সেই সব বীর নারী

ঢাকা, মঙ্গলবার, ২৪ নভেম্বর ২০২০ | ১০ অগ্রহায়ণ ১৪২৭

সেই সব বীর নারী

রোকেয়া ডেস্ক ২:০০ অপরাহ্ণ, ডিসেম্বর ০৪, ২০১৯

print
সেই সব বীর নারী

মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে নারীর অবদান অনেকটা ‘চেপে রাখা ইতিহাস’র মতো। যতটুকু আলোচনা চালু আছে সেটুকু কেবল ‘নির্যাতনের শিকারে’র মধ্যেই সীমাবদ্ধ। প্রকৃতপক্ষে মুক্তিযুদ্ধে অনেক বড় নিয়ামক শক্তি ছিল নারীরা। সক্রিয় ছিলেন কখনো সরাসরি যুদ্ধক্ষেত্রে, কখনো বা যুদ্ধক্ষেত্রের আড়ালে।

দুঃসাহসী কিশোরী তারামন
এক কিংবদন্তি যোদ্ধার নাম তারামন বিবি। যে বয়সে যুদ্ধ শব্দটির মানে বোঝার কথা নয়, যে বয়স ভেলা ভাসানো আর ঘুড়ি ওড়ানোর, সেই বয়সে তার দেশপ্রেম ও বীরত্বগাঁথার বর্ণনা শুনলে গা শিউরে ওঠে। মুক্তিযুদ্ধের সময় তারামন বিবি ১১ নম্বর সেক্টরে নিজ গ্রাম শংকর মাধবপুরে ছিলেন। তখন ১১ নম্বর সেক্টরের নেতৃত্বে ছিলেন সেক্টর কমান্ডার আবু তাহের। মুক্তিযোদ্ধা মুহিব হাবিলদার তারামন বিবিকে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেওয়ার জন্য উৎসাহিত করেন। যুদ্ধ শেষে ১৯৭৩ সালে তৎকালীন সরকার মুক্তিযুদ্ধে তারামন বিবিকে তার সাহসিকতা ও বীরত্বপূর্ণ অবদানের জন্য বীরপ্রতীক উপাধিতে ভূষিত করেন। কিন্তু ১৯৯৫ সাল পর্যন্ত তাকে খুঁজে বের করা সম্ভব হয়নি। ওই বছরে ময়মনসিংহের বিমল কান্তি নামের গবেষক তাকে খুঁজে বের করেন।

অনেক যুদ্ধে পুরুষ মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে অংশ নেন। শুধু সম্মুখ যুদ্ধই নয়, নানা কৌশলে শত্রুপক্ষের তৎপরতা এবং অবস্থান জানতে গুপ্তচর সেজে সোজা চলে গেছেন পাকবাহিনীর শিবিরে। কখনো সারা শরীরে কাদা মাটি, চক, কালি এমনকি মানুষের বিষ্ঠা পর্যন্ত গায়ে লাগিয়ে পাগল সেজেছেন তারামন। চুল এলো করে বোবা সেজে পাক সেনাদের সামনে দীর্ঘ হাসি কিংবা কান্নার অভিনয় করেছেন। কখনো প্রতিবন্ধী কিংবা পাগলের মতো করে চলা ফেরা করে শত্রুসেনাদের খোঁজ নিয়ে এসেছেন নদী সাঁতরে। আবার কলাগাছের ভেলা নিয়ে কখনো পাড়ি দিয়েছেন ব্রহ্মপুত্রের শাখা নদী। আর জান-মানের কথা না ভেবেই এসব দুঃসাহসী কাজে ঝাঁপিয়ে পড়েছেন একমাত্র দেশমাতৃকার মুক্তির জন্য। অসীম সাহসী এ নারী মুক্তিযোদ্ধা, বীরপ্রতীক তারামন বিবি চলে গেলেন বিজয়ের মাসের প্রথম প্রহরেই।
২০১৮ সালের ৩০ নভেম্বর রাত দেড়টায় কুড়িগ্রামের রাজীবপুর উপজেলার কাচারিপাড়ায় নিজের বাড়িতে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তার বয়স হয়েছিল ৬২ বছর।

