প্রতিবন্ধকতা জয়ী নারী

ঢাকা, সোমবার, ৩০ নভেম্বর ২০২০ | ১৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৭

প্রতিবন্ধকতা জয়ী নারী

সাইফ-উদ-দৌলা রুমী ১২:৫০ অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ০৯, ২০২০

print
প্রতিবন্ধকতা জয়ী নারী

দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে অসামান্য অবদান রেখে যাচ্ছেন নারীরা। তৈরি পোশাক শিল্প, চিকিৎসা, শিক্ষা, সমাজ সংস্কার, হস্ত ও কুটির শিল্পে অভাবনীয় সাফল্য পেয়েছেন গাজীপুরের নারীরা। চলার পথে নানা প্রতিবন্ধকতা জয়ী নারীদের কথা তুলে ধরেছেন তানজেরুল ইসলাম। সম্পাদনা করেছেন সাইফ-উদ-দৌলা রুমী

রত্নগর্ভা নূরুন নাহার
১৯৬৫ সালে পঞ্চম শ্রেণীতে থাকা অবস্থায় বিয়ের পিঁড়িতে বসেন নূরুন নাহার সিদ্দিকী। লেখাপড়ার প্রতি তার অদম্য আগ্রহের মাঝে বাধার দেয়াল হয়ে দাঁড়াননি স্বামী আনিছুর রহমান সিদ্দিকী। স্ত্রীর ইচ্ছা পূরণে তিনি ভাই পরিচয়ে নূরুন নাহার সিদ্দিকীকে লেখাপড়া চালিয়ে যেতে হোস্টেলে ভর্তি করিয়ে দেন।

নূরুন নাহার সিদ্দিকী ১৯৬৮ সালে এসএসসি পাস করেন। তখন তার প্রথম পুত্র সন্তানের বয়স মাত্র ছয় মাস। দেশ স্বাধীনের পর ১৯৭৪ সালে নূরুন নাহার সিদ্দিকী যখন উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেন তখন তার দ্বিতীয় সন্তানের বয়স মাত্র ৩১ দিন। ১৯৭৮ সালে লড়াকু এ নারী স্নাতক পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে ফরম পূরণ করেন। যদিও পারিবারিক বিভিন্ন কারণে তিনি স্নাতক পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে পারেননি।

তবে নূরুন নাহার সিদ্দিকীর লেখাপড়া শেষ না করতে পারার আক্ষেপ পূরণ করেছেন তার সন্তানদের দিয়ে। তার চার ছেলে ও এক মেয়ে ঢাকা বিভাগের বিভিন্ন প্রান্তে শিক্ষা বিস্তারে অনন্য অবদান রেখে যাচ্ছেন। তার ছেলেরা হলেন ইকবাল সিদ্দিকী, শওকত সিদ্দিকী, হায়দার সিদ্দিকী এবং মিঠুন সিদ্দিকী। তার একমাত্র মেয়ে হোসনে আরা জুলি।

১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার পর নূরুন নাহার সিদ্দিকী জানতেন না তার স্বামী বেঁচে আছে কি না। সে সময় আনিছুর রহমান সিদ্দিকী পশ্চিম পাকিস্তানে সেনাবাহিনীতে কর্মরত ছিলেন। যুদ্ধ শুরু হলে আনিছুর রহমান সিদ্দিকী পাকিস্তান সেনাবাহিনীর টুপিতে থাকা চাঁদ ও তারা প্রতীকের রূপ পাল্টে দিয়ে নৌকা প্রতীক বানান। এতে ক্ষুব্ধ পাকিস্তানি সেনা কর্মকর্তারা তাকে কারাবন্দি করে রাখে। পরে তৎকালীন ব্রিগেডিয়ার বিলগ্রামী তাকে শর্ত সাপেক্ষে ছেড়ে দেওয়ার প্রস্তাব দিলেও আনিছুর রহমান সিদ্দিকী সেসব শর্ত প্রত্যাখ্যান করেন। দিনের পর দিন কারাবন্দি আনিছুর রহমান সিদ্দিকীর উপর মধ্যযুগীয় কায়দায় নির্যাতন চালায় পাক সেনারা। শুধু তাই নয়। তাকে লেন্সনায়েক থেকে পদাবনতি দিয়ে সৈনিক পদবী দেওয়া হয়।

