প্রথম পর্বতকন্যা

ঢাকা, বুধবার, ১২ ডিসেম্বর ২০১৮ | ২৮ অগ্রহায়ণ ১৪২৫

প্রথম পর্বতকন্যা

শিমুল জাবালি ও ছোটন সাহা ৬:১৩ অপরাহ্ণ, নভেম্বর ০৭, ২০১৮

print
প্রথম পর্বতকন্যা

নারী তার পায়ের বেড়ি ছিঁড়েছেন, সেটা বেশ পুরনো কথা। সেই ধারাবাহিকতায় দিন যত গড়াচ্ছে তারা বেরিয়ে পড়ছেন পাহাড় থেকে জঙ্গলে, মহাসাগর থেকে মহাকাশে। নিছক শখের ভ্রমণ নয়, প্রতীকী অর্থে তারা প্রত্যেকে উঁচু করে তুলে ধরেছেন নারীর বিজয়কে। এমন কয়েকজন নারীর গল্প নিয়ে আমাদের আজকের রোকেয়া। লিখেছেন শিমুল জাবালিছোটন সাহা

‘পাহাড় আমাকে অনেক শিখিয়েছে, আমি বুঝতে পেরেছি আমার ব্যক্তিগত সমস্যাগুলো কতটা নগণ্য’-কথাটি জুনকো তাবেইর। পাহাড়ের সঙ্গে যার আত্মার আত্মীয়তা। এভারেস্টজয়ী বিশ্বের প্রথম নারী তিনি। প্রথম নারী হিসেবে সাত মহাদেশের সাত সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ আরোহণের অনন্য বিশ্ব রেকর্ডও তার দখলে। শুধু কি তাই, মৃত্যুর আগ পর্যন্ত জয় করেছেন বিশ্বের অন্তত ৭০টি দেশের সর্বোচ্চ চূড়া।
১৯৩৯ সালের ২২ সেপ্টেম্বর জাপানে জন্মগ্রহণ জুনকো তাবেই ছোটবেলায় ছিলেন খুবই দুর্বল প্রকৃতির। কে জানতো এ মেয়েটিই নিজের মধ্যে নিরন্তর প্রাণশক্তি তিনি লুকিয়ে রেখেছিলেন। ১৯৭৫ সালের মে মাসে প্রথমবারের মতো এভারেস্টকে নিয়ে আসেন নারীর পায়ের নিচে। সেটি করতে গিয়ে শুধু রক্ষণশীল সমাজের বাধার মুখেই পড়েননি, আক্ষরিক অর্থেই পড়েছিলেন মৃত্যুর মুখে। কিন্তু জুনকো তাবেইর অভিধানে যে বাতিল বলে কোনো শব্দ নেই!
১৯৫৩ সালে স্যার এডমুন্ড হিলারি ও তেনজিং নোরগে যে রুট ধরে এভারেস্ট জয় করেছিলেন সে রাস্তাতেই ১৯৭৫ সালে যাত্রা শুরু করলেন তাবেই ও তার সঙ্গীরা। দিনটি ছিল ৪ মে, ঘড়ির কাটায় রাত ১২টা ৩০ মিনিট। সারা দিনের ক্লান্তিকর পদভ্রমণ শেষে অভিযাত্রীরা ঘুমিয়ে আছেন ২১ হাজার ৩২৬ ফুটের বরফ শীতল উচ্চতায় ক্যাম্প ২-এ। আচমকা দানবের মতো পাহাড় বেয়ে নেমে এলো তুষারের দল। জুনকো আর তার সঙ্গীরা ডুবে গেলেন বরফের নিচে। বোধহয় জ্ঞান হারাচ্ছেন। কোনোমতে গলার কাছে বেঁধে রাখা পকেট ছুরিটা হ্যাঁচকা টানে বের করলেন। হাত বাড়িয়ে দিলেন বরফ ভেদ করে। জ্ঞান হারালেন তিনি।
