রংপুরে মজুরিবৈষম্যের শিকার নারী শ্রমিক

ঢাকা, শনিবার, ৪ এপ্রিল ২০২০ | ২০ চৈত্র ১৪২৬

রংপুরে মজুরিবৈষম্যের শিকার নারী শ্রমিক

সুশান্ত ভৌমিক, রংপুর ১১:০৯ পূর্বাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ২৩, ২০২০

print
রংপুরে মজুরিবৈষম্যের শিকার নারী শ্রমিক

রংপুরের পীরগঞ্জ উপজেলায় পুরুষের পাশাপাশি নারী শ্রমিকও কৃষি কাজ করে চলেছেন। বিশেষ করে আদিবাসী নারীরা পুরুষ শ্রমিকের পাশাপাশি তাদের দক্ষতা প্রমাণ করে চলেছেন। কিন্তু তাদের পারিশ্রমিক কম। এতে তারা ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।

গত বছর এসএসসি পাস করেছেন রুমিলা হেমরন। এখন এইচএসসিতে পড়ছেন। বিয়েও করেছেন। স্বামীর অভাবের সংসার। তাই পড়ালেখার পাশাপাশি অন্যের জমিতে দিনমজুরি করেন। সঙ্গে তার স্কুলপড়ুয়া ননদ যশিপিনা মার্ডিও কাজ করেন। পীরগঞ্জের বড়দরগাহ ইউনিয়নের দিগদুয়ারী গ্রামের ভেক্টর হেমরনের মেয়ে রুমিলা।

পাশ্ববর্তী দিনাজপুরের ঘোড়াঘাট উপজেলার কশিবাড়ী গ্রামের রিপন মার্ডির সঙ্গে গত বছর তার বিয়ে হয়। শ্বশুরবাড়িতে গিয়ে মৌসুমি শ্রমিক হিসেবে মাঠেঘাটে কাজ করছেন। কাজ থাকলে মজুরি চলে, রুমিলাদের জীবন তখন ভালো চলে। কিন্তু পারিশ্রমিক কম।

দিনাজপুরের ঘোড়াঘাটের কশিবাড়ী গ্রামের পথ দিয়ে চলার সময় জমিতে দেখা মেলে কয়েকজন আদিবাসী তরুণী ও নারীর। তারা ইরি-বোরো রোপণ করছেন। এ রকম আরও বেশ কয়েকটি জমিতে নারী শ্রমিকরা কাজে ব্যস্ত।

রুমিলার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, রংপুরের পীরগঞ্জে তার বাবার বাড়ি। গত বছর এসএসসি পাসের পরই বিয়ে হয়। এখন তিনি ঘোড়াঘাটের রানীগঞ্জ মহিলা ডিগ্রি কলেজে একাদশ শ্রেণিতে পড়ছেন। স্বামী রিপন মার্ডি ওষুধের দোকানের কর্মচারী। সঙ্গে তার ননদ যশিপিনা মার্ডি, প্রতিবেশী পূর্ণিমা। তারা দুজনই রানীগঞ্জ সরকারি দ্বিমুখী উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজের দশম শ্রেণির ছাত্রী। আরও এক গৃহবধূ লক্ষ্মী রানী। চারজনই চারা রোপণ করছেন।

লক্ষ্মীর স্বামী ফিলিপস। তিনিও শ্রমিক। লক্ষ্মীর ১০ বছরের সংসার জীবন, সন্তান নেই। তারপরও অভাব মেটাতে মাঠে কাজ করছেন। লক্ষ্মী জানান, একজন পুরুষের সমান কাজ করলেও নারী হওয়ায় দিনে ৩০০ টাকা মজুরি, একবেলা খাবার পাই। অপরদিকে একজন পুরুষ শ্রমিক ৫০০ টাকা মজুরি আর সকাল ও দুপুরে খাবার পান। দশম শ্রেণির ছাত্রী পূর্ণিমা বলে, আমরা কোনোভাবেই পুরুষের চেয়ে কম কাজ করি না। অথচ মজুরিবৈষম্যের শিকার হচ্ছি। শুধু পড়ালেখার খরচ মেটাতেই কাজ করছি।

স্কুলে উপবৃত্তি না পাওয়ায় দুঃখ করে বড় নিঃশ্বাস ফেলে যশিপিনা মার্ডি বলে, উপবৃত্তি নিয়ে বাঙালিদেই টানাটানি। সেখানে আমাদের হিসাব আশা করা যায় কি? আমার বাবা পাগল মার্ডি। খাবার খরচ দিতে তার কষ্ট হয়। তাই কাজ করে লেখাপড়াসহ আনুষঙ্গিক খরচ চালিয়ে আসছি। পাশের জমিতে আরও কয়েক আদিবাসী নারী শ্রমিকের কাজ করছেন। এ সময় তারাও চলে আসেন। পারিশ্রমিকের ব্যাপারে তারাও অসন্তুষ্টির কথা জানিয়ে বলেন, আমরা সারা দিন কাজ করে মাত্র ৩০০ টাকা পাই। এটা অনেক কম।

পীরগঞ্জ উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) টিএমএ মমিনের পূর্বের কর্মস্থল দিনাজপুরের ঘোড়াঘাট উপজেলা। তিনি সেখানকার ১০ হাজার আদিবাসী পরিবারের সদস্যদের জীবন-মান উন্নয়নে সরকারের কাছে তাঁতশিল্প প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপনের প্রস্তাবনা দেন। ২০১৮ সালে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে সমতলের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ব্যক্তিদের জন্য বেশকিছু প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। এর মধ্যে তাঁতশিল্প প্রশিক্ষণও একটি। পরে ঘোড়াঘাটে ‘ক্ষুদ্র-নৃগোষ্ঠীদের জন্য বঙ্গবন্ধু তাঁতশিল্প প্রশিক্ষণ কেন্দ্র’ স্থাপন করে কেন্দ্রটির মাধ্যমে আদিবাসী নারী-পুরুষ প্রশিক্ষণ নিয়ে শাড়ি, লুঙ্গি, গামছাসহ বিভিন্ন ধরনের কাপড় বাজারজাত করছেন।

ইউএনও টিএমএ মমিন জানান, দিনাজপুরের ঘোড়াঘাটের আদিবাসীরা কর্মঠ হওয়া সত্ত্বেও কাজ না থাকায় অলস সময় কাটাত। তাই তাদের জন্য ওই প্রকল্প গ্রহণ করেছিলাম। সেটি এখন প্রশংসিত এবং কয়েকশ আদিবাসী নারী-পুরুষ কাজ করছেন সেখানে।