মোমের জাদুকর মাদাম তুসো

ঢাকা, বুধবার, ১৯ জুন ২০১৯ | ৫ আষাঢ় ১৪২৬

মোমের জাদুকর মাদাম তুসো

সাইফুল ইসলাম ৩:৪১ অপরাহ্ণ, এপ্রিল ১৭, ২০১৯

print
মোমের জাদুকর মাদাম তুসো

মোমের জাদুকর মাদাম তুসো এবং তার নামের সঙ্গে মিলিয়ে মাদাম তুসো জাদুঘরের নাম শোনেননি এমন মানুষ খুব কমই আছেন। মোম দিয়ে তৈরি জনপ্রিয় ও বিখ্যাত ব্যক্তিত্বদের মূর্তির এই জাদুঘরের প্রতিষ্ঠাতা মাদাম তুসো ছিলেন একজন ফরাসি মহিলা। তার পুরো নাম আনা মারিয়া গ্রোশোলজ এবং তিনি মোমের ভাস্কর্য শিল্পী হিসেবে পরিচিত। বিয়ের পর তার নতুন নাম হয় ‘মাদাম তুসো’। এই নামের জাদুঘরে প্রবেশের পর মোমের পুতুলের পাশে সত্যিকার মানুষটিকে দেখলেও বুঝে ওঠা কঠিন কে মানুষ আর কে মোমের ভাস্কর্য।

১৭৬১ সালের ১ ডিসেম্বর ফ্রান্সের স্ট্রবার্গে জন্মগ্রহণ করেন আনা মারিয়া গ্রোশোলজ ওরফে মাদাম তুসো। দুর্ভাগ্যবশত, জন্মের দুই মাস পরই এক যুদ্ধে তার বাবা জোসেফ গ্রোশোলজ নিহত হন। আর্থিক অবস্থাও বিশেষ ভালো ছিল না তাদের। বাবার মৃত্যুর পর মাতা অ্যানি ম্যারি ওয়ালদারের সঙ্গে সুইজারল্যান্ডের বার্নে চলে আসেন আনা। সেখানে একজন চিকিৎসকের বাড়িতে গৃহ পরিচারিকার কাজ নেন তার মা। ডাক্তার ফিলিপ কার্টিসের সহযোগিতায় সুইস নাগরিকত্ব গ্রহণ করেন উভয়েই। ফিলিপ মোমের মূর্তি তৈরিতে পারদর্শী ছিলেন। তিনি চিকিৎসাশাস্ত্রে শব ব্যবচ্ছেদ শিক্ষায় এগুলোকে ব্যবহার করতেন মূর্তিগুলোর প্রতিকৃতি অঙ্কন করে। ছোট্ট আনার সঙ্গে তার সুসম্পর্ক গড়ে ওঠে। সেখান থেকেই মূর্তি তৈরির হাতেখড়ি হয় আনার। ডা. ফিলিপ আনাকে মোমের মূর্তি তৈরির প্রশিক্ষণ দেন। আনাও এই শিল্পে তার মেধা ও প্রতিভার পরিচয় দেন দক্ষতার সঙ্গে।

১৭৬৫ সালে ডা. ফিলিপ ‘ক্যাবিনেট ডি সিরে’ বা মোমের প্রদর্শনীর উদ্দেশ্যে প্যারিসে আসেন। সেখানে তিনি ফ্রান্সের সম্রাট পঞ্চদশ লুইসের শেষ উপত্নী ‘মাদাম দু ব্যারি’র মোমের ভাস্কর্য তৈরি করেন। ফিলিপের এই ভাস্কর্যটিই বর্তমানে মাদাম তুসো জাদুঘরে প্রাচীনতম ভাস্কর্য হিসেবে প্রদর্শিত হচ্ছে। ১৭৬৭ সালে আনা ও তার মা ডা. ফিলিপের সঙ্গে কাজে যোগ দেন। সেখানে তিনি কাজের দক্ষতায় বিপুল প্রশংসা অর্জন করেন। এই সাফল্যের পর ১৭৭৭ সালে তিনি সর্বপ্রথম সম্পূর্ণ নিজস্ব প্রচেষ্টায় জ্যাঁ জাক রুশোর মোমের প্রতিকৃতি তৈরি করেন এবং সফল হন। ১৭৮০ থেকে ১৭৮৯ সালে চলা বিপ্লবে আনা সম্রাট চতুর্দশ লুইয়ের বোন এলিজাবেথকে মানসিকভাবে সহায়তা করেন। ফলে রাজ পরিবারের সদস্যরা তার কাজে সন্তুষ্ট হয়ে তাকে ভার্সাইয়ে আমন্ত্রণ জানান এবং আনা তাদের সহযোগিতায় সেখানে বসবাস শুরু করেন। প্যারিসে ফরাসি বিপ্লব শুরু হলে তিনি সেখানেও বিশেষ ভূমিকা পালন করেন। এ উদ্দেশ্যে নেপোলিয়ন বোনাপার্ট এবং রোবসপিয়ের সঙ্গে তার সাক্ষাৎ ঘটে। পরবর্তীতে তিনি ‘সন্ত্রাসের রাজত্ব’ চলাকালীন সময়ে জোসেফিন ডি বিউহারনাইসের সঙ্গে গ্রেফতার হন এবং তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের জন্য গিলোটিন (গলা কেটে হত্যায় ব্যবহৃত বিশেষ অস্ত্র) প্রস্তুত করা হয়। কিন্তু ডা. কুতিয়া ও তার পরিবারের সহায়তায় তিনি মৃত্যুদণ্ড থেকে রেহাই পান এবং কিছুদিন পরই মুক্তি লাভ করেন।

