোলেন প্রকৃত গুণী সম্প্রদায়ের কাছে। কারণ তখনও নাটক ছিল শুধুই ভোগ-বিলাসের অংশ। ১২ বছরের অভিনয় জীবনে তিনি ৮০টি নাটকে ৯০টি চরিত্রে অভিনয় করে হয়ে উঠেছিলেন নাট্যজগতের বিস্ময় রমণী। একই নাটকে অনেক চরিত্রে অভিনয়ের মতো চ্যালেঞ্জ তাকে নিতে হয়েছে বার বার। মেঘনাদ বধ নাটকে প্রমিলা, বারুনি, রতি, মায়া, মহামায় ও সীতা এ ছয়টি ভূমিকায় অভিনয় করে তিনি তার সহজাত দক্ষতার পরিচয় দিয়েছিলেন। ক্রমশ তিনি সমগ্র ভারতবর্ষের শ্রেষ্ঠ মঞ্চাভিনেত্রী হিসেবে সকলের দৃষ্টি কেড়ে নেন। তার দিকে অভিভূত হয়ে চেয়ে রইল বাংলার নাট্যজগত। বিনোদিনী হয়ে উঠলেন বাংলার নাট্য জগতের অপরিহার্য শক্তি।

নাট্যাচার্য গিরিচন্দ্র ঘোষ দ্বিধাহীনভাবে স্বীকার করেছেন, তার (গিরিশচন্দ্র ঘোষের) নাটকের সাফল্যের মূলেই ছিল বিনোদিনী দাসী। তিনি এ কথাও অকপটে স্বীকার করেছেন, বিনোদিনীর অভিনয় ক্ষমতা, গুরুর শিক্ষাকে অতিক্রম করে স্বকীয়তা অর্জন করেছে। সে সময়ের প্রতিটি সংবাদপত্রে বিনোদিনীর অভিনয়ের ভূয়সী প্রশংসা করে সংবাদ ছাপানো হতো।

তার অভিনয়ের অসাধারণ ক্ষমতায় মুগ্ধ হয়ে, তাকে নানা উপাধিতে ভূষিত করেছে সে সময়ের পত্র-পত্রিকা। ফ্লায়ার অফ দি নেটিভ স্টেজ, প্রাইমা ডোনা অফ দি বেঙ্গলি উপাধি দিয়ে সম্মানিত করা হয়েছে বাংলার মহাতারকা বিনোদিনী দাসীকে। পরবর্তী পর্যায়ে গড়ড়হ ড়ভ ঃযব ংঃধৎ ঃযবধঃৎব উপাধিতে তাকে ভূষিত করা হয়।

বঞ্চনা ও অভিনয় জীবনের সমাপ্তি
গিরিশবাবু বললেন, থিয়েটারই বিনোদিনীর উন্নতির সোপান। নিজেকে বিসর্জন দেওয়ার এটাই তার নির্ধারিত বেদী। ততোদিনে আবারও ফিরে এসেছেন গুর্মুখ রায়। দাঁড়িয়েছেন বিনোদিনীর মুখোমুখি। অবশেষে ভালোবাসা আর ব্যক্তিগত জীবন সবকিছু পায়ে মাড়িয়ে মাতৃরূপে বিনোদিনী দাসী দাঁড়ালেন থিয়েটারের পাশে। গুর্মুখ রায়ের কাছে সঁপে দিলেন নিজেকে। কারণ থিয়েটার ও অভিনয়ই ছিল তার ধ্যান জ্ঞান। ৫০ হাজার টাকা দিলেন গুর্মুখ রায়। বিনোদ সেই টাকা ঢাললেন থিয়েটার গড়তে। বিডন স্ট্রিটে জমি নেওয়া হল।

তৎকালীন সমাজের বিচারে, তথাকথিত সভ্য সংসার বিনোদিনীর জন্য বরাদ্দ ছিল না। কিন্তু বিনোদিনী দাসী টাকার বিনিময়ে ভালোবাসা লেনদেন করার স্তরের নারীও ছিলেন না। তার একদিকে নিজের জীবন, পিছনে আছে ভালোবাসার বন্ধন। অন্যদিকে শিল্পীসমাজের কাতর অনুরোধ ‘তুমি যেভাবে পারো আমাদের একটা থিয়েটার বানিয়ে দাও।’ নিঃস্ব, সর্বস্বান্ত হয়ে দান করার এক মহান দৃষ্টান্ত স্থাপন করলেন তিনি। একেই মনে হয় বলে, ইহলোক ত্যাগ না করেই জীবন দান করা। বিনিময়ে গুর্মুখ রায়কে দিয়ে শুরু করলেন শিল্পী সমাজের এতদিনের স্বপ্ন থিয়েটার নির্মাণের কাজ। গুর্মুুখ রায়ের রক্ষিতা বিনোদিনী হয়ে উঠলেন শিল্পী সমাজের দুর্গতিনাশিনী।

