কিশোরগঞ্জে ঋণের ফাঁদে কৃষক

ঢাকা, শুক্রবার, ১৬ নভেম্বর ২০১৮ | ২ অগ্রহায়ণ ১৪২৫

কিশোরগঞ্জে ঋণের ফাঁদে কৃষক

মাফি মহিউদ্দিন, কিশোরগঞ্জ (নীলফামারী) ৯:৩৬ অপরাহ্ণ, মে ১৬, ২০১৮

print
কিশোরগঞ্জে ঋণের ফাঁদে কৃষক

নীলফামারীর কিশোরগঞ্জ উপজেলার রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক শাখা থেকে শত শত কৃষকের নামে ঋণ হালনাগাদ (রিকভারি) ও নতুন ঋণ করার নামে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে ব্যাংক কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে। ব্যাংকের ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে এখন দিশেহারা হয়ে পড়েছেন কৃষক।

খোদ ঋণগ্রহীতা কৃষকই জানেন না তাদের নামে ব্যাংকে ঋণের পরিমাণ কত। এমনকি তাদের কাছে নেই কোনো কাগজপত্র। ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ এক অডিট আপত্তিতে বিষয়টি ধরা পড়ে।
রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক নীলফামারী কিশোরগঞ্জ উপজেলা শাখা সূত্রে জানা গেছে, ২০১৫-১৬ অর্থবছরে এ শাখা থেকে ৭৬৯ জন ঋণগ্রহীতাকে পাঁচ কোটি ১৭ লাখ ৭২ হাজার টাকা ঋণ বিতরণ করা হয়। এর মধ্যে ১৫ জন ব্যবসায়ীকে সিসি লোন দেওয়া হয় ৭৪ লাখ ৩০ হাজার। বাকি চার কোটি ৪৩ লাখ ৪২ হাজার টাকা ৭৫৪ জন কৃষকের মধ্যে বিতরণ করা হয়। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ৬৯১ জন ঋণগ্রহীতাকে পাঁচ কোটি ৪০ লাখ ৬১ হাজার টাকা ঋণ বিতরণ করা হয়। এর মধ্যে ১৭ জন ব্যবসায়ীকে সিসি লোন দেওয়া হয় ৭২ লাখ ৪০ হাজার,  বাকি চার কোটি ৬৮ লাখ ২১ হাজার ৬৭৪ জন কৃষকের মধ্যে বিতরণ করা হয়। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে এখন পর্যন্ত ২৮১ জনের নামে দুই কোটি ৯৩ লাখ ১৩ হাজার টাকা ঋণ বিতরণ করা হয়েছে। এর মধ্যে ২০ জন ব্যবসায়ীর নামে সিসি লোন ৮৭ লাখ ৫০ হাজার এবং ২৬১ জন কৃষকের মধ্যে দুই কোটি পাঁচ লাখ ৬৩ হাজার টাকা বিতরণ করা হয়।
ভুক্তভোগী কৃষক কেশবা গ্রামের আজাহার আলী বলেন, ২০১৬ সালের মার্চ মাসে ব্যাংকে ঋণ করতে গেলে সুপারভাইজার আব্দুর রাজ্জাক তাকে জানান তার কাগজপত্রে সমস্যা থাকায় ঋণ প্রদান করা যাবে না। তাই তিনি নিরুপায় হয়ে ব্যাংকের দালাল ফারুক আহম্মেদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন।
ফারুক তাকে বলেন, আপনি চলে যান আপনার ঋণের ব্যবস্থা আমি করব। কয়েকদিন পরে ফারুক আমাকে বলেন, আপনার নামে ৪০ হাজার টাকা ঋণ হয়েছে। কিন্তু ফারুক আমাকে প্রথম দফায় ১২ হাজার ও দ্বিতীয় দফায় আট হাজার টাকা দিয়ে বলেন বাকি টাকা ব্যাংকে খরচ হয়ে গেছে। আমি অনেক কান্নাকাটি করলে সে বাকি টাকা তো দেয়ইনি এমনকি আমার ঋণের কাগজপত্র চাইলে সে গত দুই বছর যাবৎ কোনো কাগজপত্র দিচ্ছে না।’
চাঁদখানা ইউনিয়নের দক্ষিণ চাঁদখানা দহবন্দ গ্রামের সেল্লাই চন্দ্র রায় বলেন, ‘২০০৯ সালে ব্যাংকে আমি ১০ হাজার টাকা ঋণ করেছিলাম। ১০ হাজার টাকার মধ্যে আমি পেয়েছিলাম পাঁচ হাজার। পরে আবারও ব্যাংকের দালাল মোস্তফা আমাকে জানান, ব্যাংকের লোন পরিশোধ না করলে মামলা হবে। তাই আবারও ২০১৭ সালে আমার নামে পূর্বের ঋণ হালনাগাদ করে ৩০ হাজার টাকা ঋণ করে মাত্র তিন হাজার টাকা দিয়ে আমাকে পাঠিয়ে দেয়। কিন্তু আমাকে কোনো কাগজপত্র দেয়নি।
জানতে চাইলে তৎকালীন ব্যাংক ম্যানেজার ও বর্তমানে রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলা রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক শাখার ম্যানেজার ফিরোজ মোহাম্মদ ফারুক বলেন, ‘ব্যাংকে কার বিষয়ে কোনো আপত্তি এসেছে সেটা আপনি কেমন করে জানেন। এটা তো ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ বিষয়। আপনি কে আপনাকে কেন বলব। যান আপনার কি লেখার আছে লেখেন।’
চাঁদখানা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান হাফিজার রহমান হাফু বলেন, ‘আমার ইউনিয়নের অনেক অসহায় দরিদ্র মানুষের নামে কৃষি ব্যাংক থেকে নোটিস পাঠানো হয়েছে ব্যাংকের ঋণ পরিশোধ করার জন্য।’
রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক কিশোরগঞ্জ শাখার ম্যানেজার আফজালুল হক চৌধুরী বলেন, ‘আমি এ শাখায় গত ২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে যোগদান করেছি। পূর্বে কে কী অনিয়ম করেছে সে বিষয়ে আমি কিছুই বলতে পারব না।’ কতজন কৃষকের ঋণের বিষয়ে অডিট আপত্তি এসেছে প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, ‘২০১৬-১৭ অর্থবছরে যে সমস্ত কৃষকের মধ্যে হালনাগাদ (রিকভারি) ঋণ বিতরণ করা হয়েছিল তাদের মধ্যে থেকে কিছু কৃষকের নামে ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা দল কর্তৃক আপত্তি এসেছে।’
রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকের নীলফামারী জোনাল ম্যানেজার আমিনুল হক বলেন, ‘এ বিষয়ে আমার কাছে কোনো লিখিত অভিযোগ আসেনি। অভিযোগ আসলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।