নূরুন নাহার সিদ্দিকীর ভাসুরের ছেলে বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী। মুক্তিযুুদ্ধের সময় নূরুন নাহার সিদ্দিকী টাঙ্গাইল জেলায় ছিলেন। টাঙ্গাইলের কালিহাতী থানার ছাতিহাটি গ্রামের তিনমনা স্থানে বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকীর নেতৃত্বে ৬০ জন মুক্তিযোদ্ধা পাক বাহিনীর বিরুদ্ধে সম্মুখ যুদ্ধে লিপ্ত হয়। এটি ছিল বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকীর পরীক্ষা যুদ্ধ। সেই যুদ্ধে নূরুন নাহার সিদ্দিকী বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকীর পাশেই ছিলেন। তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের খাবার ও চিকিৎসাসেবা নিশ্চিতের দায়িত্বে ছিলেন। পরবর্তীতে টাঙ্গাইলের ঘাটাইল থানার মাকরাই এলাকায় ধলাপাড়া চৌধুরী বাড়িতে পাক বাহিনী ক্যাম্প গড়ে তোলে। সে সময় ঘাটাইল যাওয়ার পথে বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকীসহ মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে চিড়া, মুড়ি সরবরাহের দায়িত্বে ছিলেন নূরুন নাহার সিদ্দিকী। ওই থানার মাকরাই এলাকায় কাদের সিদ্দিকীর নেতৃত্বে পাক বাহিনীর জাহাজ ডুবিয়ে দেয় মুক্তিযোদ্ধারা। সেই যুদ্ধে মারা যায় ১২০ জন পাক সেনা।

নূরুন নাহার সিদ্দিকী বলেন, মুক্তিযুদ্ধের সময় কে আছে, কে নেই এসব ভাবনার সময় ছিল না। যুদ্ধ চলাকালে আমরা শুধু একে অপরকে প্রশ্ন করতাম ‘শেখ মুজিব কবে ফিরবেন।’ আমরা তার ফেরার অপেক্ষায় অধীর আগ্রহে ছিলাম। ১৯৭১-১৯৭৪। আমি জানতাম না আমার স্বামী বেঁচে আছে কি না। তবে শুধু মনে মনে ভাবতাম তিনি অবশ্যই ফিরবেন। তবে অনেকেই মনে করেছিল তিনি হয়ত আর ফিরবেন না। এ কারণে অনেকেই আমাকে লেখাপড়া চালিয়ে যেতে পরামর্শ দিয়েছিলেন। তবে তিনি ১৯৭৪ সালে স্বাধীন বাংলার মাটিতে ফিরে আসেন। যা ছিল বঙ্গবন্ধুর শেখ মুজিবুর রহমানের অবদান।


উদ্যোক্তা খাদিজা খানম
২০১৩ সালে ৩০ জন বিধবা, অসহায় এবং কর্মহীন নারীদের নিয়ে উদ্যোগী নারী উন্নয়ন সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেন খাদিজা খানম। সাত বছর পর বর্তমানে সংগঠনটির সদস্য সংখ্যা তিন শতাধিক। ব্লক, বাটিক, হস্তশিল্প, কুটির শিল্প ও কাপড় সেলাই কাজে শত শত নারীকে দক্ষ কারিগর হিসেবে গড়ে তোলার কারিগর খাদিজা খানম।

