ইতিহাসের পাতায় নারী

ঢাকা, রবিবার, ২৯ নভেম্বর ২০২০ | ১৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৭

ইতিহাসের পাতায় নারী

সাইফ-উদ-দৌলা রুমী ১২:৪৩ অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ০২, ২০২০

print
ইতিহাসের পাতায় নারী

আধুনিক যুগকে ধরা হয় নারীমুক্তি ও জাগরণের যুগ। এ যুগেই নারীর প্রতি বৈষম্য ও বঞ্চনাকে উপলব্ধি করার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। রাষ্ট্র এবং সমাজ উন্নয়নে নারীরও রয়েছে ভূমিকা। ইতিহাসেও ঠাঁই করে নিয়েছে নারী। ইতিহাসের পাতায় লিপিবদ্ধ হয়েছে এমন কয়েকজন নারীকে নিয়ে আজকের আয়োজন। সম্পাদনা করেছেন সাইফ-উদ-দৌলা রুমী

 

মহীয়সী মাদার তেরেসা
আমৃত্যু আর্তমানবতার সেবায় নিজেকে বিলিয়ে দিয়ে সারাবিশ্বের মানুষের হৃদয়ে অমর হয়ে আছেন মহীয়সী মাদার তেরেসা। মানুষের মাঝে তিনি খুঁজে নিয়েছিলেন ঈশ্বরকে, তার কাছে ছিল না কোনো জাতি-ধর্মের ভেদাভেদ, মানবসেবাকেই ধর্ম হিসেবে নিয়েছিলেন তিনি।

মাদার তেরেসার আসল নাম আগনেস গঞ্জা বয়াজু। মেসিডোনিয়ার স্কোপি শহরে ১৯১০ সালের ২৬ আগস্ট একটি ক্যাথলিক পরিবারে জন্ম তার। জন্ম শহর স্কোপিতে প্রাথমিক লেখাপড়া সম্পন্ন করেন তিনি। তিন ভাই-বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন সবার ছোট।

১৯১৯ সালে মাত্র নয় বছর বয়সে মাদার তেরেসা পিতৃহারা হন। আকস্মিক এ বিপর্যয়ের ফলে তেরেসার মা ভীষণ মুষড়ে পড়েন। জীবনের এ সংগ্রাম থেকে দারিদ্র্য আর প্রতিকূলতাকে সাহস ও উদ্দীপনার সঙ্গে গ্রহণ করার তৎপরতা আবিষ্কার করেন মাদার তেরেসা। বাবার মৃত্যুর পর মা তাকে রোমান ক্যাথলিক আদর্শে লালন-পালন করেন। মাত্র ১৮ বছর বয়সে সন্যাসব্রত গ্রহণ করার সিদ্ধান্ত নেন তেরেসা। ১৯২৮ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর গৃহত্যাগ করে সিস্টার্স অব লরেটো সংস্থায় যোগ দেন সিস্টার হিসেবে।

মা আর দিদিদের সঙ্গে মাদার তেরেসার আর কোনোদিন দেখা হয়নি।তৎকালীন সময়ে ভারতে বাংলায় ধর্মীয় কাজ করতেন যুগোসøাভিয়া ধর্মযাজকরা। তাদের সিদ্ধান্ত ছিল, লরেটা সিস্টারদের মধ্যে যারা আইরিশ সম্প্রদায়ভুক্ত তারা যাবেন ভারতবর্ষের মতো এলাকায় কাজ করতে। মাদার তেরেসা তাদের সঙ্গে যুক্ত হয়ে কাজ শুরু করতে চাইলেন। ব্রিটিশ শাসিত ভারতের দার্জিলিংয়ে ১৯২৮ সালে সন্ন্যাসিনী হওয়ার প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন তিনি। ১৯২৯ সালের ৬ জানুয়ারি কলকাতা আসেন তিনি। ১৯৩১ সালের ২৪ মে সর্বপ্রথম দারিদ্র্য, বার্ধক্য ও সংযমের সাময়িক সংকল্প গ্রহণ করেন তেরেসা। লরেটো কনভেন্ট স্কুলে শুরু হয় তার শিক্ষিকা জীবন।