অবশ্য পরবর্তীতে গুর্মুখ রায় বিনোদিনীকে ৫০ হাজার টাকা নিয়ে নিজের মতো করে বাঁচতে পরামর্শ দিয়েছিলেন। বলেছিলেন ঝামেলা বাদ দিয়ে তুমি বরং নিজের জীবন গুছিয়ে নাও। ষড়যন্ত্রের কিছু আভাস সম্ভবত গুর্মুখ রায় আগে থেকেই অনুমান করেছিলেন। কিন্তু বিনোদিনীর এক কথা- ‘আমার একটা থিয়েটার হল চাই এবং তা যত টাকাই লাগুক। তাই হলো, বিনোদিনীর জীবন এবং শ্রমের বিনিময়ে সত্যিই একদিন গড়ে উঠল শিল্পী সমাজের স্বপ্নের থিয়েটার।

কিন্তু বিনোদিনী নিজেও বুঝতে পারছিলেন না এক নির্মম প্রতারণা অপেক্ষা করছিল তার সামনে। সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত ছিল, নতুন থিয়েটারের নাম হবে ‘বি থিয়েটার’। কিন্তু অন্য সকলের সঙ্গে বিনোদিনীও এক সকালে দেখলেন, বি থিয়েটার নয়। সেখানে নাম হিসেবে জ্বল জ্বল করছে স্টার থিয়েটার। কারণ তখন বিনোদিনীর মধ্যে, সুধী সমাজ আবিষ্কার করলেন, বিনোদিনী তো রক্ষিতা। বিপদের কা-ারি বিনোদিনী রাতারাতি হয়ে গেলেন রক্ষিতা। তারপর শুরু“ হয়ে গেল বিনোদিনীকে স্টার থিয়েটার থেকে নির্বাসনের আয়োজন।

এ ষড়যন্ত্রের ফলে দুই মাস স্টার থিয়েটার থেকে দূরেও থাকতে হয়েছিল তাকে। নাট্যচার্য গিরিশচন্দ্র ঘোষ তার হাতে গড়া প্রতীমাকে বিসর্জন দিতে রাজি না হওয়াই এবং স্বত্বাধিকারী গুর্মুুখ রায় বিনোদিনী বাদে থিয়েটার চালাতে রাজি না হওয়ার ফলে, আবার ফিরিয়ে আনা হয় তাকে। গুরু গিরিশচন্দ্র এবং বিনোদিনীর হাত ধরেই স্টার থিয়েটারের প্রথম নাটক ‘দক্ষযজ্ঞ’ মঞ্চায়িত হয়।

স্টার থিয়েটার তৈরি হওয়ার পর গিরিশচন্দ্র ঘোষের ধ্যান জ্ঞান হয়ে উঠলো, কিভাবে অভিনেতা-অভিনেত্রীদের দক্ষতা আরও বাড়ানো যায়। থিয়েটার শুধু বিনোদন নয়। মানুষ গড়ার প্রতিষ্ঠানও। এটাই ছিল গিরিশ চন্দ্র ঘোষের নৈতিক মন্ত্র। যখন নতুন করে যাত্রা শুরু করেছে স্টার থিয়েটার, তখন হঠাৎ বেঁকে বসলেন গুর্মুখ রায়। বিনোদিনীর প্রতি শিল্পীসমাজের এতোবড় অন্যায় সম্ভবত গুর্মুখ রায় কখনও ভুলতে পারেনি। স্টার থিয়েটারের স্বত্ব বিনোদিনীর হস্তগত করে তিনি বিনোদিনীর জীবন থেকে চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছেন।

কিন্তু গুর্মুখ রায়ের এ ইচ্ছার সঙ্গে এক মত হতে পারেননি-নাট্যাচার্য গিরিশচন্দ্র ঘোষ। তিনি বললেন, ‘বিনোদকে ফেলিয়া তো আমি কখনও অন্যত্র কার্য করিব না। আমরা কার্য করিব; বোঝা বহিবার প্রয়োজন নাই। গাধার পিঠে বোঝা দিয়া কার্য করিব।’ গুরুকে প্রণাম করে আবার নতুন করে যাত্রা শুরু করলেন বিনোদিনী দাসী। গিরিশচন্দ্র ঘোষ বিনোদিনীকে বোঝাতে সক্ষম হয়েছিলেন, অভিনয়ে উৎকর্ষ ছাড়া শিল্পীদের আর কিছু চাইতে নাই। বিনোদিনীও ধর্মজ্ঞানে নিজেকে সমর্পণ করলেন নাট্যবেদীতে। এ সময় কিছু বিখ্যাত নাটক দেখার সৌভাগ্য হয়েছিল নাট্যপ্রেমীদের।

