কেউ জানল না মুজিবর ও জাদুঘরটির কথা

ঢাকা, শুক্রবার, ৬ ডিসেম্বর ২০১৯ | ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

কেউ জানল না মুজিবর ও জাদুঘরটির কথা

প্রীতম সাহা সুদীপ ৯:৫৩ পূর্বাহ্ণ, নভেম্বর ২১, ২০১৯

print
কেউ জানল না মুজিবর ও জাদুঘরটির কথা

এ টি এম মুজিবর রহমান, একজন প্রত্নতাত্ত্বিক ও ইতিহাস গবেষক। ইতিহাসকে ধারণ করে দীর্ঘ ৬১ বছরের চেষ্টায় তিল তিল করে গড়ে তুলেছেন নিজের বিশাল এক সংগ্রহশালা। যেখানে স্থান পেয়েছে প্রাচীন ও দুর্লভ সব জিনিসপত্র। সেগুলো নিয়েই ১৯৮৩ সালে তিনি নীলফামারী জাদুঘর স্থাপন করেন।

বর্তমানে বয়সের ভারে ন্যুয়ে পড়েছেন প্রবীণ এই ইতিহাস গবেষক। সেই সঙ্গে রুগ্ন দশায় রয়েছে নিজ হাতে গড়ে তোলা তার জাদুঘরটিও। ৮০ বছর বয়সী মুজিবর রহমান এখন শয্যাশায়ী। সম্প্রতি শরীরে প্রচুর লবনশূন্যতা দেখা দেওয়ায় মস্তিষ্কে আঘাতপ্রাপ্ত হন। মাইনর স্ট্রোকের কারণে কথা বলা ও হাঁটাচলার শক্তি হারিয়ে ফেলেছেন তিনি। বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়ার পর বর্তমানে তিনি নীলফামারীর মাস্টার পাড়ায় নিজ বাড়িতেই আছেন। চিকিৎসকরা বাসায় রেখেই প্রবীণ এই ব্যক্তির চিকিৎসা কার্যক্রম চালিয়ে নেওয়ার জন্য তার পরিবারকে পরামর্শ দিয়েছেন। এমন অবস্থায় সর্বক্ষণ পাশে থেকে স্বামীর সেবা শুশ্রুষা করে যাচ্ছেন স্ত্রী সালেহা বেগম।

মুজিবর রহমান সমবায় বিভাগের পরিদর্শক হিসেবে ২০০০ সালে অবসর গ্রহণ করেন। তিনি নীলফামারী পুলিশ লাইন্স একাডেমির প্রিন্সিপাল ছিলেন।

এ ছাড়াও নীলফামারী অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মচারী কল্যাণ সমিতির (অসকস) চেয়ারম্যান ও জীবন সদস্য, প্রবীণ হিতৈষী সংঘের জীবন ও নির্বাহী সদস্য, নীলফামারীর ইতিহাস, তথ্য ও সাহিত্য গবেষণা কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ও সম্পাদক, নীলফামারী জেলা বাস্তবায়ন কমিটির আহ্বায়ক, মাস্টারপাড়া জামে মসজিদের সভাপতি এবং বজ্রকণ্ঠ, বিশ্বঐতিহ্য, ইউনেস্কো স্বীকৃত সংরক্ষণ পরিষদ, নীলফামারীর প্রতিষ্ঠাতা সভাপতিও ছিলেন মুজিবর রহমান।

মহান মুক্তিযুদ্ধের আগে লালমনিরহাটের তুষভাণ্ডার এলাকায় ভাড়া থাকতেন মুজিবর। সেখানকার স্থানীয় আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠাকালীন সদস্য ছিলেন তিনি। যুদ্ধ শুরু হলে তুষভাণ্ডার থেকে তাকে তুলে নিয়ে যায় হানাদার বাহিনী। পরবর্তীতে স্থানীয় শান্তি কমিটির সদস্য জসিম মিয়ার হস্তক্ষেপে তিনি মুক্তি পান।