পাশাপাশি তিনি একটি হাসপাতালেও কাজ করতেন। সেখানেই সর্বপ্রথম দুঃখ ও দারিদ্র্যের সঙ্গে তাকে সংগ্রাম করতে হয়, যা ছিল তার কল্পনারও বাইরে। শিক্ষিকা হিসেবে তিনি ছিলেন অত্যন্ত ভালো এবং সফল। ১৯৩৭ সালের ১৪ মে সিস্টার তেরেসা তার জীবনের গতি পরিবর্তনের চিন্তা করে সন্ন্যাসিনীর জীবন বেছে নেন।
দুস্থ মানুষকে সাহায্য করার কাজটি যেন তার কাছে নেশার মতো হয়ে গেল। আর্তমানবতার সেবা করার জন্যই যেন তার জন্ম হয়েছে। আজীবন এটাই তিনি করতে চান। এরপর সত্যি সত্যি তিনি সম্পূর্ণভাবে মানবসেবায় আত্মনিয়োগ করার সংকল্পে লরেটো স্কুলের চাকরি ছেড়ে দেন।

এরপর মাত্র ১২ জন সদস্য নিয়ে ১৯৫০ সালের ৭ অক্টোবর প্রতিষ্ঠা করেন মিশনারিজ অব চ্যারিট। ১৯৫২ সালে এ চ্যারিটির অধীনেই গড়ে উঠে নির্মল হৃদয়, কুষ্ঠ রোগীদের জন্য শান্তিনগর। ১৯৫৫ সালে স্থাপন মাদার তেরেসা স্থাপন করেন নির্মল শিশুভবন। ১৯৬৩ সালে গড়ে তোলা হয় মিশনারিজ অব চ্যারিটির ব্রাদার শাখা। মাত্র ১২ জন সদস্য নিয়ে যে চ্যারিটির যাত্রা শুরু হয়েছিল সময়ের ব্যবধানে তা কয়েক হাজারে পৌঁছায়।

মানবতা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে মাদার তেরেসা ঘুরে বেড়িয়েছিলেন পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্ত। সব বাধা পেরিয়ে গড়ে তোলেন মানবতার বিরল দৃষ্টান্ত। ১৯৪৮ সালের ২১ ডিসেম্বর তিনি ভারতের নাগরিকত্ব লাভ করেন। ১৯৯৭ সালের ৫ সেপ্টেম্বর কলকাতার মাদার হাউসে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন এ মহাত্মা নারী।

প্রথম নারী মহাকাশচারী
ভ্যালেন্তিনা তেরেসকোভা বিশ্বের প্রথম নারী যিনি মহাশূন্যে পরিভ্রমণ করেন। ১৯৬৩ সালের ১৬ জুন মহাকাশযান ভস্তক-৬ এ করে ৭১ ঘণ্টায় ৪৮ বার কক্ষপথ পরিভ্রমণ করেন।

চার শতাধিক আগ্রহী নারীর মধ্য থেকে তিনি মহাশূন্য অভিযানের জন্য সুযোগ পেয়েছিলেন। নভোচারী দলে যোগদানের ফলে সোভিয়েত বিমান বাহিনীতে প্রথম বেসামরিক ব্যক্তি হিসেবে মহাকাশ গমনের সৌভাগ্য অর্জন করেন। ভস্তক-৫ এর নভোচারী ভ্যালেরি এফ. বাইকোভস্কিকে সঙ্গে নিয়ে ১৯ জুন পৃথিবীতে অবতরণ করেন।

