কী আছে স্থানীয় জাপার মনে

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৯ | ৪ আশ্বিন ১৪২৬

কী আছে স্থানীয় জাপার মনে

সাদ লাঙলের প্রার্থী

তুষার রায় ১০:৩৬ অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ০৯, ২০১৯

print
কী আছে স্থানীয় জাপার মনে

রংপুর-৩ (সদর) আসনের উপ-নির্বাচনে জাতীয় পার্টি (জাপা) প্রার্থিতা ঘোষণা নিয়ে স্থানীয় নেতাকর্মীর মাঝে চরম উত্তেজনা ছড়িয়েছে। প্রথমে রংপুর মহানগরের সাধারণ সম্পাদক এস এম ইয়াসিরকে প্রার্থী ঘোষণা করা হলেও পরে এ আসনে জাপার প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান মরহুম এইচ এম এরশাদের পুত্র রাহগীর আল মাহি সাদ এরশাদকে প্রার্থী করা হয়। 

সোমবার (৯ সেপ্টেম্বর) সাদ মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন। এ ঘটনায় স্থানীয় নেতাকর্মীর মধ্যে ক্ষোভে দেখা দিয়েছে। অনেকে প্রকাশ্যে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। সাদকে বহিরাগত আখ্যা দিয়ে তারা বলছেন, স্থানীয় নেতৃত্বের সঙ্গে আলোচনা না করেই খামখেয়ালি সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এদিকে রংপুর সিটি করপোরেশনের মেয়র মোস্তাফিজুর রহমান মোস্তফাসহ স্থানীয় নেতারা ঘোষণা দিয়েছেন, তারা শাদ এরশাদকে মেনে নেবেন না, তার জন্য কাজও করবেন না। এ ডামাডোলের মাঝেই ইয়াসির গতকাল তার মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করেছেন। তবে এরশাদের ভাতিজা আসিফ শাহরিয়ার মনোনয়নপত্র দাখিল করেছেন। স্থানীয় প্রভাবশালী নেতারা সাদের প্রতি বিরূপ মনোভাব প্রকাশ করেছেন।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এরশাদের মৃত্যুর পর তার ভাই জি এম কাদের ও স্ত্রী রওশন এরশাদের মধ্যে যে টানাপড়েন চলছিল তার আপসরফার ফল হিসেবে সাদ মনোনয়ন পেয়েছেন। এই ফর্মুলায় জি এম কাদের তার চেয়ারম্যান নিরাপদ করলেন আবার রওশন এরশাদ সংসদে প্রধান বিরোধীদলীয় নেতা পদ অটুট রাখলেন। বোনাস হিসেবে ছেলেকে সংসদে আসার সম্ভাবনা সৃষ্টি করছেন। এ সমঝোতার বলি হতে হলো স্থানীয় নেতাদের। তবে রংপুরবাসীর আশঙ্কা, স্থানীয় কর্মীদের ক্ষুব্ধ করে এ আসনে জেতা যাবে না। এর সুযোগ নেবে আওয়ামী লীগ। কারণ সাদের কোনো জনপ্রিয়তা বা গ্রহণযোগ্যতা নেই এখানে। আলোচিত আসনটিতে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি প্রার্থীসহ মোট নয়জন মনোনয়ন জমা দিয়েছেন। ফলে মনে করা হচ্ছে, এখানে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হবে।

সোমবার (৯ সেপ্টেম্বর) জাপা চেয়ারম্যান জি এম কাদের এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, জাতীয় পার্টিতে কোনো বিভেদ নেই। সবাই ঐকমত্য হয়ে সাদকে মনোনয়ন দিয়েছি। সার্বিক বিবেচনায়, সবকিছু হিসাব করে আমরা তাকে (সাদ) নমিশেন দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। এখানে কেন্দ্রীয় ও তৃণমূল নেতাকর্মীরা একত্র হয়ে দলের স্বার্থে কাজ করবে এবং আমরা জয়ী হব।

