মুসা আল খাওয়ারিজমি বীজগণিতের জনক

ঢাকা, সোমবার, ১৮ অক্টোবর ২০২১ | ৩ কার্তিক ১৪২৮

Khola Kagoj BD
Khule Dey Apnar chokh

বিশ্ব সভ্যতায় মুসলিম মনীষীদের অবদান-৩

মুসা আল খাওয়ারিজমি বীজগণিতের জনক

মুহাম্মাদ নাঈমুর রহমান সা’দ
🕐 ৮:৫৬ পূর্বাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ১০, ২০২১

মুসা আল খাওয়ারিজমি বীজগণিতের জনক

বীজগণিত বা ‘অ্যালজেব্রা’র নাম শুনেনি এমন শিক্ষিত মানুষ হয়তো নেই। এই ‘অ্যালজেব্রা’ গাণিতিক হিসাব পদ্ধতিকে বৈপ্লবিকভাবে সহজ করে দিয়েছে। তাই আজ সর্বাধিক যুগেও এই শাস্ত্রটির ব্যবহার ও শিক্ষা সর্বত্র লক্ষ্য করা যায়। স্মর্তব্য যে, এ বৈপ্লবিক পদ্ধতিটি সর্বপ্রথম আবিষ্কার করেন বিশ্বখ্যাত মুসলিম বিজ্ঞানী, গাণিতিক, জ্যোতির্বিদ ও ভূগোলবিদ আবু আবদুল্লাহ মোহাম্মদ ইবনে মূসা আল খারিজমী। সংক্ষেপে আল খারিজমী নামে তিনি পরিচিত।

সংক্ষিপ্ত জীবন

সে প্রায় এক হাজার দুইশ’ বছর আগের কথা। মুসলিম সভ্যতার স্বর্ণযুগে পারস্যের খিভা নামক প্রদেশের ‘খারিজমা’ নামক স্থানে ৭৮০ ঈসায়ী সনে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। বাগদাদে তখন বিদ্যোৎসাহী মামুনের শাসনকাল। আল খারিজমীর প্রচ- জ্ঞান-পিপাসা এবং বিজ্ঞান প্রতিভা তাকে মুগ্ধ করে। খলিফা খারিজমীকে বাগদাদের বিশ্ববিখ্যাত জাহানপীঠ লাইব্রেরির গ্রন্থাগারিক নিযুক্ত করেন। রাজকীয় এই লাইব্রেরির দায়িত্ব পেয়ে তিনি জ্ঞান-বিজ্ঞানের এক বিশাল সম্ভারের সঙ্গে পরিচিত হন। তিনি খলিফার অন্যতম গুণী সভাসদের নিযুক্তিও লাভ করেন। সোনালি যুগের মুসলিম বিজ্ঞানীদের জ্ঞান সাধনা ছিল বহুধা বিভক্ত এবং বিচিত্র প্রতিভায় সিক্ত। তারা প্রত্যেকেই একাধিক বিষয়ের ওপর গ্রন্থ রচনা করেছেন এবং মৌলিক অবদান রেখে গেছেন। আল খারিজমী ছিলেন তেমনি একজন। তার সময়ের প্রচলিত বিজ্ঞানের একাধিক বিষয়ে তিনি সাধনা করেছেন। জ্যোতির্বিজ্ঞান, জ্যামিতি, ত্রিকোণমিতি, বীজগণিত এবং ভূগোল বিষয়ে তার অনন্য অবদান আজও সভ্যতার ইতিহাসে অক্ষয় অমর করে রেখেছে তাকে। মুসলিম স্বর্ণযুগের এই বিশিষ্ট গণিতবিদ ও বিজ্ঞানী ৮৫০ ঈসায়ীতে বাগদাদে ইন্তেকাল করেন।

আল-খাওয়ারিজমীর অবদান

তিনি ছিলেন একজন জগৎবিখ্যাত গণিতবিদ। তার সময়ের গণিতের জ্ঞানকে তিনি এক অভাবনীয় সমৃদ্ধতর পর্যায়ে নিয়ে তুলেন। একজন গণিতবিদ হওয়ার পাশাপাশি ছিলেন একজন উল্লেখযোগ্য জ্যোতির্বিদ। ভূগোল বিষয়ে তার প্রজ্ঞা উৎকর্ষতাকে ছাপিয়ে গিয়েছিল।

তিনি ছিলেন বীজগণিত তথা অ্যালজেব্রার (অষমবনৎধ) জনক। তিনি প্রথম তার একটি বইয়ে এই অ্যালজেব্রার নাম উল্লেখ করেন। বইটির নাম হলো ‘আল-জাবর ওয়া-আল-মুকাবিলা’। তার বই নিয়ে নিবন্ধটির শেষ অংশে থাকবে।