জুনকোর শেরপা তাকে বরফের নিচ থেকে উদ্ধার করেন। জ্ঞান ফিরলো বটে কিন্তু পায়ের গোড়ালি তাকে একদমই সঙ্গ দিচ্ছে না। কিন্তু দমে যাওয়ার পাত্রী নন তিনি। তাকে যে এভারেস্টের দর্প চূর্ণ করতেই হবে। অতঃপর বিশ্বের ইতিহাসে নতুন একটি নাম যোগ করলেন তিনি, ‘জুনকো তাবেই, প্রথম নারী ও ৩৬তম এভারেস্ট জয়ী।’
এভারেস্ট জয়ের সময়টা কেমন ছিল? জুনকো তাবেইয়ের ভাষায়, ‘আমার সন্তানের বয়স তখন তিন বছরের কিছু বেশি, ওই সময়ে জাপানের সমাজে নারীদের ঘরের বাইরে যাওয়াই নিষেধ। তারা ঘরে রান্না করবে আর স্বামী-মেহমানদের চা এগিয়ে দেবে। এ তাদের কাজ। ভিনদেশের পাহাড়চূড়ায় উঠতে যাব শুনে ফুকুশিমা উপত্যকায় ঢি ঢি পড়ে গেল। পাড়া-প্রতিবেশীদের না হয় সামলানো গেল, কিন্তু এত ছোট্ট বাচ্চা রেখে কীভাবে যাব? আমার চার বোন ও স্বামী মাসানুভো তাবেই সাহস দিলেন। স্বামী নিজেও পাহাড়ে উঠতে পছন্দ করতেন। স্বামীর ভরসায় বোনের কাছে বাচ্চাকে রেখে রওনা হলাম এভারেস্ট প্রশিক্ষণ ক্যাম্পে।’
২০১৩ সালের জানুয়ারিতে ১২ দিনের সফরে বাংলাদেশে এসেছিলেন জুনকো। এক সাক্ষাৎকারে জুনকো সেই অভিজ্ঞতার কথা বলছিলেন, ‘বাংলাদেশের সর্বোচ্চ পাহাড়চূড়া কেওক্রাডাং ওঠার সময় আমার ভিন্ন এক অভিজ্ঞতা হয়েছে। পৃথিবীর খুব কম পাহাড়ি এলাকায় এত মানুষের বসতি আমি দেখেছি।
পথে পথে অনেক আদিবাসীর সঙ্গে আমার দেখা হয়েছে। আমার সঙ্গে তাদের অনেকের চেহারা মিল দেখে তারা আমাকে আরও বেশি আপন করে নিয়েছে।’
জুনকোর আরেক মুগ্ধতার নাম আমাদের সুন্দরবন। ‘সুন্দরবন আমার কাছে বিস্ময়কর মনে হয়েছে। আমি পাহাড় চষে বেড়ানো মানুষ। বনবাদাড় আমাকে খুব বেশি টানে না। কিন্তু সুন্দরবন দেখে মনে হয়েছে, এখানে আমাকে বারবার আসতে হবে। একমাত্র এ বনটি দেখে আমার মনে স্বাদ জেগেছে, শুধু পাহাড়চূড়া জয় না করে বনে বনে ঘুরে বেড়ালেও পারতাম। এ বনের শ্বাসমূল, জোয়ার-ভাটার খেলা, সূর্যডোবা-সূর্যোদয় বড়ই রহস্যময়। এ রহস্য এভারেস্ট চূড়ার চেয়েও কম নয়।’
২০১২ সালে তাবেইয়ের শরীরে ক্যান্সার ধরা পড়ে। আজীবন এ অভিযাত্রী তারপরও থেমে থাকেননি। ২০১৬ সালের ২০ অক্টোবর মৃত্যুর আগ পর্যন্ত যুক্ত ছিলেন সমাজসেবায়। নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠায় আর পর্বতপ্রেমীদের জন্য উজ্জ্বল উদাহরণ হয়ে থাকবেন জুনকো তাবেই।


