ব্রিটিশ মসনদ কাঁপানো নারী

ঢাকা, শুক্রবার, ৪ ডিসেম্বর ২০২০ | ১৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৭

ব্রিটিশ মসনদ কাঁপানো নারী

রোকেয়া ডেস্ক ১১:৩১ পূর্বাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ১৬, ২০২০

print
ব্রিটিশ মসনদ কাঁপানো নারী

‘বিনা যুদ্ধে নাহি দেব সূচ্যগ্র মেদিনী’ কথায় নয়, ব্রিটিশ সেনাদের কাজে কর্মে এ কথা বুঝিয়ে দিয়েছিলেন রানী লক্ষ্মীবাঈ। শরীরের শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে রক্ষা করেছিলেন প্রিয় ঝাঁসিকে। রাজমহল ছেড়ে ঝাঁপিয়ে পড়েন রণক্ষেত্রে। লড়াই করেন ব্রিটিশদের দুঃশাসনের বিরুদ্ধে। ঝাঁসির রানী লক্ষ্মীবাঈয়ের বীরত্বের সেই ইতিহাস তুলে ধরেছেন সাইফ-উদ-দৌলা রুমী

মণিকর্ণিকার শৈশব
রানী লক্ষ্মীবাঈয়ের বাবার নাম ছিল মরুপান্ত তাম্বে এবং মা ছিলেন ভাগীরথী বাঈ। ছোটবেলায় তার নাম ছিল মণিকর্ণিকা তাম্বে। কিন্তু তাকে সবাই ভালোবেসে মনু বলে ডাকতেন। তার জন্ম তারিখ নিয়ে বিতর্ক আছে। একদল ঐতিহাসিক ধারণা করেন, তার জন্ম ১৮৩৫ সালের ১৯ নভেম্বর। সে হিসেবে মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ২২ বছর। জন্মের এ তারিখ গোয়ালিয়রে তার স্মৃতিসৌধেও লেখা আছে। আবার আরেক দলের ইতিহাসবিদের ধারণা, তিনি জন্মেছিলেন আরও কয়েক বছর আগে ১৮২৭ অথবা ১৮২৮ সালের দিকে। ১৮৩২ সালে তার পরিবার বিথুরে চলে যায়। মণিকর্ণিকা বড় হয়েছেন তাতিয়া তোপি, নানা সাহেব, রাও সাহেবের সঙ্গে খেলাধুলা করে।

সুতরাং তাদের সঙ্গে বয়সের সামঞ্জস্য করতে গেলে মণিকর্ণিকাকে জন্ম সাল হয় ১৮২৭ বা ১৮২৮। সমবয়সী অন্য মেয়েদের তুলনায় লক্ষ্মীবাঈ ছিলেন স্বাধীনচেতা ও দৃঢ়। ছোটবেলাতেই লেখাপড়ার পাশাপাশি মারাঠা মার্শাল আর্ট, অশ্বারোহণ, তলোয়ার চালানো আর তীরন্দাজির দীক্ষা নিচ্ছিলেন তিনি। মাত্র চার বছল বয়সে তার মা মারা যান। তারপর তিনি বিথুরে চলে আসেন। সেখানে দ্বিতীয় পেশোয়া বাজিরাওয়ের অধীনে কাজ করতেন। পেশোয়া মনুকে বেশ পছন্দ করতেন এবং তিনি তার ছেলে নানা সাহেবের সঙ্গে যেমন ব্যবহার করতেন মনুর সঙ্গেও একইরকম আচরণ করতেন। মনু তার বয়সী বাচ্চাদের থেকে বেশ আলাদা ছিলেন। তিনি ছিলেন অত্যন্ত স্বাধীন এবং ঘোড়া চালানো, মার্শাল আর্ট, তরোয়াল চালানো, বিভিন্ন খেলাধুলা এবং অ্যাডভেঞ্চারের সঙ্গে যুক্ত থাকতেন। পেশোয়া তার চঞ্চল স্বভাবের জন্য তার নাম দিয়েছিলেন ছাবেলি।