তিনি বিজ্ঞান বিষয়ক বহু গ্রিক ও ভারতীয় গ্রন্থ আরবিতে অনুবাদ করেন। বিভিন্ন ক্ষেত্রে তার অবদান নিচে দেওয়া হলো-

১. পাটিগণিত-এর ক্ষেত্রে অবদান

পাটিগণিত বিষয়ে তিনি একটি বই রচনা করেন যা পরে ল্যাটিন ভাষায় অনূদিত হয়। খ্রিস্টীয় ষষ্ঠ শতকে হিন্দু গণিতবিদগণ দশমিক পদ্ধতির উদ্ভাবন করেন। এই পদ্ধতিকে খোয়ারিজমীই প্রথম ইসলামী জগতে নিয়ে আসেন। তার রচিত ঞযব ইড়ড়শ ড়ভ অফফরঃরড়হ ধহফ ঝঁনংঃৎধপঃরড়হ অপপড়ৎফরহম ঃড় ঃযব ঐরহফঁ ঈধষপঁষধঃরড়হ (যোগ বিয়োগের ভারতীয় পদ্ধতি) তারই উদাহরণ।

২. বীজগণিত-এর ক্ষেত্রে অবদান

এ ক্ষেত্রে তিনি সবচেয়ে বেশি উৎকর্ষতা লাভ করেন। তার হাতেই গণিতের এই শাখাটি পরবর্তী সময়ে আরও সমৃদ্ধতর হয়। বর্তমান যুগ পর্যন্ত গণিত বিদ্যায় যে উন্নয়ন এবং এর সহায়তায় বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় যে উন্নতি ও আবিষ্কার সম্ভব হয়েছে তার মূলে রয়েছে আল-খোয়ারিজমী’র উদ্ভাবিত গণিত বিষয়ক নীতিমালারই বেশি অবদান।

তার রচিত বই ‘কিতাব আলজিবর ওয়াল মুকাবিলা’ হতে বীজগণিতের ইংরেজি নাম অ্যালজেব্রা (অষমবনৎধ) উৎপত্তি লাভ করে। অষমড়ৎরঃযস শব্দটি অষশযধিৎরুসর নামের ল্যাটিন অপভ্রংশ ধষমড়ৎরংসর হতে উৎপত্তি লাভ করেছে। অ্যালজেব্রায় লিনিয়ার বা একঘাত এবং কোয়াড্রেটিক বা দ্বিঘাত সমীকরণ আছে।

আমরা সাধারণত কোনো সমীকরণ সমাধান করে যখনই অথবা- এর একটি করে মান পাই। যেগুলো এক ঘাত সমীকরণ নামে পরিচিত। আবার দ্বিঘাত সমীকরণে দুটি মান পাওয়া যায়। এই দুই ধরণের সমীকরণের বিশ্লেষণধর্মী ব্যাখা তুলে ধরেন আল-খাওয়ারিজমী।

৩. জ্যোতির্বিজ্ঞানে অবদান

জ্যোতির্বিজ্ঞানে আল-খাওয়ারিজমী একটি স্মরণীয় নাম। এ শাস্ত্রে তিনি বহু মৌলিক অবদান রেখে গেছেন, তার রচিত ‘নির্ঘণ্ট’ প্রাচ্যে ও পাশ্চাত্যে বিশেষ আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। এর সাহায্যে ইবনে আলী জ্যোতির্বিজ্ঞানের ওপর পর্যবেক্ষণ চালান এবং এ বিষয়ে বহু গ্রন্থ প্রণয়ন করেন। আল ফারাগণী তার যুগের একজন শ্রেষ্ঠ জ্যোতির্বিজ্ঞানী ছিলেন। তার রচিত ‘জ্যোতির্বিজ্ঞানের সংক্ষিপ্তসার’ (ঊষবসবহঃং ড়ভ অংঃৎড়হড়সু) ক্রিমেনার জিয়ার্ড ল্যাটিন ভাষায় অনুবাদ করেছিলেন।

৪. ভূগোলে অবদান

তার রচিত সুরত-আল-আরদ (ঞযব রসধমব ড়ভ ঃযব ঊধৎঃয) গ্রন্থটি বিশ্বের প্রথম মানচিত্র হিসেবে বিবেচিত।

৫. ত্রিকোণমিতিতে অবদান

আল খোয়ারিজমী রচিত জিজ আল সিন্দ-হিন্দে ত্রিকোণমিতি নিয়ে কম কাজ থাকলেও তা বেশ গুরুত্বপূর্ণ। এই বইয়ে ত্রিকোণমিতিক ফাংশন সাইন এবং কোসাইন-এর অনুপাত নির্ণয় করে এগুলোকে তার অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল টেবিলে সংযুক্ত করেন। গোলকীয় ত্রিকোণমিতি নিয়েও খোয়ারিজমীর একটি বই রয়েছে।

