জনগণের রাজকুমারী

ঢাকা, সোমবার, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০১৯ | ৩১ ভাদ্র ১৪২৬

জনগণের রাজকুমারী

রাশেদ রহমান ১২:১০ অপরাহ্ণ, জুলাই ০৩, ২০১৯

print
জনগণের রাজকুমারী

একসময় সোনালি চুলের মেয়েটিকে বিশ্ববাসী চিনতো ব্রিটেনের রাজবধূ হিসেবে। তিক্ত অভিজ্ঞতা নিয়ে রাজপ্রাসাদ ছাড়ার পরও তিনি ছিলেন সমান জনপ্রিয় কিংবা তার থেকেও বেশি। পৃথিবী থেকে চিরতরে বিদায় নিয়েছেন প্রায় দুই যুগ আগে-এখনো তার জনপ্রিয়তা আকাশচুম্বী, আজো তার বেদনাবিদুর বিদায় অশ্রুসিক্ত করে কোটি ভক্তকে। প্রিন্সেস ডায়ানা মানুষের কাছে পরিচিত ছিলেন ‘জনগণের রাজকুমারী’ হিসেবে।

১৯৬১ সালের ১ জুন জন্ম হয়েছিল ব্রিটেনের অন্যতম অভিজাত স্পেন্সার পরিবারে। কেন্টের ওয়েস্ট হেলথ পাবলিক স্কুলের কয়েক বছর পড়ার পর তিনি আবাসিক স্কুল রিডলসওয়ার্থ হলে পড়েছেন। পড়াশোনায় অতটা ভালো কখনোই ছিলেন না। ফেল করেছিলেন ‘ও’ লেভেলে। পড়াশোনায় খারাপ হলেও খেলাধুলা ও সাঁতারে কিশোরী ডায়ানা ছিলেন ভীষণ পটু। ভালোবেসেছিলেন ব্যালে ডান্সকে, কিন্তু র্র্৫ র্র্৮র্ উচ্চতার ডায়ানা এই নাচের জন্য ‘একটু বেশিই লম্বা’ হওয়ায় ইচ্ছা সত্ত্বেও এতে ক্যারিয়ার গড়তে পারেননি।

শিশুবৎসল ডায়ানার ক্যারিয়ার শুরু হয়েছিল শিশু-পরিচারিকা হিসেবেই। পরবর্তীতে কিছুদিন খ-কালীন বাবুর্চির কাজ করে ১৯৭৭ সালে তিনি যোগ দেন লন্ডনের নাইটসব্রিজের একটি কিন্ডারগার্টেন স্কুলে সহকারী শিক্ষিকা পদে। সেই বছরই ডায়ানার সঙ্গে চার্লসের প্রথম আলাপ হয় বোন সারাহ ম্যাককুডেলের প্রেমিক হিসেবে। সময়ের ব্যবধানে সে আলাপ গড়াল প্রেমে। শুধু বয়সেই ১৩ বছরের বড় ফারাক নয়, ব্যক্তিত্বের দিক থেকেও দুজন ছিলেন দুই মেরুর। লাজুক আর ফ্যাশন সচেতন ডায়ানার বিপরীতে রাশভারী, বাগানপ্রিয় প্রিন্স চার্লস। ডায়ানার সঙ্গে যে কেবল তখন থেকে ব্রিটিশ রাজ পরিবারের পরিচয়, তা নয়। রানী দ্বিতীয় এলিজাবেথের ছোট দুই ছেলে প্রিন্স অ্যান্ড্রু ও প্রিন্স অ্যাডওয়ার্ডের ছোটবেলার খেলার সাথী ছিলেন ডায়ানা। যা-ই হোক, ব্রিটিশ রাজমুকুটের পরবর্তী উত্তরাধিকার হওয়ায় প্রিন্স চার্লসের এই প্রেম নজর কেড়েছিল বিশ্ব মিডিয়ার। এই জুটির চার বছরের প্রণয় পরিণতি পায় ১৯৮১ সালের ২৯ জুলাইয়ের এক মাহেন্দ্র্যক্ষণে। লন্ডনের সেন্ট পল’স ক্যাথেড্রালে অনুষ্ঠিত তাদের বিয়ে সরাসরি সম্প্রচারিত হয় বিশ্ব মিডিয়ায়, যার সাক্ষী হয়েছিল বিশ্বের কোটি কোটি মানুষ।

বিয়ের ১১ মাসের মাথায় ১৯৮২ সালের ২১ জুন জন্ম নেয় চার্লস ও ডায়ানার ভালোবাসার প্রথম উপহার প্রিন্স উইলিয়াম আর্থার ফিলিপ লুইস। ১৯৮৪ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর জন্ম নেয় তাদের দ্বিতীয় সন্তান প্রিন্স হেনরি চার্লস অ্যালবার্ট ডেভিড (প্রিন্স হ্যারি)।