যুদ্ধের প্রায় ১৩ বছর আগে ১৯৫৮ সালে অনেকটা শখের বশেই ব্যক্তিগত উদ্যোগে প্রাচীন, দুর্লভ ও মূল্যবান নিদর্শনসমূহের সংগ্রহ শুরু করেন। এর প্রায় ২০ বছর পর ১৯৭৮ সালে তিনি একটি জাদুঘর স্থাপনের উদ্যোগ নেন। দীর্ঘ প্রচেষ্টার পর ১৯৮৩ সালে তিনি নীলফামারী জাদুঘর প্রতিষ্ঠা করেন। এতে স্থান পায় সাত মহাদেশের প্রাচীন ও দুর্লভ সব নিদর্শন, যার সংখ্যা তিন হাজারেরও বেশি।

মুজিবরের অনুপস্থিতিতে করুণদশা জাদুঘরটির
বর্তমানে মাত্র দুজন কর্মচারী নীলফামারী জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে অবস্থিত এই জাদুঘরের দেখাশোনা করছেন। জাদুঘরটি রক্ষায় সরকারি কোনো উদ্যোগ ও আর্থিক সহায়তা না থাকলেও মুজিবর রহমানকে ভালোবেসে রতন কুমার রায় ও মানিক ইসলাম নামে এ দুজন কর্মচারী অক্লান্ত পরিশ্রম করে যাচ্ছেন।

বর্তমানে নীল সাগর গ্রুপের অঙ্গপ্রতিষ্ঠান অনুভব ফাউন্ডেশন থেকে প্রতিমাসে পারিশ্রমিক হিসেবে কিছু টাকা পাচ্ছেন তারা।

কেয়ারটেকার রতন রায় জানান, প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে বিকাল ৩টা পর্যন্ত দর্শনার্থীদের জন্য নীলফামারী জাদুঘরটি খোলা থাকে। প্রতিদিন দশ থেকে ৫০ জন দর্শনার্থী মিউজিয়ামটি ঘুরে দেখেন।

নীলফামারী জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের পুরাতন লাল দালানের নিচতলায় অবস্থিত এই জাদুঘরে ঢুকলেই চোখে পড়বে ধুলো জমা ভাঙা-ঘোলা কাচঘেরা তিনটি লোহার সেলফ এবং দুটি আলামারি। এর মধ্যে মাঝখানের সেলফটিতে সংরক্ষিত রয়েছে ব্রিটিশ আমলের হারিকেন ও কুপি। প্রাচীন কালের রেডিও ও ট্রানজিস্টার, প্রাচীন দাঁড়িপাল্লা ও পরিমাপ যন্ত্র, সিল মোহর ইত্যাদি।
এ ছাড়া এখানে রয়েছে ব্রিটিশ আমলের সেলাই মেশিন, হুক্কা, রেকর্ড প্লেয়ার, টাইপ রাইটার, কেরোসিন তেলে চালিত ফ্যান, বিশাল আকৃতির প্রাচীনকালের তালা, সুলতানি আমলের তলোয়ার, তালপাতার পুঁথি, কষ্টিপাথরের মূর্তি, আগের দিনের মানুষের ব্যবহৃত থালা বাসন ও অলঙ্কার ইত্যাদি।

সরেজমিন ঘুরে দেখা যায়, জাদুঘরটির প্রতিটি কক্ষে থাকা সেলফ ও আলমারিই ভাঙা ও জরাজীর্ণ অবস্থায় রয়েছে। ধুলোবালি জমে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে প্রাচীন এসব অমূল্য সংগ্রহ।

