‘ঘরের বেড়া ঠিক করতে ট্যাহা নাগবো, তা পামু কনে’

ঢাকা, মঙ্গলবার, ৯ আগস্ট ২০২২ | ২৫ শ্রাবণ ১৪২৯

Khola Kagoj BD
Khule Dey Apnar chokh

‘ঘরের বেড়া ঠিক করতে ট্যাহা নাগবো, তা পামু কনে’

সুজন মাহমুদ, রাজীবপুর (কুড়িগ্রাম)
🕐 ২:০৯ অপরাহ্ণ, জুন ২৭, ২০২২

‘ঘরের বেড়া ঠিক করতে ট্যাহা নাগবো, তা পামু কনে’

‘সাতদিন ভইরা ঘর বানের পানিতে ডুইবা আছিল। মাইনসের বাইত্তে আশ্রয় নিয়া থাকছি। ঘরে যে টুক্কা চাইল আছিল তা সাতদিন বইসা খাইছি। কোনো কামকাজ করবার পাই নাই, তাই কামাই রোজগারও নাই। পানি নাইমা গেছে কিন্তুক ঘরের বারোটা বাইজা গেছে। একটা ঘর বানের স্রোতে ভাইসা গেছে। আরেক ঘরের হোলার (পাটখড়ি) বেড়ায় বানের কাদা মাটিতে পইছা গেছে। এহন নতুন করে একটা ঘর তোলা নাগবো।

আরেক ঘরের বেড়া ঠিক করতে যে ট্যাহা নাগবো তা পামু কনে। মোবাইল ফোনে পোলাক (পুত্র) কইছি যে, বানের পানিতে ঘর ভাইসা গেছে। পেটের খাওনই জোটাবার পারি না। মরার বান আমার মেলা ক্ষতি কইরা দিয়া গেছে। কথা গুলো বলছিলেন বন্যার ছোবলে তছনছ হওয়া স্বামীহারা মনোয়ারা বেগম (৫০)। গতকাল রবিবার সরেজমিনে শংক রমাধবপুর বিলপাড়া চরে গেলে কথা হয় তার সঙ্গে।

রাজীবপুর উপজেলার শংকরমাদবপুর বিলপাড়া চরে বন্যায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। ওই চরের প্রায় অর্ধশত দিনমজুর পরিবারের সবাই ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। অনেকের ঘর বন্যার স্রোতে ভেসে গেছে আবার অনেকের ঘরবাড়ি নদে বিলীন হয়ে গেছে। পানি নামছে আর বন্যার ক্ষত চিহ্ন গুলো ভেসে উঠছে। বন্যার স্রোতে ব্রহ্মপুত্র নদের ভাঙ্গনে হারিয়ে গেছে ওই চরের ১০টি পরিবারের ঘরবাড়ি। এতে প্রায় চার'শ মানুষের মাঝে এখন খাদ্য সংকট দেখা দিয়েছে।

মনোয়ারা বেগম আরো বলেন, ‘এহন কি খামু তার কোনো জো নাই। কাইলকা এক কেজি চাইল কর্জ নিছিলাম। এক পোয়ার মতো আছে। এই যে পাটের শাক তুলছি তা দিয়া আইতে খামু। আগামিকাল কি খামু তা জানি না। মাইনসের কাছে হুনি সরকার বানভাসিগো ত্রাণ দিছে, সাহায্য করছে। আমরা তো পাইলাম না। আমগোর চরের সব বাড়িঘর ডুইবা গেছিল।

