কৃষিতে নারী

ঢাকা, বুধবার, ১৯ জুন ২০১৯ | ৫ আষাঢ় ১৪২৬

কৃষিতে নারী

রাশেদ রহমান ১২:২২ অপরাহ্ণ, মে ০২, ২০১৯

print
কৃষিতে নারী

শুধু ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার কিংবা রাজনীতিবিদ নয়, বর্তমানে নারীর অংশগ্রহণের একটি বিরাট ক্ষেত্র হলো কৃষিক্ষেত্র। ধরা যাক একজন নারী শ্রমিক। কাজ করেন ধানের চাতালে, মাটিও কাটেন, আবার ধানের মৌসুমে ধান কাটার কাজও করেন। কিন্তু মজুরির বেলায় পুরুষ শ্রমিকের চেয়ে নারীকে পারিশ্রমিক কম দেওয়া হয়। শুধু মজুরির বেলায় নয়, মর্যাদাতেও নারী শ্রমিক পিছিয়ে যান বারে বারে। কৃষক বললে এখনো বাংলাদেশের সামাজিক প্রেক্ষাপটে একজন পুরুষের ছবিই অধিকাংশ মানুষের চোখে ভেসে ওঠে। অথচ কৃষিক্ষেত্রে নারীর শ্রম পুরুষের চেয়ে কম নয়। তারপরও শুধু নারী হিসেবে জন্ম নেওয়ার কারণে তার বঞ্চনার যেন কোনো শেষ নেই। একে তো দরিদ্র শ্রমজীবী, দ্বিতীয়ত নারী হিসেবে দ্বিমুখী বঞ্চনার শিকার হন নারী কৃষি শ্রমিকরা।

নারী কৃষি শ্রমিকদের দুঃখের যেন কোনো শেষ নেই। হাড়ভাঙা খাটুনির পর বাড়িতে ফিরেও রেহাই নেই তার। ঘরের সব কাজ তাকেই করতে হয়। পারিবারিক সহিংসতা ও শারীরিক মানসিক নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন তারা হরহামেশাই। সেইসঙ্গে আছে প্রভাবশালীদের দাপট। যৌন নির্যাতনের শিকার হলেও মুখ ফুটে বলার উপায় নেই। তাহলে উল্টো গ্রাম্য সালিশ ডেকে তাকেই দ্বিতীয় দফা নির্যাতন করা হবে। গ্রামীণ নারীদের বিয়েও হয় নিতান্ত অল্প বয়সে। বাবার বাড়িতে যেমন আধপেটা খেয়ে থাকতে হয়, স্বামীর বাড়িতেও তেমনি সিকিভাগ খাবার জোটে। অথচ কৃষিক্ষেত্রে বাংলাদেশের অর্জিত সাফল্যে নারীর অবদান অনেক।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী দেশের ১ কোটি ৬৮ লাখ নারী কৃষি, শিল্প ও সেবা খাতে কাজ করছেন। জিডিপিতে নারীর অবদান ২০ শতাংশ। উৎপাদন খাতের মোট কর্মীর প্রায় অর্ধেকই নারী। এ খাতে ৫০ লাখ ১৫ হাজার কর্মী আছেন। তাদের মধ্যে ২২ লাখ ১৭ হাজার নারী। ২০১০ সালে যেখানে কর্মজীবী নারীর সংখ্যা ছিল ১ কোটি ৬২ লাখ, ২০১৩ সালে এসে তা দাঁড়ায় ১ কোটি ৬৮ লাখে। কৃষি খাতে ৯০ লাখ ১১ হাজার নারী শ্রমিক আছেন।