এখন পর্যন্ত ৫৩৪ জন মহাকাশচারী মহাকাশ ভ্রমণ করেছেন এর মধ্যে নারী মহাকাশচারী হচ্ছেন ৫৭ জন। ১৯৬২ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি সোভিয়েত প্রকৌশলী সার্জেই করোলভ মহাকাশে প্রথম নারী নভোচারী পাঠানোর চিন্তা করেন এবং এ জন্য প্রাথমিকভাবে নির্বাচন করা হয় ৪০০ জন নারীকে। ৪০০ জনের মধ্য থেকে নির্বাচিত করা হয় তাতিয়ানা কুজনেতসোভা, ইরিনা সলোভোভা, ঝান্না ইয়োরোকিনা, ভ্যালেন্তিনা, পনোমারিয়োভা এবং ভ্যালেন্তিনা তেরেসকোভা। এদের মধ্যে ভ্যালেন্তিনা তেরেসকোভা প্রথম নারী নভোচারী হিসেবে ১৯৬৩ সালের ১৬ জুন মহাকাশে পাড়ি জমান।

তেরেসকোভা ১৯৫৯ সালে স্থানীয় একটি ক্লাব অ্যারোক্লাবে স্কাই ডাইভিংয়ের জন্য প্রশিক্ষণ নেন। ১৯৫৯ সালের ২১ মে তিনি প্রথম আকাশ থেকে লাফ দেন। তিনি কমিউনিস্ট লীগের সদস্য ছিলেন এবং প্যারাসুট থেকে ঝাঁপ দিয়ে বিশেষ কৃতিত্ব লাভ করেন। মোট ১২৬ বার তিনি প্যারাসুট থেকে লাফিয়ে পড়েন।

তেরেসকোভা সৌখিন প্যারাসুট আরোহী হিসেবে অংশ নেন। তাই তাকে মহাশূন্য প্রকল্পে অংশগ্রহণের সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। সাফল্যজনকভাবে তিনি প্রশিক্ষণ শেষ করেন, ১৯৬৩ সালে নভোযানে করে সর্বপ্রথম নারী হিসেবে পৃথিবী প্রদক্ষিণ করেন। তিনি ৪৯ বার পৃথিবী প্রদক্ষিণ করেন। তেরেসকোভা সোভিয়েত ইউনিয়নের বীর এবং দুবার অর্ডার অব লেনিন পুরস্কারে ভূষিত হন।

আধুনিক নার্সিং সেবার অগ্রদূত
ফ্লোরেন্স নাইটিংগেল ছিলেন আধুনিক নার্সিং সেবার অগ্রদূত, একজন লেখক এবং পরিসংখ্যানবিদ। তিনি দ্যা লেডি ইউথ দ্যা ল্যাম্প নামে পরিচিত ছিলেন। ১৮২০ সালের ১২ মে অভিজাত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন ফ্লোরেন্স নাইটিংগেল। তার বাবা উইলিয়াম এডওয়ার্ড নাইটিংগেল এবং মা ফ্রান্সিস নাইটিংগেল।

জীবদ্দশায় তিনি ১৮৫৩ সাল থেকে ১৮৫৪ সাল পর্যন্ত লন্ডনের কেয়ার অব সিক জেন্টলওমেন ইনিস্টিটিউটের তত্ত্বাবধায়ক হিসাবে কাজ করে গেছেন। ১৮৫৫ সালে তিনি নার্স প্রশিক্ষণের জন্য তহবিল সংগ্রহের জন্য কাজ শুরু করেন।

নিরলস প্রচেষ্টায় ১৮৫৯ সালে তিনি নাইটিংগেল ফান্ডের জন্য সংগ্রহ করেন প্রায় ৪৫ হাজার পাউন্ড। পরবর্তী সময়ে তিনি ভারতবর্ষের গ্রামীণ মানুষের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার উপর গবেষণা চালান। যা ভারতবর্ষে উন্নত স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে।

ইংল্যান্ডের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা উন্নয়নেও তিনি বিশেষ ভূমিকা পালন করেছেন। ১৮৫৯ সালে তিনি রয়্যাল স্ট্যাটিসটিক্যাল সোসাইটির প্রথম সারির সদস্য নির্বাচিত হন। লন্ডনের সেন্ট থমাস হাসপাতালে নার্সিংকে সম্পূর্ণ পেশারূপে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য ১৮৬০ সালে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন নাইটিংগেল ট্রেনিং স্কুল। যার বর্তমান নাম ফ্লোরেন্স নাইটিংগেল স্কুল অব নার্সিং।