রাজীবপুর উপজেলার কোদালকাটি ইউনিয়নের শংকর মাধবপুর বিলপাড়া গ্রামের আব্দুল লতিফের স্ত্রী মনোয়ারা বেগম। ২০ বছর আগে কুমিল্লায় কাজ করতে যেয়ে আর ফিরে আসেনি তার স্বামী। কোথায় আছে, নাকি মরে গেছে তাও জানেন না। তার ঘরে একমাত্র পুত্র সন্তান হাফিজুর রহমান ঢাকায় রিক্সা চালায়। বাড়িতে ছেলের বউ ও নাতি আতিক হাসান (৮) নিয়ে মনোয়ারা বেগমের সংসার। মানুষের বাড়িতে ও রাস্তায় মাটি কাটার কামলা দেয় মনোয়ারা বেগম। সঙ্গে ছেলে রিক্সা চালিয়ে যা টাকা পাঠায় তা দিয়ে তাদের সংসারের খরচ চলে। কিন্তু এবারের বন্যায় সব কিছু উলট পালট হয়ে গেছে তাদের। একটানা ৭দিন বন্যার পানিতে ঘর ডুবে ছিল।

বন্যার পানিতে তলিয়ে যায় শংকর মাদধপুর বিলপাড়া চরের জহুরা বেগমের (৫৫) ঘরটিও। পানি কমে যাওয়ার সময় নদের ভাঙ্গনে বিলীন হয়ে যায় ভিটে মাটি। মানুষের সহযোগিতা নিয়ে কোনো রকমে ঘরের চালা উদ্ধার করতে পেরেছিলেন তিনি। ঘরের বেড়া, খাম খোটা ও অন্যান্য জিনিসপত্র হারিয়ে গেছে বন্যার পানিতে। বিলীন হওয়ার পর ঘরের চালা নিয়ে পার্শ্ববর্তি চরে রাখেন। সেখানে খোলা জায়গায় অবস্থান করছেন জহুরা বেগম। ঘরে খাবার নেই, কাছে টাকা নেই। খাবার জোগারে মাঠে নামবেন না ঘর তোলার খরচ জোগাবেন-এমন চিন্তা করে দু’চোখে অন্ধকার দেখছেন তিনি।

সরেজমিনে কথা হয় জহুরা বেগমের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘বানের পানিতে ঘর ডুইবা ছিল ১০ দিনের মতো। মাইনষের বাইত্তে আশ্রয় নিছিলাম। যহন পানি কমতে শুরু করছে তহন একজন কইল নদীতে তোমার ঘর ভাইঙ্গা যাইতেছে। তাড়াহুড়া কইরা যাইয়া দেহি ভিডামাটি গেছে, ঘরও যাওনের মোহে। চিৎকার শুরু করলে মাইনষে আইসা খালি ঘরের চালাটা সরাবার পাইছে। চোহের সামনে সবকিছু হারায় গেল নদীতে। স্বামী আমার অসুস্থ। চলাফেরা করবার পারে না। তাকে ধইরা নিয়া হাকামোতা করন নাগে। এবারের বানে আমার ঘরবাড়ি সবই গেল।

তিনি আরো বলেন, ‘এহন ঘরে খাবার নাই। মাইনষের কাছে ধারকর্জ কইরা ক’দিন টেকা যায়। তাও চরের সবার ঘরেই অভাব। ধারকর্জ দিব কেরা? খাইয়া না খাইয়া দিন রাত যায় আমগোর। বানের পানিতে দুইদিন এক বেলা খাইয়া ছিলাম। কেউ আমগোর খোঁজখবর নেয় নাই। কোনো সাহায্য সহযোগিতাও পাই নাই। নতুন খরে ঘর তোলা নাগবো। খাম খোটা বেড়া ও কামলা খরচ নাই। কোনদিন ট্যাহা জোগাবার পামু, ততদিন খোলা আকাশের নিচেই থাকা নাগবো। আমগোর মতো গরীব বানভাসিগো কষ্ট করে বাঁচা ছাড়া কোনো উপায় নাই। মেম্বার চেয়ারম্যান রিলিফ দিব তাগরে চেনা মানুষগো। দ্যাশের প্রধান মন্ত্রীকে কইয়েন আমগোর কষ্টের কথা।

 
Electronic Paper