খালি ফটোক তুলে বাহে...

ঢাকা, শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২০ | ১০ আশ্বিন ১৪২৭

খালি ফটোক তুলে বাহে...

সুশান্ত ভৌমিক, রংপুর ১০:৩১ পূর্বাহ্ণ, আগস্ট ০৯, ২০২০

print
খালি ফটোক তুলে বাহে...

‘অ্যালা মাইনষে আইসে নদী দেইকপার। বানের পানি কমি যাওয়াতে সগায় অ্যালা নৌকাত চড়ি ঘোরাঘুরি নিয়্যা ব্যস্ত। কায়ো কায়ো তো খালি ফটোক তোলার জনতে আইসে। হামার দুক্কো কায়ো দ্যাকে না। বানের পানিত বসতভিটা হারেয়া হামার সোগ শ্যাষ।’ এভাবেই আক্ষেপ নিয়ে কথাগুলো বলছিলেন আফিজার রহমান। রংপুরের গঙ্গাচড়ার লক্ষ্মীটারি ইউনিয়নের পশ্চিম ইচলি গ্রামের বাসিন্দা তিনি।

গঙ্গাচড়ার শেখ হাসিনা তিস্তা সড়ক সেতুর পাশের গ্রামটি ছিল তার আদিনিবাস। নদী ভাঙন আর বন্যার থাবার সাথে প্রতিবছরই লড়তে হয় তাকে। এবার তার মাথা গোঁজার ঠাঁইও কেড়ে নিয়েছে খরস্রোতা তিস্তা।

অন্যের ভিটায় ছোট্ট একটা ঝুপড়ি তুলে কোনো রকমে কষ্টে দিন পার করছে আফিজারের পরিবার। তার চোখের সামনে এখন অনেক মানুষই আসে আর যায়। কারো কাছ থেকে দুই বেলা দু’মুঠো খাবারের জোগান মিলছে না তাদের। আফিজারের মতো এবারের বন্যায় হাজারো মানুষের বসতভিটা ভেসে গেছে।

তিস্তা নদী পাড়ের নিম্নাঞ্চলে বন্যার পানি কমে পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে। তবে নদী ভাঙন না কমায় দিশেহারা হয়ে পড়েছেন চরাঞ্চলের অসহায় মানুষ। বসতভিটা, গাছগাছালি, রাস্তাঘাটসহ গ্রামের পর গ্রাম ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবারের বন্যায়।

সরেজমিন দেখা গেছে, চারদিকে অথৈ পানি পেরিয়ে চর ইচলি গ্রাম। চরের লক্ষ্মীটারী ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ড। এখানকার বেশির ভাগ ঘরবাড়ি এখনো জলমগ্ন। পরিবার-পরিজন আর গবাদি ও পশুপাখি নিয়ে বন্যার্তের চলছে টিকে থাকার লড়াই।

এখানকার আবুজর, রাজু মিয়া, ইব্রাহিম, মোসলেমা ও খাদিজা জানান, সরকারি অনুদান তো দূরের কথা, স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরাও ঠিকমতো খোঁজ নিতে আসেননি। অনেকের খাবার জুটছে না। নেই মাথা গোঁজার ঠাঁই, ঘরবাড়ি সরিয়ে নিতে হচ্ছে অন্য জায়গায়। ঈদের আগে ও পরে কেমন কাটছে বানভাসিদের দিন, তা নিয়ে কারো মাথাব্যথা নেই।

একই আক্ষেপ পীরগাছার ছাওয়া ইউনিয়নের পাওটানা বোল্ডারের পাড় গ্রামের বজরুর আলীর। তিস্তা নদীতে চৌদ্দবার তার ঘরবাড়ি বিলীন হয়েছে জানিয়ে এই বানভাসি বলেন, ‘সবাই তো আসি হামার ছবি তোলে আর ভিডিও করে। কিন্তু কায়ো তো সমাধান করে না। অ্যালা ফির নদীর পাড়োত দূরদূরান্তের মাইনষে আইসে ঘোরাঘুরি করার জনতে। হামরা কান্দি বানের পানি দেকি। আর ওমরা আইসে ফুর্তি করার জনতে।’

অন্যদিকে তিস্তা তীরবর্তী কাউনিয়ার ভূতছড়া গ্রামের সবুর শিকদার বলেন, একে তো করোনাকাল তাতে আবার বর্ষাকাল। মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা হয়ে এসেছে বন্যা ও বন্যা-পরবর্তী নদী ভাঙন। মানুষের দুঃখ দুর্দশার অন্ত নেই। নদীপাড়ের এসব মানুষ এখন নিজেদের বসতভিটা নিয়ে চিন্তিত।

এদিকে সরেজমিন তিস্তা বেষ্টিত গঙ্গাচড়া, পীরগাছা ও কাউনিয়া উপজেলায় বন্যাকবলিত কয়েকটি গ্রাম ঘুরে দেখা গেছে, বন্যার পানি কমে এসেছে। এসব এলাকার মানুষ এখন সামান্য পানিতে তলিয়ে থাকা কৃষি জমিতেই স্বপ্ন বুননে ব্যস্ত। কেউ কেউ নতুন করে ঘরবাড়ি গড়ে তুলছেন। আবার অনেকেই অস্থায়ী ঠিকানাতেই কোনোমতে বাঁচার জন্য লড়ছেন।

দেখা গেছে, গঙ্গাচড়ায় তিস্তা সড়ক সেতু, কাউনিয়ায় তিস্তা রেল সেতু ছাড়াও পীরগাছার বোল্ডারের পাড় ও পাওয়ার প্লান্ট এলাকায় বন্যার পানি কমে আসায় বেড়েছে বিনোদন পিপাসু মানুষের উপচেপড়া ভিড়। পরিবার পরিজন, কেউবা একান্তই সময় কাটাতে এসব স্পটে ভিড় করছেন। কেউ কেউ নৌকায় চড়ে আনন্দ উল্লাসে ঘুরছেন। ছবি তোলারও হিড়িক রয়েছে এসব স্পটে। তবে বিনোদন প্রত্যাশীদের এমন আনাগোনায় কিছুটা হতাশ নদী পাড়ের অসহায় মানুষ।

সরকারি ত্রাণ সহায়তার পাশাপাশি সামর্থ্যবানদের সহায়তার দিকে তাকিয়ে থাকা এসব বানভাসি ও ক্ষতিগ্রস্ত মানুষদের প্রত্যাশা, সমাজের বিত্তবান ও সচেতন নাগরিক, বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ এবং জনপ্রতিনিধিরা তাদের দুঃখ-দুর্দশা লাঘবে পাশে এসে দাঁড়াবে। একই সাথে নদী ভাঙন রোধ ও বন্যায় ক্ষতি কমিয়ে আনতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে নদী খনন, টেকসই বাঁধ নির্মাণ ও নদী শাসনে পরিকল্পিত উদ্যোগের বাস্তবায়ন জরুরি।