পথ দেখিয়েছেন যিনি

ঢাকা, শুক্রবার, ১৩ ডিসেম্বর ২০১৯ | ২৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

সৃষ্টিতে উজ্জ্বল নারী ভাস্কর

পথ দেখিয়েছেন যিনি

ঋতু খন্দকার ৩:০০ অপরাহ্ণ, জুলাই ২৪, ২০১৯

print
পথ দেখিয়েছেন যিনি

আধুনিক ভাস্কর্যের অন্যতম পথিকৃৎ, অগ্রণী বাঙালি নারী ভাস্কর নভেরা আহমেদ। বাংলাদেশ সৃষ্টির আগে এবং পরে ভাস্কর্য নির্মাণে তার কীর্তি আজও অমলিন। রুদ্রাক্ষের মালা গলায়, উঁচু করে বাঁধা খোঁপা, কপালে তিলক...নজরকাড়া ব্যক্তিত্ব যা কারও চোখ এড়া তো না। নভেরা আহমেদ পঞ্চাশ-ষাটের দশকে রক্ষণশীল সমাজকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে হেঁটে বেড়াতেন চট্টগ্রাম আর ঢাকার পুরনো রাজপথে। তিনি সবসময়ই ছিলেন সময়ের চেয়ে বেশি এগিয়ে চলা নারী, তাই ঠিক সেস ময়ে তিনি ততটা স্বীকৃতি বা গ্রহণযোগ্যতা পাননি, যা তার অবশ্য প্রাপ্য ছিল।

১৯৩৯ সালের ২৯ মার্চ বাগেরহাটের সুন্দরবনে নভেরার জন্ম। চাচা নাম রাখেন ‘নভেরা’। ফার্সি শব্দ নভেরা অর্থ নবাগত, নতুন জন্ম।

আইন শিক্ষার জন্য তাকে বাড়ি থেকে লন্ডনে পাঠানো হয় ১৯৫০ খ্রিস্টাব্দে। তবে শৈশব থেকেই নভেরার ইচ্ছা ছিল ভাস্কর্য করার; তাই তিনি সেখানে গিয়ে সিটি অ্যান্ড গিল্ডস্টোন কার্ভিং ক্লাসে যোগ দেন। পরবর্তীতে ১৯৫১ খ্রিস্টাব্দে ভর্তি হন ক্যাম্বারওয়েল স্কুল অব আর্টস অ্যান্ড ক্রাফটসে ন্যাশনাল ডিপ্লোমা ইন ডিজাইনের মডেলিং ও স্কাল্পচার কোর্সে। সেখান ভাস্কর্য বিষয়ে শিক্ষা গ্রহণ শুরু করেন।

১৯৫৪ খ্রিস্টাব্দের জানুয়ারি মাসে নভেরা আহমেদ ইতালির ফ্লোরেন্সে গমন করেন।

১৯৬১ খ্রিস্টাব্দে অল পাকিস্তান পেইন্টিং অ্যান্ড স্কাল্পচার এক্সিবিশন আয়োজন হয়। সে সময়ে ১০ বছর বয়সী একটি ছেলে ঘরের কাজে নভেরাকে সাহায্য করত। এই প্রদর্শনীর জন্য নভেরা তারই একটি আবক্ষমূর্তি তৈরি করলেন এবং নাম দিলেন ‘চাইল্ড ফিলোসফার’। এই ভাস্কর্যের জন্য তিনি সেই প্রদর্শনীতে প্রথম পুরস্কার লাভ করেন।

১৯৬৮ থেকে ১৯৭০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে নির্মিত ভাস্কর্যগুলোর মধ্যে অধিকাংশই বেশ বড় আকারের; ৫ ফুট থেকে শুরু করে এমনকি ৭ ফুট ১১ ইঞ্চি পর্যন্ত উচ্চতাবিশিষ্ট। একই বিষয়বস্তু নিয়ে নির্মিত একাধিক ভাস্কর্যের মধ্যে পরিবার (১৯৫৮), যুগল (১৯৬৯), ইকারুস (১৯৬৯) ইত্যাদি কাজে মাধ্যমগত চাহিদার কারণেই অবয়বগুলো সরলীকৃত। ওয়েলডেড স্টিলের জেব্রা ক্রসিং (১৯৬৮), দুটি লুনাটিক টোটেম ইত্যাদির পাশাপাশি রয়েছে ব্রোঞ্জ মাধ্যমে তৈরি দণ্ডায়মান অবয়ব। এ ছাড়া কয়েকটি রিলিফ ভাস্কর্য ও স্ক্রল। লুনাটিক টোটেম বা মেডিটেশন (১৯৬৮); এই দুটি ভাস্কর্যে শিল্পী নভেরার মরমি অনুভবের বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে।

১৯৯৭ খ্রিস্টাব্দে বাংলাদেশ সরকার প্রদত্ত সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা একুশে পদকে ভূষিত হয়েছেন। তাকে নিয়ে নভেরা (১৯৯৫) শিরোনামে জীবনী উপন্যাস রচনা করেছেন হাসনাত আবদুল হাই। নির্মিত হয়েছে প্রামাণ্য চিত্র নহন্যতে (১৯৯৯)।

তিনি প্রায় ৪৫ বছর ফ্রান্সের প্যারিসে বসবাস করেন। ১৯৭৩ খ্রিস্টাব্দে দেশ ত্যাগ করার পর প্যারিসে বসবাস কালে ১৯৭৪ খ্রিস্টাব্দে সড়ক দুর্ঘটনায় আক্রান্ত হন নভেরা, তবে বড় কোনো আঘাত পাননি। তবে এরপর তিনি কখনো বাংলাদেশে প্রত্যাবর্তন করেননি। ২০১০ খ্রিস্টাব্দের নভেম্বর মাসে স্ট্রোকের ফলে হুইলচেয়ারে বসেই তার শেষ জীবন কাটে। ২০১৫ খ্রিস্টাব্দের ৫ মে, মঙ্গলবার প্যারিসের স্থানীয় সময় ভোর ৩টায় মধ্যে ৭৬ বছর বয়সে তার মৃত্যু হয়।

২০১৫ খ্রিস্টাব্দ অবধি বিস্তৃত দীর্ঘ জীবনের তুলনায় নভেরা আহমেদের শিল্পকর্মের সংখ্যা কম। ষাট দশকের শেষভাগের মধ্যেই তার যা কিছু সৃষ্টি ও নির্মাণ। ২০১৫ খ্রিস্টাব্দে তার মৃত্যুর পর ৪৩টি চিত্রকর্মের হদিস পাওয়া গেছে। তার ৮০ তম জন্মদিনে গুগল ডুডল তৈরি করে সম্মাননা প্রদান করে।