স্বামীর মৃত্যু ও রাজকার্য পরিচালনা
লক্ষ্মীবাঈ ভোরে ঘুম থেকে উঠে সুগন্ধি আতর দিয়ে স্নান করতেন। সাধারণত ধবধবে সাদা চান্দেরী শাড়ি পরে তিনি নিয়মিত প্রার্থনায় বসতেন। ১৮৫৩ সালে তার স্বামী রাজা গঙ্গাধর মারা যান। এরপর তিনি রাজকার্য পরিচালনার দায়িত্ব নেন। স্বামীর মৃত্যুর পরও মাথায় চুল রাখার অপরাধে জল ঢেলে প্রায়শ্চিত্ত করতেন; তুলসী পূজা করতেন তুলসীবেদিতে। তারপর দরবারের গায়করা যেখানে গান করতেন, সেখানে করতেন পার্থিব পূজা। পুরাণিরা পুরাণ পাঠ করা শুরু করতেন। তারপর সিরদাররা ও আশ্রিতরা এলে তিনি তাদের অভিবাদন জানাতেন।

সকালে যে সাড়ে সাতশ মানুষ তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে আসতেন তাদের মধ্যে একজনও উপস্থিত না থাকলে তীক্ষè স্মৃতিশক্তির ফলে পরদিন তিনি তার না আসার কারণ জানতে ভুলতেন না। ভগবানের পূজা করার পর আহার করতেন। আহারের পর, এক ঘণ্টার বিশ্রাম নিতেন যদি না কোনো জরুরি কাজ থাকতো।

লক্ষ্মীবাঈ সকালের উপহার সামগ্রী তার সামনে আনার জন্য আদেশ করতেন যেগুলো রুপার থালার উপর রেশমি কাপড় দিয়ে ঢাকা থাকতো। যেগুলো তিনি পছন্দ করতেন তা গ্রহণ করতেন, বাকিগুলো কোঠিওয়ালাকে (উপহারশালার মন্ত্রী)- প্রজাদের মধ্যে বণ্টনের জন্যে দেওয়া হতো। সাধারণত পুরুষের পোশাকে তিনি দরবারে যেতেন। গাঢ় নীল রঙের জামা, পাজামা ও মাথায় একটি সুন্দর পাগড়িসদৃশ টুপি পরতেন। কোমরে জড়িয়ে রাখতেন একটি নকশা করা দোপাট্টা, যার পাশে থাকত মূল্যবান রতœখচিত তলোয়ার। মাঝে মাঝে তিনি নারীর পোশাকও পরতেন। স্বামীর মৃত্যুর পর তিনি আর কখনও অলঙ্কার পরেননি। তার হাতে থাকতো হীরার বালা, গলায় মুক্তার ছোট মালা এবং কনিষ্ঠ আঙ্গুলে একটি হীরার আংটি। তার চুলগুলো পিছনে বাঁধা থাকতো।

ব্রিটিশ সৈন্যদের সঙ্গে যুদ্ধ
১৮৫৩ সালে রাজা গঙ্গাধর মারা গেলে দত্তক নেওয়া সন্তান দামোদর রাওকে উত্তরাধীকারী ঘোষণা করা হয়। তবে লর্ড ডালহৌসির নিয়ন্ত্রণে থাকা ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ডক্ট্রিন অব ল্যাপস এর মতে রাজার দত্তক ছেলে দামোদর রাওকে উত্তরাধিকারী হিসেবে স্বীকার করতে অস্বীকৃতি জানায়। নিয়ম অনুযায়ী কোনো রাজ্যের রাজা তার নিজের রক্তের কাউকে উত্তরাধিকারী হিসেবে রেখে না গেলে সেই রাজ্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে কোম্পানির নিয়ন্ত্রণে চলে যাবে। ১৮৫৭ সালের সিপাহি বিপ্লবে বিভিন্ন রাজ্যের রাজাদের বিদ্রোহকে সাহায্য করতে এগিয়ে আসার পেছনে এ নিয়মের ভূমিকা ছিল। লক্ষ্মীবাঈ এর বিরুদ্ধে আপিল করেও কোনো ফল হয়নি। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি তার দত্তক পুত্রকে উত্তরাধিকারী হিসেবে মেনে নেয়নি।