নিশাতের নেশা
পুরো নাম নিশাত মজুমদার নিশু। বাংলাদেশের চার এভারেস্ট বিজয়ীর একজন। প্রথম বাংলাদেশি নারী এবং তৃতীয় বাংলাদেশি হিসেবে বিশ্বের সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ এভারেস্ট জয় করেছেন নিশাত মজুমদার।
শৈশবে স্বপ্ন ছিল বৈমানিক হবেন। পবর্তারোহী হওয়ার কথা কখনো ভাবেননি কিন্তু প্রথম পাহাড় দর্শনেই প্রেমে পড়ে গেলেন। একসময় এ প্রেমই নেশার মতো হয়ে উঠলো।
বাংলা মাউন্টেনিয়ারিং অ্যান্ড ট্র্যাকিং ক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা ইনাম আল হকের হাত ধরেই পর্বত আরোহণের সুযোগ হয় নিশাত মজুমদারের। ২০০৭ সালের মে মাসে বিখ্যাত পর্বতারোহণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ‘হিমালয়ান মাউন্টেনিয়ারিং ইনস্টিটিউটে’ কাটলো এক মাস। এতে তিনি এ গ্রেড রেজাল্টসহ বেসিক পবর্তারোহণ কোর্সে উত্তীর্ণ হন। এক লাফেই কোনো অভিযাত্রী এভারেস্ট চূড়ায় উঠতে পারেন না। এ জন্য তাকে ছোট-বড় আরও কিছু পাহাড়-পর্বতে আরোহণের মাধ্যমে নিজেকে উপযোগী করে গড়ে তুলতে হয়। নিশাত মুজমদারও সে পথে হেঁটেছেন, আরোহন করেছেন কেওক্রাডং, মেরা পর্বতশৃঙ্গ, সিঙ্গচুলি পর্বতশৃঙ্গ এবং বাংলাদেশ-ভারতের যৌথ অভিযানে গঙ্গোত্রী হিমালয়ের গঙ্গোত্রী পর্বতশৃঙ্গসহ আরও অনেক পাহাড়-পর্বত।
তারপর আসে সেই কাঙ্ক্ষিত দিন। ২০১২ সালের ৬ এপ্রিল ঢাকা থেকে নেপালের রাজধানী কাঠমুণ্ডুর উদ্দেশে যাত্রা শুরু করেন নিশাত মজুমদার। ৮ দিন ট্র্যাকিং করে বেস ক্যাম্পে পৌঁছান তিনি। তারপর এক এক করে বিভিন্ন ক্যাম্প পাড়ি দিয়ে ১৯ মে নেপালের স্থানীয় সময় সকাল সাড়ে ৯টায় ২৯ হাজার ২৯ ফুট (৮,৮৪৮ মিটার) উচ্চতার মাউন্ট এভারেস্টে আরোহণ করেন। এর আগে জীবন মৃত্যুর সন্ধিক্ষণের মধ্যে দিয়ে যেতে হয়েছে নিশাত মজুমদারকে। ক্যাম্প-১ থেকে ক্যাম্প-২ এ যাওয়ার পথে ‘কুম্বু হিমবাহ’ পার হতে হয়। বিশটি মই দিয়ে ওখানকার বরফের ফাটল পার হতে হয়েছিল তাকে।
৭ দিন হেঁটে কাঠমুণ্ডু থেকে বেস ক্যাম্পে যেতে হয়েছে। বেস ক্যাম্প থেকে চূড়ায় যেতে লেগেছে ১ মাস ৪ দিন। নিশাতের নাক-কপাল ফেটে রক্ত ঝরছে একাধিকরার। কিন্তু এ অবস্থার মধ্যেও এভারেস্ট জয়ে পিছপা হননি নিশাত।


দুই চাকার নারী
অ্যানি লন্ডনডেরি, যিনি ল্যাটিন অভিবাসী ছিলেন। বিশ্বব্যাপী সাইকেল চালিয়ে পরিভ্রমণকারী প্রথম নারী তিনি। অ্যানি শুধু ভ্রমণপিপাসুই ছিলেন না, ছিলেন একজন মুক্তচিন্তাশীল নারী, একজন উদ্যোক্তা, ক্রীড়বিদ। বিশ্বজুড়ে সাইকেল ভ্রমণে বাজি ধরাই তার বড় অনুপ্রেরণা।
১৮৯৪ সালের ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝিতে তিনি এক বছরের মধ্যে ৫ হাজার ডলারের ট্রিপ সূচনা করে। তখনকার সময়ে নারীদের সাইকেল চালানো সীমিত ছিল। এমনকি সাইকেল চালালে জরিমানাও দিতে হতো। তা ছাড়া সাইকেলের গঠন নারীদের চালানোর উপযোগী ছিল না। এর সবকিছু আদায় করে নেন অ্যানি। সব বাধা-বিপত্তি ভেঙে তিনি হয়ে যান যুগান্তকারী নারী। ২০১১ সালে, ইভ্যালিন প্যারি তার সাইকেল-থিমযুক্ত ‘অ্যালি লন্ডনডেরি ব্যাল্যাড’ নামে একটি গান তৈরি করেন। এ ছাড়া অ্যানীকে নিয়ে আছে চলচ্চিত্রও। ‘লন্ডনডেরি’ শিরোনামে ২৬ মিনিটের সিনেমাটি ২০১৩ সালে একটি ফিল্ম  ফেস্টিভ্যালে সেরা চলচ্চিত্রের স্বীকৃতি পায়।

