বঙ্গবন্ধুর নেপথ্যে অনন্য বঙ্গমাতা

ঢাকা, শনিবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০১৯ | ৬ আশ্বিন ১৪২৬

বঙ্গবন্ধুর নেপথ্যে অনন্য বঙ্গমাতা

আশরাফুল ইসলাম ১২:১৫ অপরাহ্ণ, এপ্রিল ০৩, ২০১৯

print
বঙ্গবন্ধুর নেপথ্যে অনন্য বঙ্গমাতা

স্বাধীন বাংলাদেশের রূপকার জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান দেশ ও স্বাধীন রাষ্ট্র গঠনে অসামান্য অবদানের জন্য যে নারীর ত্যাগ, অবদান ও প্রেরণার কাছে ঋণী তিনি হলেন তারই স্ত্রী ফজিলাতুন নেছা মুজিব। বঙ্গবন্ধু তার জীবন ও যৌবনের বেশির ভাগ সময় ব্যয় করেছেন জনগণের সেবায়, দেশের কল্যাণে। এই সময়কালে বেশির ভাগ সময় বঙ্গবন্ধুকে কাটাতে হয়েছে জেলে। আর তখন কাণ্ডারির মতো হাল ধরেছিলেন বেগম ফজিলাতুন নেছা মুজিব।

খুব অল্প বয়সেই বিয়ে হয় বেগম ফজিলাতুন নেছার। শ্বশুর-শাশুড়ি ও দেবর-ননদের সঙ্গেই তিনি বেড়ে ওঠেন। বেগম ফজিলাতুন নেছার জন্মদিন উপলক্ষে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার মা সম্পর্কে বলেন, ‘তিনি স্বামীকে খুব কম সময়ই কাছে পেতেন। আমি যদি আমাদের জীবনটার দিকে ফিরে তাকাই এবং আমার বাবার জীবনটা যদি দেখি কখনো একটানা দুটি বছর আমরা কিন্তু বাবাকে কাছে পাইনি। স্ত্রী হিসেবে আমার মা ঠিক এভাবে বঞ্চিত ছিলেন। কিন্তু কখনো কোনো দিন কোনো অনুযোগ-অভিযোগ করতেন না। সব সময় বিশ্বাস করতেন, তার স্বামী দেশের জন্য কাজ করছেন, মানুষের জন্য কাজ করছেন, মানুষের কল্যাণের জন্য কাজ করছেন।’

বঙ্গবন্ধু বারবার গ্রেফতার হয়েছেন, জেল-জুলুমের শিকার হয়েছেন কিন্তু ভেঙে পড়েননি বেগম মুজিব। নির্বাচনে জয়ী হওয়ার পর মন্ত্রিসভার সদস্য হলেন শেখ মুজিব।

মন্ত্রিসভা ভেঙে যাওয়ার পর গ্রেফতার হন বঙ্গবন্ধু। পুরো পরিবারকে বাড়ি থেকে বের করে দেওয়া হয়। শেখ হাসিনা সেই দিনের কথা স্মরণ করে বলেন, ‘১৪ দিনের নোটিস দিয়ে আমাদের বের করে দিল। কোথায় যাবেন, কেবল ঢাকায় এসেছেন, খুব কম মানুষকে মা চিনতেন। মন্ত্রী থাকা অবস্থায় ওই বাসায় মানুষে মানুষে গমগম করত। কিন্তু ওই দিন সব ফাঁকা, আব্বার ফুফাতো ভাই, আমার এক নানা এগিয়ে এলেন। নাজিরাবাজারে একটা বাড়ি পাওয়া গেল, সে বাসায় আমাদের নিয়ে উঠলেন। এভাবেই একটার পর একটা ঘাত-প্রতিঘাত এসেছে। কিন্তু একটা জিনিস বলব, মাকে কখনো ভেঙে পড়তে দেখিনি। যত কষ্টই হোক, আমার বাবাকে কখনো বলেননি, তুমি রাজনীতি ছেড়ে দাও বা চলে আসো বা সংসার কর বা সংসারের খরচ দাও, কখনো না। সংসারটা কীভাবে চলবে, সম্পূর্ণভাবে তিনি নিজেই তা ভাবতেন। কোনো প্রয়োজনে বাবাকে বিরক্ত করেননি।’

