চিলাহাটী স্থলবন্দর ঘিরে বাড়ছে প্রাণচাঞ্চল্য

ঢাকা, বুধবার, ২০ অক্টোবর ২০২১ | ৪ কার্তিক ১৪২৮

Khola Kagoj BD
Khule Dey Apnar chokh

চিলাহাটী স্থলবন্দর ঘিরে বাড়ছে প্রাণচাঞ্চল্য

ডোমার (নীলফামারী) প্রতিনিধি
🕐 ১০:৪২ পূর্বাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ১৯, ২০২১

চিলাহাটী স্থলবন্দর ঘিরে বাড়ছে প্রাণচাঞ্চল্য

দীর্ঘ ৫৬ বছরের প্রতিক্ষার অবসান হয়েছে নীলফামারীর মানুষের। চিলাহাটি স্থলবন্দরে ফের ফিরেছে প্রাণচঞ্চলতা। গত ১ আগস্ট (রোববার) রেলপথে ভারত থেকে পাথর আমদানির মধ্যদিয়ে বাণিজ্যিক কার্যক্রম শুরু হয় স্থলবন্দরটিতে। এ বন্দর ঘিরে সক্রিয় হচ্ছেন ব্যবসায়ীরা। সংশ্লিষ্ট এলাকায় নতুন শিল্প, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার পরিকল্পনা এগিয়ে চলেছে। ফলে স্থানীয়রা নানা অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত হচ্ছে। তারা মনে করছেন, এ বন্দর ঘিরে উত্তরবঙ্গে ব্যাপক উন্নয়ন কর্মকাণ্ড পরিচালিত হবে। ফলে বাড়বে কর্মসংস্থান।

উদ্বোধনের সাড়ে সাত মাস পর পাথর আমদানি: ২০২০ সালের ১৭ ডিসেম্বর এ পথে পণ্যবাহী ট্রেন চলাচলের উদ্বোধন হয়। ওইদিন বেলা সাড়ে ১১টা ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে ওই রেল যোগাযোগের উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। দুই প্রধানমন্ত্রীর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন ঘোষণার পর বেলা ১২টা ৪৬ মিনিটে চিলাহাটি স্টেশন থেকে ৩২টি পণ্যবাহী ওয়াগনের বহর নিয়ে ভারতের উদ্দেশ্যে ছেড়ে যায় বাংলাদেশ রেলওয়ের ট্রেনটি।

গুরুত্বপূর্ণ পথটি বন্ধ হয় ১৯৬৫ সালে : ব্রিটিশ শাসনামলে আটটি স্থান দিয়ে বর্তমান বাংলাদেশ ও ভারতের বিভিন্ন স্থানে পণ্য ও যাত্রীবাহী ট্রেন চলাচল করত। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল চিলাহাটি-হলদিবাড়ী পথ। এই পথ দিয়ে নিয়মিত চলাচল করত দার্জিলিং থেকে খুলনা এবং দর্শনা দিয়ে কলকাতা পর্যন্ত একাধিক যাত্রীবাহী ও পণ্যবাহী ট্রেন। ১৯৬৫ সালের ৫ সেপ্টেম্বর পাকিস্তান-ভারত যুদ্ধে এ রুট বন্ধ হয়। অবশেষে ২০০২ সালের ২৬ জুন মানুষ চলাচলের পথটিও বন্ধ ঘোষণা করা হয়। তবে সে সময় থেকে আনুষ্ঠানিক বন্ধ ঘোষণা করা হয়নি ইমিগ্রেশন এবং শুল্ক স্টেশন।

২০১১ সালে চিলাহাটি স্থলবন্দর সচলের ঘোষণা : ২০১৩ সালের ২৮ জুলাই মন্ত্রিপরিষদের বৈঠকে চিলাহাটিকে স্থলবন্দর ঘোষণা করে ওই বছরের ১ আগস্ট সরকারি গেজেট প্রকাশ করা হয়।

পরিত্যক্ত রেলপথ পুনর্নির্মাণের উদ্যোগ : ১৯৬৫ সালে পাক-ভারত যুদ্ধের পর এ পথটি বন্ধ হয়। বর্তমান সরকার ২০১৫ সালে বন্ধ থাকা রেল লিংক পুনরায় চালুর উদ্যোগ নেয়। সে লক্ষ্যে ২০১৮ সালে চিলাহাটি-হলদিবাড়ি রেল লিংকটি স্থাপনের সিদ্ধান্ত হয়। ২০১৯ সালের ২১ সেপ্টেম্বর নির্মাণকাজের উদ্বোধন করেন বর্তমান রেলপথমন্ত্রী নূরুল ইসলাম সুজন।

চিলাহাটি-হলদিবাড়ী রেল লিংক স্থাপনের প্রকল্প পরিচালক আবদুর রহীম বলেন, ‘ওই কাজের ৯৬ ভাগ সম্পন্ন হয়েছে। এরপর স্টেশনটিকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করে সম্পূরক আরেকটি রিভাইজ প্রস্তাবনা প্রদান করা হয়েছে। শিগগিরই সেটি অনুমোদন হলে নতুন করে আরেকটি দ্বিতল স্টেশন ব্লিডিং, নতুন আরেকটি প্ল্যাটফর্ম স্থাপন, পুরাতন প্ল্যাটফর্মটি আরও উঁচুকরণ, ফুটওভার ব্রিজ স্থাপন করা হবে। এজন্য তিন একর জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে। ওই স্টেশন বিল্ডিং-এ স্থাপিত হবে কাস্টমস ও ইমিগ্রেশন কার্যালয়।