নার্সিং ক্যাম্পের প্রতিষ্ঠাতা সাজেদা চৌধুরী
১৯৩৮ সালে মাগুড়া জেলায় মামার বাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী। বাবার নাম সৈয়দ শাহ হামিদ উল্লাহ। মাতা সৈয়দা আছিয়া খাতুন। ১৯৫৬ সাল থেকে সাজেদা চৌধুরী আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। ১৯৬৯ থেকে ১৯৭৫ সময়কালে তিনি বাংলাদেশ মহিলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধকালীন কলকাতার ‘গোবরা নার্সিং ক্যাম্পের প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক ছিলেন। তিনি একাধারে তিনি নারীনেত্রী, সংগঠক ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। যুদ্ধকালীন ‘গোবরা নার্সিং ক্যাম্পই একমাত্র ক্যাম্প যেটি মুক্তিযুদ্ধকালীন সরকারের প্রচেষ্টায় প্রতিষ্ঠিত ও পরিচালনা হতো। যুদ্ধের সময় গোবরা ক্যাম্পের প্রায় ৩০০ তরুণীকে ‘বিএলএফ’ ক্যাম্পে অস্ত্র প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছিল সম্মুখ যুদ্ধের জন্য।

১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ সময়কালে বাংলাদেশ নারী পুনর্বাসন বোর্ডের পরিচালক, ১৯৭২-১৯৭৬ পর্যন্ত বাংলাদেশ গার্লস গাইডের ন্যাশনাল কমিশনার ছিলেন। ১৯৭৬ সালে বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ডের পর বাংলাদেশ আওয়মী লীগের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন তিনি। ১৯৮৬ থেকে ১৯৯২ সাল পর্যন্ত তিনি বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক, ১৯৯২ সাল থেকে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। ২০০৯ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে তিনি জাতীয় সংসদের উপনেতা হন। তার স্বামী প্রয়াত রাজনীতিবিদ ও সমাজকর্মী গোলাম আকবর চৌধুরী।

কথিকা পাঠক আইভি
মুক্তিযোদ্ধা আইভি রহমানের জন্ম ১ ডিসেম্বর, ১৯৪৪ সালের কিশোরগঞ্জ জেলার ভৈরব উপজেলার চণ্ডিবের গ্রামে। তার মা হাসিনা বেগম গৃহিণী। বাবা জালাল উদ্দিন আহমেদ ছিলেন তৎকালীন সময়ের ঢাকা কলেজের অধ্যক্ষ। ১৯৬৯ সালে বাংলাদেশ মহিলা আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা সাংগঠনিক সম্পাদক ছিলেন তিনি। আইভি রহমান ছোটবেলা থেকেই সাহসী এবং প্রতিবাদী ছিলেন। রাজপথে মিটিং-মিছিলে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতেন। ১৯৭১ সালে যুদ্ধ শুরু হলে তিনি ভারতে চলে যান। সেখান থেকে অস্ত্র ও নার্সিং প্রশিক্ষণ গ্রহণের মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন।

এর পাশাপাশি তিনি জয় বাংলা রেডিওতে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে কথিকা পাঠ করতেন। তার পুরো নাম জেবুন্নাহার আইভি। তিনি আজীবন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের একজন সক্রিয় সদস্য ছিলেন। রাজনীতি ছাড়াও সামাজিক কর্মকাণ্ডে নিজেকে উৎসর্গ করেছিলেন। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত বাংলাদেশ মহিলা সমিতির সভানেত্রী ও জাতীয় অন্ধ কল্যাণ সমিতির সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করে গেছেন।
মুক্তিযুদ্ধ এবং সমাজসেবায় অনন্য ও গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা রাখার জন্য তিনি ‘স্বাধীনতা দিবস পুরস্কার-২০০৯’ লাভ করেন। ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট রাজধানীর বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের জনসভায় গ্রেনেড হামলা হলে তিনি গুরুতর আহত হন। ২৪ আগস্ট দিবাগত রাত ২টায় তিনি মৃত্যুবরণ করেন। প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমানের সহধর্মিণী ছিলেন তিনি।