নল-দময়ন্তী, ধ্রুবচরিত্র, শ্রীবৎস-চিন্তা ও আরও দুই একটা বিখ্যাত নাটক তখন মঞ্চে আসে। থিয়েটারের সুনামের ফলে তখন মানুষকে বসার জায়গা দেওয়াই কঠিন হয়ে পড়ে। এ সময়ই প্রথমে চৈতন্যলীলা এবং পরে দ্বিতীয় ভাগ চৈতন্যলীলার মঞ্চায়ন শুরুহয়। চৈতন্যলীলা দ্বিতীয় অভিনয় করতে গিয়ে পরবর্তী ছয় মাস বিনোদিনী আর কোনো নাটকে অভিনয় করতে পারেননি। কারণ চৈতন্য চরিত্র থেকে তিনি বের হয়ে আসতে পারতেন না। এর আগে পাশাপাশি দুই তিনটা নাটকে একাধিক চরিত্রে অভিনয় করা বিনোদিনীর জন্য ছিল স্বাভাবিক ব্যাপার। কিন্তু চৈতন্য চরিত্র থেকে বেরিয়ে আসা তার জন্য হয়ে দাঁড়ালো দুঃসাধ্য ব্যাপার।

বিনোদিনী দাসীর মতানুসারে, এই সময় তার জীবনে একটা ভিন্ন ধরনের অনুভূতি দেখা দেয়। মাত্র কিছুদিন আগেই নাটকে পরিবেষ্টিত সজ্জন দ্বারা প্রতারিত হওয়া এবং চৈতন্যলীলা নাটককে কেন্দ্র করে রামকৃষ্ণ পরমহংস দেবের সাহচর্যে আসা। এই স্বত্ব যারা কিনে নিয়েছিল সেই সকল শিল্পীও ধীরে ধীরে বনে গেল মালিক। তিনি অনুভব করলেন এ নাট্যজগত তার নয়। এটা তিনি চাননি। এ নাট্যজগতে বিনোদিনী দাসীর দাঁড়ানোর আর কোনো জায়গা নেই। মহান শিল্পী বিনোদিনী দাসী চোখভরা জল গোপন করে ছেড়ে দিলেন থিয়েটার। তার অভিনীত শেষ নাটক বেল্লিক বাজার।

বিনোদিনী লিখেছেন, ‘থিয়েটার ভালোবাসিতাম, তাই কার্য করিতাম, কিন্তু ছলনার আঘাত ভুলিতে পারি নাই। তাই অবসর বুঝিয়া লইলাম।’

বিনোদিনী এক ধনবান যুবকের প্রণয়ে আবদ্ধ ছিলেন। জীবন চলার নিয়মেই, বিনোদিনীর দৈনন্দিন ব্যয়ভার ওই যুবকই বহন করতেন। বিনোদিনী দাসীর জীবনে তখন সচ্ছলতার কোনো টানাপোড়েন ছিল না। কিন্তু হঠাৎই ভদ্র পাড়ার যুবক নিজের ঘরকান্নার দিকে মনোযোগী হয়ে, বিরূপ হয়ে উঠলেন বিনোদিনীর প্রতি। স্বামী-সন্তানভরা সংসারের স্বপ্নও তিনি দেখতেন। তার ব্যক্তিগত জীবনের বাকি ভাগটা অনেকটাই পর্দার আড়ালেই থেকে গেছে। পুরুষ এসেছে গেছে তার জীবনে।

কিন্তু প্রকৃত ভালোবাসার জন্য তার অন্তর কেঁদেছে সর্বদাই। সন্তানও এসেছিল তার কোলে, কিন্তু মাত্র ১৩ বছর বয়সে তার একমাত্র কন্যা মারা যায় ১৯০৪ সালে।
থিয়েটার থেকে বিদায় নেওয়ার পর তিনি আশ্রয় নিয়েছিলেন তার প্রকৃত উপকারী বন্ধু রাঙাবাবুর কাছে। তিনিও চলে গেলেন পরপারে ১৯১২ সালে। সেই সময় থেকে তার মৃত্যু পর্যন্ত জীবন কিভাবে কেটেছে ভালো জানা যায় না। সম্ভবত যে জায়গাকে ও যে পেশাকে তিনি সবচাইতে বেশী ঘৃণা করতেন, সেই জায়গায় যেখানে তার ছেলেবেলা কেটেছে সেখানেই ফিরে গিয়েছিলেন পেটের দায়ে। মাঝে মাঝে স্টার থিয়েটারেও গিয়ে বসে থাকতেন হয়তো ভিক্ষেও করতে হয়েছে তাকে। ১৯৪২ সালে মারা যান মঞ্চ কাঁপানো এ অভিনেত্রী।