কোম্পানি জানিয়েছিল, ঝাঁসির সিংহাসনে প্রকৃত উত্তরাধিকারী নেই। ঝাঁসিকে কোম্পানির নিয়ন্ত্রণে নেওয়া হবে। এর উত্তরে রানী জানিয়েছিলেন, তিনি তার ঝাঁসি কখনও দিতে রাজি নন। ১৮৫৪ সালে ঝাঁসির রানীর নামে বার্ষিক ৬০ হাজার ভারতীয় রুপি ভাতা হিসেবে মঞ্জুর করা হয় এবং ঝাঁসির কেল্লা পরিত্যাগ করার জন্য হুকুম জারি করা হয়। ১৮৫৭ সালে সিপাহী বিদ্রোহের দাবানল ছুঁয়ে গিয়েছিল ঝাঁসিকেও। সেখানকার বিদ্রোহীরা ৬০ জনের মতো ইংরেজকে হত্যা করে। রানী তখন তার প্রাসাদে। ক্ষমতাহীন লক্ষ্মীবাঈ, যতদূর প্রমাণ পাওয়া যায়, এ হত্যার সঙ্গে কোনোভাবেই জড়িত ছিলেন না।

এ ঘটনার পর ইংরেজ সরকার নড়েচড়ে বসল। সিপাহী বিদ্রোহকে শক্ত হাতে দমনের সঙ্গেই ঝাঁসির বিদ্রোহীদের কঠোর সাজা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। শাসনকর্তা প্রভুর পায়ের নিচ থেকে তার জাতভাইকে মেরে ফেলবে, এমন সাহস যেন আর কোনো ভারতীয়ের না হয় এমন উদ্যোগ নেওয়া হয়।

১৮৫৮ সালে জেনারেল হিউজ রস তার সৈন্য নিয়ে ঝাঁসি পৌঁছান। তবে রানী বসে থাকেননি। তিনি নিজেই ঝুঁকি নিলেন। বললেন, ‘আমি আমার ঝাঁসি কাউকে দেব না। বলা হয়ে থাকে, রানী বেঁচে গিয়েছিলেন ইংরেজদের সতীদাহ বিলোপ নীতির কারণেই, কিন্তু একসময়ে এসে সেই ইংরেজদের বিরুদ্ধেই অস্ত্র তোলেন। গঙ্গাধরও চেয়েছিলেন তার মৃত্যুর পর লক্ষ্মীবাঈ দামোদরের অভিভাবক হয়ে ঝাঁসি পরিচালনা করার দায়িত্ব নেবে। স্বামীর মৃত্যুতে নিয়মানুযায়ী চুল না কেটে লক্ষ্মীবাঈ প্রতীজ্ঞা করেছিলেন, যতদিন না তিনি ইংরেজদের অবিচারের প্রতিশোধ নেবেন, ততদিন চুল যেমন আছে, তেমন থাকবে।

১৮৫৮ সালের জানুয়ারি মাসের কোনো একটা সময়ে গিয়ে লক্ষ্মীবাঈ উপদেষ্টাদের সাথে মতবিনিময় শেষে ঠিক করেছিলেন ঝাঁসিকে রক্ষা করতে তিনি যুদ্ধ করবেন। কোম্পানির সৈন্যরা দুর্গ দখল করার পথে থাকলেও তিনি যুদ্ধ চালিয়ে যান। রানী লক্ষ্মীবাঈ তার সশস্ত্র বাহিনী নিয়ে ব্রিটিশের বিরুদ্ধে যুদ্ধের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। তবে ব্রিটিশরা প্রযুক্তিগতভাবে উন্নত ছিল, তাই রানী দুর্গটি রক্ষা করতে পারেননি। ব্রিটিশ বাহিনী তার শহরে প্রবেশ করে প্রাসাদের দিকে অগ্রসর হয়। এক রাতে দুর্গের দেয়াল থেকে সন্তানসহ লাফ দিয়ে লক্ষ্মীবাঈ প্রাণরক্ষা করেন। আনন্দ রাওকে সঙ্গে নিয়ে রানী তার বাহিনীসহ কালপিতে যান। সেখানে তিনি অন্যান্য বিদ্রোহী বাহিনীর সঙ্গে যোগ দেন। পরবর্তীতে গোয়ালিয়র কেল্লা দখল করেন রানী লক্ষ্মীবাঈ এবং তাতিয়া তোপির সম্মিলিত বাহিনী।

