তিস্তার তিন রূপ

ঢাকা, রবিবার, ৬ ডিসেম্বর ২০২০ | ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৭

তিস্তার তিন রূপ

মোস্তাক আহমেদ, কাউনিয়া, রংপুর ১২:১৪ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ০৬, ২০২০

print
তিস্তার তিন রূপ

উত্তর জনপদের জীবন সীমারেখা নামে পরিচিত তিস্তা নদী। ভারতের গজল ডোবায় তিস্তা নদীর উজানে বাঁধ নির্মাণ করায় এবং পানির ন্যায্য হিস্যা না দেওয়ায় ধীরে ধীরে তিস্তা নদী পানিশূন্য হয়ে কঙ্কালে পরিণত প্রায়। বর্ষা মৌসুমে পানি পেয়ে তিস্তা হয়ে ওঠে ভরা যৌবনা। শীত মৌসুমে থাকে হাঁটুপানি। শুকনো মৌসুমের শেষ দিকে শুধুই ধু-ধু বালুচর।

ভারতের গজল ডোবার দো-মোহনী থেকে শুরু করে বাংলাদেশের নীলফামারী জেলার সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করা এ দেশের অন্যতম প্রধান নদী তিস্তা। নীলফামারী, রংপুর, লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম ও গাইবান্ধার সাঘাটা উপজেলার ভেতর দিয়ে এঁকে বেঁকে তিস্তা নদীর বিসর্জন হয়েছে ব্রহ্মপুত্র নদের বুকে। তিস্তার এই প্রবাহ ধারা বাংলাদেশে রয়েছে ১১৫ কিলোমিটার। বিশাল এ তিস্তার সন্তানও রয়েছে অনেক। তার মধ্যে করতোয়া, মরাসতী, ছোট তিস্তা, বুড়ী তিস্তা অন্যতম। এই তিস্তা নদী নিয়ে তিস্তা পারের মানুষের রয়েছে দুঃখগাথা। বর্তমানে রংপুর বিভাগের ৫ জেলার কোটি মানুষের একটাই দাবি, তিস্তা নদী খনন ও পানির ন্যায্য হিস্যা আদায়। 

তারা বলছেন, বিষয়টিতে সরকারের নজর দেওয়া জরুরি। চর নীজপাড়া গ্রামের জহির রায়হান বলেন, ‘তিস্তা নদী প্রতি বছর শত শত বাড়িঘর গিলে খায়, বন্যায় মানুষের ভোগান্তি চিরদিনের।’

চর নাজিরদহ গ্রামের আবুল হোসেন বলেন, ‘তিস্তা’র তিন রূপ। শীত মৌসুমে হাঁটুজল, শীত শেষে শুধু বালু আর বালু, বর্ষা মৌসুমে ভরা নদী উপচে হয় বন্যা। এ নিয়েই আছি আমরা ৩০টি চরাঞ্চলের লাখো মানুষ। কত নেতা, মন্ত্রী কথা দিল নদী খনন হবে, বাঁধ হবে, হামরাও আন্দোলন করনো, কামের কাম কিছুই হইলো না, যেই নদী আর সেই নদী এলাও হামাক কাঁদায় অহর্নিশী।

এ অবস্থা থেকে মুক্তির জন্য ২০০৭ সালের সেপ্টেম্বরে বাংলাদেশ-ভারত সিদ্ধান্ত হয়, তিস্তার পানি ৩৬ শতাংশ পাবে বাংলাদেশ আর ৩৯ শতাংশ পাবে ভারত। আর বাকি ২০ শতাংশ পানি নদী সংরক্ষণের জন্য রাখা হবে। কিন্তু পরবর্তী সময়ে ভারত গজল ডোবায় বাঁধ নির্মাণ করে পানি প্রবাহ আটকে দেয়। ফলে তিস্তার তলদেশে অজস্র পাথর, নুড়ি, বালু আর পলি পড়ে। ভরাট হয়ে যায় তিস্তার বুক।

তাই বর্ষা মৌসুমে তিস্তার পানি উপচে পড়ে নদীর দুই ধারে। সে কারণে প্রতি বছর ২০ হাজার মানুষ হয় গৃহহারা। গাছপালা, আবাদী জমি হারিয়ে অনেকে হয়ে যায় পথের ভিখিরি। এছাড়াও বর্ষা মৌসুমে ভারত অতিরিক্ত পানি ছেড়ে দেওয়ায় নদীর দু’পারের মানুষের জমি, ঘরবাড়ি ডুবে সর্বশান্ত করে দেয় নদী আর খড়া মৌসুমে পানির অভাবে ইরি বোরো ও অন্যান্য ফসলের চাষাবাদ করতে পারেন না নদী তীরের মানুষ।

এক সময় সারি সারি নৌকা মাল বোঝাই করে পাল তুলে দেশের বিভিন্ন জায়গায় যেত। বর্তমানে সেগুলো এখন কল্পকাহিনীর মতো। নৌ যোগাযোগ বন্ধ হয়ে পড়ায় কর্মহীন হয়ে পড়েছে শতাধিক মানুষ। এছাড়াও সরকারের নদী শাসনের পরিকল্পিত পরিকল্পনার অভাবে নদীর মাঝ খান উঁচু হয়ে যাওয়ায় পানি উপচে দু’পারে ছড়িয়ে পড়ে। নদী খননের কাজ কী তা এই এলাকার মানুষ জানে না। অথচ নদী ড্রেজিং করে নদীর পানির গতিপথ সচল করলে একদিকে যেমন নদীভাঙন কমে যাবে অন্যদিকে কৃষক নদীর পানি দিয়ে সেচ কাজ চালাতে পারবে। এর ফলে একদিকে যেমন বিদ্যুৎ খরচ কমে যাবে অন্যদিকে কৃষি উৎপাদন ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পাবে।

সরকার তিস্তা নদী জরুরিভিত্তিতে ড্রেজিং করে কৃষিনির্ভর রংপুর বিভাগের ৫ জেলার কোটি মানুষের কৃষি আর মৎস্য ভা-ার সমৃদ্ধ করবে এই হলো এখন সময়ের দাবি।

বিষয়টি নিয়ে পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী আহসান হাবিব বলেন, আমার অফিসে তেমন কোনো তথ্য নেই, সবটাই জাতীয় বিষয়। তবে শুনেছি চীন সরকারের একটি প্রতিনিধি দল তিস্তা নদী পর্যবেক্ষণ করেছে এবং নদী খননের বিষয়ে সাড়ে ৮ হাজার কোটি টাকার একটি প্রস্তাবনা সরকারের কাছে জমা দিয়েছে। সরকার সম্মত হলে আগামী শুকনো মৌসুমে তিস্তা নদী খনন শুরু হতে পারে।