অপরাজেয় ঝুমু রানী

ঢাকা, সোমবার, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০১৯ | ৩১ ভাদ্র ১৪২৬

অপরাজেয় ঝুমু রানী

রোকেয়া ডেস্ক ২:৪৮ অপরাহ্ণ, মে ১৫, ২০১৯

print
অপরাজেয় ঝুমু রানী

ঝুমু রানী দাশ যখন ঘুম থেকে উঠেন তখনো পৃথিবীর ঘুম ভাঙে না। অন্ধকার পৃথিবীতেই শুরু হয় তার সংগ্রামের এক অনন্য কর্মযজ্ঞ। ভোরের আলো ফোটার আগেই সাইকেল নিয়ে বেরিয়ে পড়েন, যেন অন্ধকারের বিরুদ্ধে নিজেই একটা আলো। বাইসাইকেলের প্যাডেলে একেকটা চাপ একেকটা প্রত্যয়ের গল্প।

ঝুমু রানী দাশ একজন পত্রিকা বিক্রেতা। রাজবাড়ী শহরে তিনিই একমাত্র নারী পেপার এজেন্ট। সেই ভোরবেলা একা একাই সাইকেল চালিয়ে যান পত্রিকা সংগ্রহের উদ্দেশে। তারপর এক দোকান থেকে আরেক দোকান, এক বাড়ি থেকে আরেক বাড়ি পত্রিকা পৌঁছে দেওয়া। দ্রুত পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে আর ১০টা পুরুষের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে হয়, সঙ্গে যুক্ত হয় প্রতিদিনের নানা রকম বিড়ম্বনা কিন্তু ঝুমু রানী সবকিছুকে পায়ে দলে এগিয়ে চলেছেন। 

ঝুমু রানীর স্বামী ছিল পত্রিকার এজেন্ট। ২০১৭ সালের নভেম্বরের ঘটনা, কিডনি রোগে অচল হয়ে পড়েন। সন্তানদের নিয়ে অথৈই সাগরে পড়ে গেলেন ঝুমু। কিছু টাকা জোগাড় করে ঢাকায় নিয়ে আসেন স্বামীকে। কিন্তু স্বামী সহজেই হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেলেন না। চারদিক থেকে যেন অন্ধকার ঘিরে ধরল ঝুমুকে। ঠিক তখন থেকেই শুরু তার ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প।

এক দিন হাসপাতালে শুয়ে থেকেই স্বামী বললেন, তুমি বাড়ি গিয়ে ব্যবসাটা ধরো। এ কথার পর দ্বিতীয় চিন্তা করার কোনো সুযোগ ছিল না ঝুমু রানীর হাতে। স্বামীকে হাসপাতালে রেখেই বাড়ি এসে পত্রিকা হাতে বেরিয়ে পড়লেন। কিন্তু বিধিবাম! অন্যরা অর্থাৎ পুরুষরা যখন সকাল ১০টার মধ্যেই পত্রিকা পৌঁছে দেন, তখন ঝুমু রানীর পত্রিকা পৌঁছাতে দুপুর গড়িয়ে যায়। পাঠকরা তাহলে ঝুমু রানীর কাছ থেকে পত্রিকা নেবেন কেন? ফলাফল অনুমিতই ছিল, ঝুমু রানীর হাতে আর কোনো গ্রাহক থাকল না।

কিন্তু ঝুমু হেরে যাওয়ার পাত্র নন। তখনই টাকা জোগাড় করে একটা পুরাতন সাইকেল কিনে নেন। ব্যবসা ভালোই চলতে থাকে। কিন্তু চলতি বছরের জুন মাসে দীর্ঘদিন রোগভোগের পর মারা যান স্বামী। এরপর থেকে ব্যবসার পাশাপাশি সংসারের কাজ ও মায়ের দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে। কিন্তু এতে কোনো দুঃখ বা কষ্ট নেই ঝুমু রানীর-‘ভোর ৪টার আগেই ঘুম থেকে উঠে প্রথমেই ঘরের কাজ শেষ করি। ঘণ্টা খানেক পর সাইকেল নিয়ে বেরিয়ে পড়ি। পেপার দেওয়া শেষে বাজার করে তারপর রান্নাবান্নার পালা। শান্তিটা হলো, আমাকে কারও মুখাপেক্ষী হতে হচ্ছে না। আমার ছেলেকে নিয়ে খেয়ে-পরে ভালোই আছি।’

জীবনযাত্রায় পরিবর্তন এসেছে ঝুমু রানীর। এখন আর আগের মতো টিভি দেখা, বিশ্রাম নেওয়া, একটু বেশি করে ঘুমানোর কথা কল্পনাও করতে পারেন না। ভোর থেকে রাত পর্যন্ত যেন একটা সংগ্রামের গল্প বয়ে নিয়ে বেড়ান। ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা একটাই, ছেলেটাকে মানুষের মতো মানুষ করা।