‘ব্রিটিশ রাজবধূ’র বাইরে এসে তিনি গড়তে চেয়েছিলেন নিজের আলাদা একটি পরিচয়, এখানেই ব্যতিক্রম তিনি! পোশাক সচেতনতা দিয়ে ফ্যাশন আইকন বা কোটি তরুণের চোখে মোহময়ীই তিনি কেবল হননি, ভেবেছিলেন সাধারণ মানুষের জন্য। এইচআইভি সম্পর্কিত সচেতনতা তৈরিতে নানা ক্যাম্পেইনে সরাসরি যুক্ত থাকার পাশাপাশি এইডস আক্রান্তদের জন্যও মানবিক সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলেন ডায়ানা। সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের জন্য কাজ করা দাতব্য সংস্থাগুলোর অনুদান জোগাড়ে সর্বোচ্চ সহযোগিতা করতেন তিনি। গণমাধ্যমও এই মানবীকে এমনভাবেই লুফে নিলো যে, ব্রিটিশ পার্লামেন্টকে পর্যন্ত পত্রিকা সম্পাদকদের তলব করতে হয়েছিল!

প্রিন্সেস ডায়ানা ও চার্লসের সংসারের সুখ বুঝি আর সইলো না। ১৯৯২ সালে প্রকাশিত হয় অ্যান্ড্রু মর্টনের বই ‘ডায়ানা : হার ট্রু স্টোরি’। বিষণ্নতার সঙ্গে ডায়ানার নিরন্তর লড়াইয়ের কথা উঠে এসেছিল বইটিতে। ওদিকে ক্যামিলা পার্কারের সঙ্গে স্বামী চার্লস পরকীয়া সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ায় আরও দিশেহারা ডায়ানা নিজেও জেমস গিলবের সঙ্গে সম্পর্কে জড়িয়ে যান।

১৯৯২ সালে এই দুই সম্পর্কের কথা গণমাধ্যমের কল্যাণে পাদপ্রদীপের আলোয় আসে। ফলশ্রুতিতে রাজপরিবার কর্তৃক আদিষ্ট হয়ে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী জন মেজর পার্লামেন্টে চার্লস-ডায়ানার বিচ্ছেদের ঘোষণা দেন। ১৯৯৬ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে বিবাহবিচ্ছেদ কার্যকর হয় তাদের। ১৯৯৪ সালে এক সাক্ষাৎকারে চার্লস সম্পর্কের ভাঙনের পেছনে নিজের বিশ্বাসভঙ্গ ও অন্যাসক্তির দায় স্বীকার করেছিলেন। আত্মপরিচয়ে বিশ্বময় এতটাই ভাস্বর হয়েছিলেন ডায়ানা যে, ব্রিটিশ রাজপরিবার ছেড়ে আসার পরও তার জনপ্রিয়তা ছিল অটুট। বরং বিয়ের পর পুরোটা উদ্যম তিনি ব্যয় করেছিলেন মানুষের সেবায়। স্থলমাইন সম্পর্কে যুদ্ধপীড়িত অ্যাঙ্গোলায় সচেতনতা কার্যক্রমের জন্য তিনি গিয়েছিলেন মানুষের দ্বারে দ্বারে। সাবেক রাজবধূর হু হু করে বাড়তে থাকা এই জনপ্রিয়তা প্রিন্স চার্লসকে জনগণের কাঠগড়ায় (বিচ্ছেদের জন্য) খলচরিত্রে পরিণত করছিল। ওদিকে ফ্যাশন দুনিয়া ও দাতব্য কর্মসূচিতে তার তুমুল জনপ্রিয়তাকে কাজে লাগিয়ে ফ্যাশন ম্যাগাজিনসহ ব্রিটিশ ট্যাবলয়েডগুলো তাকে অতি মহিমান্বিত করে নিজেদের কাটতিও বাড়িয়েছিল।

বলা হয়ে থাকে, সংবাদ মাধ্যমের হাত থেকে পালিয়ে বাঁচতে চাওয়ার নীতিই কাল হয়েছিল ডায়ানার জীবনে। ১৯৯৭ সালের আগস্টে ফ্রান্সে প্রমোদ ভ্রমণে এসেছিলেন ডায়ানা। ৩১ আগস্ট সকালে ‘হোটেল রিৎজ’ থেকে একটি মার্সিডিজ বেঞ্জ গাড়িতে করে বেরোতেই পথিমধ্যে তাদের ধাওয়া করে পাপারাজ্জিদের একটি দল। তাদের চোখে ধুলো দিয়ে দ্রুত গতিতে গাড়ি আকস্মিক মোড় নিতে গিয়েই ঘটল অঘটন। এক টানেলের রাস্তায় তাদের বহনকারী গাড়িটি অন্য গাড়ির সঙ্গে সংঘর্ষে দুমড়ে মুচড়ে যায়। এতে ঘটনাস্থলেই মারা যান দোদি ফায়েদ ও গাড়িটির চালক। কোনোমতে বেঁচে যান ডায়ানার ব্যক্তিগত দেহরক্ষী। ওদিকে দুর্ঘটনায় মারাত্মক আহত ডায়ানাকে দ্রুতই একটি হাসপাতালে নেওয়া হয়। শরীরে অজস্র জখম নিয়ে তীব্র যন্ত্রণার সঙ্গে কয়েক ঘণ্টার লড়াই শেষে পরপারে পাড়ি জমান প্রিন্সেস ডায়ানা।