স্কুটিতে স্কুল থেকে স্কুলে
কেউ ডাক্তার, কেউ শিক্ষার্থী, কেউবা চাকরিজীবী। সঙ্গে স্কুটার, কাঁধে ব্যাগ-ল্যাপটপ। কখনো রোদ কখনো বৃষ্টি আবার কখনো অন্য বিড়ম্বনা বা প্রতিকূলতা। কিন্তু শত বাধা পেরিয়ে এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে অবিরাম ছুটে চলা। ক্লান্তিকে ছুটি দিয়ে গন্তব্যে পৌঁছানো এবং শিক্ষার্থীদের সুরক্ষার কৌশল শেখানোই তাদের লক্ষ্য। এ গল্প ডা. সাকিয়া হক, ডা. মানসী সাহা তুলি, মুন্তাহা রহমান অর্থি ও নুসরাত জাহান রিজভির। যারা ‘ভ্রমণকন্যা’ নামে পরিচিত। ট্রাভেলারস অব বাংলাদেশ ভ্রমণকন্যা-সংগঠনের ব্যানারে তারা ছুটে চলেন দেশের এক জেলা থেকে অন্য জেলায়। শহর ও মফস্বলের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নারী শিক্ষার্থীদের আত্মরক্ষার কৌশল, নারীর ক্ষমতায়ন, বয়ঃসন্ধিকালে সমস্যা-সমাধান, খাদ্য ও পুষ্টি এবং সুরক্ষার কৌশল শেখান তারা। এ ছাড়াও দেশের মুক্তিযুদ্ধ এবং পর্যটন স্পট নিয়েও মাল্টিমিডিয়া প্রদর্শন ও আলোচনা করা হয়। ভ্রমণের মাধ্যমে নারীদের সচেতন ও ভ্রমণজগতে নারীদের সুস্থ পরিবেশ তৈরির লক্ষ্যে ইতোমধ্যে দেশের ৩৫টি জেলা অতিক্রম করার পরও তাদের অভিযাত্রা অব্যাহত রয়েছে। এভাবে দেশের ৬৪ জেলা অতিক্রম করার লক্ষ্য নিয়ে ছুটে চলেছে তাদের স্কুটি।
‘ট্রাভেলারস অব বাংলাদেশ ভ্রমণকন্যা’র তথ্য ও পরিকল্পনা সম্পাদক টুম্পা প্রামাণিক জানান, ‘ভ্রমণ করতে গিয়ে আমাদের নানা রকমের প্রতিকূলতার মধ্যে পড়তে হয়েছে, কখনো বৃষ্টি কখনো ঝড়। তবে যখন দেখি স্কুলের মেয়েরা খুব আগ্রহ নিয়ে আমাদের গ্রহণ করছে তখন সব বাধা ও ক্লান্তি ভুলে যাই।’ নিজেদের অর্থায়নে ঘুরে বেড়ান ভ্রমণকন্যারা। প্রতিটি জেলার প্রশাসক ও সংবাদকর্মীরা সহযোগিতা করে থাকেন।
প্রশিক্ষণে অংশগ্রহণকারী স্কুলের শিক্ষার্থীরা উচ্ছ্বসিত। তারা বলছেন, ‘আগে আমরা নিজের সুরক্ষা বা আত্মরক্ষার কৌশল সম্পর্কে জানতাম না, ভ্রমণকন্যারা আমাদের এ বিষয়ে সচেতন করে তুলেছেন, যা আমাদের কাজে লাগছে।’ উল্লেখ্য, গত বছরের ৬ এপ্রিল কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার থেকে যাত্রা শুরু করে দলটি।

