নীলফামারীতে মানবিক পুলিশিং

ঢাকা, শুক্রবার, ১৪ আগস্ট ২০২০ | ৩০ শ্রাবণ ১৪২৭

নীলফামারীতে মানবিক পুলিশিং

মোশাররফ হোসেন, নীলফামারী ১০:০৯ অপরাহ্ণ, জুলাই ১০, ২০২০

print
নীলফামারীতে মানবিক পুলিশিং

একজন মোহাম্মদ মোখলেছুর রহমান। যিনি পুলিশ সুপার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন নীলফামারীতে। এখানে যোগদানের সাড়ে পাঁচ মাসের মাথায় তার বিশেষ কর্মদক্ষতায় জেলা পুলিশ ‘মানবিক পুলিশ’-এ পরিণত হয়েছে। ইন্টেলিজেন্স লেড পুলিশিংয়েও সফলতা পেয়েছেন তিনি। তার হাত ধরেই দুদিকে সমান তালে এগুচ্ছে জেলা পুলিশ। ইতোপূর্বে তিনি ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা বিভাগে কর্মরত ছিলেন। কাজের স্বীকৃতি স্বরূপ পেয়েছেন মহামান্য রাষ্ট্রপতি পদক (পিপিএম) ও বাংলাদেশ পুলিশ পদক (বিপিএম)। গত ১০ জানুয়ারি পুলিশ সুপার হিসেবে যোগদান করেন এ জেলায়।

পুরনো কর্মস্থলের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে নীলফামারীতে অপরাধ কমিয়ে আনা এবং মানবিক কার্যক্রমে মানুষের পাশে থাকার প্রত্যয়ে কাজ করছেন তিনি। যা দৃশ্যমান হয়েছে ইতোমধ্যে। এসপি মোখলেছুর রহমান নীলফামারীতে যোগদানের কিছুদিনের মধ্যে গ্রেফতার হয় নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন আল্লাহর দলের কেন্দ্রীয় সমন্বয়কারীসহ দুজন। এছাড়া ভারত থেকে অবৈধভাবে আসা গরু আটক করা হয়।

দাফতরিক কার্যক্রমের পাশাপাশি পরিচয়হীন উদ্ধার হওয়া এক নবজাতকের দায়িত্ব গ্রহণ, করোনা সময়ে সংকটে পড়া মানুষের বাড়ি বাড়ি গিয়ে খাদ্যসামগ্রী পৌঁছে দেওয়া, জাতীয় সেবা নম্বর ৯৯৯ থেকে খাদ্য সহায়তা চেয়ে ফোন করা ব্যক্তিদের পরিচয় গোপন রেখে খাদ্য পৌঁছে দেওয়া, হোম কোয়ারেন্টিন নিশ্চিত করা এবং পর্যবেক্ষণে রাখা, প্রয়োজন অনুসারে কোয়ারেন্টিনে থাকা পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়ানো, করোনা আক্রান্ত রোগীদের খোঁজখবর রাখা ও তাদের পুষ্টিকর খাদ্য সরবরাহ, করোনা এবং উপসর্গ নিয়ে মৃত্যুবরণকারী ব্যক্তিদের দাফন সম্পন্ন করা হয় পুলিশ সুপারের নির্দেশনা এবং সরাসরি তত্ত্বাবধানে।

নীলফামারীতে কাজের সন্ধানে আসা কুষ্টিয়া জেলার বেত সম্প্রদায়ের ১১ মানুষ করোনায় লকডাউনের কারণে নীলফামারীতেই আটকা পড়েন। কাজ না পাওয়ায় তিন মাস ধরে তারা মানবেতর অবস্থায় ছিলেন। তাদের কথা জানতে পেরে তিনি তাদের দায়িত্ব নেন এবং তাদের বাড়ি পাঠানোর ব্যবস্থা করে মহানুভবতার পরিচয় দিয়েছেন। করোনা সচেতনতায় প্রচারণামূলক লিফলেট, স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা, মাস্ক ও হ্যান্ড স্যানিটাইজার বিতরণ, সড়কে জীবাণুনাশক, জেলায় প্রবেশ ও বহির্গমন বন্ধে বিশেষ চেক পোস্টেও মাধ্যমে তা নিশ্চিত করা, সৈয়দপুর বিমানবন্দর ও উত্তরা ইপিজেডে স্বাস্থ্যবিধি পর্যবেক্ষণ এবং প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত রাখতে ধান কাটায় কৃষি শ্রমিক প্রেরণ করা হয় তার সার্বিক তদারকিতেই।