এরপর তিনি গিলোটিনে নিহত ব্যক্তিদের মুখোশ তৈরিতে নিয়োজিত হন এবং তার তৈরি বিখ্যাত ব্যক্তিদের মুখোশ বিপ্লবে বিভিন্ন শোভাযাত্রা ও মিছিলে তুলে ধরা হয়। সেখানেই এই অভিনব পদ্ধতিতে প্রতিবাদে তার শিল্পের জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি পায়। ১৭৯৫ সালে ফ্রঁসোয়া তুসোকে বিয়ে করেন এবং তখন থেকেই তিনি মূলত মাদাম তুসো নামধারণ করেন। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি দুই পুত্রসন্তানের জন্ম দেন-জোসেফ এবং ফ্রাঁসোয়া। ১৭৯৪ সালে ডা. ফিলিপ মৃত্যুর আগমুহূর্তে তার মোমের মূর্তিগুলো মাদাম তুসোকে দান করেন। পরবর্তী ৩৩ বছর মাদাম তুসো মূর্তিগুলো নিয়ে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে প্রদর্শনীর জন্য ঘুরে বেড়ান। ১৮০২ সালে মূর্তিশিল্পের অগ্রদূত পল ফিরিডোরের আমন্ত্রণে মাদাম তুসো তার চার বছরের সন্তান জোসেফকে নিয়ে লন্ডনে যান। সেখানে লাইসিয়াম থিয়েটারে তার শিল্পের প্রদর্শনী হয়। এরপর ১৮৩১ সালের দিকে স্বল্প সময়ের জন্য বেকার স্ট্রিট বাজার ভবনের ওপরতলা ভাড়া নেন, যা বেকার স্ট্রিটের পশ্চিম পার্শ্বে এবং ডোরসেট স্ট্রিট ও কিং স্ট্রিটের মধ্যবর্তী এলাকায় অবস্থিত। ১৮৩৪ সালে সেখানেই তিনি জাদুঘর প্রতিষ্ঠা করেন যা বর্তমানে ‘মাদাম তুসো জাদুঘর’ নামে পরিচিত। ১৮৩৫ সালের দিকে বেকার স্ট্রিটের ওই ভবনই প্রথম স্থায়ী নিবাস হিসেবে পরিণত হয় মাদাম তুসোর।

জাদুঘরের সবচেয়ে আকর্ষণীয় ছিল ‘ভৌতিক কক্ষ’, যেখানে ফরাসি বিপ্লবে মৃত ঘাতক ও খুনিসহ বিপ্লবে নিহতদের মূর্তি প্রতিষ্ঠিত ছিল। ভৌতিক কক্ষ সর্বপ্রথম পাঞ্চ ম্যাগাজিনে ব্যবহৃত হলেও তুসো দাবি করেন নামটি তার নিজের দেওয়া এবং জাদুঘরের প্রচারণার জন্য ১৮৪৩ সালে তিনি এ নামটি ব্যবহার করেছিলেন। ১৮৩৫ সালে তিনি প্রথম নিজ ভবনে মোমের মূর্তি প্রদর্শনী শুরু করেন। ১৮৩৮ সালে তিনি আত্মজীবনী লেখেন এবং ১৮৪২ সালে তিনি নিজের একটি মোমের মূর্তি তৈরি করেন যেটা এখনো জাদুঘরের সম্মুখে প্রদর্শিত রয়েছে। ১৮৫০ সালের ১৬ এপ্রিল, ৮৮ বছর বয়সে ঘুমের মধ্যেই মৃত্যুবরণ করেন তিনি।