খাদিজা খানম ১৯৯৫ সালে এসএসসি এবং বিয়ের পর ২০১৪ সালে এইচএসসি পাস করেন। দুই সন্তানের জননী খাদিজা খানম বর্তমানে স্নাতকে অধ্যয়নরত। তিনি কাপাসিয়ার বরুণ গ্রামে দাম্পত্য জীবন শুরু করেন ২০০৬ সালে। স্বামী স্কুল শিক্ষক খুদে নেওয়াজ সরকার। বিগত দিনে খাদিজা খানম গাজীপুর চান্দনা চৌরাস্তা এলাকায় গ্রিন বাংলা সমবায় সমিতিতে মাঠকর্মী হিসেবে চাকরি করেছেন। ২০১০ সালে সেই চাকরি ছেড়ে তিনি কাপাসিয়া যুব উন্নয়ন প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে ২১ দিনের সেলাই প্রশিক্ষণে অংশ নেন।

পরে প্রশিক্ষণ শেষে যুব উন্নয়ন থেকে ৩৫ হাজার ঋণ নিয়ে সেলাই মেশিন কিনে প্রাথমিক পর্যায়ে তিনি দর্জির কাজ শুরু করেন। হাতের সেলাইয়ের পাশাপাশি তিনি ব্লক, বাটিক ও হস্তশিল্পের কাজ শিখে একটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন ২০১৩ সালে। একই বছর কাপাসিয়ার বিভিন্ন এলাকার বিধবা, অসহায় এবং বেকার নারীদের নিয়ে উদ্যোগী নারী উন্নয়ন সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেন তিনি। পরে সংগঠনটি সরকারিভাবে নিবন্ধিত হয়। সংগঠনটির শুরুতে নারী সদস্য সংখ্যা ছিল ৩০ জন। বর্তমানে সদস্য সংখ্যা তিন শতাধিক। খাদিজা খানম সমিতির সদস্যদের প্রশিক্ষিত করে গড়ে তুলেছেন হস্তশিল্প, কুটির শিল্প, সুই সুতার কাজ, তাল পাতা দিয়ে বিভিন্ন গৃহস্থালী সামগ্রী প্রস্তুত কাজ, ব্লক, বাটিক ও কাপড় সেলাইসহ বিভিন্ন ধরনের হাতের কাজে।

খাদিজা খানম বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে বিভিন্ন ক্যাটাগরির কার্যাদেশ সংগ্রহ করে সমিতির সদস্যদের দিয়ে কাজগুলো করিয়ে নেন। আড়ং ও অনলাইন ভিক্তিক বিভিন্ন জনপ্রিয় ব্যবসা প্রতিষ্ঠান থেকে বিগত দিনে কার্যাদেশ পেয়েছেন খাদিজা খানম। গত সাত বছর আগে তিনি ব্যবসায় ৩৫ হাজার টাকা বিনিয়োগ করলেও বর্তমানে ব্যবসায় বিনিয়োগ সাত লাখ টাকার বেশি। কাপাসিয়া বরুণ এলাকায় তিনি সাড়ে তিন কাঠা জমি কিনেছেন। এ ছাড়া ২০১৮ সালে যুব উন্নয়ন কেন্দ্র থেকে বিশ হাজার টাকা অনুদান পেয়েছেন।

২০১৫ সালে রোকেয়া দিবস উপলক্ষে সমাজ উন্নয়নে অসামান্য অবদান রাখার জন্য খাজিদা খানম জয়িতা পুরস্কার লাভ করেন। উদ্যোগী নারী উন্নয়ন সংগঠনের সদস্য হয়ে দরিদ্র পরিবারের নাছিমা, শিলাসহ আরও অনেকেই স্বাবলম্বী হয়েছেন। খাদিজা খানম বলেন, মহামারি করোনার কারণে গত কয়েক মাস ধরে কোনো কার্যাদেশ নেই। সরকারি কিংবা বেসরকারি উদ্যোগে সংগঠনটির সদস্যদের আর্থিক সহায়তা জোটেনি। গেল পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে সংগঠনটির সদস্যরা পাঁচ লাখ টাকার বেশি বিভিন্ন ধরনের পণ্য তৈরি করেছিল যা বর্তমানে অবিক্রিত রয়ে গেছে। এতে তাকে আর্থিক লোকসান গুণতে হচ্ছে। কিছু প্রতিষ্ঠান কার্যাদেশ দিয়েও কারোনার কারণে পণ্য নিচ্ছে না। এতে প্রাপ্য মজুরি বঞ্চিত হচ্ছে সমিতির সদস্যরা। তাকেও আর্থিক লোকসান গুণতে হচ্ছে। কার্যাদেশ ছাড়া এভাবে আর কয়েক মাস অতিবাহিত হলে তিনিসহ সমিতির তিন শতাধিক দরিদ্র পরিবারের কর্মজীবী নারীদের কর্মহীন হয়ে পড়ার আশঙ্কা করছেন তিনি।

