শৌলমারী চরাঞ্চলে কাঁটাতারের বেড়া

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২১ অক্টোবর ২০২১ | ৬ কার্তিক ১৪২৮

Khola Kagoj BD
Khule Dey Apnar chokh

শৌলমারী চরাঞ্চলে কাঁটাতারের বেড়া

ইন্ট্রাকো সোলার পাওয়ার রাস্তা বন্ধ করে দেয়, আড়াই কিলোমিটার ঘুরে চলাচল করতে হয়, বিভিন্ন দপ্তরে অভিযোগ করেও কোনো ফল পাচ্ছেন না

নিয়াজ আহমেদ সিপন, কালীগঞ্জ, লালমনিরহাট
🕐 ১০:১১ পূর্বাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ১৯, ২০২১

শৌলমারী চরাঞ্চলে কাঁটাতারের বেড়া

বছরের পর বছর যে রাস্তা দিয়ে লালমনিরহাটের কালীগঞ্জ উপজেলার শৌলমারী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা চলাফেরা করতেন সেই রাস্তাসহ শৌলমারী চরাঞ্চল কাঁটাতার দিয়ে ঘিরে ফেলেছে ‘ইন্ট্রাকো সোলার পাওয়ার লিমিটেড’। ফলে শৌলমারী চরের মানুষদের আড়াই কিলোমিটার ঘুরে চলাচল করতে হয়। এতে ওই এলাকাবাসী চরম বিপাকে পড়েছেন।

স্থানীয়রা বলছেন, এ নিয়ে তারা সরকারি বিভিন্ন দপ্তরে অভিযোগ করেও কোনো ফল পাচ্ছেন না।

সরজমিনে দেখা যায়, সকাল ৯টায় শিক্ষকরা দাঁড়িয়ে রয়েছেন শৌলমারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যাবেন। কিস্তু নৌকা না পাওয়ায় সেখানে দাঁড়িয়ে থাকতে হয় অনেক সময়। উপায় না পেয়ে তারা হাঁটু পানিতে পথ পার হয়ে যান বিদ্যালয়ে। একসময় মূলত এই পথই ছিল উপজেলার মূল ভূখ-ের সঙ্গে চরবাসীর যোগাযোগের রাস্তা। কিন্তু সেই রাস্তাটি বন্ধ করে দেয় ‘ইন্ট্রাকো সোলার পাওয়ার লিমিটেড’। সেই রাস্তাটিও সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের নামে ‘ইন্ট্রাকো সোলার পাওয়ার লিমিটেড’-এর সাইনবোর্ড লাগিয়ে কাঁটাতারে ঘিরে দখলে নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। ফলে যেসব লোকজন বাপ-দাদার আমল থেকে ওই রাস্তা দিয়ে কালীগঞ্জ উপজেলা সদরে যাতায়াত করছিলেন তাদের যেন দুর্ভোগের শেষ নেই। এতে চরের শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি শিক্ষকরাও পড়েছেন চরম বিপাকে।

জানা যায়, শৌলমারী চরে শিক্ষার আলো জ্বালানোর দায়িত্বে যেসব শিক্ষক রয়েছেন তাদের প্রায় সবার বাড়ি কালীগঞ্জ উপজেলা সদরের আশপাশে। প্রতিদিন স্কুলে যেতে প্রথমে নৌকাযোগে পরে দীর্ঘ পথ হেঁটে শৌলমারী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পৌঁছতে হয় তাদের। কিন্তু নদীর ঘাট থেকে যে রাস্তাটা সরাসরি গিয়ে স্কুলে ঠেকেছে, সেটি যে কাঁটাতারে ঘিরে ফিলবে বেসরকারি কোনো কোম্পানি তা জানা ছিল না তাদের। তাই বাধ্য হয়ে কাঁটাতারের ফাঁক দিয়ে পথ পেরিয়ে স্কুলে যাতায়াত করতে হচ্ছে তাদের।

শৌলমারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক ইতি মনি বলেন, দীর্ঘদিন ধরে ওই রাস্তা দিয়েই স্কুলে যাওয়া আসা করছি। এখন সেই রাস্তাটি বন্ধ হওয়ায় বাধ্য হয়েই কাঁটাতারের ফাঁক দিয়ে বেশ ঝুঁকি নিয়ে যাতায়াত করতে হচ্ছে। অনেক সময় কাঁটাতারের ফাঁক দিয়ে পার হতে গেলে কাপড় ছিঁড়ে যায়। একজন নারী শিক্ষক হয়ে ওই কাঁটাতারের ফাঁক দিয়ে যাতায়াত কতটা কষ্টের তা বলে বোঝানো মুশকিল। এর দ্রুত সমাধান হওয়া প্রয়োজন।