একাত্তরের জননী রমা চৌধুরী
মুক্তিযুদ্ধের সময়ে একাত্তরের ১৩ মে তিন শিশুসন্তান নিয়ে পোপাদিয়ায় গ্রামের বাড়িতেই ছিলেন রমা চৌধুরী। আর স্বামী ছিলেন তখন ভারতে। ওইদিন সেই এলাকার পাকিস্তানি দালালদের সহযোগিতায় হানাদার বাহিনীর লোকজন রমা চৌধুরীদের বাড়িতে হানা দেয়। রমাকে ধর্ষণ করে। পুকুরে ঝোপের আড়ালে লুকিয়ে থাকেন পুনরায় ধর্ষণের ভয়ে। চোখের সামনে গানপাউডার দিয়ে তাদের বাড়িতে আগুন লাগিয়ে দেয় হানাদাররা। ঘরের মূল্যবান মালামাল, নিজের লেখা সাহিত্যকর্ম চোখের পলকেই পুড়ে যেতে দেখলেন তিনি। কিন্তু হানাদারদের ভয়ে কেউ আগুন নেভাতে সেদিন এগিয়ে যায়নি। একপর্যায়ে রমা চৌধুরী নিজেই ঝোপের আড়াল থেকে বের হয়ে প্রাণপণ চেষ্টা করেন ধ্বংসযজ্ঞ রোধ করতে। কিন্তু তার একার চেষ্টায় কিবা তিনি করতে পারেন। চোখের সামনে সব জ্বলে ছারখার হয়ে যায়।

পাক-হানাদারদের কাছে নির্যাতিত হওয়ার পর সমাজের লাঞ্ছনায় এবং ঘরবাড়ি হারিয়ে অসহায় হয়ে পড়লেন রমা চৌধুরী। পৃথিবী থাকার মধ্যে থাকল তিন ছেলে। কিন্তু বিধি বাম, অকালে তাদেরও হারান রমা চৌধুরী। ঠিক বিজয়ের আগের রাতে ১৫ ডিসেম্বর থেকে শ্বাসকষ্ট শুরু হয় সাগরের। ২০ ডিসেম্বর রাতে সাগর মারা গেল। একই অসুখে টগরও মারা গেল। দ্বিতীয় সংসার বাঁধতে গিয়ে হলেন প্রতারণার শিকার। দ্বিতীয় সংসারের ছেলে টুনু ১৯৯৮ সালের ১৬ ডিসেম্বর বোয়ালখালীর কানুনগোপাড়ায় সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গেল। রমা চৌধুরী জীবনে আর জুতা পরেননি। ১৫ বছর জুতা ছাড়া খালি পায়েই পথ চলেছেন।

পুরুষের বেশে শিরিন বানু
অদম্য সাহসী নারীর নাম মুক্তিযোদ্ধা শিরিন বানু মিতিল। সব বাধা-বিপত্তি, প্রতিরোধ ভেঙে তিনি মুক্তিযুদ্ধে অসামান্য অবদান রেখেছেন। মাত্র ২০ বছর বয়সে নিজের জীবন বাজি রেখে পুরুষের পোশাক পরে যুদ্ধ করেছেন। হাতে অস্ত্র নিয়ে রণাঙ্গনে অগ্নিকন্যার ভূমিকা পালন করেছেন।
জন্ম ১৯৫০ সালে পাবনা জেলায়। পারিবারিকভাবেই তিনি ছিলেন রাজনৈতিক পরিবারের সন্তান। সাংস্কৃতিক, রাজনৈতক পরিবারেই বেড়ে ওঠা। নানা খান বাহাদুর ছিলেন নামকরা আইনজীবী ও সমাজসেবক এবং পাবনা পৌরসভার প্রথম সভাপতি। মা সেলিনা বানু ছিলেন ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট সরকারের এমপি। বাবা ছিলেন কমিউনিস্ট পার্টির সক্রিয় রাজনৈতিক ব্যক্তি। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ পাকিস্তানি বাহিনী কারফিউ জারি করে নির্মম হত্যাযজ্ঞ শুরু করলে শিরিন বানু মিতিল তা মেনে নিতে পারেননি। ঘরে বসে যুদ্ধে যাওয়ার জন্য মনস্থির করেন।