সাদের জয় নিশ্চিত করতে জোটসঙ্গী আওয়ামী লীগের সঙ্গে আলোচনা হচ্ছে বলেও ইঙ্গিত দেন জি এম কাদের। বলেন, ‘এ বিষয়ে আমরা কথা বলার চেষ্টা করছি, আলাপ-আলোচনা কিছুটা করেছি। আমরা এখনো কোনো ঐকমত্যে আসতে পারিনি। উনারাও বিষয়টি বিবেচনা করবেন বলেছেন। দু-চারদিন পর প্রত্যাহারের দিনের মধ্যেই আমরা নিশ্চিত হব।’

তবে মসৃণ নয় রংপুরের পরিস্থিতি। সেখানে অনেক ধারা সৃষ্টি হয়েছে। এর মধ্যে সিংহ ভাগ নেতাকর্মী সাদের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। তারা বলছেন, সাদের মনোনয়ন প্রত্যাহার করে স্থানীয় প্রার্থীকে মনোনয়ন দিতে হবে। তারা প্রকাশ্যেই বলছেন, সাদের জন্য তারা কাজ করবেন না। তাকে জেতাতে হলে জাপা হাইকমান্ড এসে জেতাক। এখানেই আশঙ্কা দানা বেঁধেছে।

স্থানীয় সাধারণ সমর্থকরা মনে করছেন, রংপুরবাসীর নিজস্ব রাজনীতির ধারা রয়েছে। তারা মরহুম এরশাদের জন্য অন্তপ্রাণ হলেও ছেলে সাদের জন্য তাদের বিশেষ প্রীতি নেই। কারণ তিনি রংপুরবাসীর সঙ্গে আগেও সম্পৃক্ত ছিলেন না। ফলে স্থানীয় জনআবেগ বুঝতে ব্যর্থ হলে আসনটি হারাতে হতে পারে। এর মধ্যে গতকাল এরশাদের ভাতিজা শাহরিয়ার আসিফ মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন। তবে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্তের কথা জানালেন রংপুর মহানগর সাধারণ সম্পাদক এস এম ইয়াসির। নিজের জীবনের নিরাপত্তা ও সবার ভালোবাসার সম্মান রক্ষার্থে তিনি এই সিদ্ধান্তের কথা জানান।

গতকাল এক সংবাদ সম্মেলনে কান্না জড়িত কণ্ঠে এস এম ইয়াসির বলেন, ‘জাতীয় পার্টি করতে গিয়ে আমি অনেকবার মৃত্যুর মুখে পতিত হয়েছিলাম। অনেক ষড়যন্ত্র হয়েছে। আমি ভোট করতে চাইনি। সবার অনুরোধে প্রস্তুতি নিয়েছিলাম। কিন্তু এর মধ্যে আমাকে মৃত্যুর হুমকি দেওয়া হয়েছে। মেরে ফেলার ভয় দেখানো হচ্ছে। তাই আমি সরে দাঁড়ালাম’। এসব ঘিরে বহুপক্ষীয় বিরোধ চরমে উঠেছে, চাপা উত্তেজনাও সৃষ্টি হয়েছে। সেখানে উভয়পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষের শঙ্কাও রয়েছে। ফলে জমে উঠেছে নাটক।

গত রোববার জাপা রংপুর মহানগর কমিটির সভাপতি এবং রংপুর সিটি মেয়র মোস্তাফিজুর রহমান মোস্তফা জানিয়েছেন, ‘কেন্দ্রীয় কমিটি আমাদের মতামতের গুরুত্ব দেয়নি। তাই কেন্দ্রীয় কমিটি তাকে বিজয়ী করার ব্যাপারে কাজ করবে। আমরা সাদের পক্ষে কাজ করব না।’

তিনি আরও বলেন, আমরা কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দকে জানিয়েছিলাম এখানে তিনজন প্রার্থী রয়েছেন। এস এম ইয়াসির, হাজী আবদুর রাজ্জাক ও এস এম ফখরুজ্জামানের মধ্যে যাকে প্রার্থী করা হবে আমরা তাকে বিজয়ী করতে কাজ করব। কিন্তু তা মানা হয়নি।

এই ডামাডোলের মধ্যে গতকাল দলের রওশন এরশাদকে সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ও দলটির চেয়ারম্যান জি এম কাদেরকে উপনেতা করে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে। দলটির চেয়ারম্যান পদেও রয়েছেন তিনি।