স্বাধীনতাকামী মানুষের প্রেরণার উৎস
স্বামীর মৃত্যুর পর রাজপাট সামলেছেন রানী লক্ষ্মীবাঈ। প্রজাদের মঙ্গলের চেষ্টা করে গেছেন আমৃত্যু। ভীরু মনে মরার অপেক্ষা করেননি। বরং ঝাঁসিকে স্বাধীন রাখতে হাতে তুলে নিয়েছিলেন অস্ত্র। নারীদের নমনীয় শারীরিক গঠন ও সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে অধিকাংশ সময়ই তাদের দুর্বল প্রতিপন্ন করা হয়। অথচ তলোয়ার চালানো বা তীর-ধনুকে লক্ষ্যভেদ করার কথা কল্পনা করতেই চোখের সামনে ভেসে উঠে লক্ষ্মীবাঈয়ের ছবি। যুগে যুগে এমন কিছু সাহসী নারীর আবির্ভাব ঘটেছে যারা সম্মুখ সমরে পরাজিত করেছেন বহু বীরকে। এসব অসাধারণ ব্যক্তিত্বের মধ্যে অন্যতম ছিলেন লক্ষ্মীবাঈ। প্রিয় ঝাঁসিকে রক্ষায় গড়ে তুলেছেন প্রমীলা বাহিনী। যুদ্ধ ক্ষেত্রে সেনাপতির ভূমিকা নিয়েছিলেন। লড়তে লড়তে ক্ষতবিক্ষত হয়ে গোয়ালিয়রের এক প্রান্তে পৌঁছে নদীর কিনারে এক সাধুকে অনুরোধ করেন তার জন্য চিতা সাজাতে। লক্ষ্মীবাঈ চাননি ইংরেজরা তার কেশাগ্র স্পর্শ করুক। করতেও পারেনি।

দুর্গ রক্ষার যুদ্ধে নিহত মুসলমান ও হিন্দু যোদ্ধাদের যে স্থানে কবর ও দাহ করা হয়েছিল প্রতি বছর ফেব্রয়ারি মাসের মেলায় দুই ধর্মের মানুষ সেখানে জড়ো হন শ্রদ্ধা জানাতে। দুর্গে প্রতিদিন সন্ধ্যার আলো ও ধ্বনির মূর্ছনায় জীবন্ত হয়ে ওঠে দেড়শ বছর আগের ঝাঁসির ইতিহাস ও রানীর জীবন-আলেখ্য। ইতিহাস আজও শ্রদ্ধার সঙ্গে মনে রেখেছে এই অতুলনীয় বীরাঙ্গনা নারীকে। যিনি স্বাধীন ভারত প্রতিষ্ঠার প্রথম পর্বে রেখেছিলেন তার অসামান্য অবদান, হয়ে উঠেছিলেন স্বাধীনতাকামী ভারতবর্ষের মানুষের প্রেরণার উৎস।

ভারতবর্ষের জাতীয় বীরাঙ্গনা
রানী লক্ষ্মীবাঈ ভারতবর্ষের জাতীয় বীরাঙ্গনা হিসেবে ব্যাপক পরিচিতি পান। তাকে ভারতীয় নারীদের সাহসের প্রতীক ও প্রতিকল্প হিসেবে চিত্রিত করা হয়েছে। সুভাষ চন্দ্র বসুর নেতৃত্বাধীন আজাদ হিন্দ ফৌজের প্রথম নারী দলের নামকরণ করা হয় রানী লক্ষ্মীবাঈকে স্মরণ করে। সাম্প্রতিককালে, লক্ষ্মীবাঈকে বিশ্বের শীর্ষ ১০ জন ডানপিটে নারীদের একজন হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, যারা তাদের স্বামীদের কাছ থেকে সক্রিয় সহযোগিতা পেয়েছিলেন। টাইম ম্যাগাজিনে এ তথ্য প্রকাশ করা হয়।