ভাই জিঞ্জির তখন বলেছিল, ‘বুবু তুমি কি প্রীতিলতার মতো পুরুষের পোশাক পরে যুদ্ধ করতে পার না’। এ কথাটিই শিরিনকে উজ্জ্বীবিত করে। ২৮ মার্চ পাবনা টেলিফোন এক্সচেঞ্জের দখলকৃত ৩৬ জন পাকিস্তানি সেনাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ হয়। মাত্র ৩০মিনিটের অস্ত্র প্রশিক্ষণ শেষে ওই যুদ্ধে তিনি স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণ করেন। যুদ্ধে ৩৬ জন পাকসেনা এবং দুজন মুক্তিযোদ্ধা মারা যান। ৩০ মার্চ পাবনা জেলা স্বাধীন হয়। পরের দিন সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয়। যার নেতৃত্বে ছিলেন পাবনা ন্যাপের সাধারণ সম্পাদক আমিনুল ইলাম বাদশা। তিনি জেলা প্রশাসককে শিরিনের পুরুষের বেশে মুক্তিযুদ্ধ করার কথা জানিয়ে দেন। কিছুদিন পর ভারতের ‘স্টেটম্যান’ পত্রিকায় শিরিনের ছবিসহ সাক্ষাৎকার ছাপা হলে ছেলে সেজে মুক্তিযুদ্ধ করার সুযোগটি বন্ধ হয়ে যায়। শিরিনকে পাঠিয়ে দেওয়া হয় ক্যাম্পে। তাকে আশ্রয় দেন নাচোলের রানী ইলা মিত্র। সেখানেই আওয়ামী লীগের নেত্রী সাজেদা চৌধুরীর নেতৃত্বে ক্যাম্প গঠন করে নারীদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। যুদ্ধ শেষে মুক্তি হয়ে ফিরে আসেন শিরিন বানু মিতিল। ২০১৬ সালের ২১ জুলাই না ফেরার দেশে চলে যান তিনি।

‘মুক্তি আপা’ খালেদা
খালেদা খানম। শরীয়তপুরের সাহসী নারী। স্বাধীনতার জন্য তিনি এতটাই সক্রিয়ভাবে গ্রামে গ্রামে ঘুরে ঘুরে কাজ করতেন যে, শরীয়তপুর অঞ্চলে তাকে সবাই ‘মুক্তি আপা’ নামে ডাকত। ১৯৪৯ সালে শরীয়তপুরে জন্ম। নন্দন কানন স্কুল, চট্টগ্রাম সরকারি কলেজ এবং পরে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে কেটেছে তার শিক্ষা জীবন। ১৯৬৬ সাল থেকেই ছাত্র রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। এরপর চট্টগ্রাম সরকারি কলেজে পড়ার সময় তিনি আইয়ুববিরোধী আন্দোলনে সামনের সারিতে চলে আসেন। এ ছাড়া ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানেও সক্রিয় ছিলেন খালেদা। আর চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হওয়ার পর প্রথম ছাত্র সংসদ নির্বাচনে তিনি মহিলা সম্পাদিকা হিসেবে নির্বাচিত হন। তারা পাঁচ বোনই রাজনীতির সঙ্গে জড়িত থাকার ফলে তাদের বাড়ি ছাত্রলীগের ঘাঁটিতে পরিণত হয়েছিল।