কেয়ারটেকার রতন জানান, জাদুঘরটি দেখাশোনার জন্য আমরা নামে মাত্র পারিশ্রমিক পাই স্যারের (মুজিবর রহমান) কাছ থেকে। স্যারকে ভালোবেসে এবং ঐতিহ্যবাহী এসব নিদর্শনের প্রতি আগ্রহ থেকেই এই জাদুঘরে কাজ করে যাচ্ছি। নিজ উদ্যোগে আমরাও জাদুঘরের জন্য দুর্লভ জিনিসপত্র সংগ্রহের চেষ্টা করে যাচ্ছি।

তিনি আরও বলেন, জাদুঘরটি রক্ষায় আমরা কোনো ধরনের সরকারি সহায়তা পাচ্ছি না। সরকার যদি জাদুঘরটি রক্ষায় এগিয়ে আসত তাহলে ইতিহাস ধারণ করা এসব দুর্লভ নির্দশন ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা পেত।

শেষ সময়েও মূল্যবান নিদর্র্শনগুলো আগলে রেখেছেন মুজিবর
মাস্টার পাড়ায় মুজিবর রহমানের বাড়ির গেট দিয়ে ভেতরে ঢুকতেই দেখা গেল বিছানায় শুয়ে আছেন অসুস্থ এই ইতিহাস গবেষক। সাংবাদিক পরিচয় দিতেই তার চোখে মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল। শুয়ে শুয়েই হাত নাড়িয়ে অস্পষ্ট স্বরে কিছু বলতে চাইছিলেন, কিন্তু বোঝাতে পারছিলেন না।

তাঁর স্ত্রী সালেহা বেগম জানালেন, শয্যাশায়ী অবস্থায়ও তার সব চিন্তা ওই জাদুঘরটি নিয়ে। যখন সুস্থ ছিলেন সারা দিন তিনি জাদুঘরের জন্য বিভিন্ন নিদর্শন সংগ্রহ করতেন এবং ইতিহাস নিয়ে গবেষণা করতেন। বাড়ির বারান্দায় রয়েছে তার স্টাডি রুম। সেখানে রয়েছে তার সংগৃহীত অসংখ্য বই। এ ছাড়াও দুটি আলমারিতে রয়েছে তার সংগৃহীত সবচেয়ে দুর্লভ নিদর্শনগুলো।

২০০৭ সালে স্থানীয় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে অবসর গ্রহণ করা সালেহা আরও বলেন, এ দুটি আলমারিতে কি রয়েছে, সেটা আমাদেরও কখনো দেখতে দেননি আমার স্বামী। তালাবদ্ধ করে এই আলমারি দুটির চাবি সব সময় তিনি নিজের কাছেই রাখেন। সেই বিয়ের পর থেকেই দেখছি, পরিবারের দিকে তার তেমন নজর ছিল না। তার জগৎই ছিল এসব সংগ্রহকে ঘিরে। মাঝে মধ্যে আমি বিরক্ত হয়ে অনেক কিছু বলতাম, আবার পরক্ষণে ভাবতাম তিনি তো দেশের জন্য আগামী প্রজন্মের জন্য কাজ করছেন। ব্যক্তিগত জীবনে দুই ছেলে ও দুই কন্যা সন্তানের জনক মুজিবর রহমান। তার বড় ছেলে এস কে মালেক একজন ঠিকাদারি ব্যবসায়ী, ছোট ছেলে এস কে মঞ্জু কাঠের ব্যবসা করেন।

বড় ছেলে মালেক বলেন, বাবার ধ্যান, জ্ঞান, চিন্তা-চেতনা সব কিছুই ছিল এই জাদুঘর। শেষ বয়সে এসে শয্যাশায়ী অবস্থায়ও তিনি সেটি নিয়েই ভেবে চলেছেন। আমাদের চাওয়া-পাওয়ার কিছুই নেই, সরকার থেকে যদি বাবার জাদুঘর ও এই বিশাল সংরক্ষণ রক্ষার ব্যবস্থা করা হয় তাহলে বাবার চাওয়া পাওয়া পূর্ণ হতো।