চরম ঝুঁকির মধ্যেও পুলিশের প্রত্যেক সদস্যের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করে, ছুটি বাতিল করে তাদের মানবিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত রাখেন তিনি। করোনা সংক্রমণ প্রতিরোধে বিভিন্ন তথ্য আদান-প্রদানের জন্য জেলা পুলিশের সমন্বয়ে কমিউনিটি পুলিশিং এবং বিট পুলিশিং কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে।

নীলফামারী ট্রাফিক বিভাগের সার্জেন্ট বরকতুল্লাহ সরকার বলেন, গেল তিন মাসে একদিনও ছুটি কাটাইনি। ক্রান্তিকালে মানুষের সেবায় ব্রত নিয়ে কাজ করছি। ভবানীগঞ্জ চেকপোস্টে দায়িত্ব পালন করি আমি। ক্লাস্টার অনুযায়ী তিনটি টিম সার্বক্ষণিক দায়িত্বে থাকে এখানে।

জেলা কমিউনিটি পুলিশিংয়ের সদস্য সচিব প্রকৌশলী সফিকুল আলম ডাবলু বলেন, করোনার সময়ে পুলিশ মানুষের পাশে থেকেছে- তা দেখেছি। মানবিক মূল্যবোধ থেকে এটি তৈরি করতে পেরেছেন পুলিশ সুপার মহোদয়। আশা করি তার হাত ধরেই নীলফামারী অপরাধমুক্ত হবে এবং মানবিক পুলিশিংও স্মরণীয় হয়ে থাকবে।

পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মোখলেছুর রহমান বিপিএম, পিপিএম এ ব্যাপারে বলেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষার পাশাপাশি মানুষের পাশে দাঁড়াতেও সদা প্রস্তুত আমরা। করোনা সংকটে পরিচয় গোপন রাখার শর্তে অনেকে খাদ্য চেয়েছেন আমাদের কাছে, আমরা পরিচয় গোপন রেখেই ওই পরিবারগুলোর কাছে খাবার পৌঁছে দিয়ে এসেছি। হোম কোয়ারেন্টিনে থাকা দেশি-বিদেশি ১২৯০ জন নাগরিকের বাড়ি বাড়ি গিয়ে সচেতনতা ও পরামর্শ এবং বিভিন্ন জেলা থেকে আগত ১২ হাজার ৮০০ জনকে কোয়ারেন্টিনে রাখার বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে। এগুলো করা হয়েছে মানুষ যেন ভালো থাকে। ভাইরাসে সংক্রমিত না হতে পারে।

তিনি বলেন, সবচেয়ে বড় অর্জন আমি মনে করি উত্তরা ইপিজেডে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার বিষয়টি নিশ্চিত করা, কারণ সার্বক্ষণিক খোঁজখবর রাখা হয়েছে সেখানে এবং কেউ অসুস্থ হলে তাৎক্ষণিকভাবে আমরা উদ্যোগ নিয়েছি। একইভাবে বিমান বন্দরও আমরা পর্যবেক্ষণ করেছি।

করোনার মাঝে সর্বোচ্চ ঝুঁকি নিয়ে আমার পুলিশ সদস্যরা সার্বক্ষণিক দায়িত্ব পালন করেছেন যার কারণে চুরির কোনো ঘটনা ঘটেনি। এটি জেলাবাসীর জন্য ভালো একটি উদাহরণ। তারপরও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে যারা জড়িত ছিলেন তাদের গ্রেফতার করতে সক্ষম হয়েছে পুলিশ।