ডা. এলিজাবেথ ব্ল্যাকওয়েলের সঙ্গে যৌথভাবে ১৮৬৭ সালে নিউইয়র্কে চালু করেন উইমেন্স মেডিকেল কলেজ। এ ছাড়াও তিনি বিভিন্ন সময় নার্সিংয়ের উপর বইও লিখেছেন। তিনি অসংখ্য পদক আর উপাধিতে ভূষিত হয়েছেন। ১৮৮৩ সালে রানী ভিক্টোরিয়া তাকে রয়েল রেডক্রস পদক প্রদান করেন। প্রথম নারী হিসেবে অর্ডার অব মেরিট খেতাব লাভ করেন ১৯০৭ সালে।

১৯০৮ সালে লাভ করেন লন্ডন নগরীর অনারারি ফ্রিডম উপাধি। এ ছাড়াও ১৯৭৪ সাল থেকে তার জন্মদিন ১২ মে পালিত হয়ে আসছে ইন্টারন্যাশনাল নার্সেস ডে। যার মধ্যমে সম্মান জানানো হয় এক নারীকে যিনি তার কর্মের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠা করেছেন নার্সিং একটি পেশা নয় সেবা। ১৯১০ সালের ১৩ আগস্ট ৯০ বছর বয়সে লন্ডনে নিজ বাসভবনে মৃত্যুবরণ করেন যাত্রী ফ্লোরেন্স নাইটিংগেল। ফ্লোরেন্স নাইটিংগেলের সবচেয়ে বিখ্যাত অবদান ছিল ক্রিমিয়ার যুদ্ধে, যখন ব্রিটেনে যুদ্ধাহতদের করুণ অবস্থার বিবরণ আসে তখন এটি তার চিন্তার মূল বিষয় হয়ে দাঁড়ায়।

১৮৫৪ সালের ২১ অক্টোবর তিনি এবং তার কাছেই প্রশিক্ষিত ৩৮ জন সেবিকা, তার আত্মীয় মেই স্মিথ এবং ক্যাথোলিক ১৫ নানসহ অটোম্যান সম্রাজ্যে যান। নাইটিংগেল প্যারিসে তার বান্ধবী মেরী ক্লার্কের সহযোগিতা পেয়েছিলেন। তাদের ক্রিমিয়ার ব্লাক্লাভার ব্ল্যাক সি এর ২৯৫ নটিক্যাল মাইল এলাকা জুড়ে প্রেরণ করা হয়, যেখানে ব্রিটিশদের মূল ঘাঁটি ছিল। তার অবদান স্মরণ রাখতে ১৮৫৫ সালের ২৯ নভেম্বর ক্রিমিয়ায় সেবিকাদের প্রশিক্ষণের জন্য নাইটিংগেল ফান্ড গঠন করা হয়। সেখানে প্রচুর সাহায্য আসতে থাকে। সিডনি হারবার্ট ফান্ডের সচিব এবং ডিউক অফ ক্যামব্রিজ চেয়ারম্যান হন। নাইটিংগেলকে মেডিকেল ট্যুরিজমের অগ্রদূত ভাবা হয়, ১৮৫৬ সালে অটোম্যান সাম্রাজ্যের স্পা বর্ণনা করে তার চিঠিগুলোর জন্য। তিনি সেখানকার স্বাস্থ্য ব্যবস্থার নানান দিক তুলে ধরেন যেগুলো সুইজারল্যান্ডের তুলনায় সস্তা ছিল।

নাইটিংগেল নোটস অন নার্সিং নামে একটি বই লিখেন ১৮৫৯ সালে। এ বই নাইটিংগেল স্কুলসহ অন্যান্য নার্সিং স্কুলে পাঠ্যসূচির ভিত্তি হিসেবে কাজ করে। যদিও এটা বাড়িতে সাধারণ স্বাস্থ্যসেবার জন্য লেখা হয়েছিল।