মহাকাশের কল্পনা চাওলা
ভারতীয় নারী হিসেবে প্রথমবারের মতো মহাকাশ জয় করা কল্পনা চাওলার ভাগ্যটাই সহায় ছিল না, নচেৎ সুদূর মহাকাশে গিয়ে আর ফিরবেনই না কেনো? ২০০৩ সালের ১ ফেব্রুয়ারি মহাকাশ ছেড়ে যখন পৃথিবীতে অবতরণ করবে কল্পনাসহ আরও ছয়জন, সে মুহূর্তেই ঘটে বিপর্যয়। বায়ুমণ্ডলের সঙ্গে সংঘর্ষে তাদের বহনকারী নভোযানটি বিধ্বস্ত হয়। নভোযানের সাতজন মহাকাশচারী এবং ক্রুসহ সবাই মৃত্যুবরণ করেন।
কল্পনা চাওলা ১৯৬২ সালের ১৭ মার্চ ভারতের হরিয়ানা রাজ্যের কারনালে বসবাসকারী এক পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। চণ্ডীগড়ের পাঞ্জাব প্রকৌশল কলেজ থেকে মহাকাশ প্রকৌশলের ওপর স্নাতকের পাঠ সম্পন্ন করে উচ্চশিক্ষার জন্য যুক্তরাষ্ট্রে চলে যান এবং সেখানে ইউনিভার্সিটি অব টেক্সাস অ্যাট আর্লিংটন থেকে একই বিষয়ে স্নাতকোত্তর শিক্ষা সমাপ্ত করেন।
১৯৮৮ সালে নাসাতে তার কর্মজীবন শুরু হয়। কল্পনা প্রথম মহাকাশ যাত্রা শুরু করে ১৯৯৭ সালে। নাসা স্পেস ফ্লাইট মেডেল পান তিনি। কল্পনা বিশ্বাস করতেন না তিনি কোনো দেশের নাগরিক। তিনি বিশ্বাস করতেন তিনি সৌরজগতের নাগরিক।
মহাকাশচারী এই নারীকে নিয়ে শিগগিরই নির্মাণ হচ্ছে বায়োপিক। কল্পনার চরিত্রে প্রিয়াঙ্কার অভিনয়ের গুঞ্জন শোনা যায় সবচেয়ে বেশি। পরিচালনায় দেখা যেতে পারে নবাগতা পরিচালক প্রিয়া মিশ্রকে। প্রিয়া জানিয়েছেন, ৮ বছর ধরে এ নিয়ে গবেষণা করছেন তিনি।