সফল জননী মনোয়ারা বেগম
কতটা ত্যাগ ও পরিশ্রমে দুই কন্যা সন্তানকে চিকিৎসক বানানো যায়। কতটা মানসিক দৃঢ়তা এবং দেশ সেবার মনোভাব থাকলে একমাত্র ছেলেকে প্রকৌশলী বানিয়ে পিএইচডি সম্পন্নের জন্য কানাডায় পাঠানো যায়। গাজীপুরের কাপাসিয়া উপজেলার বড়জনা এলাকায় জন্মগ্রহণ করা মনোয়ারা বেগম একজন রত্নগর্ভা মা। সন্তানদের দেশ সেবায় মানুষের মতো মানুষ করে গড়ে তোলার দৃঢ় মানসিক চেতনার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত মনোয়ারা বেগম আলোকিত করেছেন গাজীপুর।

মনোয়ারা বেগম পারিবারিকভাবে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন গাজীপুর সদর উপেজলার বেগমপুর এলাকার মো. বেলায়েত হোসেনের সঙ্গে। বেলায়েত হোসেন অবসরপ্রাপ্ত পরিবার পরিকল্পনা পরিদর্শক। মনোয়ারা বেগম ১৯৮৫ সালে পরিবার পরিকল্পনা পরিদর্শিকা হিসেবে যোগদান করেন। সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে তিনি তার উপর অর্পিত সরকারি দায়িত্ব পালন করছেন ৩৫ বছরের বেশি সময় ধরে। মাত্র সাত দিন বয়সী মেয়েকে ঘরে রেখেও তিনি সরকারি দায়িত্ব পালন করেছেন। এখন তার অবসরে যেতে আর মাত্র চারটি বছর বাকি।

বন্ধুর পথে মনোয়ারা বেগমের জীবন যুদ্ধের প্রতিটি ধাপে ধাপে সংগ্রাম ও ত্যাগের উপমায় পরিপূর্ণ। তার বড় মেয়ে ডা. আফরোজা সুলতানা ২৮তম বিসিএস ক্যাডার। বর্তমানে তিনি কর্মরত আছেন ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। আরেক মেয়ে ডা. তাসলিমা বিনতে বেলায়েত ৩২তম বিসিএস ক্যাডার। তিনি কর্মরত আছেন একই মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। একমাত্র ছেলে ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক্স ইঞ্জিনিয়ার মিজানুর রহমান ঢাকা নর্থ সাউথ ইউনির্ভাসিটির শিক্ষক ছিলেন। বর্তমানে তিনি কানাডায় একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি করছেন। কঠোর শাসন এবং স্নেহ মমতা দিয়ে মনোয়ারা বেগম তিন সন্তানকে যোগ্য করে গড়ে তুলেছেন।