ভারতীয় অংশে নির্মাণ কাজ শেষ : বন্ধুপ্রতীম দেশ ভারত হলদিবাড়ি থেকে বাংলাদেশের সীমান্ত পর্যন্ত তিন কিলোমিটার রেললাইন স্থাপনসহ প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নির্মাণকাজ শতভাগ শেষ করেছে তাদের দেশের রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ। ইতিমধ্যে বাংলাদেশের প্রবেশদ্বারে (ভারতীয় অংশে) রেলপথের ওপর স্থাপন করা হয়েছে স্থায়ী তোরণ।

ঢাকা-জলপাইগুড়ি চলবে মিতালি এক্সপ্রেস: ঢাকা থেকে পশ্চিমবঙ্গের নিউ জলপাইগুড়ি স্টেশন পর্যন্ত চলবে মিতালি এক্সপ্রেস ট্রেন। রেলওয়ে সূত্র মতে, প্রতি সপ্তাহে সোমবার ও বৃহস্পতিবার ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট স্টেশন থেকে ছাড়বে এই ট্রেন। নিউ জলপাইগুড়ি থেকে ‘মিতালি এক্সপ্রেস’ ছাড়বে রোববার ও বুধবার। এনজেপি, ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট ও চিলাহাটি স্টেশনে শুল্ক ও অভিবাসন সংক্রান্ত ব্যবস্থাপনা থাকবে। উত্তরবঙ্গের মানুষের সুবিধার্থে চিলাহাটি স্টেশন থেকে এই ট্রেনের সঙ্গে আরও দুটি বা তার বেশি কামরা যুক্ত করা হবে। এই কারণেই নীলফামারীর চিলাহাটি স্টেশনে শুল্ক ও অভিবাসনের ব্যবস্থা রাখা হচ্ছে।

ঢাকা থেকে জলপাইগুড়ি পর্যন্ত ৫৯৫ কিলোমিটার যাত্রার জন্য থাকবে তিন ক্যাটাগরি আসন। এজন্য ভাড়া হবে ২২, ৩৩ ও ৪৪ ডলার। সব কামরাই শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত থাকবে। ১০টি বগি বিশিষ্ট ট্রেনে মোট ৮৬৪ যাত্রীর বসার ব্যবস্থা থাকবে।

এ বিষয়ে চিলাহাটি-হলদিবাড়ী রেল লিংক স্থাপনের প্রকল্প পরিচালক আব্দুর রহীম বলেন, এখন ব্যবসায়ীরা সৈয়দপুর পার্বতীপুরসহ খুলনা পর্যন্ত মালামাল এ পথে আনা নেওয়া করতে পারবেন। পাশাপাশি উত্তরা ইপিজেড, ঈশ্বরদি ইপিজেড থেকে মালামাল আমদানি-রপ্তানি সহজ হবে। মোংলা বন্দর থেকে নেপাল ভুটান পর্যন্ত কম খরচে সহজে মালামাল আনা-নেওয়া করা যাবে।

এ বিষয়ে নীলফামারী চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের সভাপতি মারুফ জামান বলেন, ‘৫৬ বছর পর সমস্যার সমাধান হলো। এখন দুই দেশের ব্যবসায়ীরা কম খরচে রেলপথে পণ্য আমদানি-রপ্তানি করতে পারবেন। আগে এ অঞ্চলে ভারত থেকে মালামাল আমদানি-রপ্তানিতে বুড়িমারী, হিলি, বাংলাবান্ধা, বেনাপোল বন্দরের ওপর নির্ভরশীল ছিলেন ব্যবসায়ীরা। এতে খরচ এবং সময় বেশি হতো। চিলাহাটি স্থলবন্দর চালু হওয়ায় ব্যবসা-বাণিজ্যের সহজীকরণ হলো। এ পথে নেপাল, ভুটানসহ সেভেন সিস্টার-খ্যাত দেশগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ সহজীকরণে ব্যবসা-বাণিজ্যের আরও প্রসার ঘটবে।’

তিনি বলেন, ট্রেনপথে যোগাযোগ শুরু হওয়ায় মালামাল পরিবহনে যেমন খরচ কম হবে, তেমনি যোগাযোগের সমস্যাও দূর হবে। পরিবহন খরচ কম লাগায় বাজারে আমদানিনির্ভর পণ্যের দাম কমবে।

এ বিষয়ে নীলফামারী উন্নয়ন ফোরামের আহ্বায়ক ও নীলফামারী চেম্বারের সাবেক সভাপতি আব্দুল ওয়াহেদ সরকার বলেন, এ বন্দরের সুফল আমরা পেতে শুরু করেছি। এজন্য জেলাবাসীর পক্ষে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ধন্যবাদ জানাই। এখন আমাদের দাবি দ্রুত এ পথে যাত্রীবাহী ট্রেন চলাচল।

এদিকে চিলাহাটি স্থলবন্দর বাস্তবায়ন কমিটির আহ্বায়ক আবু মুসা মাহমুদুল হক বলেন, এ এলাকার মানুষের দাবি ছিল পুনরায় স্থলবন্দর চালু করা। আজ সেটি হয়েছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হাত ধরে। এজন্য আমরা তার কাছে কৃতজ্ঞ।

 
Electronic Paper