তালিকায় ঝাঁসির রানীর অবস্থান ছিল অষ্টম। ঝাঁসির রানী লক্ষ্মীবাঈয়ের কাহিনী নিয়ে নির্মিত হয়েছে চলচ্চিত্র। হিন্দি, তেলেগু, তামিল ভাষায় মণিকর্ণিকা : দ্য কুইন অব ঝাঁসি নামের চলচ্চিত্রটির পরিচালক রাধা কৃষ্ণ জগরলামুন্ডি। ইংরেজ বাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধ চালিয়ে শহীদ হন রানী। পরবর্তীতে ব্রিটিশ সেনাদল গোয়ালিয়র দখল করে। ১৮৫৮ সালের ১৭ জুন তার মরদেহ ভস্ম হয়ে গিয়েছে সত্য।

তবু তিনি অমর। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত কখনও মাথা নত করেননি। যুদ্ধ করে, নিজের শক্ত হাতে প্রতিপক্ষকে প্রতিহত করে তবেই শহীদ হয়েছেন তিনি। ইতিহাসের পাতায় আজীবনের জন্য স্থান করে নিয়েছেন তিনি।

মণিকর্ণিকা থেকে লক্ষ্মীবাঈ
মণিকর্ণিকা ১৮৪২ সালে ঝাঁসির রাজা গঙ্গাধর রাও নেওয়ালকারকে বিয়ে করে ঝাঁসিতে চলে যান। সেখানে তার নাম রাখা হয় লক্ষ্মীবাঈ। গঙ্গাধরের আগেও একজন স্ত্রী ছিলেন, যিনি নিঃসন্তান অবস্থায় মারা যান।

গঙ্গাধর-লক্ষ্মীবাঈয়ের রসায়নকে উপন্যাসের পাতায় অথবা রূপালি পর্দায় যতটাই মধুর করে দেখানো হোক না কেন, তা রাজা-রানীর সম্পর্কের চেয়ে বেশি কিছু ছিল না। গঙ্গাধর স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কের সবচেয়ে বেশি চেয়েছিলেন একটি সন্তান, তাদের উত্তরাধিকারী। ১৮৫১ সালে লক্ষ্মীবাঈ একটি ছেলে সন্তান জন্ম দেন।
তার নাম রাখা হয় দামোদর রাও। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে সে মাত্র মিন মাস বেঁচে ছিল। পুত্র শোক ভুলতে রাজা এবং রাণী উভয়েই আনন্দ রাওকে দত্তক নেন। আনন্দ রাও ছিলেন গঙ্গাধর রাওয়ের জ্যেঠাতো ভাইয়ের ছেলে।

জীবিত থাকা অবস্থায় ঝাঁসির রাজা তার পুত্রের মৃত্যু রহস্য কখনও উদ্ঘাটন করতে পারেননি। রাজা গঙ্গাধর মারা গেলে রানী লক্ষ্মীবাঈ রাজকার্য পরিচালনার দায়িত্ব নেন। অবশ্য দত্তক নেওয়া সন্তান দামোদর রাওকে উত্তরাধীকারী ঘোষণা করা হয়। তবে ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ দামোদর রাওকে উত্তরাধিকারী হিসেবে স্বীকার করতে অস্বীকৃতি জানায়।