নাইটিংগেল লিখেন, ‘প্রতিদিন পরিষ্কার থাকার জ্ঞান, অথবা নার্সিংয়ের জ্ঞান অন্য কথায় কিছু নিয়মাবলী যা নিয়ে যাবে রোগমুক্ত অবস্থায় অথবা রোগ থেকে মুক্ত করবে, আরও ভালো করবে, এটা সার্বজনীন জ্ঞান যা সবার থাকা উচিত, চিকিৎসাশাস্ত্র থেকে কিছুটা আলাদা যেটি নির্দিষ্ট পেশার মানুষে সীমাবদ্ধ।’

নারী যোদ্ধা পাইলট সাবিহা
আকাশ জয়ের গল্প রয়েছে নারীর। এমই একজন নারী সাবিহা গকসেন। উনিশ শতকে তুরস্ক দেখেছিল এ নারী যোদ্ধা পাইলটকে। সাবিহা পৃথিবীর প্রথম নারী যোদ্ধা পাইলট। মাত্র ২৩ বছর বয়সে তিনি ইস্কিসিরের সামরিক বিমান বাহিনীতে যোগ দেন।

যদিও অন্যান্য ভূমিকায় তার আগে ম্যারি মারভিন্ত ও ইহিনি মেখেইলোভনারকে দেখা গিয়েছিল। সাবিহা মোস্তফা কামাল আতাতুর্কের পালিত আট সন্তানের মধ্যে অন্যতম। তবে তার নাগরিকত্ব নিয়ে ছিল বিতর্ক।

প্রথম নারী চিকিৎসক
এলিজাবেথ ব্ল্যাকওয়েল ছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম নারী চিকিৎসক। তিনি জন্মেছিলেন ১৮২১ সালে ইংল্যান্ডের ব্রিস্টলে। যখন তার বয়স ১১ বছর তখন তিনি সপরিবারে যুক্তরাষ্ট্রে চলে আসেন। যুক্তরাষ্ট্রের মেডিকেল স্কুল থেকে প্রথম নারী চিকিৎসক হিসেবে গ্র্যাজুয়েট ডিগ্রি লাভ করেন। পরে ১৮৬০ সালে তিনি নারীদের জন্য প্রথম একটি মেডিকেল স্কুল স্থাপন করেন।

মেডিকেল স্কুল নির্মাণের পরে তিনি একটি ক্লিনিকও নির্মাণ করেন। যা নিউইয়র্ক ডিসপেন্সারি নামে সবার কাছে পরিচিত ছিল। ১৮৫৩ সালে নির্মিত এ ক্লিনিকে দরিদ্র নারী ও শিশুদের চিকিৎসা দেওয়া হতো। ১৮৫৭ সালে তার সহকর্মী এবং তার বোন এমিলি ব্ল্যাকওয়েলের সহযোগিতায় একটি হাসপাতাল নির্মাণ করেন। যেখানে অভাবী নারী ও শিশুদের চিকিৎসা সেবা দেওয়া হতো। ওই বছরই প্রথম নারী চিকিৎসক হিসেবে ব্রিটিশ মেডিকেল রেজিস্ট্রারে তার নাম লিপিবদ্ধ হয়।

কিন্তু ব্রিটিশ আমলেও একজন নারী হিসেবে চিকিৎসাশাস্ত্রে অধ্যয়ন করা তার জন্য সহজ কাজ ছিল না। ডাক্তার হওয়ার ইচ্ছে পরিবারের সদস্যদের কাছে বললে, সাধুবাদ জানালেও এলিজাবেথের পক্ষে ডাক্তার হওয়া অসম্ভব তাও মনে করিয়ে দিয়েছিলেন তারা। কারণ তৎকালীন সময়েও চিকিৎসাশাস্ত্রে পড়ালেখা করা অনেক ব্যয়বহুল এবং তখন পর্যন্ত কোনো নারীই ওই পেশায় ছিলেন না।

