‘ফুলটাইম মাদার’ সীমা

ঢাকা, বুধবার, ২৬ জুন ২০১৯ | ১২ আষাঢ় ১৪২৬

‘ফুলটাইম মাদার’ সীমা

রোকেয়া ডেস্ক ২:৩৪ অপরাহ্ণ, মে ১৫, ২০১৯

print
‘ফুলটাইম মাদার’ সীমা

আমাদের মাঝে এমনও মা আছেন, যার ছেলের বয়স ১৮, কিন্তু তাকে কোলেপিঠে নেওয়ার পার্ট আজও চুকোয়নি। ২০১৮ সালের আলোচিত এ মায়ের নাম সীমা সরকার। আঠারো বছরের সন্তানকে তিনি এখনো কোলেপিঠে করে চলে। এটা কী তার কাছে বোঝা? কখনই না। মার কাছে সন্তান কখনই বোঝা না। আর তাই তো মা সীমা সরকারকে বিবিসি উপাধি দিয়েছে ‘ফুলটাইম মাদার’ হিসেবে। ‘ফুলটাইম মাদার’ হওয়ার পর তার অভিব্যক্তি এ রকম : আমি এতকিছু বুঝি না। তবু একজন মা বা মহিলা হিসেবে এই নাম শুনতে ভালো লাগে। আমার ভবিষ্যৎ কাজের অনুপ্রেরণা এই স্বীকৃতি। এই তালিকায় আছেন যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটনের মেয়ে চেলসি ক্লিনটন, অস্ট্রেলিয়ার সাবেক প্রধানমন্ত্রী জুলিয়া গিলার্ড ও পাকিস্তানের প্রথম হিন্দু নারী সিনেটর কৃষ্ণকুমারীর মতো নারীরা।

সীমা সরকারের ছেলে হৃদয় সরকার। মায়ের কোলে চড়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা দিতে আসা হৃদয় সরকারের ছবিটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে খুব দ্রুত ভাইরাল হয়েছিল। সীমা সরকার জানান, তিনি যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে হৃদয়কে কোলে নিয়ে হাঁটাচলা করছেন তখন অনেক ব্যক্তি তার সন্তানের লেখাপড়ার কথা শুনেছেন। কীভাবে তিনি এত কষ্ট করেছেন। তার জবাবে তিনি বলেন, ‘সন্তানের জন্য কোনো মায়ের কষ্ট হয় না। আর আমার তো আরও হয়নি, কারণ আমার ছেলে প্রতিবন্ধী। তাকে তো বেশি যত্ন নিতে হবে। আমি এখানে অদম্য মা। সন্তানের লেখাপড়ার লক্ষ্যে আমার স্বপ্নপূরণের জন্য এ কষ্ট কিছুই না। প্রয়োজনে আমি আরও কষ্ট করব।

রেজাল্ট প্রকাশিত হওয়ার পর দেখা যায়, মেরিট লিস্টে হৃদয়ের স্থান ৩০৪৭। কিন্তু ভর্তির জন্য ফরম তুলতে গিয়ে বাধে যত বিপত্তি। বিশ্ববিদ্যালয়ে দৃষ্টি, শ্রবণ ও বাকপ্রতিবন্ধীদের কেবল ভর্তির সুবিধা রয়েছে। কিন্তু শারীরিক প্রতিবন্ধীর জন্য কোনো কোটা নেই। এ নিয়ে মিডিয়া এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও সুশীল সমাজ বেশ কথাবার্তা বলেন। এ অবস্থায় ৯ নভেম্বর সিনেটের সভায় এই আইন সংশোধন করে তার ভর্তির সুযোগ করে দেওয়া হয়। এ জন্য তিনি সিনেট ও মিডিয়ার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। ‘ফুলটাইম মাদার’ সীমা যেন ফুলটাইম সংগ্রামী। এসএসসি পাস করার আগেই বিয়ে হয়ে যায় তার। স্বামী সমীরণ ইটভাটায় কাজ করেন। বিয়ের বছর দুয়েকের মাথায় হৃদয়ের জন্ম। কিন্তু প্রতিবন্ধী ছেলেকে পড়াশোনা করানোয় পারিবারিক, সামাজিক নিগ্রহের শিকার হতে হয়! তবু দমেননি মা।

হৃদয়ের মা সীমা রানী সরকার বলেন, ‘স্বামী ইটভাটার ব্যবস্থাপক। টানাটানির সংসারে হৃদয়ের জন্ম হয় ২০০০ সালে। জন্ম থেকেই সে শারীরিক প্রতিবন্ধী। তবু তাকে অবহেলা করিনি। তাকে নিয়ে স্বপ্ন দেখেছি। কষ্ট করেছি, তাই এখন হয়তো সফলতার দিকে যেতে পারব।’ হৃদয়ের বাবা সমীরণ সরকার বলেন, ‘আমার এই প্রতিবন্ধী সন্তানের জন্য আমার স্ত্রী যা করেছেন, তার তুলনা নেই। তার জন্যই হৃদয় এ পর্যন্ত যেতে পেরেছে। আমি আজ গর্বিত। আপনারা আশীর্বাদ করবেন, আমার স্ত্রীর স্বপ্ন যেন পূরণ হয়।’

সব প্রতিবন্ধকতা উড়িয়ে দিয়ে ছেলেকে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি করাতে দিনরাত শ্রম দিয়েছেন। সেসব শ্রমের ঘামের যথাযোগ্য ফলও তিনি পেয়েছেন আজ। ছেলে আজ ঢাবির ছাত্র। আর মা সীমা সরকার পেয়েছেন বিবিসির ‘ফুলটাইম মাদার’ খেতাব।