জিপিএ-৫ পেয়েও অনিশ্চয়তা

ঢাকা, মঙ্গলবার, ১৬ জুলাই ২০১৯ | ১ শ্রাবণ ১৪২৬

জিপিএ-৫ পেয়েও অনিশ্চয়তা

কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি ৫:১৩ অপরাহ্ণ, মে ১৫, ২০১৯

print
জিপিএ-৫ পেয়েও অনিশ্চয়তা

কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ীতে দরিদ্রতাকে জয় করে জিপিএ-৫ পেয়েছে প্রদীপ পাল, সাবিনা ইয়াছমিন ও শাহারিয়া হোসাইন। ভালো ফলাফলে তাদের পরিবারে আনন্দ বিরাজ করলেও অর্থ সংকটে তা ফিকে হয়ে যাচ্ছে। অর্থের অভাবে কলেজে ভর্তি হতে পারবে কি না সে ব্যাপারে অনিশ্চয়তায় রয়েছে তারা। বিস্তারিত জানিয়েছেন কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী প্রতিনিধি এস এম আসাদুজ্জামান।

ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার স্বপ্ন প্রদীপের

প্রদীপ পাল

দরিদ্র পরিবারের সন্তান প্রদীপ পাল। মা মলি রানী পাল গৃহিনী। বাবা শ্যামল চন্দ্র পাল চা বিক্রিতা। চা বিক্রি করে কোনো রকমেই চলে তাদের সংসার। তবে দারিদ্রতার সীমাহীনতা তাকে আটকাতে পারেনি। বড় ছেলে মলয় পাল ও ছোট ছেলে প্রদীপ পাল চা বিক্রির পাশাপাশি নিয়মিত স্কুলে যেত। বড় ছেলে মলয় পাল ২০১৭ সালে এসএসসি পাস করে। সে এবার এইচএসসি পরীক্ষা দিচ্ছে। ছোট ছেলে প্রদীপ পাল ২০১৬ সালে জেএসিতে জিপিএ-৫ পেয়েছিলে।

এবার বালারহাট আদর্শ স্কুল অ্যান্ড কলেজে বিজ্ঞান বিভাগ থেকে এসএসসিতে জিপিএ-৫ পেয়ে গরিব বাবা-মায়ের মুখে হাসি ফুটিয়েছেন প্রদীপ। তার বাড়ি কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী উপজেলার বালাতাড়ি গ্রামে।

প্রদীপের বাবা শ্যামল পাল জানান, আমরা বাপ-ছেলে মিলে চা বিক্রি করে কোনো রকমে খেয়ে না খেয়ে বেঁচে আছি। তবে ছেলের পড়ালেখায় ছিলাম সচেতন। তাদের মাঝে মাঝে বলতাম, আমাদের সংসারে অভাব। নেই জমিজমা। চা বিক্রি করেই আমাদের চলতে হয়। কলেজে ভর্তির জন্য তাদের কাছে তেমন কোনো অর্থ নেই।
ইচ্ছা থাকলেও ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার স্বপ্ন ভেস্তে যেতে বসেছে প্রদীপের।


ডাক্তার হতে চান সাবিনা ইয়াসমিন

সাবিনা ইয়াসমিন

ফুলবাড়ী উপজেলার বালারহাট আদর্শ স্কুল অ্যান্ড কলেজের বিজ্ঞান বিভাগ থেকে গোল্ডেন জিপিএ-৫ পেয়েছে সাবিনা ইয়াছমিন নিথী। ২০১৩ সালের পিইসি ও ২০১৬ জেএসসিতে জিপিএ-৫ পেয়ে গরিব বাবা-মায়ের মুখ উজ্জ্বল করেছিল সে। উপজেলার নাওডাঙ্গা ইউনিয়নের সীমান্ত ঘেষা কৃষ্ণানন্দবকসি গ্রামের দিনমজুর ইউসুফ আলীর মেয়ে নিথী। মেয়ের পড়ালেখার খরচ জোগাতে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় রাজমিস্ত্রীর কাজ করেন ইউসুফ। স্বল্প আয়ে মেয়ে নিথী ও ছোট ছেলে লুৎফর রহমানের স্কুলের পড়ালেখার খরচ জোগাতে হয় তাকে। মা আদরী বেগম মাঝে মাছে অন্যের বাড়িতে ঝিয়ের কাজ করেন। অভাবের সংসারে কিভাবে মেয়ের পড়ালেখার খরচ চালাবেন তা ভেবে পাচ্ছেন না নিথীর বাবা-মা।
সাবিনা ইয়াছমিন নিথী জানায়, আমার গরিব বাবা-মা কিভাবে আমাকে উচ্চ শিক্ষার জন্য কলেজে ভর্তি করাবে ভেবেই পাচ্ছি না। তার স্বপ্ন ডাক্তার হয়ে গরীব দুঃখীদের পাশে দাঁড়াবে।
মা আদরী বেগম জানান, ছেলে-মেয়েকে পড়ালেখা করায় আরও দুশ্চিতায় পড়া লাগে বেশি। মেয়ে ভালো ফল করেছে এর আনন্দ যেমন আছে তার চেয়ে কষ্ট অনেক বেশি। মেয়েটা আমার ডাক্তার হতে চায়। কিন্তু কলেজে ভর্তি হবে, টাকা পাব কোথায়। ভিটাবাড়ির পাঁচ শতক জমি ছাড়া আর কিছুই নেই আমার।


চিকিৎসাসেবা দিতে চান শাহারিয়া

শাহারিয়া হোসাইন

দিনমজুরের ছেলে শাহরিয়া হোসাইন জিপিএ-৫ পেয়েছে। তবে অর্থের অভাবে কলেজে ভর্তি হতে পারবেন কিনা তা নিয়ে শঙ্কায় পড়েছে তার দরিদ্র পরিবার। উপজেলার নাওডাঙ্গা ইউনিয়নের গোরকম-প গ্রামের দিনমজুর মমিনুল হকের ছেলে শাহরিয়া। মমিনুল হকের দুই ছেলে এক মেয়ে। শাহারিয়া হোসাইন সবার বড়। পরিবারের অভাব অনটন থাকায় ছোট বেলা থেকে বালাতাড়ি গ্রামে মামা বাড়ি থাকে শাহারিয়া হোসাইন। সেখানে থেকে টিউশনি ও দিনমজুরের কাজ বালারহাট আদর্শ স্কুল অ্যান্ড কলেজের বিজ্ঞান বিভাগ থেকে জিপিএ-৫ পেয়েছে সে। তবে অভাবের তাড়নায় ইচ্ছা থাকলেও ডাক্তার হওয়ার স্বপ্ন ভেস্তে যেতে বসেছে তার।
শাহারিয়া হোসাইন জানায়, মামা বাড়িতে থাকলেও সে নিজে কোনো সময় টিউশনি ও এমনকি দিনমজুরের কাজ করে পড়ালেখার খরচ যোগাড় করেছে। শিক্ষক আর বন্ধুদের সহযোগিতায় এ পর্যন্ত এসেছে। বাবা-মায়ের আর্থিক সামর্থ না থাকায় ডাক্তার হওয়ার স্বপ্ন তার ভেস্তে যেতে বসেছে।
বাবা মমিনুল হক জানান, ধারদেনা করে কোনো রকমে সংসার চলে তারা। স্ত্রী শাহানাজ বেগমও অন্যের বাড়িতে ঝিয়ের কাজ করেন। পড়ালেখার খরচ যোগাড় করতে শাহারিয়াও অবসর সময়ে দিনমজুরের কাজ করে এ পর্যন্ত এসেছে।