তবে কোনোকিছুই বাধা হয়ে আসতে পারেনি এলিজাবেথের সামনে। ঠিকই পারিবারিক দুই চিকিৎসককে পটিয়ে ফেলেন তিনি এবং এক বছর তাদের কাছে অধ্যয়ন করেন। তৎকালীন সময়ে তিনি ১২টি ডাক্তারি স্কুলে আবেদনপত্র জমা দিয়েছিলেন, কিন্তু নারী হওয়ার কারণে প্রত্যেক স্থান থেকেই তিনি হয়েছিলেন প্রত্যাখ্যাত।

বাবার মৃত্যুর পর ১৮৩৮ সালে তিনি ইংল্যান্ড থেকে যুক্তরাষ্ট্রে ফিরে যান। সেখানেই মা আর বোনের সঙ্গে বসবাস করতে শুরু করেন। ১৮৩৮ সালে তাদের সহযোগিতায় গড়ে তোলেন একটি মেডিকেল স্কুল। পরবর্তীতে তিনি চিকিৎসা বিজ্ঞানকে তার পেশা হিসেবে বেছে নেন এবং তার নির্মিত স্কুলটিতে করতে থাকেন ব্যক্তিগত চিকিৎসা চর্চা। স্বাধীনভাবে চিকিৎসা সেবা শুরু করার আগে তিনি ১৮৪৭ সালে নিউইয়র্কের জেনেভা মেডিকেল কলেজে অধ্যয়নরত ছিলেন।

তার মেডিকেল স্কুলটিতে নারীদের বিভিন্ন রকম স্বাস্থ্য জ্ঞান দেওয়া হতো। কর্মজীবনে তিনি যুক্তরাষ্ট্র স্যানিটারি কমিশন গড়ে তুলতে সহায়তা করেছিলেন। পরবর্তীতে তারই একজন ছাত্রের তৈরি লন্ডনের একটি মেডিকেল কলেজে শিক্ষকতা শুরু করেন। ১৮৭৭ সালে তিনি তার কর্মজীবন থেকে অবসর নেন। ১৯১০ সালের ৩১ মে মৃত্যু হয় প্রথম এ নারী চিকিৎসকের।

১৮৯৫ সালে এলিজাবেথ প্রথম চিকিৎসাশাস্ত্রের উপর একটি বই প্রকাশ করেছিলেন। পাঠকদের কথা চিন্তা করে যতটা তিনি ওই বইটি লিখেছিলেন তার চেয়েও বইটিতে মেটাফিজিক্স নিয়ে আলোকপাত করা হয়েছিল। যাতে তার মৃত্যুর অনেক পরে ব্রিটিশ অধ্যাপকরা এলিজাবেথের মেটাফিজিক্স নিয়ে কাজগুলো পড়তে পারেন। বইয়ে তিনি লিখেছিলেন, ‘আমার প্রিয় বিষয় হলো ইতিহাস এবং মেটাফিজিক্স। আমাদের এ যে শরীর তা মূলত অনেকগুলো গড়নের সন্নিবেশ। কোনো চিকিৎসাশাস্ত্রই এ গড়নগুলোকে পরিপূর্ণরূপে বুঝতে পারবে কিনা সে বিষয়ে যথেষ্ট সন্দেহ আছে।’

পরিবেশবাদী ওয়াঙ্গারি
১৯৪০ সালের পহেলা এপ্রিল কেনিয়ার নায়েরি শহরে জন্মগ্রহণ করেন ওয়াঙ্গারি মাথাই। তিনি ছিলেন প্রথম কেনীয় নাগরিক যিনি নোবেল শান্তি পদক পেয়েছিলেন। এছাড়া পূর্ব এবং মধ্য আফ্রিকায় তিনিই প্রথম ডক্টরেট ডিগ্রি অর্জনকারী নারী। ১৯৭৭ সালে গ্রিন বেল্ট মোভমেন্ট নামের পরিবেশবাদী সংগঠন প্রতিষ্ঠার পর থেকে আজীবন পরিবেশ রক্ষায় সংগ্রাম করেছেন মাথাই।