এমনকি আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতারা প্রায়ই তাদের বাসায় আসতেন, বৈঠক করতেন। যুদ্ধের সময় পাকসেনাদের জাহাজ থেকে অস্ত্র নামানো ঠেকানোর জন্য মিছিল নিয়ে যান। ছিলের অগ্রগামীদের মধ্যে তিনি একজন। এক দিন দেখেন একটা ছেলে চাদর গায়ে এসে এগিয়ে আসছে। প্রথমে তিনি ঠাহর কারতে পারলেন না তাকে। চাদর পরিহিত লোকটি তাকে দেখে বলল, আমি মুক্তিযোদ্ধা। মুক্তিযোদ্ধাদের একটা দল আসছে ভারত থেকে। তখন তিনি তাকে বাড়িতে নিয়ে গেলেন এবং সব খোঁজখবর নিলেন। এরপর স্টুয়ার্ড মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে ভারত থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের একটি দল আসল। তিনি ব্যক্তিগত উদ্যোগে একটা নৌকা নিয়ে গ্রামে গ্রামে গিয়ে মানুষদের মুক্তিযুদ্ধের বিষয়টি বোঝাতে লাগলেন। বিভিন্ন জায়গায় গিয়ে উঠান বৈঠক করলেন। এমনকি এসব কর্মকাণ্ডের কারণে শরীয়তপুরের মানুষ তাকে ‘মুক্তি আপা’ বলে ডাকা শুরু করেছিল। এভাবে তিনি গ্রামের নারী-পুরুষদের বুঝিয়ে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে জনমত গঠন করে ফেলেন।

বীরাঙ্গনা প্রিয়ভাষিণী
‘বিজয় দেখেছি আমি। যুদ্ধের নয়টি মাস যে কেমন ছিল সেটা আমি কখনোই ভুলতে পারি না। আমি বুঝতে পারি না যে যুদ্ধ হবে সেনাবাহিনীর সঙ্গে সেনাবাহিনীর, কিন্তু এ সাধারণ বেসামরিক মানুষের ওপর যে পাকিস্তানি বাহিনীর ন্যক্কারজনক আচরণ এবং আক্রমণ, সেটা কেন?’ এভাবেই ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণী তার মুক্তিযুদ্ধাকলীন অভিজ্ঞতার কথা বলেন। ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণীর জন্ম ১৯৪৭ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি। বাবার নাম সৈয়দ মাহবুবুল হক এবং মায়ের নাম রওশন হাসিনা। তার ছয় সন্তান। তিন ছেলে ও তিন মেয়ে। ১৯৭১ সালে এ দেশের লাখো মেয়েদের মতো তিনিও পাক হানাদার বাহিনীর নির্যাতনের শিকার হন।

খুলনার পাইওনিয়ার গার্লস স্কুল থেকে এসএসসি এবং খুলনা গার্লস স্কুল থেকে এইচএসসি ও ডিগ্রি পাস করেন। ১৯৭৭ সাল থেকে ১৯৯৮ পর্যন্ত তিনি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেছেন। মাঝে কিছুদিন স্কুলে শিক্ষকতাও করেছেন। ইউএনডিপি, ইউএনআইসিইএফ, এফএও, কানাডিয়ান দূতাবাস প্রভৃতি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেছেন। জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল আইন, ২০০২-এর ৭ (ঝ)-এর ধারা অনুসারে মুক্তিযোদ্ধা (বীরাঙ্গনা) হিসেবে চলতি বছর স্বীকৃতি পান তিনি। বীরমুক্তিযোদ্ধা ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণী ২০১০ সালে ‘স্বাধীনতা দিবস’ পদক লাভ করেন।

রণাঙ্গনে ডা. লুৎফুন নেসা
বিদ্যালয় জীবন থেকেই আন্দোলন-সংগ্রামের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত ডা. লুৎফুন নেসা। মুক্তিযুদ্ধেও সক্রিয় অংশগ্রহণ করেছেন এই সাহসী নারী। ১৯৪৯ সালের পহেলা জুন ঢাকায় জন্ম ডা. লুৎফুন নেসার। বাবা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ব্রিটিশ সেনা দলের সদস্য এবং মুক্তিযোদ্ধা বজলুর রহমান লস্কর, মা গুল আনান লস্কর। ১৯৬২ সালে হামিদুর রহমান শিক্ষা কমিশন বাতিলের দাবিতে আন্দোলনের সময় অষ্টম শ্রেণীর ছাত্রী ছিলেন লুৎফুন নেসা। পরে ছয় দফা ও এগারো দফা আন্দোলন এবং মুক্তিযুদ্ধসহ দেশের সকল আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয় ভূমিকা রেখেছেন তিনি।