আন্তর্জাতিক একটি সংস্থার ২০১৫ সালের এক জরিপে দেখা গেছে, দেশের ৯০ শতাংশ বাড়িতে মুরগি পালন নিয়ন্ত্রণ করেন নারী। ছাগল ও গরু পালনে নারীদের নিয়ন্ত্রণ ৫৫ শতাংশ। কুমড়া ও লাউ চাষিদের ৪২ শতাংশ এবং টমেটো চাষিদের ৩৮ শতাংশ নারী। আলু চাষে নারীর অংশগ্রহণ এখন বিপুল। সবজি চাষের ক্ষেত্রে নারীর ভূমিকা প্রধান। সবজি চাষের সময় কৃষক পরিবারের নারীরা খুব ভোরে ক্ষেতে চলে যান। ক্ষেত তৈরি করা, চারা রোপণ, আগাছা পরিষ্কার, চারাগাছ বাড়ার সময় দেখাশোনা করা, সেচ, সবজি সংগ্রহ, বস্তাবন্দি করার প্রতিটি পর্যায়ে নারীর অংশগ্রহণই প্রধান। ফুলচাষে নারীর অংশগ্রহণ বিপুল। ভুট্টা চাষেও নারী শ্রমিকরা অবদান রাখছেন।

আবহমান কাল থেকেই কৃষিশ্রমে নারীর অবদান ছিল। প্রাচীন বাংলার সমাজ চিত্রেও দেখা যায় এ দেশের প্রধান ফসল ধান চাষের বেলায় বীজধান সংরক্ষণ, ধান মাড়াই, ধানভানাসহ অনেক কাজই নারী করতেন। কিন্তু যেখানে ধান বিক্রির প্রশ্ন সেখানে ছিল পুরুষ আধিপত্য। ফলে খাটুনি থাকলেও পরিশ্রমলব্ধ অর্থ থাকত পুরুষের হাতে। বাড়ির আশপাশে সবজির চাষ, ঘরের চালে লাউ-কুমড়া ফলানো, মাচায় শসা, জালি কুমড়ার চাষ করে পরিবারের সবজির চাহিদা মেটান নারী। শুধু পরিবারের চাহিদা নয়, বাজারে বিক্রির জন্যও ফলান শাক-সবজি। এখন তো কৃষিক্ষেত্রে নারী শ্রমিকরা পুরুষের সমপরিমাণ শ্রম দিয়ে সব ধরনের কাজ করে চলেছেন।

কিন্তু নারী ও পুরুষ শ্রমিকের বেলায় মজুরি বৈষম্য এখনো আছে। বর্তমানে নারী শ্রমিকদের মজুরি বৈষম্য দূর করার বিষয়ে সব সচেতন মানুষের ঐক্যবদ্ধ হওয়া প্রয়োজন। দরকার সরকারি কঠোর পদক্ষেপ। আসন্ন বাজেটে কৃষিক্ষেত্রে গৃহীত প্রকল্পগুলোতে কৃষক নারীর জন্য সুনির্দিষ্ট কোটা রাখা প্রয়োজন। পুরুষ কৃষি শ্রমিককে যেমন স্বল্প টাকায় ব্যাংক হিসাব খোলার সুযোগ দেওয়া হয়েছে, তেমন সুযোগ নারী কৃষি শ্রমিকদেরও দেওয়া প্রয়োজন। সার, বীজ, কৃষি উপকরণ ও কৃষক কার্ডের সুবিধা নারীর জন্য নিশ্চিত করা প্রয়োজন। কৃষির যেসব ক্ষেত্রে নারী শ্রমের অবদান ৬০-৯০ শতাংশ, সেসব ক্ষেত্রে গৃহীত বাজেটারি পদক্ষেপ ও প্রণোদনার সিংহভাগ নারীর জন্য বরাদ্দ রাখতে হবে।

সরকারি খাসজমি বিতরণের সময় নারীর জন্য আলাদা করে সুবিধা প্রদান করতে হবে। নারী উদ্যোক্তাদের পণ্য বিপণনের জন্য রয়েছে সরকারি প্রকল্প ‘জয়িতা’। নারী কৃষকের উৎপাদিত পণ্য বিপণনে এমন সহায়তামূলক আরো বেশি প্রকল্প প্রয়োজন। ছাদে নারীরা শখের বসে করলেও অনেকেই এখন সংসারের প্রয়োজন মেটাতে ছাদ কৃষিতে সময় দিচ্ছে। ছাদ কৃষিতে সফলভাবে আবদান রাখার জন্য তাদের বীজ ও অন্যান্য উপকরণ দিয়ে সহায়তা করা প্রয়োজন। নারী কৃষি শ্রমিকের অধিকার ও মর্যাদা রক্ষা করা না গেলে দেশের কৃষি খাতের প্রত্যাশিত সাফল্য অর্জন অধরাই থেকে যাবে।