পরিবেশবাদী ও সামজসেবী নারী মাথাইয়ের নেতৃত্বে তার সংগঠন গোটা আফ্রিকা জুড়ে প্রায় চার কোটি বৃক্ষরোপণ করেছে। কেনিয়ার বাইরে মধ্য আফ্রিকার কঙ্গো অববাহিকার বনাঞ্চলে বনায়নে এবং বৃক্ষ নিধন ঠেকাতে কাজ করেছেন ওয়াঙ্গারি মাথাই।

এছাড়া নাগরিক ও নারী অধিকারের জন্যও আজীবন লড়াই চালিয়ে গেছেন এ সংগ্রামী নারী। সত্তরের দশকে কেনিয়া রেড ক্রসের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন তিনি। ২০০২ সালে ৯৮ শতাংশ ভোট পেয়ে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ২০০৩ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত কেনিয়ার পরিবেশ বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন তিনি। মাথাইয়ের পরিবেশ রক্ষার আন্দোলন ক্রমে কেনিয়ায় গণতন্ত্র ও শান্তিশৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা এবং শোষণ দুর্নীতি বিরোধী আন্দোলনে রূপ নেয়। দীর্ঘদিন কারাগারেও কাটাতে হয়েছে তাকে।

মাথাই তার পরিবেশ ও সামজবাদী কাজের স্বীকৃতি স্বরূপ ২০০৪ সালে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন। ২০১১ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর গর্ভাশয়ের ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে মারা যান তিনি।

নোবেল জয়ী ডায়ানা
প্রিন্সেস ডায়ানা ছিলেন সৌন্দর্য আর ফ্যাশনে অদ্বিতীয় নারী ব্যক্তিত্ব। তার জন্ম ১৯৬১ সালের ১ জুলাই, স্পেন্সার পরিবারে। তার কুমারী নাম ছিল ডায়ানা স্পেন্সার। রাজপরিবারের সঙ্গে তাদের বেশ ঘনিষ্ঠতা ছিল। ডায়ানার পিতামহী ছিলেন রানী এলিজাবেথের ঘনিষ্ঠ বান্ধবী। সে সময় থেকেই হয়তো তাকে রাজপরিবারের বধূ করার পরিকল্পনা ছিল রানীর। ১৯৭৫ সালে স্পেন্সার পরিবারকে আর্ল অব স্পেন্সার পদবিতে ভূষিত করা হয় এবং ১৯৮১ সালে ডায়ানাকে বধূ হিসেবে বরণ করে নেয় ইংল্যান্ডের রাজপরিবার।

মাত্র ২০ বছর বয়সে রাজপরিবারের বধূ হয়ে অভিজাত পরিবারের নিয়ম কানুন শিখে নেন তিনি। সৌন্দর্য্য আর মধুর স্বভাবের জন্যই শুধু নয়, বিশ্বমানবতার জন্য কাজ করেও তিনি জায়গা করে নেন পুরো পৃথিবীর মানুষের মনে। স্থল মাইনের ব্যবহারের বিরুদ্ধে বিশ্বজুড়ে প্রচারণা চালান রাজবধূ প্রিন্সেস ডায়ানা।

ডায়ানা মারা যান ১৯৯৭ সালের ৩০ অগাস্ট, প্যারিসে এক গাড়ি দুর্ঘটনায়। পাপারাজ্জিদের এড়াতে একটি টিউবে ঢুকে যায় গাড়িটি। সে সময় ডায়ানার সঙ্গে ছিলেন তার সাবেক প্রেমিক মিসরীয় ব্যবসায়ী ডোডি আল-ফায়াদ। দুর্ঘটনার কয়েক ঘণ্টা পর হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন সাবেক প্রিন্সেস অব ওয়েলস। গাড়ির চালক ও ডোডি ঘটনাস্থলেই মারা যান। তাদের দেহরক্ষী গুরুতর আহত হন।

প্রায় ১০০টি দাতব্য প্রতিষ্ঠান সমর্থন করার কারণে মৃত্যুর কয়েক মাস পর তাকে নোবেল শান্তি পুরস্কার দেওয়া হয়।