ওই স্কুলের একজন সহকারী শিক্ষক সানিউর রহমান সানি বলেন, ‘রাস্তাটি দিয়ে শুধু আমরা না, স্কুলের শিক্ষার্থী আর অভিভাবকরাও যাতায়াত করেন। বর্তমানে সেটি কাঁটাতারে ঘেরা থাকায় প্রায় দেড় কিলোমিটারের বেশি পথ ঘুরতে হয়। সে কারণে বাধ্য হয়ে কাঁটাতারের ফাঁক দিয়ে যাতায়াত করছি।’

চরবাসীদের ভাষ্যমতে, একসময় ওই রাস্তা দিয়ে হাজার হাজার মণ ফসল বিভিন্ন হাটে বাজারে যেত। আবার এলাকাবাসী চিকিৎসা, কেনাকাটার জন্যও ওই রাস্তা ব্যবহার করত বাপ-দাদার আমল থেকে। কিন্তু সেই রাস্তা কাঁটাতারে ঘিরে বন্ধ করে দেওয়ায় চরম দুর্ভোগ সৃষ্টি হয়েছে।

স্থানীয় বাসিন্দা বাচ্চু মিয়া ও লুৎফর রহমান বলেন, ‘আমাদের রাস্তা বন্ধ করায় চলাচলের কোনো পথ নেই। সে কারণে আমরা লিখিতভাবে ঘটনাটি বিভিন্ন দপ্তরে জানিয়েছি কিন্তু কোনো কাজ হয়নি।’

শৌলমারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হরিদাস চন্দ্র রায় বলেন, প্রায় দেড় বছর পর বিদ্যালয় খুলে দিয়েছে। কিন্তু চরাঞ্চলের শিক্ষকদের কষ্টের কোনো সীমা নেই। এর মধ্যে ‘ইন্ট্রাকো সোলার পাওয়ার লিমিটেড’ কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে মূল রাস্তা বন্ধ করে দেয়। যার ফলে প্রায় তিন কিলোমিটার ঘুরে আসতে হয়। আবার দ্রুত পথ পাড়ি দেওয়ার জন্য কাঁটাতারের ফাঁক দিয়ে আসতে গেলে কাপড় ছিঁড়ে গিয়ে নষ্ট হয়। বেশি সমস্যা হয়েছে নারী শিক্ষকদের নিয়ে। তারা নুয়ে আসতে গেলে অনেক সময় মানুষ হাসাহাসি করেন।

একই অভিযোগ করেন ওই চরাঞ্চলের কালিকাপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা। তারা বলেন, এ অবস্থা চলতে থাকলে এখানে শিক্ষা কার্যক্রম চালানো মুশকিল হয়ে দাঁড়বে। তাই দ্রুত সরকারকে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

ভোটমারী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আহাদুল হোসেন চৌধুরী কাঁটাতারে রাস্তা বন্ধের বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, ‘ওই রাস্তাটি সরকারি বরাদ্দে আমি নিজেও কয়েকবার মেরামত করেছি। এখন সেটি বন্ধ থাকায় স্কুলের শিক্ষক-শিক্ষার্থীসহ এলাকার মানুষজন খুবই সমস্যায় পড়েছে। এ নিয়ে অভিযোগ জানিয়েও প্রশাসন কিছুই করছে না বলে উল্লেখ করেন তিনি।

তবে ওই সোলার কোম্পানির কালীগঞ্জ অফিসের দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তা উত্তম রায় দাবি করে বলেন, ‘আমরা পাশ দিয়ে আর একটা রাস্তা করে দিয়েছি।’

এ বিষয়ে জানতে চাইলে কালীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আব্দুল মান্নান বলেন, রাস্তা বন্ধ করে কোনো কাজ করা ঠিক নয়। বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে জানতে পেরেছি, তাদের সঙ্গে কথা বলে আগের রাস্তা খুলে দেওয়া যায় কিনা সেটি দেখা হবে।

 
Electronic Paper