একমাত্র ছেলে নটর ডেম কলেজ এবং এক মেয়ে ভিকারুন্নেছা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেন। দুই সন্তানকে হোস্টেলে রেখে লেখাপাড়া চালিয়ে নিতে গিয়ে মাস শেষে সঞ্চয় তো দূরের কথা কখনও স্বামী-স্ত্রীকে অনাহারে-অর্ধাহারে থাকতে হয়েছে। দাম্পত্য জীবনে নিজেদের সুখ-আহ্লাদ সব কিছুই বিসর্জন দিয়েছেন এ দম্পতি। সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে সরকারি দায়িত্ব পালন করে মনোয়ারা বেগম ২০০৮ সালে জেলা এবং ২০০৯ সালে উপজেলা থেকে শ্রেষ্ঠ নির্বাচিত হয়ে পুরস্কৃত হয়েছেন। সন্তানদের মানব সেবায় মানুষের মতো মানুষ করে গড়ে তুলে সফল জননী ক্যাটাগরীতে গাজীপুর জেলা ও সদরে পৃথকভাবে শ্রেষ্ঠ জয়িতা পুরস্কার পেয়েছেন ২০১৩ সালে।

মনোয়ারা বেগম বলেন, নবম শ্রেণিতে অধ্যয়নরত অবস্থায় তিনি বিয়ের পিঁড়িতে বসেন। সংসারে ছয় ভাই-বোনের মধ্যে তিনি বড় ছিলেন। বাবার সংসারে নিজের লেখাপড়ার পাশাপাশি ছোট ভাই-বোনদের দেখাশুনা করতেন তিনি। সংসারের অনেক কাজও করতে হয়েছে তাকে। বিয়ের পর প্রথম সন্তান গর্ভে থাকাবস্থায় তিনি এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেন। শ্বশুরবাড়িতে তিনি যৌথ পরিবারে ছিলেন। যৌথ পরিবারটিতে তিনি তার তিন সন্তানসহ ২০ জনকে লেখাপড়া শিখিয়েছেন। নিজেও এইচএসসি পর্যন্ত লেখাপড়া চালিয়ে গেছেন। তার বড় মেয়ের স্বামী আব্দুল্লাহ আল বাকী সফট্ওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে স্যামসাং কোম্পানিতে কর্মরত। ছোট মেয়ের স্বামী আইটি ইঞ্জিনিয়ার আব্দুল্লাহ আল মাহফুজ কাজ করছেন নিজের আইটি ফার্মে।

মনোয়ারা বেগম তার শশুরবাড়ি বেগমপুরে একটি হাসপাতাল গড়ে তুলতে চান। সেখানে গরিব এবং অসহায় মানুষের চিকিৎসাসেবার দায়িত্ব দিতে চান তার দুই মেয়েকে। স্বামী-স্ত্রী দুজন সরকারি চাকরিজীবী ছিলেন। অথচ তার বাড়িতে কখনও গৃহপরিচারিকা ছিল না। সন্তানদের তিনি এমন আদর্শেই নিজের কাজ নিজেকেই করতে শিখিয়েছেন।

স্বার্থক মা হলে সন্তানরা সাফল্যের মুখ দেখবেই। জয়িতা শুধু আমি একাই নই। জয়িতা যাতে এদেশের প্রতিটি ঘর থেকেই জন্ম নেয়।

এনজিওকর্মী থেকে জনপ্রতিনিধি
নূরজাহান আক্তার একটি এনজিওর মাঠকর্মী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন নয় বছর। চাকরিকালে ১৯৯০ সালে দাম্পত্য জীবন শুরু করেন।

তার স্বামী মো. নূরুল আমীন তৎকালীন সময়ে বেকার ছিলেন। এনজিও চাকরির পাশাপাশি নূরজাহান আক্তার একটি বীমা কোম্পানিতে চাকরি করছেন দুই যুগেরও বেশি সময় ধরে। বিগত দিনে নূরজাহান আক্তার এনজিও কর্তৃক পরিচালিত একটি স্কুলে শিক্ষকতা করেছেন তিন বছর। তৃণমূলের মানুষের সঙ্গে বিশেষ করে নারীদের ভাগ্যোন্নয়নে নূরজাহান আক্তার দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন। সুনাম কুড়িয়েছেন গাজীপুর শ্রীপুর উপজেলার এক নম্বর মাওনা ইউনিয়নে। মানুষের আস্থা, ভালোবাসা ও বিশ্বাসে এক সময়ের এনজিও কর্মী নুরজাহান আক্তার এখন জনপ্রতিনিধি।

