বিলুপ্ত ছিটমহলের সালিশ ঘর

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২৬ নভেম্বর ২০২০ | ১২ অগ্রহায়ণ ১৪২৭

বিলুপ্ত ছিটমহলের সালিশ ঘর

এস এম আসাদুজ্জামান, ফুলবাড়ী (কুড়িগ্রাম) ১০:৫৯ পূর্বাহ্ণ, অক্টোবর ১৮, ২০২০

print
বিলুপ্ত ছিটমহলের সালিশ ঘর

৬৮ বছরের অন্ধকার জীবন থেকে মুক্ত হয়েছে গেল পাঁচ বছর। বহু ঘাত-প্রতিঘাত, সংগ্রাম, লড়াইয়ের দিন গেছে তাদের। শোষক শ্রেণির কিছু মানুষের কাছে তারা ছিল জিম্মি। না পারত বাংলাদেশে এসে অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে, না পারত ভারতে গিয়ে তাদের কথা বলতে। এসব জটিলতায় বলতেই পারত না তাদের রাষ্ট্রনায়ক কে? চাকরি পেত না, ছিল না জমি কেনার অধিকার। উপায়ান্ত না পেয়ে বিভিন্ন সময়ে দুই দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে আত্মগোপন করত। পরে ভুল পরিচয়ে কাজ নিত। আর সেই সুবিধা ভোগ করত ফের শোষকরা। বেতনের টাকাটাও ঠিক মতো দিত না। খালি হাতে ফের ফিরতে হতো তাদের। বলছিলাম, পাঁচ বছর আগে বিলুপ্ত ছিটমহল দাসিয়ারছড়ার কথা। ছিটমহল বিলুপ্ত হলে এখন সেখানে পড়ে আছে স্মৃতিচিহ্ন। আছে জ্বরাজীর্ণ আইন সালিশ ঘরটিও। যার মাধ্যমে তারা নিজেরাই এক সময় নিজেদের বিরোধ নিষ্পত্তি করত। অথচ কালের সাক্ষী এসব স্থান সংস্কার করে জায়গাটি উন্মুক্ত রাখলে পর্যটকদের যেমন ভিড় বাড়বে তেমনিভাবে সরকার ব্যাপক রাজস্ব আয় করতে পারবে বলে মনে করছেন এলাকাবাসী।

দাসিয়ারছড়া ভারতের ভূখ- হলেও ভারতের সঙ্গে সংযোগ না থাকার কারণে এখানে ভারতের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী প্রবেশ করতে পারত না। সে কারণে এখানকার নাগরিকরা বাংলাদেশিদের দ্বারা প্রতিনিয়ত অন্যায় অত্যাচারের শিকার হতে হতো। তাই ছিটমহলের বাসিন্দারা নিয়ম-শৃঙ্খলা ঠিক রাখার জন্য ১৯৪৭ সালে দেশ ভাগের পর নিজেরাই এডহক কমিটি করে দাসিয়ারছড়ার মোট আয়তন এক হাজার ৬৪৩ দশমিক ৪৪ একর এলাকা সীমানা নির্ধারণ ও গঠনতন্ত্র তৈরি করে এখানে পঞ্চায়েত প্রথা চালু করেন। গঠনতন্ত্রে দাসিয়ারছড়াকে দুভাগে ভাগ করেন তারা। একটি হলোÑ উজানটারী অপরটি ভাটিয়াটারী।

আবার ৩ মৌজায় ভাগ করা হয়। সে সময় দাসিয়ারছড়ার মোট ভোটার ছিল ১ হাজার ৯০০ জন। কিন্তু ভোটার তালিকায় শুধু পুরুষরাই ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারত। মহিলাদের ভোট ছিল না। গঠনতন্ত্রে আরও একটি বিষয় ছিল শুধু উজানটারীর লোকরাই পঞ্চায়েত প্রধান পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারতেন। কিন্তু ভাটিয়াটারীর লোকজন শুধু ভাইস-চেয়ারম্যান পদে লড়তেন। পঞ্চায়েত প্রধান পদে নয়।

ছিটমহল আন্দোলনের নেতা মো. আলতাফ হোসেন, দাসিয়ারছড়ার সাবেক পঞ্চায়েত প্রধান নজরুল ইসলাম ও স্থানীয় বাসিন্দা আমজাদ হোসেন, মোজাফফর রহমান, জহুর আলী জানান, ৬০-এর দশকে বিচারকার্য পরিচালনার জন্য প্রধান কার্যালয় হিসেবে ২৫ শতাংশ জমিতে আইন ও সালিশ ঘরটি (বোর্ড ঘর) প্রতিষ্ঠা করা হয়। ওই ঘরটিতে বিচারক কক্ষ, সেমিনার কক্ষ ও আসামি রাখার কক্ষ নামে ৩ কক্ষ বিশিষ্ট ঘর নির্মাণ করা হয়। পরে দাসিয়ারছড়ার আইনশৃঙ্খলা ঠিক রাখার জন্য মোট ৯৪ জনের সমন্বয়ে ভিডি পার্টি (গ্রাম নিরাপত্তা বাহিনী) গঠন করা হয়। এদের মধ্যে একজন উইং কমান্ডার ও ৩ জন সেক্টর কমান্ডারের মাধ্যমে ভিডি পার্টি পরিচালিত হতো। কেউ বিচারে দোষী সাব্যস্ত হলে তাকে ভিডি পার্টি দ্বারা ধরে এনে এই বোর্ড ঘরে আটকে রেখে বিচারকার্য পরিচালনা করত দাসিয়ারছড়া পঞ্চায়েতের সদস্যরা। সেই কালের সাক্ষী ঐতিহাসিক আইন ও সালিশ ঘরটি (বোর্ড ঘর) আজ বিলুপ্তির পথে। এই ঘরটি সংস্কার করে সরকার সংরক্ষণের উদ্যোগ নিলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম এর প্রকৃত ইতিহাস জানতে পারবে বলে জোর দাবি জানিয়েছেন এলাকাবাসী।

১৯৭৪ সালে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে ঐতিহাসিক ইন্দিরা-মুজিব স্থল সীমান্ত চুক্তিটি ২০১৫ সালের ৩১ জুলাই মধ্য রাতে বাস্তবায়ন হওয়ায় বাংলাদেশের অভ্যন্তরের ১১১টি এবং ভারতের অভ্যন্তরে বাংলাদেশের ৫১টি ছিটমহল দুই-দেশের ভূ-খ-ে যুক্ত হয়। ফলে উভয় দেশের নাগরিক হওয়ার সুযোগ পান অবরুদ্ধ ছিটমহলের বাসিন্দারা।

বাংলাদেশ-ভারত ছিটমহল বিনিময় সমন্বয় কমিটির বাংলাদেশ অংশের সাবেক সাধারণ সম্পাদক গোলাম মোস্তফা খাঁন বলেন, আমরা বহু আন্দোলন করেছি দাসিয়ারছড়াকে আলাদা একটি ইউনিয়ন করার জন্য। কিন্তু তা হয়নি। এই বোর্ড ঘড়টি দাসিয়ারছাড়ার বিচার ও আইন ব্যবস্থার কালের সাক্ষী। আমি সরকারের কাছে জোর দাবি জানাচ্ছি বোর্ড ঘরটির সংস্কারপূর্বক সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা হোক। জায়গাটি উন্মুক্ত করে রাখলে পর্যটকদের যেমন ভিড় বাড়বে তেমনিভাবে সরকার ব্যাপক রাজস্ব আয় করতে পারবে।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা তৌহিদুর রহমান জানান, বিষয়টি বিস্তারিত জেনে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।