জাপার কয়েকজন প্রভাবশালী প্রেসিডিয়াম সদস্যের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এভাবে পদ ভাগাভাগির মাধ্যমে জি এম কাদের ও রওশনের মধ্যে চলমান দ্বন্দ্বের অবসান হলো। কারণ সম্প্রতি তারা দুজনই নিজেদের দলের চেয়ারম্যান ও বিরোধী নেতার হিসেবে ঘোষণা করেন। দলীয় নেতারাও দুভাগ হয়ে যান। দলে আরেক দফা ভাঙনের পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়। পরে রওশন দেবর জি এম কাদেরকে এক আত্মীয়ের মাধ্যমে সমঝোতার প্রস্তাব পাঠান। সমঝোতা অনুযায়ী, কাদের হবেন চেয়ারম্যান আর বিরোধী দলনেতা হবেন রওশন। পাশাপাশি ছেলে সাদকে রংপুর-৩ আসনের প্রার্থী করতে হবে। এই প্রস্তাব মেনে নেন জি এম কাদের।

তবে স্থানীয়দের ক্ষোভের পাশাপাশি জাপা প্রার্থীর জন্য অপেক্ষা করছে আওয়ামী লীগের কঠিন চ্যালেঞ্জ। কারণ আওয়ামী লীগও এখানে প্রার্থী ঘোষণা করেছে। নৌকা নিয়ে লড়বেন জেলা আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক মো. রেজাউল করিম রাজু। ক্ষমতাসীন দলটি জাপার রাজনীতির প্রাণপুরুষ এরশাদের আসনটি কব্জায় নিতে চায়। দলটি বৃহত্তর রংপুরে এরশাদের শূন্যতার সুযোগে এখানে প্রভাব বাড়াতে চায়। তাছাড়া জাপার দ্বন্দ্বের সুযোগে বিএনপি যাতে আসনটি ছিনিয়ে না নিতে পারে সে হিসাবও আওয়ামী লীগের মাথায় রয়েছে। যদিও জোটসঙ্গী হিসেবে জাপা আশা করছে, এরশাদের প্রতি সম্মান দেখিয়ে এ আসনে ছাড় দেবে আওয়ামী লীগ। তবে আওয়ামী এখনো এরকম কোনো আশ^াস দেয়নি বলে জানা গেছে।

আবার বিএনপি তার মরা গাঙে জোয়ার আনতে এ আসনকে পাখির চোখ করেছে। দলটি প্রার্থী করেছেন সদ্য বিলুপ্ত পিপলস পার্টি অব বাংলাদেশের নেতা রিটা রহমানকে। রিটার হাতে ধানের শীষ তুলে দেওয়া নিয়েও ক্ষোভ রয়েছে স্থানীয় বিএনপিতে। বিএনপির রংপুর মহানগর কমিটির সাধারণ সম্পাদক শহিদুল ইসলাম মিজু বলেন, ‘আমরা হতাশ-ক্ষুব্ধ। ভোটের বাক্সে এর প্রভাব পড়বে। রিটার স্বামী পলাতক মেজর (অব.) খায়রুজ্জামান ১৫ আগস্ট সপরিবারে বঙ্গবন্ধু এবং ৩ নভেম্বর কারাগারে জাতীয় চার নেতা হত্যা মামলার আসামি। যা নির্বাচনে প্রভাব পড়তে পারে।’

নির্বাচন অফিস সূত্রে জানা গেছে, মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করা ১২ জন প্রার্থীর মধ্যে তিনজন মনোনয়নপত্র জমা দেননি। বাকি নয়জনের মধ্যে দুই স্বতন্ত্র এবং অন্যরা দলীয় প্রার্থী হিসেবে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন।

এরশাদের মৃত্যুতে আসনটি শূন্য হয়। ৫ অক্টোবর ভোটগ্রহণ হবে। মনোনয়নপত্র জমা ৯ সেপ্টেম্বর, বাছাই ১১ সেপ্টেম্বর, মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের শেষ দিন ১৬ সেপ্টেম্বর।