সাইকেলে সর্বোচ্চ চূড়ায়
মাত্র দুই বছর আগেও খারদুংলা পাস (বিশ্বের সবচেয়ে উঁচু সড়ক) কোনো বাংলাদেশি জয় করতে পারেননি। ২০১৬ সালে প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে নিয়াজ মোর্শেদ খারদুংলা পাস জয় করেন সাইকেল চালিয়ে। দুই বছর পর, ’১৮-তে এসে খারদুংলা পাস জয় করলেন একজন বাংলাদেশি তরুণী। নাম জিনিয়া তাবাসসুম। এটি পৃথিবীর সর্বোচ্চ ‘মোটরেবল রোড’। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে আঠারো হাজার তিনশ ফিট উঁচুতে এই খারদুংলা পাসের অবস্থান, যা কি না এভারেস্ট বেস ক্যাম্পের চেয়েও উঁচুতে!
জিনিয়া তাবাসসুমের যাত্রাটা মোটেও সহজ ছিল না। স্বপ্ন দেখার শুরুটা অনেক আগে, যখন সাইকেল চালানো শিখলেন। দুই চাকার এই বাহন নিয়েই বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে বেড়াতে ভালো লাগত তার। একদিন জানতে পারলেন খারদুংলা পাসের কথা। স্বপ্ন দানা বাঁধল তার মনে। পৃথিবীর সর্বোচ্চ মোটরেবল হাইওয়েতে দুই চাকার প্রিয় সাইকেলটা নিয়ে যাবেন।
বাকিটা ইতিহাস। দেশের প্রথম নারী সাইক্লিস্ট হিসেবে রেকর্ডের খাতায় নাম লেখালেন খুলনার এই মেয়ে। বিশ্বের সবচেয়ে উঁচু সড়কে সাইকেল চালিয়ে জিনিয়া পাড়ি দিয়েছেন ৫১০ কিলোমিটার। গত ১০ থেকে ২২ আগস্ট ভারতের হিমাচল প্রদেশের মানালি থেকে জম্মু ও কাশ্মিরের লাদাখ পেরিয়ে খারদুংলা পর্যন্ত সাইকেল চালিয়ে রেকর্ড গড়েন তিনি। এর মধ্যে পার হন ছয়টি মাউন্টেন পাস। এগুলো হলো- রোথাং পাস, বারালাচা পাস, নাকিলা পাস, লাচুংলা পাস, তাংলাংলা পাস ও খারদুংলা পাস।
সেই কঠিনতম পথ পাড়ি দেওয়ার অভিজ্ঞতা খুব সুখের ছিল না জিনিয়ার জন্য। পাহাড়ের আঁকাবাঁকা সড়ক। যত ওপরে উঠছেন ততই প্যাডেল ঘোরাতে তাকে হিমশিম খেতে হচ্ছে। নিঃশ্বাস ভারী হচ্ছে। তিনি একদিকে অমানুষিক চেষ্টায় ওপরে উঠছেন, অন্যদিকে যেন মনে হচ্ছে কেউ তাকে পেছন থেকে টেনে ধরছে। ঠাণ্ডায় নাক, কান সব বন্ধ, সর্দি লেগে অবস্থা খুব খারাপের দিকে। এর ওপর শুরু হলো শ্বাসকষ্ট। বিরূপ প্রকৃতির সঙ্গে রীতিমতো যুদ্ধ করে জিনিয়া জয় করে নিলেন সেই কাঙ্ক্ষিত রেকর্ড। খারদুংলা পাস জয়।
বাংলাদেশে এই প্রথম কোনো নারী সাইক্লিস্ট এই পাসগুলো অতিক্রম করলেন। এর আগে তাবাসসুম বাংলাবান্ধা থেকে টেকনাফ, দর্শনা থেকে আখাউড়া, হালুয়াঘাট থেকে কুয়াকাটা এবং ভোমরা থেকে তামাবিল-এই ক্রস কান্ট্রিগুলো সম্পন্ন করেন। তিনটি পার্বত্য জেলায়ও সাইকেল চালিয়েছেন তিনি। এ ছাড়াও দলগতভাবে এবং একা অনেক রাইড দিয়েছেন জিনিয়া তাবাসসুম।

এক্সপেডিশান ১৯৬
শুধু নারীদের মধ্যেই নয়, বিশ্বভ্রমণকারীদের মধ্যেও ইতালির ক্যাসি দ্য পিকল তিন বছর তিন মাসেরও কম সময়ে ১৯৬টি দেশ ভ্রমণের রেকর্ড গড়েছেন। তরুণ ও নারী হিসেবে এই রেকর্ড প্রথম তারই। ওয়াশিংটনের মেয়ে ২৯ বছর বয়সী ২০০৯ সালে তার সফর শুরু হয়। প্রথমদিকে ভ্রমণসঙ্গী ছিলেন ক্যাসির ভাই। এরপর বাকি পথ ভাইকে ছাড়া একাই যেতে হয় তাকে। দুই বছর যাত্রাপথে তিনি কখনো ট্রেনে ঘুমিয়েছেন, কখনো স্টেশনের মেঝেতে থেকেছেন, কখনো হেঁটেছেন। তার এই বিশ্বভ্রমণের নামকরণ করেছেন ‘এক্সপেডিশান ১৯৬’। ক্যাসি নাম উঠিয়েছেন গিনেজ বুকেও। ক্যাসি বলেন, ‘যে যা কিছুই বলুক না কেন, বিশ্বভ্রমণের অভিযান মোটেও সহজ নয়। পুরো ভ্রমণে আমার কাজ ছিল বিভিন্ন দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর পর্যটনবিষয়ক শিক্ষার্থীদের সঙ্গে পর্যটন ও অর্থনীতি নিয়ে আলাপ-আলোচনা করা। এ ছাড়া অভিযাত্রী এবং বিজ্ঞানীদের সঙ্গে বিভিন্ন জায়গায় পানীয় জলে ক্ষুদ্র প্লাস্টিকের উপস্থিতি নিয়েও আমি কাজ করেছি।’