১৯৭১ সালে ময়মনসিংহ চিকিৎসা মহাবিদ্যালয়ে তৃতীয় বর্ষের ছাত্রী ছিলেন লুৎফুন নেসা। একইসাথে ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদিকা ছিলেন। সেই হিসেবে চলমান স্বাধিকার আন্দোলনের বিভিন্ন কর্মসূচিতে নেতৃত্ব দিয়েছেন তিনি। এছাড়া সৈয়দা সাজেদা চৌধুরীর নেতৃত্বে ইন্দিরা রোডের মরিচা হাউসে যুদ্ধের জন্য প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন লুৎফুন নেসা। স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু হলে দুই নম্বর সেক্টরের আওতায় মুন্সীগঞ্জে ক্যাপ্টেন হায়দার এর নেতৃত্বে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন। বীর সৈনিক পিতার অনুপ্রেরণায় তিনি পরে ভারতের কলকাতায় গিয়ে সম্মুখ যুদ্ধের জন্য প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। ভারত থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে আবারও মুন্সীগঞ্জে ফিরে আহত মুক্তিযোদ্ধাদের চিকিৎসা সেবায় যোগ দেন লুৎফুন নেসা।

‘জয়বাংলা হাসপাতালে’র সহকারী আরজুমান
মাত্র ১৫ বছর বয়সে ভাইয়ের সহযোগিতায় ভারতে গিয়ে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন আরজুমান বানু। জন্ম ১৯৫৭ সালের ৪ মে কুষ্টিয়া জেলার মিরপুর উপজেলার আমলার সদরপুর গ্রামে। ২৬ মার্চের পর সারা দেশে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার পর এলাকায় থমথমে অবস্থা বিরাজ করে। অল্প বয়সী মেয়েদের তখন বাড়িতে থাকা অনিরাপদ ছিল। তাই তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন ভারতে গিয়ে যেভাবেই হোক দেশের জন্য কাজ করবেন। এপ্রিল মাসে পরিবারের সঙ্গে ভারতে যান। সেখানে যাওয়ার পর জানতে পারেন বাংলাদেশ থেকে যাওয়া শরণার্থী ও আহত মুক্তিযোদ্ধা এবং বাঙালিদের সেবার জন্য ‘জয়বাংলা হাসপাতাল’ তৈরি হয়েছে। সেই সুযোগ গ্রহণ করলেন তিনি।

মুক্তিযোদ্ধাদের সেবায় ভারতের করিমপুরে ‘জয়বাংলা হাসপাতালে’ ডাক্তার আলী হোসেনের নেতৃত্বে মেডিকেল অ্যাসিসটেন্ট হিসেবে যোগদেন। আহত মুক্তিযোদ্ধাদের চিকিৎসাসেবার কাজে নিজেকে আত্মনিয়োগ করেন। সেখানেই অন্ন-বস্ত্র, খাদ্য আর চিকিৎসাসেবার মাধ্যমে মুক্তিযোদ্ধাদের সহায়তা করেন। যুদ্ধের পুরো সময় আহত মুক্তিযোদ্ধাদের আর্তনাদ, অসহায় মানুষের কষ্ট নিজ চোখে দেখার পরও তিনি ধৈর্যের সঙ্গে মোকাবেলা করছেন। পাশে থেকেছেন মুক্তিযোদ্ধাদের। জয়বাংলা হাসপাতালে অসংখ্য অসহায় নারী-পুরুষ ও মুক্তিযোদ্ধাদের চিকিৎসাসেবা করেছেন নিজ হাতে। দেশ স্বাধীন হলে দেশে ফিরে আসনে। পরবর্তী সময়ে শিক্ষকতা পেশার সঙ্গে নিজেকে যুক্ত করেন। এখনো মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ধারণ করে শিক্ষা দেন শিক্ষার্থীদের। তার স্বামী কুষ্টিয়ার বিখ্যাত মুক্তিযোদ্ধা ‘বিএলএফ’-এর ডেপুটি কমান্ডার শহীদ মারফত আলী।