১৮৫৭ সালের বিদ্রোহ
১৮৫৭ সালের ১০ মে মিরাটে বিদ্রোহের সূচনা হয়। চারদিকে গুজব ছড়িয়ে পড়ে লি ইনফিল্ড রাইফেলের আচ্ছাদনে শুকরের মাংস এবং গরুর চর্বি ব্যবহার করা হয়েছে। এরপরও ব্রিটিশ শাসকগোষ্ঠী রাইফেলে শুকরের মাংস এবং গরুর চবি ব্যবহার অব্যাহত রাখে। তারা বিবৃতি দেয় যে, যারা রাইফেল ব্যবহারে অসম্মতি জানাবে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আদেশ অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতেও শুরু করে ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ। এ বিদ্রোহে সিপাহীরা অনেক ব্রিটিশ সৈন্যসহ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিতে নিযুক্ত কর্মকর্তাদের হত্যা করে।

ওই সময়ে লক্ষ্মীবাঈ তার বাহিনীকে নিরাপদে ও অক্ষত অবস্থায় ঝাঁসি ত্যাগ করাতে পেরেছিলেন। সমগ্র ভারতবর্ষে প্রবল গণআন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ কৌশলের আশ্রয় নেয়। ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ অন্যত্র মনোযোগের চেষ্টা চালায়। লক্ষ্মীবাঈ একাকী ঝাঁসি ত্যাগ করেন। তার নেতৃত্বে ঝাঁসি শান্ত ও শান্তিপূর্ণ অবস্থা বজায় ছিল। হলদী-কুমকুম অনুষ্ঠানে ঝাঁসির নারীরা শপথ গ্রহণ করেছিলেন, যেকোনো আক্রমণকেই তারা মোকাবেলা করবেন এবং প্রতিপক্ষের আক্রমণকে তারা ভয় পান না।

১৮৫৮ সালের ৩১ মার্চ ব্রিটিশ সৈন্যদের আক্রমণে টিকতে না পেরে ঝাঁসি দুর্গ ছাড়তে বাধ্য হন রানী লক্ষ্মীবাঈ। পরবর্তীতে আনন্দ রাওকে সঙ্গে নিয়ে রানী তার বাহিনী সহযোগে বাণিজ্যিক বিনিয়োগের উর্বর ক্ষেত্র কাল্পীতে যান। সেখানে তিনি অন্যান্য বিদ্রোহী বাহিনীর সঙ্গে যোগ দেন। তাতিয়া তোপির নেতৃত্বেও একটি বিদ্রোহী দল ছিল। এরপর রানী লক্ষ্মীবাঈ এবং তাতিয়া তোপি গোয়ালিয়রের দিকে রওনা দেন। সেখানে তাদের যৌথবাহিনী গোয়ালিয়রের মহারাজার দলকে পরাজিত করে। পরাজিত বাহিনীর সদস্যরা পরবর্তীতে যৌথবাহিনীর সঙ্গে একত্রিত হয়। তারপর কৌশলগত অবস্থানে থাকা গোয়ালিয়রের কেল্লা দখল করে লক্ষ্মীবাঈ এবং তাতিয়ার তোপির সম্মিলিত বাহিনী।

১৮৫৮ সালের ১৭ জুন ফুলবাগ এলাকার কাছাকাছি কোটাহ-কি সেরাইয়ে রাজকীয় বাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধ চালিয়ে শহীদ হন রানী লক্ষ্মীবাঈ।

পরবর্তীতে আরও তিনদিন পর ব্রিটিশ সেনাদল গোয়ালিয়র পুনর্দখল করে। যুদ্ধ শেষে জেনারেল হিউজ রোজ তার প্রতিবেদনে উল্লেখ করেন যে, ‘রানী তার সহজাত সৌন্দর্য্য, চতুরতা এবং অসাধারণ অধ্যবসায়ের জন্য স্মরণীয় হয়ে আছেন। এছাড়াও তিনি বিদ্রোহী সকল নেতা-নেত্রীর তুলনায় সবচেয়ে বিপজ্জনক ছিলেন।

কথিত আছে যুদ্ধে ভীষণরকম আহত রানী অনুমান করেছিলেন যে ইংরেজ সেনারা নিশ্চিতভাবে তার মৃতদেহের অসম্মান করবে। তাই তিনি এক সন্ন্যাসীকে অনুরোধ করেছিলেন, মৃত্যুর পর যেন তার দেহ গোপনে পুড়িয়ে ফেলা হয়।