শুধু নিজের পরিবার-পরিজন নয়, আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের অসুখ-বিসুখেও তাদের পরিবারের খোঁজখবর নেওয়া, যারা জেলখানায় আটক ছিল তাদের পরিবারকে প্রয়োজনে বাজার-সদাই করে দিতেন। এসব করতে গিয়ে কখনো কখনো তার গহনা বিক্রি করতে হয়েছে। এমনকি নিজের পরিবারের অভাব-অনটন তিনি খুব হাসিমুখেই মেনে নিয়েছেন এবং বিভিন্ন সময়ে অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে তা কাটিয়ে উঠেছেন। কখনো তা ছেলেমেয়েদের বুঝতে দেননি।

প্রধানমন্ত্রীর ভাষ্য, ‘এমনও দিন গেছে বাজার করতে পারেননি। আমাদের কিন্তু কোনো দিন বলেননি আমার টাকা নেই, বাজার করতে পারলাম না। চাল-ডাল দিয়ে খিচুড়ি রান্না করেছেন, আচার দিয়ে বলেছেন প্রতিদিন ভাত ভালো লাগে নাকি; আজকে আমরা খিচুড়ি খাব।’

উত্তাল দিনগুলোতে শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে ছায়ার মতো ছিলেন বেগম মুজিব। বিভিন্ন হামলা-মামলা, বিশেষ করে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার বিষয়ে বেগম মুজিবকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছিল। শেখ মুজিব যখন গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে নেতাদের সঙ্গে বসতেন, বেগম মুজিব সবসময় খেয়াল রাখতেন কী সিদ্ধান্ত হচ্ছে। তিনি সময়মতো তার মতামত দিতেন কিন্তু কখনো তাদের সঙ্গে বৈঠকে বসতেন না।

বঙ্গবন্ধু-কন্যার স্মৃতিচারণায় থেকে উঠে এসেছে, আইয়ুব খান গোলটেবিল বৈঠক ডাকল সেখানে যেতে হবে, না গেলে সর্বনাশ হবে। মা খবর পেলেন। আমাকে পাঠালেন, বললেন আমার সঙ্গে কথা না বলে কোনো সিদ্ধান্ত যেন তিনি না দেন। আমাদের বড় বড় নেতারা সবাই ছিলেন, তারা নিয়ে যাবেন।

দেশ স্বাধীন হওয়ার পর বেগম মুজিব বিলাসী জীবনে ফিরে যেতে পারতেন। কিন্তু নিজের গড়া ৩২ নম্বরের বাড়িতেই থেকে যান। সারা জীবন ছায়ার মতো স্বামীর পাশেই ছিলেন। ঘাতকরা বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর তিনি বলেছিলেন, ‘ওনাকে যখন মেরে ফেলেছ আমাকেও মেরে ফেল’। প্রচারবিমুখ এই মহীয়সী নারী পর্দার অন্তরালে থেকে দেশের স্বাধীনতা-সংগ্রামে নিরন্তর প্রেরণা জুগিয়ে গেছেন।

বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা গড়ার স্বপ্নে নিজের স্বপ্ন মিলিয়েছেন। হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির জনক শেখ মুজিবুর রহমানের পাশে ছায়ার মতো থেকে শক্তি জুগিয়েছেন। একটি স্বাধীন দেশের জন্মের ইতিহাসের সঙ্গে যে নামটি ওতপ্রোতভাবে জড়িত তা ফজিলাতুন নেছা মুজিব। দীর্ঘ সংগ্রামে অনন্য ভূমিকার জন্য তিনি হয়ে উঠেছেন বঙ্গমাতা।