মানুষমারা গ্রাম

ঢাকা, মঙ্গলবার, ২৬ মে ২০২০ | ১১ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭

মানুষমারা গ্রাম

মোশাররফ হোসেন, নীলফামারী ১০:৩০ অপরাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ২০, ২০২০

print
মানুষমারা গ্রাম

গ্রামের নাম মানুষমারা! গ্রামের এই নামানুসারে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ‘মানুষমারা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়’। সম্প্রতি জেলা প্রশাসকের উদ্যোগে ৮৫ বছরের পুরনো ওই বিদ্যালয়টির নাম দেওয়া হয়েছে ‘মানুষগড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়’। তাতে বিদ্যালয়ের নামের বিস্বাদ দূর হলেও সে বিস্বাদ রয়েই গেছে গ্রামের নামটিতে।

নীলফামারী সদরের পঞ্চপুকুর ইউনিয়নে গ্রামটির অবস্থান। শ্রুতিকটু ওই নামটি অনেক পুরনো। এমন নামের সঠিক ব্যাখ্যাও নেই গ্রামবাসীর কাছে। লোকমুখে প্রচলিত আছে, কোনো এক সময়ে গ্রামটিতে মারাত্মক কলেরার প্রকোপ দেখা দিয়েছিল। সেই কলেরায় মারা গিয়েছিল গ্রামের অনেক মানুষ। সেকালের মানুষের ধারণা ছিল ওই গ্রামে যেই আসবেন সেই মারা যাবেন। কলেরাকে সে সময় ভাবা হতো অদৃশ্য শক্তি হিসেবে। সেই অদৃশ্য শক্তির নিবাস ধরা হয়েছিল ওই গ্রামটিকে। সেখান থেকে চিহ্নিত হয় ‘মানুষমারা’ গ্রাম নামে।

ওই গ্রামের কৃষক মোজাহারুল ইসলাম (৭৫) বলেন, নামটি উচ্চারণ করতে খারাপ লাগে। এলাকার বাইরে গিয়ে গ্রামের নাম বলতে সংকোচ বাধে। নাম শুনে অনেকে আঁতকে ওঠেন, আমাদের অন্য চোখে দেখেন, বিভিন্ন প্রশ্ন করেন। ধারণা করেন অনেক কিছু। তিনি দাবি করে বলেন, যুগের পরিবর্তন হয়েছে। সে পরিবর্তনে বিদ্যালয়ের নাম বদল হয়েছে, তাতে আমরা অনেক খুশি। এখন প্রয়োজন আমাদের গ্রামের নামের পরিবর্তনের।

একই গ্রামের বাসিন্দা প্রকৌশলী আবু সাইদ মোহাম্মদ নুরুল হুদা (৫৫)। ছোটবেলায় লেখাপড়া করেছেন মানুষ মারা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। শিক্ষা এবং চাকরি জীবনে তিনিও বিব্রত ছিলেন ওই গ্রাম এবং প্রাথমিক বিদ্যালয়ের নাম নিয়ে।

এ বিষয়ে তিনি বলেন, গ্রাম আর বিদ্যালয়ের নাম নিয়ে অনেক প্রশ্নের সম্মুখীন হয়েছি। অথচ শ্রুতিকটু ওই নামের বিদ্যালয়ে পড়ে গ্রামের অনেকে ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, শিক্ষক হয়েছেন। অনেকে বিভিন্ন পেশায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন। সম্প্রতি বিদ্যালয়ের নামের পরিবর্তন হয়েছে। এখন আমাদের দাবি গ্রামের নাম পরিবর্তনের।

গ্রামের আবদুল কাদের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে অনার্স তৃতীয় বর্ষে লেখাপড়া করেন জেলার জলঢাকা ডিগ্রি কলেজে। ওই শিক্ষার্থীও বিব্রত গ্রামের নাম নিয়ে। বিদ্যালয়ের নামের মধ্য দিয়ে সূচনা ঘটেছে পরিবর্তনের। এখন তাদের দাবি গ্রামের নামটি পরিবর্তনের।
যেভাবে নাম পরিবর্তন বিদ্যালয়ের

১৯৩৫ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় মানুষ মারা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। দীর্ঘ ৮৫ বছর বিদ্যালয়টি মানুষ গড়ার কাজে নিয়োজিত থাকলেও সেটি নজরে আসেনি। জেলা প্রশাসক মো. হাফিজুর রহমান চৌধুরী গত বছরের মাঝামাঝি সময়ে এ জেলায় যোগদানের পর নামটি চোখে পড়ে তার। সেই থেকে উদ্যোগ নেন নামটি পরিবর্তনের।

ওই বিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি আজাহারুল ইসলাম বলেন, জেলা প্রশাসক মো. হাফিজুর রহমান চৌধুরী যোগদানের পর প্রাথমিক শিক্ষা নিয়ে একটি সভা করেন। সে সভায় তিনি বিদ্যালয়ের নামটি জানতে পেরে পরিবর্তনের প্রস্তাব দেন। এরপর প্রক্রিয়া শেষে মানুষ মারার পরিবর্তে মানুষ গড়া নামটি যুক্ত হয়।

একই কথা বলেন বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. কামরুজ্জামান শাহ। তারা বলেন, নাম পরিবর্তনে শিক্ষার্থী-শিক্ষক এবং এলাকাবাসী খুশি।
জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) তাজুল ইসলাম বলেন, ‘জেলা প্রশাসক নাম পরিবর্তনের প্রস্তাব করলে বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটি এবং এলাকাবাসী তিনটি নাম প্রস্তাব করে উপজেলা শিক্ষা কমিটিতে পাঠায়। সেখান থেকে একটি নাম আমার কাছে আসে। আমি সেটি জেলা প্রশাসকের কাছে জমা দিলে তিনি মন্ত্রণালয়ে পাঠান। পরবর্তী সময়ে রাষ্ট্রপতির আদেশক্রমে সেটি পরিবর্তন করে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়।
জেলা প্রশাসক মো. হাফিজুর রহমান চৌধুরী বলেন, একজন জেলা প্রশাসক যোগদানের পর প্রথম কাজ এলাকা সম্পর্কে জানা। আমি এ জেলায় যোগদানের পর প্রাথমিক শিক্ষা বিষয়ে জানতে চাইলে ওই বিদ্যালয়টির নাম চোখে পড়ে। যেখানে মানুষ গড়া হয়, সে বিদ্যালয়টির নাম কেন মানুষ মারা হবে? এটি উচ্চপর্যায়ে আলোচনার পর নাম পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। শিশুদের মানবিক বিকাশের অন্তরায় ছিল ওই নামটি। তিনি বলেন, গ্রামের নামটিও পরিবর্তনের প্রক্রিয়া চলছে।