একজন জনপ্রতিনিধি হিসেবে তৃণমূলে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ ও সমন্বয় রক্ষার কারণে নূরজাহান আক্তার শ্রীপুর এক নম্বর মাওনা ইউনিয়নের পরিচিতি পেয়েছেন। অভাবের সংসারে লড়াই করে বড় হয়ে উঠা নূরজাহান এক যুগেরও বেশি সময় ধরে নারী ইউপি সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। অথচ এখনও তিনি স্বচ্ছলতার মুখ দেখেননি। বিগত দিনে শ্রীপুর এক নম্বর মাওনা ইউনিয়ন পরিষদের এক, দুই ও তিন নম্বর ওয়ার্ডের নারী সদস্য হিসেবে ভোটে নির্বাচিত হয়ে একটানা দায়িত্ব পালন করেন প্রায় আট বছর। পরবর্তীতে আবার নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে তিনি নির্বাচিত হয়ে বর্তমানে দায়িত্ব পালন করছেন। সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে এক যুগেরও বেশি সময় ধরে জনপ্রতিনিধির দায়িত্ব পালন করে নারীদের ভাগ্যোন্নয়নে অসামান্য অবদান রেখেছেন এ ইউপি সদস্য।

বাল্যবিয়ে, নারী ও শিশু নির্যাতন বন্ধে সর্বমহলে প্রশংসিত হয়েছেন নূরজাহান আক্তার। অগণিত নারী ও পুরুষকে তিনি বিভিন্ন শিল্প প্রতিষ্ঠানে কর্মসংস্থানের সুযোগ করে দিয়েছেন। ইউনিয়নটির দরিদ্র পরিবারের গর্ভবতী নারীদের তালিকা করে ভাতা প্রদান, বয়স্ক, বিধবা ও প্রতিবন্ধীদের ভাতা প্রদানের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা রক্ষা করেছেন নূরজাহান আক্তার। নারীদের পারিবারিক ও সামাজিক বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতা দূরীকরণে মাঠ পর্যায়ে কাজ করে যাচ্ছেন তিনি।

নূরজাহান আক্তার বলেন, ইউনিয়নটি দরিদ্র পরিবারের অগণিত গৃহিণী সংসারে দায়িত্ব পালন করছেন।

এসব দরিদ্র পরিবারের নারীদের সাবলম্বী করতে, ঘরে বসেই হস্তশিল্প ও কুটির শিল্প কাজে প্রশিক্ষিত করে গড়ে তোলা জরুরি হয়ে পড়েছে। এজন্য চাই সরকারি এবং বেসরকারি সহযোগিতা।


স্বনির্ভর সিমা চৌধুরী
সকল সামাজিক প্রতিবন্ধকতা ডিঙ্গিয়ে এদেশের কর্মজীবী নারীরা অপ্রতিরোধ্য গতিতে এগিয়ে চলছে স্বনির্ভরতার দিকে। এসব কর্মজীবী, পরিশ্রমী এবং ত্যাগী নারীরা বাংলাদেশকে সারা বিশ্বে নারী জাগরণের কেন্দ্রস্থল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। এরই ধারাবাহিকতায় গাজীপুর পূবাইল মীরের বাজারের আশরাফুল ইসলামের স্ত্রী সিমা চৌধুরী তানহা নিজেকে গড়ে তুলেছেন একজন সফল নারী উদ্যোক্তা হিসেবে।