৬. ইহুদি বর্ষপঞ্জি

হিব্রু বর্ষপঞ্জি নিয়ে আল-খাওয়ারিজমী ‘রিসালা ফি ইসতিখরাজ তারিখ আল ইয়াহুদ’ (ঊীঃৎধপঃরড়হ ড়ভ ঃযব ঔবরিংয ঊৎধ) শিরোনামের একটি বই রচনা করেন। সপ্তাহের কোন দিন মাসের প্রথম দিন হবে তা নির্ণয়ের উপায় তিনি এতে বর্ণনা করেন। এটি ‘তিশ্রি’ নামেও পরিচিত। এছাড়াও ইহুদি বর্ষ বা ‘অ্যানো মুন্ডি’ এবং ‘অ্যানো গ্রেকোরাম’ বা গ্রিক বর্ষের মধ্যকার বিরামকাল তিনি নির্ণয় করেন। হিব্রু পঞ্জিকা ব্যবহার করে সূর্য ও চাঁদের দ্রাঘিমাংশ নির্ণয় করা নিয়েও এতে আলোচনা আছে।

সম্মান

ইন্টারন্যাশনাল এস্ট্রোনমিক্যাল অর্গানাইজেশন (আইএইউ) ১৯৭০ সালে জ্যোতির্বিজ্ঞানী ও গণিতজ্ঞকে সম্মানিত করার সিদ্ধান্ত নেয়। এ সিদ্ধান্তের অংশ হিসেবে চাঁদের একটি গহ্বরের নামকরণ করা হয়ে তার নামে সাত দশমিক এক দ্রাঘিমাংশ এবং ১০৬ দশমিক ৪ অক্ষাংশে এ গহ্বরের ব্যাস ৬৫ দশমিক শূন্য পাঁচ কিলোমিটার। ইরানের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি গবেষণা সংস্থা প্রতি বছর গবেষণা, উদ্ভাবন ও বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারে বিশেষ অবদান রাখার জন্য সংশ্লিষ্ট বিজ্ঞানীদের খাওয়ারিজম ইন্টারন্যাশনাল অ্যাওয়ার্ড প্রদান করে থাকে।

রচনাবলি

বার্লিন, ইস্তাম্বুল, তাসখন্দ, কায়রো ও প্যারিসের লাইব্রেরিগুলোতে খাওয়ারিজমীর কয়েকটি আরবি পা-ুলিপি সংরক্ষিত আছে। আল-খাওয়ারিজমীর ‘মুকাবালা’ বীজগণিতের সর্বশ্রেষ্ঠ ও মধ্যযুগের সর্বশ্রেষ্ঠ গ্রন্থ হিসেবে স্বীকৃত সূর্যঘড়ির ওপর লেখা একটি বইয়ের পা-ুলিপি ইস্তাম্বুল লাইব্রেরির হেফাজতে।

ঐতিহাসিক ইবনে আল-নাদিমের ‘কিতাব আল ফিরিস্তি’তে এ পাণ্ডুলিপির উল্লেখ রয়েছে। মক্কা শরীফের দিকনির্দেশনা সম্বলিত তার একটি কর্মের সন্ধান পাওয়া গেছে। এ বইটি হচ্ছে স্ফেরিক্যাল এস্ট্রোনমির ওপর খাওয়ারিজমীর লেখা কয়েকটি বইয়ের একটি। ‘মারিফাত সা’ত মাশরিক ফি কুল বালাদ’ এবং ‘মারিফাত আল-সামি মিন কিবাল আল-ইরতিফা’ নামে আরও দুটি বই পাওয়া গেছে।

মারিফাত সা’ত মাশরিক ফি কুল বালাদ-এ সকালের দৈর্ঘ্য এবং মারিফাত আল-সামি মিন কিবাল আল-ইরতিফা’য় একটি উঁচু জায়গা থেকে দিগবলয় নির্ধারণ নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। খাওয়ারিজমী এস্ট্রোল্যাব নির্মাণ ও ব্যবহারের ওপর অন্য দুটি বই লিখেছিলেন। ফিরিস্তি’তে বই দুটির নাম উল্লেখ করা হয়েছে। একটি হলো ‘কিতাব আর রুখমাত’ এবং আরেকটি হলো ‘কিতাব আল-তারিখ’।

মুসলিম মনীষীরা যখন জ্ঞান-বিজ্ঞানে নিজেদেরকে সমৃদ্ধ করার দিকে ধাবিত হন, তখন খারিজমিই একপ্রকার পথ দেখিয়েছেন তাদের। খারিজমিকে তাই স্বর্ণযুগের একজন কারিগর বললেও বেশি বলা হবে না।

মুহাম্মাদ নাঈমুর রহমান সা’দ, শিক্ষার্থী, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া।

 
Electronic Paper