সিমা চৌধুরী গাজীপুর শ্রীপুর মাওনা চৌরাস্তা বাজার সড়কে ‘নারী অঙ্গন’ নামে একটি দোকানে কসমেটিকস্, টেইলারিং ও বুটিকস্ ব্যবসা শুরু করেন গত তিন বছর আগে। প্রাথমিক পর্যায়ে তিনি মাত্র ৫০ হাজার টাকা বিনিয়োগের মাধ্যমে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানটি গড়ে তোলেন। নিজেকে সাবলম্বী করে গড়ে তুলতে স্বামীর বাড়ি ছেড়ে তিনি শ্রীপুর মাওনায় শামসুল হকের বাড়িতে ভাড়াটিয়া হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে বসবাস করছেন। ২০১৯ সালে জয়িতা ফাউন্ডেশন থেকে সিমা চৌধুরীকে একজন সফল নারী উদ্যোক্তা হিসেবে পুরস্কৃত করা হয়। সিমা চৌধুরী ১৯৯৯ সালে ঢাকা মিরপুর বাংলা কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন।

সিমা চৌধুরী জানান, বিশ্বায়নের যুগেও নারীরা যেমন অসহায় তেমনি সমাজে অবহেলিত। স্বামীর কর্মজীবনের উপর একজন গৃহিনীর নির্ভরশীলতা, নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার অনাগ্রহ সমাজে নারীরা পিছিয়ে পড়ার অন্যতম কারণ। নারী শুধু স্বামী-সন্তানের জন্য’ কথিত এ সামাজিক প্রথা ভেঙে তিনি সমাজে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন। তিল তিল করে গত তিন বছর ধরে তিনি তার ব্যবসা প্রতিষ্ঠানটি গড়ে তুলেছেন। শ্রীপুরে বাটিক থ্রি-পিস, ব্লক থ্রি-পিস, হ্যান্ডপিস, ওড়না, শাড়ি ও বিভিন্ন উপহার সমগ্রীর ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। ক্রেতাদের এ চাহিদা তাকে ব্যবসায় অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে। ব্যবসার পরিধি বাড়াতে তিনি লড়াই সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছেন প্রতিনিয়ত।

সমাজে স্বাবলম্বী নারী হওয়ার কৃতিত্ব একজন নারীকে পরিপূর্ণতা দিতে পারে। মাত্র তিন বছরে ব্যবধানে তিনি তার ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠানে পাঁচ লাখ টাকা বিনিয়োগ করেছেন। অথচ ব্যবসা শুরু করেছিলেন মাত্র ৫০ হাজার টাকা বিনিয়োগ করে। তার ব্যবসা প্রতিষ্ঠানটিতে তিনি দুজনকে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করেছেন।

তিনি আরও বলেন, বর্তমানে দেশে করোনা পরিস্থিতির কারণে জয়িতা ফাউন্ডেশন ও জয়িতা ফাউন্ডেশনের সক্ষমতা বিনির্মাণ প্রকল্পের যৌথ উদ্যোগে নারী উদ্যোক্তাদের অনলাইন ব্যবসার প্রতি জাগরিত করছে। এরই ধারাবাহিকতায় ইতিমধ্যে তিনি ‘নারী অঙ্গন’ নামে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেইসবুকে একটি পেজ খুলেছেন। অনলাইন ভিত্তিক এ পণ্য বিক্রি কার্যক্রমে ক্রেতাদের সাড়া মিলেছে বেশ আশাব্যঞ্জক। ক্রেতারা দোকানে না এসেও পছন্দের পণ্যটি ক্রয় করতে পারছেন অনায়াসে।

এতে করে ক্রেতাদের অর্থ এবং সময় দুটোই কম অপচয় হচ্ছে। সমাজে একজন নারী উদ্যোক্তা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে চাইলে বহুমুখি প্রতিবন্ধকতা শিকার হতে হয়। তবে এসব প্রতিবন্ধকতা উপেক্ষা করে ইতিবাচক মনোভাব নিয়ে কঠোর পরিশ্রম ও মেধা কাজে লাগিয়ে একজন নারীকে নিজেকে সফল হিসেবে সমাজে প্রতিষ্ঠিত করতে হয়।